পেট বোতলের পুনর্ব্যবহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

0
62

পেট বা পিইটি, যাকে আমরা তরল খাদ্য ও পানীয় সরবরাহে এক যুগান্তকারী সহজলভ্য এবং সস্তা ব্যবহার উপযোগী পাত্র হিসেবে জানি, তার পুনর্ব্যবহার ঘটাতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। পেট বোতল হচ্ছে বর্তমান পৃথিবীর বহুল ব্যবহূত একটি প্লাস্টিকপণ্য, যা একটি পলিয়েস্টার দ্রব্য। জন রেক্স উইনফিল্ড, টেনান্ট ডিকসন ও দ্য ক্যালিকো প্রিন্টার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান ১৯৪১ সালে প্রথম এ পেট নামক দ্রব্যের পেটেন্ট লাভ করে। আবিষ্কারের প্রায় ২৬ বছর পর ১৯৬৭ সালের দিকে নাথানিয়েল সি. ওয়েথ প্রথম কার্বনেটেড পানীয় সংরক্ষণের জন্য পেট বোতল ব্যবহার করেন। স্ট্যাটিস্টার (দ্য স্ট্যাটিসটিকস পোর্টাল) তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে সারা পৃথিবীতে ৪৮৫ বিলিয়নের মতো পেট বোতল উৎপাদন হয় এবং যা ২০২১ সালে ৫৮৩ দশমিক ৩ বিলিয়নের মতো হবে বলে ধারণা করা হয়।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় যেকোনো দ্রব্যের আবিষ্কার ও একে ব্যবহার উপযোগী করে তোলার পর এর ব্যবহারের পরিধি, সময়োপযোগিতা, পরিবেশে তার প্রভাব এবং মানুষ ও পশুস্বাস্থ্যের দিক বিবেচনা করে তার উত্তরোত্তর উন্নতির জন্য গবেষণা অব্যাহত রাখা হয়। যদিও এ পেট বোতল ব্যবহারে হেলথ কানাডা ও আমেরিকা ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদন রয়েছে, কিন্তু অনুন্নত দেশগুলোয় উন্নত দেশের মতো পেট বোতল প্রস্তুত ও খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের প্রক্রিয়ার যে মানদণ্ড রয়েছে তা অনুসরণ করা হয় কিনা, এটি নির্ভর করে তদারক প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্দিষ্ট সময়ান্তে নিয়মানুযায়ী তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা এবং সঠিক আইন প্রয়োগের ওপর।

পেট বোতল বা পলি ইথিলিন টেট্রাপথ্যালেট দ্বারা তৈরি বোতল যদিও খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় সরবরাহ এবং সংরক্ষণে সবচেয়ে সময়োপযোগী ও অনুমোদিত নিরাপদ (নিরাপদ স্তর বা সেফটি লেভেল ১) উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়, তবু একই বোতলের বারবার ব্যবহারে সতর্ক থাকার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আর অনুন্নত দেশগুলোয় এ পেট বোতল বা অন্যান্য প্লাস্টিকদ্রব্যের মানদণ্ড সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হয় কিনা, তা ভেবে দেখা খুবই জরুরি। কারণ বিভিন্ন ধরনের পলিয়েস্টার দ্রব্যকে বিভিন্ন বস্তুর সংরক্ষণ ও সরবরাহে ব্যবহার অনুমোদন নির্ভর করে বস্তুর ধরন ও সরবরাহের সময়কালের ওপর, যা আমাদের অনেকেরই অজানা। খাদ্যদ্রব্যের বিভিন্নতার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর সংরক্ষণে ব্যবহূত বিভিন্ন প্লাস্টিকদ্রব্যের গুণগত মান যেমন আলাদা হতে থাকে, তেমনি এ প্লাস্টিকদ্রব্যের একই কাজে পুনর্ব্যবহারে নিরাপদ স্তরের মানও আলাদা হতে থাকে। তরল খাদ্যদ্রব্য যেমন— জুস, তরল দই, দুধ ইত্যাদি সংরক্ষণের জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন গ্রেডের প্লাস্টিকদ্রব্য ব্যবহার করে, যা বিশুদ্ধ পানি ও কার্বনেটেড পানীয় থেকে অনেকটাই আলাদা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভাবনার বিষয় হলো, ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অননুমোদিত ও নামসর্বস্ব খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান; যা এরই মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হয় না কোনো মানদণ্ড এবং বস্তুভেদে প্লাস্টিকের গুণগত ভিন্নতা। তাপমাত্রা ও সংরক্ষণের সময়কালের ওপর নির্ভর করে প্লাস্টিকদ্রব্য থেকে নিঃসরণ হয় বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক। আপাতদৃষ্টিতে এ রাসায়নিকের তাত্ক্ষণিক কোনো প্রভাব দেখা না গেলেও এর রয়েছে ক্যান্সার, বন্ধ্যত্ব, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হূদরোগ ও গর্ভপাতের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বর্তমান সময়ে বাসাবাড়িতে বিভিন্ন কাজে বিভিন্নভাবে একই পেট বোতল ও প্লাস্টিক বোতলগুলো বারবার ব্যবহার হয় এবং আমরা অতিমাত্রায় যত্নশীল হয়ে সন্তানের স্কুলব্যাগে পানি সরবরাহে বারবার একই বোতল ব্যবহার করি। বহুদিন ব্যবহারের ফলে পেট বোতল থেকে নিঃসৃত অ্যান্টিমনি ও বিস-ফেনল পানির সঙ্গে মিশে এর গুণাগুণ নষ্ট করে। আর দিনের পর দিন এই একই বোতলে পানি সরবরাহ করার ফলে আমাদের অজান্তেই এসব বিষাক্ত রাসায়নিক ঢুকে পড়ছে শরীরে, যা কিছুদিন পর তৈরি করতে পারে মারাত্মক রোগ। পুনর্ব্যবহারে ক্ষতির কথা মাথায় রেখেই হয়তো পানীয় উৎপাদনকারী কোম্পানি বোতলের গায়ে সতর্কতামূলক একটি বাক্য জুড়ে দেয়— ‘please crush after use.’ যা সর্বদা আমাদের চোখের অগোচরে থেকে যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৩২টি ব্র্যান্ডের পানির বোতলের ওপর একটি গবেষণায় ২০০৯ সালে ‘সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট’ নামের জার্নালে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, পকেট ফ্লাক্স ব্যবহারে সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন; যা থেকে নিঃসৃত হতে পারে থেলিয়াম ও অ্যান্টিমনির মতো রাসায়নিক। নিঃসৃত এ রাসায়নিকের মাত্রা নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি। একই জার্নালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে শুধু পেট প্লাস্টিক বোতল সম্পর্কিত গবেষণায় ওই বোতল থেকে অ্যান্টিমনির নিঃসরণ নিশ্চিতভাবে বলা হয়, যা তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায়। তাপমাত্রা ও মাইক্রোওয়েভের ওপর নির্ভর করে অ্যান্টিমনি রাসায়নিকের নিঃসরণের ব্যাপারে তথ্য আছে ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ’ নামের জার্নালে ২০১০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রেও। তবে চীনে পরিচালিত একটি গবেষণায় বলা হয়, শুধু অ্যান্টিমনিই নয়, পাশাপাশি পেট বোতল থেকে নিঃসৃত হতে পারে বিস-ফেনল-এ নামের ক্ষতিকর রাসায়নিক; যা প্রকাশিত হয় ‘এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন’ নামে জার্নালের ২০১৪ সালের একটি গবেষণাপত্রে। তবে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, ‘ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে’ থেকে বলা হয়, পেট বোতল থেকে নিঃসৃত ‘বিস-ফেনল-এ’র মাত্রা ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশে এ ক্ষতিকর রাসায়নিকের কম মাত্রায় নিঃসরণের কারণ হিসেবে ‘ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে’ উল্লেখ করেছে তাদের খাদ্য ও পানি প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত প্লাস্টিকের মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা অনুসরণকে। যুক্তরাজ্যের এ নীতিমালা অনুসরণের বিষয়টিকে আমাদের দেশের খাদ্য ও পানি প্রক্রিয়াকরণে মানদণ্ড নির্ধারণ এবং এর প্রয়োগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কোনো কারণ নেই। এ অবস্থায় এ বিষয়ে খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় প্রক্রিয়ার যথাযথ মানদণ্ড নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো ও জনসচেতনতা তৈরি অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।

আজিজুল হাকিম: শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পিএইচডি গবেষক, সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

LEAVE A REPLY