গাঁজানো রসুন-মধু : উত্তম ভেষজ প্রতিকার

গাঁজানো রসুন-মধু : উত্তম ভেষজ প্রতিকার

রসুন ও মধুর মিশ্রণ হলো এক উত্তম ভেষজ প্রতিকার, যা সর্দি-কাশি নিরাময়ের পাশাপাশি ওজন হ্রাস করতে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই মিশ্রণের প্রাকৃতিক যৌগ রয়েছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে দেহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

রসুন ও মধু

রসুনে অ্যালিসিন রয়েছে, একটি অর্গানসালফার যৌগ, যা প্রতিরোধের মাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে। প্রাকৃতিক গবেষণায় বলা হয়, রসুন থেকে অর্গানসালফার যৌগিক সম্ভাব্যভাবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও কার্ডিওপ্রোটেক্টিভ ক্রিয়াকলাপগুলো থাকে।

মধুতেও এমন জৈব যৌগ থাকে, যা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল বৈশিষ্ট্যযুক্ত। ফলে রসুন ও মধু—এ দুটি উপাদান একত্র হলে শরীরে প্রতিরোধব্যবস্থা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। এ জন্য এই মিশ্রণ একটি শক্তিশালী ঘরোয়া উপায় হিসেবে বিবেচিত। ভেষজ প্রতিকার হিসেবে রসুন ও মধু রাখার সর্বাধিক সাধারণ উপায় সম্পর্কে জানানো হলো।

গাঁজানো রসুন-মধুর রেসিপি

উপকরণ

রসুনের কোয়া ১২টি, মধু ২৫০ গ্রাম
(পরিমাণ বেশিও করতে পারেন কিন্তু এই অনুপাতে করতে হবে।)

প্রণালি

গাঁজানো রসুনের মধু তৈরি করতে একটি পরিষ্কার হিটারপ্রুফ গ্লাস জার নিন। সেই জারে খোসা ছাড়ানো রসুনের কোয়া দিন। এবার এর মধ্যে মধু ঢেলে দিন। মুধ এমনভাবে ঢালুন, যাতে রসুনের কোষগুলো যেন মধুতে ডুবে যায়। এরপর জারের মুখটি ভাল সুতি কাপড় দিয়ে বেঁধে তিন দিন রেখে দিন।

তিন দিন পর জারের কাপড় খুলে চা–চামচ দিয়ে রসুনগুলো নেড়ে দিন। আবার মুখ বেঁধে রেখে দিন আরও এক সপ্তাহ। এরপর আবারও জারের মুখ খুলে রসুনগুলো নেড়ে দিন। এভাবে আরও তিন সপ্তাহ করুন। মোট এক মাস সময় হলেই রসুন-মধু ফারমান্টেড হয়ে খাবার উপযুক্ত হয়ে যাবে। এই গাঁজানো রসুন-মধুর জারটিকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখতে হবে। কোনোভাবেই গরম করা যাবে না, গরম জায়গায় রাখা যাবে না, এমনকি ফ্রিজেও রাখা যাবে না।

ব্যবহারবিধি

গাঁজানো রসুন-মধু টনিকটি দিনের যেকোনো সময় খেতে পারবেন। দিনে এক কোয়া রসুনসহ এক চা–চামচ মধু সেবনযোগ্য।

উপকারিতা

বিকল্প প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ড্রাগ

২০১৩ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে তাজমা মধুর (স্টিংলেস মৌমাছির ইথিওপিয়ায় উত্পাদিত মধু) সঙ্গে মিশ্রণে রসুনের যে শক্তিশালী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণ রয়েছে, তা গবেষকেরা উদ্ঘাটন করেন। তাঁরা দেখতে পান যে রসুন-মধুর মিশ্রণ সালমোনেল্লা, স্টাফিলোকক্কাস অরিয়াস, লায়রিয়া মনসিটিজেনস ও স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর।

ভেষজ টনিক এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে, যা প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণ করে। অন্য একটি গবেষণায় এই ফলাফলের সত্যতা নিশ্চিত করেছে এবং এ–ও প্রমাণ করেছে যে যখন গাঁজানো রসুন-মধু একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তখন তারা একে অপরের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘায়িত বা উন্নত করে, নিজের গুণকে বৃদ্ধি করে।

গাঁজানো রসুন-মধু সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হ্রাস

রসুন, তাজা, গুঁড়া—বিভিন্নরূপে দীর্ঘকাল ধরে শক্তিশালী প্রাকৃতিক খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যা হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা যায়, রসুন রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি রক্ত জমাট বাঁধাও প্রতিরোধ করে। একইভাবে মধু ফিনলিক যৌগে সমৃদ্ধ, যা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে ও কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে। এ কারণে হৃদরোগজনিত সমস্যায় গাঁজানো রসুন-মধু অনেক বেশি ঔষধি হিসেবে কাজ করে, রক্ত সাবলীল থাকার কারণে হার্টে ব্লক হওয়ার প্রবণতা কমে যায়। যাদের ব্লক আছে, তা আর বাড়তে দেয় না। হার্টরেট ঠিক রাখে, যাতে শরীরে কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয়।

প্রাকৃতিক ঠান্ডা ও ফ্লু থেকে মুক্তি দেয়

মধুর শক্তিশালী অ্যান্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রসুনের প্রধান উপাদান অ্যালিসিন শরীরের শ্বেত রক্ত কোষে রোগ প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়া উন্নত করতে সহায়তা করে। বিশেষত, যখন তাদের মধ্যে সাধারণ সর্দি ও ফ্লু হওয়ার কারণ রয়েছে, এমন ভাইরাসের মুখোমুখি হয়। গাঁজানো রসুন, বিশেষত সর্দি ও ফ্লুর তীব্রতা হ্রাস করতে সহায়তা করে। যাঁরা বছর ধরে ঠান্ডা বা ফ্লুতে আক্রান্ত থাকেন, তাঁদের জন্য এটা বিকল্প ওষুধ হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত খেলে আস্তে আস্তে ঠান্ডা লাগার প্রবণতা কমে আসবে। শিশুদের ঠান্ডা লাগার ক্ষেত্রেও বিশেষ উপকারী।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে
আমরা জানি, আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার একটি বড় আশ্রয় হলো আমাদের শরীরে ইমিউন সিস্টেম। এই ইমিউন সিস্টেমকে সঠিক রাখার জন্য গাঁজানো রসুন-মধু বিশেষ ভূমিকা রাখে। আমাদের শরীরে রক্তপ্রবাহ ও শরীরে পিএইচের মাত্রা স্থিতিশীল রেখে ইমিউন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে, যা আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের দুর্গ তৈরি করতে সহায়তা করে।

অন্যান্য স্বাস্থ্যসুবিধার মধ্যে রয়েছে

• ওজন হ্রাস-বৃদ্ধি করতে পারে।
• মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে।
• ইরেকটাইল ডিসফাংশনের প্রাকৃতিক নিরাময় হিসেবেও কাজ করে।
• মুড ভালো রাখে।
• শরীরে কফ জমতে পারে না, যা শিশুদের খুবই প্রয়োজন।
• রক্তে চিনির প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে মাথা ঠান্ডা রাখে।
• স্মরণশক্তি হ্রাসের প্রবণতা কমায়।
• এনার্জি লেবেল বজায় রাখে।

আরেকটা দিক দেখে নেওয়া ভালো

সাধারণত, ভেষজ প্রতিকার হিসেবে মধুতে রসুন অল্প পরিমাণে থাকে। এই মিশ্রণ ক্ষতিকারক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে না। আপনার নিশ্বাসে দুর্গন্ধ বা সম্ভবত শরীরের গন্ধ থাকতে পারে। অতিরিক্ত পরিমাণে, কাঁচা রসুন অম্বল বা অস্থির পেটের কারণ হতে পারে। রসুন ও মধু উভয়ই নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। পরাগজনিত অ্যালার্জি যাদের আছে, তাদের মধু খাওয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। মধুতে প্রাকৃতিক চিনি থাকে; তাই ডায়াবেটিসের রোগীদের পরিমিত খাওয়া উচিত।

এই গাঁজানো রসুন-মধুর উপকার পেতে হলে খাঁটি মধুর বিকল্প নেই। আর দেশি এক কোয়া রসুন আদর্শ।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

গাঁজানো রসুন-মধু সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

ওষুধমুক্ত জীবনের জন্য গ্লাইসেমিক সূচক জানা জরুরি

ওষুধমুক্ত জীবনের জন্য গ্লাইসেমিক সূচক জানা জরুরি

আধুনিক চিকিৎসায় ডায়াবেটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; মানুষ এখন ডায়াবেটিস নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। অথচ ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা সুগার লেভেলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মানুষের নানা ধরনের রোগের গভীরে প্রভাব বিস্তার করে; যা এমনকি মানুষের জীবন হরণের কারণও হতে পারে। বিশেষ করে কিডনি বিপর্যয়, দৃষ্টিশক্তি হারানো, দাঁত ও ত্বকে প্রভাব ইত্যাদি। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুগার লেভেলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সুগার লেভেল সঠিক মাত্রায় রাখার জন্য ইনসুলিন ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম উপায় বলে স্বীকৃত।

ডায়াবেটিস রোগে যাঁরা ভুগছেন এবং যাঁদের রক্তে চিনির মাত্রা বেশি থাকে, তাঁদের কার্বোহাইড্রেট কম খেতে বলা হয়। কিন্তু কার্বোহাইড্রেট আমাদের প্রধান খাদ্য উপাদান, তাই কার্বোহাইড্রেট খেতেই হবে। আর কার্বোহাইড্রেট সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, কোলাজেনের কারণে রক্তের চিনি কোষে পৌঁছায় না। যখন আমরা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাই, আমাদের শরীর কার্বোহাইড্রেট থেকে চিনি ও শ্বেতসার ভেঙে শর্করা বা গ্লুকোজ তৈরি করে, যা রক্তের সঙ্গে মিশে যায়।

আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা ইনডেক্স মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীদেরও সুগার লেভেল বাড়বে না। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট–জাতীয় খাবার খেলেও সেটা হবে না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই ইনডেক্স মেনে চলতে পারলে ওষুধমুক্ত থাকা সম্ভব বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অভিমত।

ডায়াবেটিসকে বলা হয় লাইফস্টাইল ডিজিজ। লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে টাইপ টু ডায়াবেটিসে খাদ্য ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে ওষুধমুক্ত জীবন যাপন করা সম্ভব। এই লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে যে জ্ঞান জরুরি, তা হচ্ছে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সম্পর্কে জানা। আমরা যে খাবার গ্রহণ করি, তার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বলে একটি সূচক আছে; যার ইনডেক্স যত বেশি থাকে, তা ততই শরীরের জন্য খারাপ।

আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা ইনডেক্স মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীদেরও সুগার লেভেল বাড়বে না। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট–জাতীয় খাবার খেলেও সেটা হবে না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই ইনডেক্স মেনে চলতে পারলে ওষুধমুক্ত থাকা সম্ভব বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অভিমত।

তাহলে কোন কার্বোহাইড্রেট খাব?

প্রতিদিনের ক্যালরির প্রায় ৪৫–৬৫ ভাগ আসা উচিত কার্বোহাইড্রেট থেকে। কার্বোহাইড্রেট থেকে আমরা এনার্জি বা ক্যালরি পাই, যা আমাদের কোষের শক্তি, দৈহিক তেজ, কর্মক্ষমতা, তাপ উৎপাদন ও চর্বি গঠনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। এ–জাতীয় খাবারই আমাদের দেহ গঠন ও দেহ সংরক্ষণের প্রধান উপাদান। আমাদের দেহে প্রতি ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ৪.১ ক্যালরি দেয়।

বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে, যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি থাকে, সেসব কার্বোহাইড্রেট রক্তে তাড়াতাড়ি মিশে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, আর যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম বা মাঝারি থাকে, সেগুলো রক্তে তাড়াতাড়ি মিশে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে না। তাই যাঁদের শরীরে ব্লাড সুগার সাধারণের চেয়ে বেশি, তাঁদের যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি থাকে, তা কম খাওয়া ভালো।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের প্রকারভেদ

সাধারণভাবে, কোনো খাবার যত বেশি প্রক্রিয়াজাত হয়, তত বেশি তার জিআই হয় এবং কোনো খাবারে ফাইবার বা ফ্যাট বেশি থাকলে জিআই কম হয়।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তিন প্রকারের হয়—নিম্ন, সহনীয় ও উচ্চ। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স, এটি আপনার রক্তে শর্করার উত্থানকে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ করে, তার ওপর ভিত্তি করে একটি খাদ্যকে একটি সংখ্যা বা স্কোর দেয়। খাঁটি গ্লুকোজকে (চিনি) ১০০-এর মান দেওয়া হয়, এমন খাবারগুলো শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে র‌্যাঙ্ক করা হয়। কোনো খাবারের গ্লাইসেমিক সূচক যত কম হয়, সেই খাবার খেয়ে ধীরে ধীরে রক্তে শর্করার উত্থান ঘটে। সাধারণভাবে, কোনো খাবার যত বেশি প্রক্রিয়াজাত হয়, তত বেশি তার জিআই হয় এবং কোনো খাবারে ফাইবার বা ফ্যাট বেশি থাকলে জিআই কম হয়।

এবার জানতে হবে কোন কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা কতটা আছে। নিচে অনেকগুলো কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা কত তা দেওয়া হলো।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা ধরা হয় নিম্ন ৫৫-এর নিচে, সহনীয় ৫৬ থেকে ৬৯, উচ্চ ৭০ থেকে ওপরে

  • সাদা ময়দার রুটি ৭৫-৭৭
  • লাল গমের আটার রুটি ৫৩-৫৫
  • ময়দার পরোটা ৭৭-৮০
  • ঘরে বানানো লাল আটার চাপাতি ৫২-৫৬
  • সাদা চালের ভাত ৭৩-৭৭
  • লাল চালের ভাত ৬৮-৬৯
  • বার্লিতে মাত্র ২৮ (যা খুবই নিরাপদ)
  • মিষ্টি ভুট্টা ৫২-৫৭
  • চালের নুডলস ৫৩-৬০
  • কর্নফ্লেক্স ৮১-৮৭
  • বিস্কুট ৬৯-৭১
  • ওটস ৫৫-৫৭
  • ইনস্ট্যান্ট ওটস ৭৯-৮২

ফল

  • আপেল ৩৬-৩৮
  • কমলা ৪৩-৪৬
  • কলা ৫১-৫৪
  • আনারস ৫৯-৬৭
  • আম ৫৬-৫৯
  • তরমুজ ৭৬-৮০
  • খেজুর ৪২-৪৬তবে ফলের জুস করলে ইনডেক্স বেড়ে যায়

সবজি

  • আলু ৮৭-৯১
  • গাজর ৩৯-৪৩
  • মিষ্টি আলু ৬৩-৬৯
  • মিষ্টিকুমড়া ৬৪-৭১
  • কাঁচকলা ৫৫-৬১
  • মিক্সড ভেজিটেবল সুপ ৪৮-৫৩ (টেস্টিং সল্ট ছাড়া)

দুগ্ধজাত খাদ্য

  • পূর্ণ ননীযুক্ত দুধ ৩৯-৪২
  • ননীমুক্ত দুধ ৩৭-৪১
  • আইসক্রিম ৫১/৫৪
  • দই ৪১/৪৩
  • সয়ামিল্ক ৩৪/৩৮

অন্যান্য

  • ডার্ক চকলেট ৪০-৪৩
  • পপকর্ন ৬৫-৭০
  • পটেটো চিপস ৫৬-৫৯
  • রাইস ক্র্যাকার্স ৮৭/৮৯
  • সফট ড্রিংকস ৫৯-৬২
  • সাধারণ চিনি ১০৩-১০৬
  • মধু ৬১-৬৪এই তালিকা ধরে খাওয়ার ক্ষেত্রে ইনডেক্স মেনে চলা যায় তাহলে ডায়াবেটিস রোগীদের সুগার লেভেল আস্তে আস্তে কমতে থাকবে এবং হয়তো একসময় ইনসুলিনের প্রয়োজন না–ও হতে পারে। তাই কম ইনডেক্সের খাবার গ্রহণের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

    লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ।

রোগ সারাতে হলুদের কার্কিউমিন

রোগ সারাতে হলুদের কার্কিউমিন

আদিকাল থেকে আমরা হলুদের নানা ধরনের ব্যবহার দেখে আসছি—রূপচর্চা, রান্না, ব্যথা নিবারণ ইত্যাদিতে। তবে ঔষধিগুণের কারণে ওষুধ হিসেবেও এর ব্যবহার হয়ে আসছে। হলুদে আছে কিছু বিশেষ উপাদান, যা শরীরের অনেক সমস্যার কার্যকরী সমাধান। হলুদে অ্যান্টি–ইনফ্লামেশন, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, অ্যান্টিসেপটিক, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও কার্কুমিন উপাদান আছে, যা আমাদের শরীরের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন এমন রোগের ক্ষেত্রে।

হলুদে তিনটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হলো কার্কিউমিন, ডেমথক্সাইকুরকুমিন এবং বিসডেমেথক্সাইকুরকুমিন। এর মধ্যে কার্কিউমিন হলো স্বাস্থ্যের পক্ষে সর্বাধিক সক্রিয় এবং সবচেয়ে উপকারী যার বিশ্বাসযোগ্য উৎস হলো হলুদ। বেশির ভাগ হলুদে প্রায় ২-৮ শতাংশ প্রতিনিধিত্বকারী কার্কুমিন হলুদকে তার স্বতন্ত্র রং এবং স্বাদ দেয়; কার্কিউমিন তার প্রদাহবিরোধী, অ্যান্টিটিউমার এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট প্রভাবগুলোর জন্য পরিচিত।

এগুলো আমরা নানাভাবে আমাদের প্রয়োজনে স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব, তা জানিয়ে দেওয়া হলো:

ক্যানসার প্রতিরোধে

নিয়মিত হলুদের গুঁড়া খেলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়; বিশেষ করে ক্যানসার প্রতিরোধ করে। ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি এবং ছড়িয়ে পড়া রোধে হলুদ সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি মুখগহ্বরের ক্যানসার রোধে খুবই কার্যকরী।

শ্বাসজনিত সমস্যা

যাঁদের অ্যাজমা ছাড়াও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য হলুদের গুঁড়া অত্যন্ত উপকারী; নিয়মিত হলুদগুঁড়া গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে প্রতিদিন রাতে শোয়ার আগে খেলে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

লিভারের ইনফেকশন

লিভারের ইনফেকশন আছে, জন্ডিস হয়ে থাকলে প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে এক কাপ গরম পানির সঙ্গে এক চা–চামচ হলুদগুঁড়া মিশিয়ে খেলে লিভারের ইনফেকশন কমে যায়, এই চিকিৎসা দীর্ঘ মেয়াদে করতে হয়। আবার সকালে খালি পেটে দুই চা–চামচ কাঁচা হলুদের রস খেলে লিভারে বাইলের উৎপাদন বেড়ে যায়। এই বাইলই শরীর থেকে বিষ, বর্জ্য নির্মূল করতে ভূমিকা পালন করে। এই বাইল দেহ থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোলেস্টেরল বের করে দেয় এবং পাকস্থলী থেকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে।

টক্সিন মুক্ত করতে

যদি শরীর অসুস্থ হয়ে যায় অথবা নানা রকম রোগের উপসর্গ দেখা দেয়, তবে দেহকে সম্পূর্ণ টক্সিনমুক্ত করলে সব রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালে এবং রাতে হলুদগুঁড়া এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে খেতে হবে।

শিশুদের লিউকেমিয়া সারায়

শিশুদের লিউকেমিয়া এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, বিশেষত অ্যান্টিবায়োটিক নিয়মিত খাওয়ার ফলে শিশু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য অ্যান্টিবায়োটিকে আর কাজ হচ্ছে না। এমন শিশুদের জন্য কাঁচা হলুদের রস এক চা–চামচ কুসুম গরম পানি ও মধু মিশিয়ে খেতে হবে, দীর্ঘ মেয়াদে কাঁচা হলুদ খেলে লিউকেমিয়া সেরে যায়।

আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোধে সাহায্য করে

গাঁটের প্রদাহ আর্থ্রাইটিসের একটি প্রচলিত কারণ। হলুদের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি–ইনফ্লামেটরি বা প্রদাহরোধী গুণ। এটি আর্থ্রাইটিস রোধে সাহায্য করে। হলুদে উপস্থিত কারকুমিন বিভিন্ন ক্রনিক (যেসব রোগ প্রতিকার করা যায় না) রোগের চিকিৎসায় বেশ কার্যকর। দেড় ইঞ্চি থেকে দুই ইঞ্চি কাঁচা হলুদের তরল নির্যাস ১৫-১৬টি কালো গোলমরিচগুঁড়া গরম পানিসহ চায়ের মতো সকালে খালি পেটে খেলে আর্থ্রাইটিসজনিত সমস্যা দূর হবে।

ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ দূর করে

কম সময়ের প্রদাহ শরীরের জন্য উপকারী এবং এটি রোগের সঙ্গে লড়াই করে। তবে দীর্ঘ সময়ের প্রদাহ বা ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন জীবননাশের কারণও হয়। হলুদ এই দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ দূর করতে সাহায্য করে। সকালে কাঁচা হলুদের রস এক চা–চামচ কুসুম গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাবেন এবং রাতে হলুদের গুঁড়া গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন দূর হয়ে যায়।

মস্তিষ্ককে কার্যক্ষম রাখে

BDNF (Brain-derived neurotrophic factor) হরমোন অথবা ব্রেন-ডিরাইভড নিউরোট্রোপি মস্তিষ্কে নিউরনের ভাগ এবং সংখ্যা বৃদ্ধিতে কাজ করে, যা মস্তিষ্কের রোগের ঝুঁকি কমায়। বয়স বাড়লে মস্তিষ্কের এই কার্যকারিতা কমে যায়। যদি খাদ্যতালিকায় হলুদ থাকে, এই হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে, স্মৃতিশক্তি এবং বুদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। সকালে কাঁচা হলুদের রস এক চা–চামচ কুসুম গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাবেন এবং রাতে হলুদের গুঁড়া গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হবে।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়

রক্তনালির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত হয়, এতে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে। খাদ্যতালিকায় হলুদ থাকলে রক্তনালির কার্যক্রম ভালো থাকে। এর ফলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমে। সকালে কাঁচা হলুদের রস এক চা–চামচ কুসুম গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হবে এবং রাতে হলুদের গুঁড়া গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হবে।

হলুদের গুণ পেতে হলে অবশ্যই গুঁড়ার ক্ষেত্রে প্যাকেটজাত হলুদ না নিয়ে খোলা হলুদ কিনে নিজেই পিষে নিন, তাতে ভালো ফল পাওয়া যাবে। কাঁচা হলুদের ক্ষেত্রে ফ্রিজে না রেখে পেস্ট করতে পারলে ভালো। আর যদি অর্গানিক হলুদ পাওয়া যায়, সেটায় ভালো ফল পাওয়া যাবে। হলুদ ঔষধিগুণে ভরা; এর নির্দিষ্ট ডোজ আছে তাই অতিরিক্ত খেলে পেটের সমস্যা তৈরি হয়। এ জন্য অতিরিক্ত না খেয়ে বর্ণিত ডোজে খাওয়া উত্তম।
অনেকে হলুদ গায়ে মাখেন, এটা আয়ুবের্দিক মতে বহুগুণের, বিশেষ করে শরীরে কোনো ধরনের শুষ্ক চর্মরোগ থেকে থাকে তার জন্য ভালো। সপ্তাহে দুই দিন গায়ে মাখলেই যথেষ্ট।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ