জাগতিক ও প্রাকৃতিকগত কারণে মানুষ বর্তমানে বিভিন্ন রোগ ব্যাধীর সম্মুখীন হচ্ছে। তেমনই এক রোগ ভ্যারিকোস শিরা বা ভ্যারিকোস ভেইন। এই রোগের ফলে, শিরাগুলি বৃহৎ আকারে ফুলে যায় এবং পাকানো শিরাগুলি সাধারণত আমাদের পা-কে প্রভাবিত করে। অনুমানিক প্রায় ২৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্করা ভ্যারিকোস শিরা দ্বারা আক্রান্ত হন। তবে, মহিলাদের মধ্যে এই রোগের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কি এই রোগ, কেনই বা হয়, এর প্রকৃত কারণ কী, এই সমস্ত উত্তর পেতে পড়ুন আজকের নিবন্ধটি।

Varicose Veins

ভ্যারিকোস ভেইন কি ও কেন হয়? ভ্যারিকোস ভেইন হল রক্তনালীর একটি সাধারণ রোগ। ত্বকের নীচে জন্মানো ফোলা ও প্যাঁচানো শিরাকে ভ্যারিকোস ভেইন বলে। এই রোগ শরীরের যেকোনও অংশেই দেখা দিতে পারে। তবে, সাধারণত পায়ে ভ্যারিকোস ভেইন দেখা দেয়। মানব দেহের পায়ের শিরাগুলি দুই সারিতে বিভক্ত থাকে। এই দুই সারির মাঝে থাকে সংযোগকারী আন্তঃশিরা। এই শিরাগুলির একমুখী ভালভ্ রয়েছে, যার অর্থ রক্ত কেবল এক দিকে ভ্রমণ করতে পারে। রক্ত প্রবাহকালে কোনও কারণে যদি শিরার রক্ত নিয়ন্ত্রণকারী ভাল্ব ঠিকমতো কাজ না করে কিংবা গাত্রগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রক্ত পিছনের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রক্ত হৃদপিণ্ডে ভ্রমণের পরিবর্তে শিরাগুলিতে সঞ্চারিত হতে থাকে। ফলস্বরূপ, রক্তনালিগুলি ফুলে ওঠে এবং প্রসারিত হয়। একেই ‘ভ্যারিকোস ভেইন’ বলে।

ভ্যারিকোস ভেইন-এর লক্ষণগুলি
১) শিরাগুলির আকার বড় হয় এবং ফুলে যায়।
২) গাঢ় বেগুনি বা নীল রঙের শিরার জন্ম নেয়।
৩) ত্বকে ক্ষতর সৃষ্টি হয়।
৪) সারা শরীরে ব্যথা এবং অস্বস্তি অনুভব হয়।
৫) পায়ে অসহ্য ব্যথা হয়।
৬) পায়ের মাংসপেশীতে টান ধরা বা খিঁচুনি হওয়া।
৭) পায়ের পাতায় বা পায়ের ত্বকে ইনফেকশনের লক্ষণ দেখা দেয় এবং পায়ে শক্ত পিন্ড দেখা দেয়।
৮) পায়ের ত্বকের চারপাশে ফুসকুড়ি ও লালচে ভাব হতে পারে। ৯) দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার বা দাঁড়িয়ে থাকার পরে চরম ব্যথা অনুভব হওয়া।

ভ্যারিকোস ভেইনের ঝুঁকির কারণগুলি
১) বার্ধক্যজনিত কারণ – বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভ্যারিকোস ভেইনে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা দেয়। কারণ, বার্ধক্যজনিত কারণে শিরার ভালভ্ দুর্বল হয়ে পড়ে।
২) লিঙ্গ – মহিলাদের ক্ষেত্রে এই রোগের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায়, মাসিকের আগে বা মেনোপজের সময় হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। কারণ, মহিলাদের হরমোন শিরার প্রাচীরকে শিথিল করে। এছাড়াও, জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ি গ্রহণের ফলে ভ্যারিকোস ভেইন হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
৩) পারিবারিক ইতিহাস – যদি আপনার পরিবারের সদস্যদের ভ্যারিকোস ভেইন থাকে তবে আপনারও সেটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
৪) স্থূলতা – স্থূলত্বের কারণে শিরাগুলিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
৫) গর্ভাবস্থা – যখন কোনও মহিলা গর্ভবতী হন, তখন দেহে রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা সেই মহিলার পায়ে ফোলা শিরা সৃষ্টি করতে পারে।
৬) দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা – আপনি যদি দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন বা বসে থাকেন তবে রক্ত ভালভাবে প্রবাহিত করতে অক্ষম হয় যার কারণে ভ্যারিকোস ভেইনের দেখা দেয় ।

চিকিৎসা
নিজের যত্ন নেওয়া এবং সংক্ষেপণ স্টকিংস হল ভ্যারিকোস ভেইন এর চিকিৎসা পদ্ধতি। যদি এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলির সাথে অবস্থার উন্নতি না হয় তবে, চিকিৎসক নিম্নলিখিত চিকিৎসা বিকল্পগুলির পরামর্শ দেবেন –
স্ক্লেরোথেরাপি (Sclerotherapy) – এটি একটি দ্রবণ। সাধারণত একটি লবণের সমাধান। এর মাধ্যমে সরাসরি শিরায় ইনজেকশনের ব্যবস্থা করা হয়। এটি রক্তনালীগুলিকে নাড়া দেয় এবং রক্তকে স্বাস্থ্যকর শিরাগুলির মাধ্যমে ভ্রমণ করতে বাধ্য করে। দাগযুক্ত শিরাটি স্থানীয় টিস্যুতে পুনরায় সংশ্লেষিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত এটি ম্লান হয়ে যায়।
লেজারের চিকিৎসা (Laser treatment) – এই চিকিৎসা পদ্ধতিটির সাহায্যে ছোট ভ্যারিকোস ভেইন বন্ধ করতে ব্যবহৃত হয় এবং এটি ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে যায় ও অদৃশ্য হয়।
অ্যাম্বুলেটরি ফ্লেবেক্টোমি (Ambulatory phlebectomy) – এর মাধ্যমে ছোট ছোট শিরাগুলিকে ত্বকের পাঙ্কচারের মাধ্যমে মুছে ফেলা হয়।
ক্যাথেটার-সহায়তা পদ্ধতি (Catheter-assisted procedures) – একটি পাতলা টিউব একটি বড় শিরাতে প্রবেশ করানো হয় এবং ক্যাথেটার টিপটি রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি বা লেজার শক্তির মাধ্যমে গরম করা হয়। ক্যাথেটারটি বার করার সময় তাপটি শিরাটিকে ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে এটি ভেঙে যায়।

রোগ প্রতিরোধ
১) নিয়মিত শরীরচর্চা ও ব্যায়ামের করুন। পায়ের রক্ত চলাচলকে বৃদ্ধি করতে রোজ হাঁটুন। ২) শরীরের ওজন কমান ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হন। কম লবণযুক্ত খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস করুন।
৩) উঁচু হিলযুক্ত জুতা ব্যবহার করবেন না। সমান আকৃতির জুতো পরুন, যাতে কাফ মাসলের ক্রিয়াশীলতা বৃদ্ধি পায়, যা শিরার জন্য উপকারী।
৪) কোমর, পায়ে,হাতে ও কুঁচকিতে আঁটোসাঁটো কিছু পরবেন না, যাতে রক্ত চলাচলে সমস্যা দেখা না দেয়।
৫) দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকবেন না।
৬) বেশিক্ষণ পা ভাঁজ করে বসবেন না।