গাঁজানো রসুন-মধু : উত্তম ভেষজ প্রতিকার

গাঁজানো রসুন-মধু : উত্তম ভেষজ প্রতিকার

রসুন ও মধুর মিশ্রণ হলো এক উত্তম ভেষজ প্রতিকার, যা সর্দি-কাশি নিরাময়ের পাশাপাশি ওজন হ্রাস করতে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই মিশ্রণের প্রাকৃতিক যৌগ রয়েছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে দেহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

রসুন ও মধু

রসুনে অ্যালিসিন রয়েছে, একটি অর্গানসালফার যৌগ, যা প্রতিরোধের মাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে। প্রাকৃতিক গবেষণায় বলা হয়, রসুন থেকে অর্গানসালফার যৌগিক সম্ভাব্যভাবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও কার্ডিওপ্রোটেক্টিভ ক্রিয়াকলাপগুলো থাকে।

মধুতেও এমন জৈব যৌগ থাকে, যা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল বৈশিষ্ট্যযুক্ত। ফলে রসুন ও মধু—এ দুটি উপাদান একত্র হলে শরীরে প্রতিরোধব্যবস্থা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। এ জন্য এই মিশ্রণ একটি শক্তিশালী ঘরোয়া উপায় হিসেবে বিবেচিত। ভেষজ প্রতিকার হিসেবে রসুন ও মধু রাখার সর্বাধিক সাধারণ উপায় সম্পর্কে জানানো হলো।

গাঁজানো রসুন-মধুর রেসিপি

উপকরণ

রসুনের কোয়া ১২টি, মধু ২৫০ গ্রাম
(পরিমাণ বেশিও করতে পারেন কিন্তু এই অনুপাতে করতে হবে।)

প্রণালি

গাঁজানো রসুনের মধু তৈরি করতে একটি পরিষ্কার হিটারপ্রুফ গ্লাস জার নিন। সেই জারে খোসা ছাড়ানো রসুনের কোয়া দিন। এবার এর মধ্যে মধু ঢেলে দিন। মুধ এমনভাবে ঢালুন, যাতে রসুনের কোষগুলো যেন মধুতে ডুবে যায়। এরপর জারের মুখটি ভাল সুতি কাপড় দিয়ে বেঁধে তিন দিন রেখে দিন।

তিন দিন পর জারের কাপড় খুলে চা–চামচ দিয়ে রসুনগুলো নেড়ে দিন। আবার মুখ বেঁধে রেখে দিন আরও এক সপ্তাহ। এরপর আবারও জারের মুখ খুলে রসুনগুলো নেড়ে দিন। এভাবে আরও তিন সপ্তাহ করুন। মোট এক মাস সময় হলেই রসুন-মধু ফারমান্টেড হয়ে খাবার উপযুক্ত হয়ে যাবে। এই গাঁজানো রসুন-মধুর জারটিকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখতে হবে। কোনোভাবেই গরম করা যাবে না, গরম জায়গায় রাখা যাবে না, এমনকি ফ্রিজেও রাখা যাবে না।

ব্যবহারবিধি

গাঁজানো রসুন-মধু টনিকটি দিনের যেকোনো সময় খেতে পারবেন। দিনে এক কোয়া রসুনসহ এক চা–চামচ মধু সেবনযোগ্য।

উপকারিতা

বিকল্প প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ড্রাগ

২০১৩ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে তাজমা মধুর (স্টিংলেস মৌমাছির ইথিওপিয়ায় উত্পাদিত মধু) সঙ্গে মিশ্রণে রসুনের যে শক্তিশালী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণ রয়েছে, তা গবেষকেরা উদ্ঘাটন করেন। তাঁরা দেখতে পান যে রসুন-মধুর মিশ্রণ সালমোনেল্লা, স্টাফিলোকক্কাস অরিয়াস, লায়রিয়া মনসিটিজেনস ও স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর।

ভেষজ টনিক এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে, যা প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণ করে। অন্য একটি গবেষণায় এই ফলাফলের সত্যতা নিশ্চিত করেছে এবং এ–ও প্রমাণ করেছে যে যখন গাঁজানো রসুন-মধু একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তখন তারা একে অপরের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘায়িত বা উন্নত করে, নিজের গুণকে বৃদ্ধি করে।

গাঁজানো রসুন-মধু সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হ্রাস

রসুন, তাজা, গুঁড়া—বিভিন্নরূপে দীর্ঘকাল ধরে শক্তিশালী প্রাকৃতিক খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যা হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা যায়, রসুন রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি রক্ত জমাট বাঁধাও প্রতিরোধ করে। একইভাবে মধু ফিনলিক যৌগে সমৃদ্ধ, যা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে ও কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে। এ কারণে হৃদরোগজনিত সমস্যায় গাঁজানো রসুন-মধু অনেক বেশি ঔষধি হিসেবে কাজ করে, রক্ত সাবলীল থাকার কারণে হার্টে ব্লক হওয়ার প্রবণতা কমে যায়। যাদের ব্লক আছে, তা আর বাড়তে দেয় না। হার্টরেট ঠিক রাখে, যাতে শরীরে কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয়।

প্রাকৃতিক ঠান্ডা ও ফ্লু থেকে মুক্তি দেয়

মধুর শক্তিশালী অ্যান্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রসুনের প্রধান উপাদান অ্যালিসিন শরীরের শ্বেত রক্ত কোষে রোগ প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়া উন্নত করতে সহায়তা করে। বিশেষত, যখন তাদের মধ্যে সাধারণ সর্দি ও ফ্লু হওয়ার কারণ রয়েছে, এমন ভাইরাসের মুখোমুখি হয়। গাঁজানো রসুন, বিশেষত সর্দি ও ফ্লুর তীব্রতা হ্রাস করতে সহায়তা করে। যাঁরা বছর ধরে ঠান্ডা বা ফ্লুতে আক্রান্ত থাকেন, তাঁদের জন্য এটা বিকল্প ওষুধ হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত খেলে আস্তে আস্তে ঠান্ডা লাগার প্রবণতা কমে আসবে। শিশুদের ঠান্ডা লাগার ক্ষেত্রেও বিশেষ উপকারী।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে
আমরা জানি, আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার একটি বড় আশ্রয় হলো আমাদের শরীরে ইমিউন সিস্টেম। এই ইমিউন সিস্টেমকে সঠিক রাখার জন্য গাঁজানো রসুন-মধু বিশেষ ভূমিকা রাখে। আমাদের শরীরে রক্তপ্রবাহ ও শরীরে পিএইচের মাত্রা স্থিতিশীল রেখে ইমিউন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে, যা আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের দুর্গ তৈরি করতে সহায়তা করে।

অন্যান্য স্বাস্থ্যসুবিধার মধ্যে রয়েছে

• ওজন হ্রাস-বৃদ্ধি করতে পারে।
• মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে।
• ইরেকটাইল ডিসফাংশনের প্রাকৃতিক নিরাময় হিসেবেও কাজ করে।
• মুড ভালো রাখে।
• শরীরে কফ জমতে পারে না, যা শিশুদের খুবই প্রয়োজন।
• রক্তে চিনির প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে মাথা ঠান্ডা রাখে।
• স্মরণশক্তি হ্রাসের প্রবণতা কমায়।
• এনার্জি লেবেল বজায় রাখে।

আরেকটা দিক দেখে নেওয়া ভালো

সাধারণত, ভেষজ প্রতিকার হিসেবে মধুতে রসুন অল্প পরিমাণে থাকে। এই মিশ্রণ ক্ষতিকারক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে না। আপনার নিশ্বাসে দুর্গন্ধ বা সম্ভবত শরীরের গন্ধ থাকতে পারে। অতিরিক্ত পরিমাণে, কাঁচা রসুন অম্বল বা অস্থির পেটের কারণ হতে পারে। রসুন ও মধু উভয়ই নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। পরাগজনিত অ্যালার্জি যাদের আছে, তাদের মধু খাওয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। মধুতে প্রাকৃতিক চিনি থাকে; তাই ডায়াবেটিসের রোগীদের পরিমিত খাওয়া উচিত।

এই গাঁজানো রসুন-মধুর উপকার পেতে হলে খাঁটি মধুর বিকল্প নেই। আর দেশি এক কোয়া রসুন আদর্শ।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

গাঁজানো রসুন-মধু সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

স্বাস্থ্যকর নয় ঠান্ডা পানি

স্বাস্থ্যকর নয় ঠান্ডা পানি

এই গরমে ঠান্ডা পানি যেন সুহৃদ। বাইরে থেকে ফিরে ঘর্মাক্ত অবস্থায় ফ্রিজ থেকে বের করে ঢক ঢক করে পান করে ফেলি ঠান্ডা পানি। অথচ এর কুফল সম্পর্কে আমরা অবহিত থাকি না।

বিলম্বের ঘুমে জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়

বিলম্বের ঘুমে জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

যুক্তরাজ্যের একদল গবেষক চার লাখ মানুষের ওপর গবেষণা করে দেখেছেন, যারা রাতে দেরি করে ঘুমাতে যান, সকালে ঘুম থেকে দেরি করে ওঠেন, তারা কোনো না কোনোভাবে নানান মানসিক রোগে আক্রান্ত। এমন তথ্য নিয়ে যুক্তরাজ্যে বেশ সাড়া পড়েছে, বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে—যারা এ কাজটি প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, পড়াশোনার কারণে হোক বা কাজের কারণে কিংবা নিছক আড্ডার কারণেই যারা বেশি রাতে ঘুমাতে যান, তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৩৩ হাজার যুক্তরাজ্যবাসীর ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়।

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী যারা বেশি রাতে ঘুমান এবং সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন, তাদের মধ্যে যে সমস্যাগুলো দেখা যায়, সেগুলো হলো—

  • অকালমৃত্যুর ঝুঁকি
  • গড় আয়ু কমে যাওয়া: ৬.৫ বছর কম গড় আয়ু
  • বিভিন্ন মানসিক রোগ: ৯০ ভাগের
  • ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা: ৩০ ভাগ মানুষের
  • হজমশক্তিতে ব্যাঘাত
  • নার্ভাস সিস্টেমে জটিলতাঅন্ত্রের জটিলতা

যুক্তরাজ্যের এই গবেষণা রিপোর্টের ফলে সে দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এখন চাকরি নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে, রাতে কয়টায় ঘুমাতে যান এবং সকালে কয়টায় ঘুম থেকে ওঠেন?

আমাদের দেহ ঘড়ি সূর্যের সময়ের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত। ছবি: জোহানেস প্লেনিও, পেকজেলস ডট কম

যুক্তরাজ্যের এই অবস্থা আমাদের সমাজে এখন ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। এখন গ্রামগঞ্জেও মধ্যরাতে চা পাওয়া যায়, অর্থাৎ চা খাওয়ার লোক থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। আর শহুরে মানুষের জীবনব্যবস্থা আরও বেশি রাত জাগানির্ভর। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ মানুষ অফিস বা কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরেন ৯টা থেকে ১০ টায়, নিম্ন আয়ের মানুষ আরও দেরিতে ফেরেন ঘরে। রাতে খাবারের রেস্টুরেন্ট বেশি ব্যস্ত থাকে। বিরিয়ানি খাওয়া নতুন প্রজন্ম রাত গভীর হলেই খেতে যায়। ঢাকা শহরে এখন অনেক রেস্টুরেন্ট পাড়ার মতো কিছু এলাকা গড়ে উঠেছে, সেখানে রাত ২টা–৩টা পর্যন্ত খাবার পাওয়া যায় এবং রীতিমতো ভিড় থাকে।

নতুন প্রজন্ম আরেকটি রোগে আক্রান্ত, তা হচ্ছে মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটারে বেশি রাত কাটানোর অভ্যাস। এটি যে কী পরিমাণে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা হয়তো আমরা এখন বুঝতে পারছি না। কিন্তু সময়ে যখন বুঝব, হয়তো তখন আর কিছুই করার থাকবে না। একটি ভঙ্গুর সমাজ, মানসিক রোগীভরা একটি সমাজ বিশাল সংখ্যায় রাষ্ট্রের কল্যাণ করা থেকে বঞ্চিত হয়ে উঠবে।

আমাদের দেহে একটি ঘড়ি আছে, যা সূর্যের সময়ের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত। সেই ঘড়ির সময় অনুসারে রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত হজম করার চুল্লি সচল থাকে, তারপর আস্তে আস্তে নিভে যায়। গভীর রাতে খাবার খেলে সে খাবার শরীরের স্বয়ংক্রিয় হজম চুল্লি বন্ধ থাকার কারণে ঠিকমতো হজম না হয়ে পাকস্থলীতে পচতে থাকে। ফলাফল হলো স্বাস্থ্যহীনতা, ভুঁড়ি বেড়ে যাওয়া, হজমের গন্ডগোল থেকে ক্রনিক আইবিএসে রূপ নেওয়া, যার চিকিত্সা অনেক জটিল। লাইফস্টাইল পরিবর্তন ছাড়া এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ বন্ধ থাকে। এতে যারা আক্রান্ত হন, তাদের মানসিক বিপর্যয় ছাড়াও ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে জীবন যাপন করতে হয়।

রাতে আমাদের শরীর কোনো কিছু গ্রহণ করার কাজ করে না বরং ত্যাগ করার কাজ করে, যেমন রাত ১১টা থেকে লিভার তার কাছে জমে থাকা বর্জ্য বা টক্সিন অটো ডিটক্সিফিকেশন করতে থাকে। রাত এগারোটায় যদি আমরা ঘুমের মধ্যে না থাকি, তাহলে লিভার অটো ডিটক্সিফিকেশন করতে পারে না। এর ফলাফল হজমের গন্ডগোল এবং ত্বকের রং কালো হয়ে যাওয়া। তেমনি রাতে হার্ট, ফুসফুস, গলব্লাডার, পাকস্থলী, কিডনি অটো ডিটক্সিফিকেশন করতে থাকে। যদি আমরা রাতে না ঘুমাই, তখন শরীর অটো ডিটক্সিফিকেশন করতে পারে না। পরিণতিতে শরীরের টক্সিন না বেরিয়ে শরীরে থেকে যায়, যা আমাদের স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ব্যাহত করে। এতে শেষ পর্যন্ত শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগের উপসর্গ তৈরি হয়, যার ফলে মৃত্যু হওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।

এ থেকে মুক্তি পেতে কী করবেন

সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে, সকালে ঘুম থেকে উঠে মুক্ত বাতাসে হাঁটলে নির্মল বায়ু পাওয়া যায়, যা সকালে ওজন স্তরে থাকে বলে হালকা থাকে। সে বায়ু থেকে শ্বাস নিলে শরীরে অক্সিজেন প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, শরীরের ভেতরে অক্সিজেন নিজেই অনেক বিচ্যুতি দূর করে দেয়। ভোরের আলো ভিটামিন ডি ভরা। সকালের সে সূর্যকিরণ শরীরে হাড় মজবুত করে, শরীরে কোনো ধরনের ব্যথা হয় না। সকালে হাঁটতে পারলে শরীরের সব অর্গান সচল হয়। কায়িক পরিশ্রম শরীরে কোনো ধরনের চর্বি জমতে দেয় না; ফলে ওজন বাড়ে না, ডায়াবেটিস হয় না, হার্টের সমস্যা হয় না, মস্তিষ্ক শক্তিশালী থাকে—কঠোর পরিশ্রমেও তা ঠিকমতো কাজ করে এবং স্মরণশক্তি অটুট থাকে। এ ছাড়া দিনে কর্মঘণ্টা বেড়ে যায় এবং রাতে ঘুম তাড়াতাড়ি ঘুমানো সম্ভব হয়।

ভোরের আলোয় ভিটামিন ডি থাকে। ছবি: জিল ওয়েলিংটন, পেকজেলস ডট কম

দেহঘড়ি ঠিক রাখুন

আমাদের দেহঘড়িকে সঠিক উপায়ে চলতে দেওয়ার জন্য সূর্যের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। রাত যেহেতু ঘুমানোর জন্য, তাই ঘুমাতে হবে রাতে, দিন জেগে থাকার জন্য; তাই জেগে থাকতে হবে, কর্মময় থাকতে হবে। এটিই সাধারণ সূত্র।

রাত জাগার অভ্যাস পরিবর্তন করে সকালে ঘুম থেকে উঠে কর্মময় হওয়ার অভ্যাস গড়লে শরীরও ভালো থাকবে এবং অনেক কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে। তাই রাতকে ঘুমানোর জন্য রেখে সকালে কর্মময় থাকুন।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শরীর সুস্থ রাখার চাবিকাঠি

শরীর সুস্থ রাখার চাবিকাঠি

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়ুন

অ্যাসিড উৎপাদনকারী খাদ্য অ্যাসিড–বৃষ্টির মতো হজমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং দিনের পর দিন অ্যাসিড খাবারের প্রভাব চলতে থাকলে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে গিয়ে প্রথমে পেটের পীড়া দেখা দেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে নানা রকমের ডিজেনারেটিভ রোগ, যেমন গ্যাস্ট্রিক, আলসার, হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগের জায়গা তৈরি করে।

আমাদের শরীরে একটি রাসায়নিক মান ঠিক করে চলার বিষয় আছে, যাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় পিএইচ (পটেনশিয়াল অব হাইড্রোজেন) বলে। মাটি ও পানির যেমন নির্দিষ্ট পিএইচ ব্যালান্স আছে, মানুষের দেহেরও এমন ব্যালান্স থাকে, যা আমরা প্রোফাইল চেক করলে পেয়ে থাকি। এই পিএইচ ঠিক থাকলে আমরা সুস্থ, না থাকলে অসুস্থ। অনেক সময় ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রে লেখা থাকে ‘বডি কন্ডিশন’ অ্যাসিডিক কিংবা অ্যালকালাইন। আমাদের শরীরের এ অবস্থা জানান দেয়, আমাদের পিএইচ কোন অবস্থায় আছে। অ্যাসিডিক হলে আপনি অসুস্থতার জায়গায় অবস্থান করছেন, অ্যালকালাইন হলে আপনি ভালো কন্ডিশনে আছেন।

মাঝে মাঝে প্রকৃতিতে অ্যাসিড–বৃষ্টি হয়। অ্যাসিড–বৃষ্টি হলে গাছের পাতা এবং বোঁটা শুকিয়ে পাতার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। এই অ্যাসিডের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে গাছের শিকড় মাটি থেকে প্রয়োজনীয় অ্যালকালাইন চরিত্রের পুষ্টি (ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম) শুষে নিয়ে পাতাকে জোগান দেয়। তারপর ধীরে ধীরে পাতা আবার নতুন জীবন ফিরে পায়।

ঠিক তেমনি অ্যাসিড উৎপাদনকারী খাদ্য অ্যাসিড–বৃষ্টির মতো হজমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং দিনের পর দিন অ্যাসিড খাবারের প্রভাব চলতে থাকলে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে গিয়ে প্রথমে পেটের পীড়া দেখা দেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে নানা রকমের ডিজেনারেটিভ রোগ, যেমন গ্যাস্ট্রিক, আলসার, হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগের জায়গা তৈরি করে। অথচ এটা এখন প্রমাণিত যে অ্যালকালাইন খাবার বেশি খেয়ে শরীরকে অ্যালকালাইন করতে পারলে রোগ থাকে না।

সুস্বাস্থ্যের জন্য আদর্শ রক্তের পিএইচ স্তরগুলো সামান্য অ্যালকালাইন যুক্ত (৭.৩৬৫ থেকে ৭.৪৫–এর মধ্যে) হওয়া দরকার। পিএইচ হলো হাইড্রোজেন আয়ন ঘনত্বের একটি পরিমাপ। পিএইচ স্কেল ০-১৪ পর্যন্ত হিসাব করা হয়। নিরপেক্ষ পিএইচ ৭.০। পিএইচ উচ্চতর (৭–এর বেশি) বেশি অ্যালকালাইন বা বেসিক, তবে ৭–এর চেয়ে কম পিএইচ অ্যাসিডিক। তাই লিপিডে দেখা যায়, অসুস্থ মানুষের মধ্যে খুব কমই ৭ মাত্রা পিএইচ পাওয়া যায়।

পি.এইচ এর বিশ্বজনীন সূচক কাগজ তারতম্যের রঙ দেখাচ্ছে ছবি: উইকিপিডিয়া

মানুষ যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশু অ্যালকালাইন থাকে। শিশু ধীরে ধীরে যখন খাদ্য গ্রহণে বৈচিত্র্য আনতে থাকে, রান্নাজাতীয় খাবার বেশি খেতে থাকে, তখনই অ্যালকালাইন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুটিও অ্যাসিডিক হয়ে ওঠে।

আপনার রক্তের পিএইচ ভারসাম্য বজায় রাখা নিশ্চিত করার জন্য শরীর জটিল প্রক্রিয়া অতিক্রম করে। আপনার দেহের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোকে সমর্থন করার জন্য কেবল একটি ভারসাম্যযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করতে হবে!

অ্যালকালাইন এবং অ্যাসিডিক খাবারের চার্ট

বেশির ভাগ শাকসবজি, বেশির ভাগ ফল, ছোলা, মুগ ও মসুর ডাল—এ খাবারগুলো অ্যালকালাইন খাবার হিসেবে বিবেচিতছবি: আবেট ল্লেসার, পেকজেলস ডট কম

অ্যালকালাইন খাবার ও পানীয়

বেশির ভাগ শাকসবজি, বেশির ভাগ ফল, ছোলা, মুগ ও মসুর ডাল—এ খাবারগুলো অ্যালকালাইন বা লো-অ্যাসিডযুক্ত খাবার হিসেবে বিবেচিত। এগুলোকে আপনি আপনার ডায়েটের জন্য বিবেচনা করতে পারেন। সয়া (তবে আমরা যে সয়াবিন তেল নামে যা খাই, তার পিএইচ ঠিক নেই), অলিভ অয়েলসহ ছোট একটি তালিকা দেখে নিন।

উচ্চ অ্যালকালাইন খাবার

লেবু (যা অ্যাসিডিক হলেও শেষ পরিণতিতে এটা অ্যালকালাইনে পরিণত হয়ে দেহের ভারসাম্য রক্ষা করতে বেশ কার্যকর), কুল, তরমুজ, পাকা আম, পাকা পেঁপে, আনারস, আঙুর, ক্যাপসিকাম, কিশমিশ, খেজুর।

মাঝারি অ্যালকালাইন খাবার

বেশির ভাগ শাক (যা প্রাকৃতিক উপায়ে বেড়ে ওঠে), শজনে ডাঁটা, কাঁচা পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম, বেগুনসহ বেশির ভাগ সবজি। ফলের মধ্যে কলা, কমলা, কাঁঠাল, বেদানা, নাশপাতি, পেয়ারা ও বেল।

ডাবের পানি কম অ্যালকালাইন খাবারছবি: এনি লেন, পেকজেলস ডট কম

কম অ্যালকালাইন খাবার

ডাবের পানি, শসা, ঢ্যাঁড়স, পেঁয়াজ, মুলা, টমেটো, সেদ্ধ ডিম, পানিফল, সয়া দুধ, মাশরুম।

উচ্চ অ্যাসিডিক খাবার

সব ধরনের ফাস্ট ফুড উচ্চ অ্যাসিডিক খাবার ছবি: ইঞ্জিন আকিয়ার্ট, পেকজেলস ডট কম

অ্যাসিডিক খাবার ও পানীয় বিশেষত অ্যাসিডযুক্ত বা ৪ বা ৭ এর নিচে কম পিএইচসহ কিছু খাবারের মধ্যে রয়েছে সব ধরনের কার্বনেটেড পানীয় বা কোমল পানীয়, সোডা ওয়াটার, শক্তি পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস, কিছু দুগ্ধজাতীয় পণ্য, চিনি, অ্যালকোহল, মাংস ও সব ধরনের ফাস্ট ফুড। সব ধরনের মিষ্টি বা মিষ্টান্ন, সাদা ময়দার তৈরি সব খাবার, সাদা চালের তৈরি সব খাবার, সব ধরনের পোলট্রি মাংস, চাষের মাছ।

মাঝারি অ্যাসিডিক খাবার

চিনাবাদাম, কাজুবাদাম, মাখন, ঘি, পনির, কর্নফ্লেক্স, মুড়ি, সুজি, খই ও যব।

বেশির ভাগ গরমমসলা কম অ্যাসিডিক খাবারছবি: উইকিপিডিয়া

কম অ্যাসিডিক খাবার

নারকেল, বার্লি, মধু, বেশির ভাগ গরমমসলা, আমন্ড বাদাম।

অ্যালকালাইন খাবার আমাদের দেহে রক্তের পিএইচ যা হওয়া দরকার, ঠিক সেখানে রাখার জন্য দুর্দান্ত কাজ করে। অ্যালকালাইন যুক্ত খাবার, যেমন শাক, ফল এবং কাঁচা সবজি পাওয়ার হাউস হিসেবে এ উদ্ভিজ্জ খাবারগুলো আমাদের দেহকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ এবং ফাইটোকেমিক্যাল সরবরাহ করে।

স্বাভাবিক পিএইচ মাত্রা রাখার জন্য প্রতিদিন ৭০ শতাংশ অ্যালকালাইন এবং ৩০ শতাংশ অ্যাসিডিক খাবার গ্রহণ করলে শরীর সঠিক মাপে চলে আসবে, শরীর ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে। আমাদের শরীরে ক্রনিক সমস্যা থাকলেও ভালো হতে থাকবে।

অ্যাসিডিক খাবার রক্তের পিএইচের মাত্রা কমিয়ে দিয়ে রক্তের গতি মন্থর ও দূষিত করে ফেলে, যা অ্যাসিডিক কন্ডিশন। এই অবস্থা শরীরে রোগ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে, যার শুরু হয় পেট থেকে অর্থাৎ হজমের সমস্যা দিয়ে।

স্বাভাবিক পিএইচ মাত্রা রাখার জন্য প্রতিদিন ৭০ শতাংশ অ্যালকালাইন এবং ৩০ শতাংশ অ্যাসিডিক খাবার গ্রহণ করলে শরীর সঠিক মাপে চলে আসবে, শরীর ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে। আমাদের শরীরে ক্রনিক সমস্যা থাকলেও ভালো হতে থাকবে। যদিও আমরা উল্টো পথেই চলছি, তাই শরীর ঠিক রাখার জন্য অ্যাসিড অ্যালকালাইনের দিকে খেয়াল রেখে প্রাকৃতিক নিয়মে সুস্থ থাকা সম্ভব। আমরা যদি অ্যাসিডিক খাবারগুলো কমিয়ে দিয়ে অ্যালকালাইন খাবারগুলো গ্রহণ করতে থাকি, তাহলে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা হবে, যা সুস্থ থাকার চাবিকাঠি। দেহের এই ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে খাবার দিয়ে। কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট দিয়ে সেটি করা সম্ভব নয়।

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়ুন

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

ওষুধমুক্ত জীবনের জন্য গ্লাইসেমিক সূচক জানা জরুরি

ওষুধমুক্ত জীবনের জন্য গ্লাইসেমিক সূচক জানা জরুরি

আধুনিক চিকিৎসায় ডায়াবেটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; মানুষ এখন ডায়াবেটিস নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। অথচ ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা সুগার লেভেলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মানুষের নানা ধরনের রোগের গভীরে প্রভাব বিস্তার করে; যা এমনকি মানুষের জীবন হরণের কারণও হতে পারে। বিশেষ করে কিডনি বিপর্যয়, দৃষ্টিশক্তি হারানো, দাঁত ও ত্বকে প্রভাব ইত্যাদি। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুগার লেভেলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সুগার লেভেল সঠিক মাত্রায় রাখার জন্য ইনসুলিন ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম উপায় বলে স্বীকৃত।

ডায়াবেটিস রোগে যাঁরা ভুগছেন এবং যাঁদের রক্তে চিনির মাত্রা বেশি থাকে, তাঁদের কার্বোহাইড্রেট কম খেতে বলা হয়। কিন্তু কার্বোহাইড্রেট আমাদের প্রধান খাদ্য উপাদান, তাই কার্বোহাইড্রেট খেতেই হবে। আর কার্বোহাইড্রেট সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, কোলাজেনের কারণে রক্তের চিনি কোষে পৌঁছায় না। যখন আমরা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাই, আমাদের শরীর কার্বোহাইড্রেট থেকে চিনি ও শ্বেতসার ভেঙে শর্করা বা গ্লুকোজ তৈরি করে, যা রক্তের সঙ্গে মিশে যায়।

আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা ইনডেক্স মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীদেরও সুগার লেভেল বাড়বে না। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট–জাতীয় খাবার খেলেও সেটা হবে না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই ইনডেক্স মেনে চলতে পারলে ওষুধমুক্ত থাকা সম্ভব বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অভিমত।

ডায়াবেটিসকে বলা হয় লাইফস্টাইল ডিজিজ। লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে টাইপ টু ডায়াবেটিসে খাদ্য ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে ওষুধমুক্ত জীবন যাপন করা সম্ভব। এই লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে যে জ্ঞান জরুরি, তা হচ্ছে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সম্পর্কে জানা। আমরা যে খাবার গ্রহণ করি, তার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বলে একটি সূচক আছে; যার ইনডেক্স যত বেশি থাকে, তা ততই শরীরের জন্য খারাপ।

আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা ইনডেক্স মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীদেরও সুগার লেভেল বাড়বে না। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট–জাতীয় খাবার খেলেও সেটা হবে না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই ইনডেক্স মেনে চলতে পারলে ওষুধমুক্ত থাকা সম্ভব বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অভিমত।

তাহলে কোন কার্বোহাইড্রেট খাব?

প্রতিদিনের ক্যালরির প্রায় ৪৫–৬৫ ভাগ আসা উচিত কার্বোহাইড্রেট থেকে। কার্বোহাইড্রেট থেকে আমরা এনার্জি বা ক্যালরি পাই, যা আমাদের কোষের শক্তি, দৈহিক তেজ, কর্মক্ষমতা, তাপ উৎপাদন ও চর্বি গঠনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। এ–জাতীয় খাবারই আমাদের দেহ গঠন ও দেহ সংরক্ষণের প্রধান উপাদান। আমাদের দেহে প্রতি ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ৪.১ ক্যালরি দেয়।

বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে, যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি থাকে, সেসব কার্বোহাইড্রেট রক্তে তাড়াতাড়ি মিশে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, আর যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম বা মাঝারি থাকে, সেগুলো রক্তে তাড়াতাড়ি মিশে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে না। তাই যাঁদের শরীরে ব্লাড সুগার সাধারণের চেয়ে বেশি, তাঁদের যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি থাকে, তা কম খাওয়া ভালো।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের প্রকারভেদ

সাধারণভাবে, কোনো খাবার যত বেশি প্রক্রিয়াজাত হয়, তত বেশি তার জিআই হয় এবং কোনো খাবারে ফাইবার বা ফ্যাট বেশি থাকলে জিআই কম হয়।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তিন প্রকারের হয়—নিম্ন, সহনীয় ও উচ্চ। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স, এটি আপনার রক্তে শর্করার উত্থানকে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ করে, তার ওপর ভিত্তি করে একটি খাদ্যকে একটি সংখ্যা বা স্কোর দেয়। খাঁটি গ্লুকোজকে (চিনি) ১০০-এর মান দেওয়া হয়, এমন খাবারগুলো শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে র‌্যাঙ্ক করা হয়। কোনো খাবারের গ্লাইসেমিক সূচক যত কম হয়, সেই খাবার খেয়ে ধীরে ধীরে রক্তে শর্করার উত্থান ঘটে। সাধারণভাবে, কোনো খাবার যত বেশি প্রক্রিয়াজাত হয়, তত বেশি তার জিআই হয় এবং কোনো খাবারে ফাইবার বা ফ্যাট বেশি থাকলে জিআই কম হয়।

এবার জানতে হবে কোন কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা কতটা আছে। নিচে অনেকগুলো কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা কত তা দেওয়া হলো।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা ধরা হয় নিম্ন ৫৫-এর নিচে, সহনীয় ৫৬ থেকে ৬৯, উচ্চ ৭০ থেকে ওপরে

  • সাদা ময়দার রুটি ৭৫-৭৭
  • লাল গমের আটার রুটি ৫৩-৫৫
  • ময়দার পরোটা ৭৭-৮০
  • ঘরে বানানো লাল আটার চাপাতি ৫২-৫৬
  • সাদা চালের ভাত ৭৩-৭৭
  • লাল চালের ভাত ৬৮-৬৯
  • বার্লিতে মাত্র ২৮ (যা খুবই নিরাপদ)
  • মিষ্টি ভুট্টা ৫২-৫৭
  • চালের নুডলস ৫৩-৬০
  • কর্নফ্লেক্স ৮১-৮৭
  • বিস্কুট ৬৯-৭১
  • ওটস ৫৫-৫৭
  • ইনস্ট্যান্ট ওটস ৭৯-৮২

ফল

  • আপেল ৩৬-৩৮
  • কমলা ৪৩-৪৬
  • কলা ৫১-৫৪
  • আনারস ৫৯-৬৭
  • আম ৫৬-৫৯
  • তরমুজ ৭৬-৮০
  • খেজুর ৪২-৪৬তবে ফলের জুস করলে ইনডেক্স বেড়ে যায়

সবজি

  • আলু ৮৭-৯১
  • গাজর ৩৯-৪৩
  • মিষ্টি আলু ৬৩-৬৯
  • মিষ্টিকুমড়া ৬৪-৭১
  • কাঁচকলা ৫৫-৬১
  • মিক্সড ভেজিটেবল সুপ ৪৮-৫৩ (টেস্টিং সল্ট ছাড়া)

দুগ্ধজাত খাদ্য

  • পূর্ণ ননীযুক্ত দুধ ৩৯-৪২
  • ননীমুক্ত দুধ ৩৭-৪১
  • আইসক্রিম ৫১/৫৪
  • দই ৪১/৪৩
  • সয়ামিল্ক ৩৪/৩৮

অন্যান্য

  • ডার্ক চকলেট ৪০-৪৩
  • পপকর্ন ৬৫-৭০
  • পটেটো চিপস ৫৬-৫৯
  • রাইস ক্র্যাকার্স ৮৭/৮৯
  • সফট ড্রিংকস ৫৯-৬২
  • সাধারণ চিনি ১০৩-১০৬
  • মধু ৬১-৬৪এই তালিকা ধরে খাওয়ার ক্ষেত্রে ইনডেক্স মেনে চলা যায় তাহলে ডায়াবেটিস রোগীদের সুগার লেভেল আস্তে আস্তে কমতে থাকবে এবং হয়তো একসময় ইনসুলিনের প্রয়োজন না–ও হতে পারে। তাই কম ইনডেক্সের খাবার গ্রহণের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

    লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ।