আমড়া খান, সুস্থ থাকুন

আমড়া খান, সুস্থ থাকুন

মৌসুম এখন আমড়ার। ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালসিয়ামে ভরপুর এ ফল নানা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। এর রয়েছে বিশেষ পুষ্টিগুণ। জানাচ্ছেন খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ আলমগীর আলম

আমড়াকে বলা হয় সোনালি আপেল। এটি অ্যানাকারডিয়েসি পরিবারভুক্ত। আমড়ায় প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও আঁশ রয়েছে, যা শরীরের জন্য ভীষণ দরকারি। কারণ, এসব আপনার মেরুদণ্ডকে সোজা রাখে; হজমে সহায়তা করে। আমড়ায় প্রচুর ভিটামিন সি থাকায় এটি খেলে স্কার্ভি রোগ এড়ানো যায়। বিভিন্ন প্রকার ভাইরাল ফ্লু প্রতিরোধ করা যায়।

প্রতি ১০০ গ্রাম আমড়ায় ১ দশমিক ১ গ্রাম প্রোটিন, ১৫ গ্রাম শ্বেতসার, শূন্য দশমিক ১০ গ্রাম স্নেহ–জাতীয় পদার্থ ও ৮০০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন আছে। এ ছাড়া আছে ০.২৮ মিলিগ্রাম থায়ামিন, ০.০৪ মিলিগ্রাম রিবোফ্লাভিন, ৯২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৫৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও ৩.৯ মিলিগ্রাম লৌহ। আমড়ার খাদ্যশক্তি ৬৬ কিলোক্যালোরি। খনিজ পদার্থ বা মিনারেলসের পরিমাণ ০.৬ গ্রাম। আরও আছে প্রায় ৯০ শতাংশ পানি, ৪-৫ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট।

আমড়ার উপকারিতা

• বদহজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ: আমড়ায় প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ থাকে। এ কারণে হজমশক্তি বৃদ্ধিতে কার্যকর। এ ছাড়া বদহজমের কারণে সৃষ্ট সমস্যা যেমন গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি দূর করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে এটি। আহারের পর নিয়মিত আমড়া খেলে ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।

• হিমোগ্লোবিনের উৎপাদন বৃদ্ধি: আমড়ায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকার কারণে শরীরে হিমোগ্লোবিন ও মায়োগ্লোবিন উৎপাদনে সাহায্য করে। ফলে শরীরে অক্সিজেন পরিবহণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

• সর্দি-কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রতিরোধ: আমড়া বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং সর্দি-কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে। তাই আমড়ার মৌসুমে প্রতিদিন এ ফল খেলে নানা সংক্রমণ থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

• হাড়কে মজবুত করতে: ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড়ের রোগ, মাংস পেশির খিঁচুনিসহ অনেক রোগ হতে পারে। তাই প্রতিদিনের ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণে আমড়ার খাওয়া যেতে পারে। নিয়মিত খেলে প্রতিদিনের ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করতে পারে। ফলে হাড়ের যেকোনো রোগ দূর করা ছাড়াও হাড়কে শক্তিশালী রাখতেও সাহায্য করে।

• ত্বক ভালো রাখতে: ব্রণ কমিয়ে ত্বক সুস্থ ও উজ্জ্বল রাখতে আমড়া দারুণ উপকারী। আমড়ায় প্রচুর ভিটামিন সি রয়েছে, যা ত্বক উজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে।

• পেশিশক্তি বৃদ্ধিতে: আমড়ায় থিয়ামিন নামের একটি উপাদান পাওয়া যায়, যেটি মানুষের শরীরে পেশি সংকোচন ও স্নায়ুসংকেত সঞ্চালনে সহায়তা করে। তাই আমড়া মানুষের পেশির দুর্বলতা দূর করে একে শক্তিশালী করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

• রক্তস্বল্পতা রোধ: আমড়ায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন রয়েছে, যা রক্তস্বল্পতা রোধে কার্যকর। আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও ঠিক রাখে।

• রুচি বৃদ্ধি: অসুস্থদের মুখের স্বাদ ফিরিয়ে আনতে আমড়া দারুণ কার্যকর। আমড়া খেলে মুখের অরুচিভাব দূর হয় ও ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়। তাই রুচি বাড়াতে নিয়মিত ফলটি খাওয়া যেতে পারে।

• স্ট্রোক ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে: আমড়া রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। তাই আমড়া খেলে স্ট্রোক ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমে।

• দাঁতের সমস্যায়: আমড়ায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে, যা দাঁত ও মাড়ির বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী দাঁতের মাড়ি ফুলে যাওয়া, দাঁতের গোড়া থেকে পুঁজ ও রক্ত পড়া, প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া, খেতে অসুবিধা হওয়া, অকালে দাঁত পড়ে যাওয়া ইত্যাদি প্রতিরোধে আমড়ার ভূমিকা অনন্য।

আমড়ায় বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইটোকেমিক্যাল থাকে। এসব উপাদান স্ট্রেসের প্রভাব কমাতেও সহায়তা করে।

প্রথম আলো থেকে পড়ুন: আমড়া খান, সুস্থ থাকুন

চুইঝাল শুধু ঝালই নয়, আছে অন্য কিছু

চুইঝাল শুধু ঝালই নয়, আছে অন্য কিছু

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের রান্নায় অন্যতম আলোচিত মসলা-উপাদান চুইঝাল; যদিও এর ফলন বেশি হয় পঞ্চগড়ের ঠাকুরগাঁওয়ে। কিন্তু খুলনা অঞ্চলের মানুষ এটাকে ট্র্যাডিশন হিসেবে গণ্য করে থাকে। এই চুইঝালের রয়েছে অনেক খাদ্যগুণ। বিশেষ করে কিছু বিরল উপাদান রয়েছে, যা মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ অবদান রাখতে পারে। খুলনা অঞ্চলে চুইঝালের কাণ্ড, শিকড় বা লতা ছোট ছোট টুকরা করে মসলা হিসেবে গরুর মাংস বা খাসির মাংস রান্নায় ব্যবহার করা হয়, যা এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এবং খুবই জনপ্রিয় একটি পদ।

চুইঝালে রান্না মাংস দক্ষিণাঞ্চলে খুবই জনপ্রিয়

চুইঝালে রান্না মাংস দক্ষিণাঞ্চলে খুবই জনপ্রিয়

চুইঝালের শিকড়, কাণ্ড, পাতা, ফুল-ফল—সবই ভেষজ গুণসম্পন্ন। এ ছাড়া মসলা হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়। তবে ঝাল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় কাণ্ড ও ডালের অংশ দিয়ে হাঁস ও গরুর মাংস রান্নায়। মূলত রান্নার জন্য চুইঝালের কাণ্ড ব্যবহার করা হয়। চুইঝালে দশমিক ৭ শতাংশ সুগন্ধি তেল থাকে।
চুইঝালে আছে আইসোফ্লাভোন, অ্যালকালয়েড, পিপালারিটিন, পিপারন, পোলার্টিন, গ্লাইকোসাইডস, মিউসিলেজ, গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ, সিজামিন, পিপলাস্টেরল। চুইয়ের শিকড়ে রয়েছে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ পিপারিন। এর রয়েছে নানা রাসায়নিক প্রভাব, যা নানা ঔষধি গুণসম্পন্ন। যেমন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিলেশম্যানিয়াল, অ্যান্টিম্যালেরিয়াল, অ্যান্টিপ্যারাসাইটিক, সাইটোটক্সিক/অ্যান্টিক্যানসার, অ্যাডিপোজেনিক, হেপাটো এবং গ্যাস্ট্রো প্রতিরক্ষামূলক, অ্যান্টিডায়াবেটিক, অ্যানালজেসিক, অ্যান্টিডায়রিয়াল, ডিপ্রেশন, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, মূত্রবর্ধক, অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ, অ্যান্টিপাইরেটিক, অ্যান্টি-আলসার এবং ইমিউনোমোডুলেটরি।
অ্যাজমা ও ব্রঙ্কাইটিস রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে

অ্যাজমা ও ব্রঙ্কাইটিস রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে

বিচ্ছিন্ন যৌগগুলোর মধ্যে রয়েছে চ্যাবামাইডস, পিপারিন, পিপ্লারটাইন, রেট্রোফ্র্যাক্টামাইডস এ/বি, মিথাইলেনডিওক্সিফেনাইল-নোনা-২ই, ৪ই, ৮ই-ট্রাইনোইক অ্যাসিড, এন-বুটাইল বা এন-পেন্টাইল অ্যামাইন, পাইপারলংগুমিনিন, পাইপরোনালাইন, ডিহাইড্রোপিপারিন, এন-বিউটিন ২ই ও ৪ই, অক্টাডেক্যাডিয়েনামাইড আর এন-আইসোবিউটাইল ইকোস্যাট্রিয়েনামাইড। বিভিন্ন পরীক্ষাপদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক উপাদান থাকায় স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিয়ে এর প্রভাব নথিভুক্ত করেছে।

সঠিক উপায়ে রান্নায় মেলে উপকারিতা

অ্যাজমা ও ব্রঙ্কাইটিস রোগের ওষুধ হিসেবে: অ্যাজমা ও ব্রঙ্কাইটিস রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকজনিত রোগপ্রতিরোধে চুইঝাল বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকজনিত রোগপ্রতিরোধে সাহায্য করে। মরিচের বিকল্প হিসেবে চুইঝালের ভেষজ গুণ থাকার কারণে অনেক রোগব্যাধির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে

কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে

ক্যানসার প্রতিরোধ

চুইঝালের ভেষজ উপাদানের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে আইসোফ্লাভোন ও অ্যালকালয়েড নামের ফাইটোকেমিক্যাল রয়েছে, যা অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং ক্যানসার প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ক্যানসার হওয়ার আগে শরীরে যে টিউমার হয়ে থাকে, সেই টিউমারের বৃদ্ধি প্রতিরোধ করতে পারে। চুইঝালে গুরুত্বপূর্ণ যৌগ হলো সেসামিন, যা টিউমারের বিকাশ ও অগ্রগতি কমানোর জন্য একটি কার্যকর সহায়ক থেরাপিউটিক এজেন্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে

দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে এটি হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। বর্তমান সময়ে কার্ডিওভাসকুলার ডিজঅর্ডার, ইমিউন ডিজফাংশনের মতো রোগপ্রতিরোধে মানুষ প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদানের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। উপরন্তু অসংখ্য রোগের চিকিৎসার জন্য ঔষধি গাছ থেকে প্রাপ্ত যৌগকে পরিপূরক খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে। এসবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। আর খরচও কম।

প্রসব-পরবর্তী ব্যথা প্রশমনে ভালো কাজ করে

প্রসব-পরবর্তী ব্যথা প্রশমনে ভালো কাজ করে

প্রসূতির ব্যথা কমাতে

প্রসব-পরবর্তী ব্যথা প্রশমনে ভালো কাজ করে চুইঝাল। সদ্য প্রসূতি মায়েদের শরীরের ব্যথা কমাতে চুইঝাল ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এ ক্ষেত্রে চুইঝাল গরম পানিতে সেদ্ধ করে চায়ের মতো পান করা যায়।
অন্যান্য
পাকস্থলী ও অন্ত্রের প্রদাহ দূর করে। গ্যাস্ট্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। স্নায়বিক উত্তেজনা ও মানসিক অস্থিরতা প্রশমন করে। আমাদের শরীরের বিভিন্ন ধরনের ব্যথা দূর করে শরীর সতেজ রাখতে সহায়তা করে। এটি ঘুমের ওষুধ হিসেবে কাজ করে এবং শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে সাহায্য করে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভেষজ উপকরণ আদিতে যেভাবে ছিল, নানা কারণে তার কিছু রূপান্তর ঘটেছে। তবে চুইঝালে এখনো তেমন কিছু ঘটেনি। ফলে মাঝেমধ্যে চুইঝাল দিয়ে মাংস রান্না করে খাওয়া যেতে পারে।

অবশ্য কম লবণ ও মসলা ব্যবহার করে সঠিক উপায়ে রান্না করলে এর ঔষধি গুণ লাভ করা যাবে।

হাল ফ্যাশন থেকে পড়ুন: https://www.haal.fashion/lifestyle/well-being/dlf9abpqfe

শক্তির উৎস কাঁঠাল

শক্তির উৎস কাঁঠাল

কাঁঠালে আছে থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, জিংক, নায়াসিনসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর উপাদান। অন্যদিকে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, শর্করা ও ভিটামিন থাকায় কাঁঠাল মানবদেহের জন্য বিশেষ উপকারী। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালে পুষ্টিমান হিসেবে মোট কার্বোহাইড্রেট ২৪ গ্রাম, বায়াটারি ফাইবার ২ গ্রাম, প্রোটিন ১ গ্রাম, ভিটামিন এ ২১৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৬.৭ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩৪ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ৩৭ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৩০৩ মিলিগ্রাম ও ক্যালরি পাওয়া যায় ৯৪ মিলিগ্রাম। খনিজ পদার্থ ১.১ গ্রাম, শক্তি কিলোক্যালরি ৪৮, আমিষ ১.৮ গ্রাম, শর্করা ৯.৯ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২০ মিলিগ্রাম, লৌহ ০.৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ১.১১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ ১৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ২১ মিলিগ্রাম, ক্যারেটিন ৪৭০০ মাইক্রোগ্রাম, আঁশ ০.২ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, জলীয় অংশ ৮৮ গ্রাম।

কাঁঠালের উপকারিতা

• কাঁঠালে চর্বির পরিমাণ নিতান্ত কম। এই ফল খাওয়ার কারণে ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কা কম।

• কাঁঠাল পটাশিয়ামের উৎকৃষ্ট উৎস। ১০০ গ্রাম কাঁঠালে পটাশিয়ামের পরিমাণ ৩০৩ মিলিগ্রাম। পটাশিয়াম উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। এ জন্য কাঁঠাল উচ্চ রক্তচাপ কমায়।

• কাঁঠালে প্রচুর ভিটামিন এ থাকায় রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।

• কাঁঠালের অন্যতম উপযোগিতা হলো ভিটামিন সি। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দাঁতের মাড়িকে শক্তিশালী করে ভিটামিন সি, যা কাঁঠালে ভরপুর থাকে।

• কাঁঠালে বিদ্যমান ফাইটোনিউট্রিয়ন্টেস থাকে, যা একটু দুর্লভ খাদ্য উপাদান, যা সহজেই আলসার, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ এবং বার্ধক্য প্রতিরোধে সক্ষম।

• কাঁঠালে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আমাদের দেহকে ক্ষতিকর ফ্রি- র‌্যাডিকেলস থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া সর্দি-কাশি রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

• টেনশন ও নার্ভাসনেস আমাদের এখন নিত্যসঙ্গী, এই সমস্যা কমাতে কাঁঠাল বেশ কার্যকর।

• বদহজম রোধ করে কাঁঠাল। দীর্ঘদিন ধরে বদহজমজনিত সমস্যায় যাঁরা ভুগছেন, তাঁরা নিয়মিত কাঁঠাল খেতে পারেন, তাতে বদহজমের সমস্যা দূর হবে; সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্যও হ্রাস পাবে।

• কাঁঠালে বিপুল পরিমাণে আছে ম্যাঙ্গানিজ, যা রক্তে শর্করা বা চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

• কাঁঠালে বিদ্যমান ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়ামের মতো হাড়ের গঠন ও হাড় শক্তিশালী করায় ভূমিকা রাখে।

• কাঁঠালে থাকা ভিটামিন বি৬ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়।

• কাঁঠালে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম কেবল হাড়ের জন্য উপকারী নয়, রক্তসঞ্চালনের প্রক্রিয়ায়ও ভূমিকা রাখে।

• ছয় মাস বয়সের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে কাঁঠালের রস খাওয়ালে শিশুর ক্ষুধা নিবারণ হয়। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় ভিটামিনের অভাব পূরণ হয়।

• চিকিৎসাশাস্ত্রমতে, প্রতিদিন ২০০ গ্রাম তাজা পাকা কাঁঠাল খেলে গর্ভবতী নারী ও গর্ভে থাকা সন্তানের সব ধরনের পুষ্টির অভাব দূর হয়। গর্ভবতী নারীরা কাঁঠাল খেলে তাঁর স্বাস্থ্য স্বাভাবিক থাকে এবং গর্ভস্থ সন্তানের বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়। দুগ্ধদানকারী মা তাজা পাকা কাঁঠাল খেলে দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

• কাঁঠালে থাকা খনিজ উপাদান আয়রন রক্তস্বল্পতা দূর করে।

কাঁঠাল সবাই খেতে পারেন না। অনেকে গন্ধের জন্য খেতে পারেন না আবার ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের কাঁঠাল খাওয়া একদম বারণ করা থাকে। অথচ ইচ্ছা করলে খেতে পারবেন। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও। এ ক্ষেত্রে কাঁঠাল খাওয়ার উপযুক্ত সময় হচ্ছে সকালে খালি পেটে। নাশতায় কাঁঠাল খেলে অন্য শর্করা-জাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না।

ডেউয়ায় আছে প্রচুর ক্যালসিয়াম

ডেউয়ায় আছে প্রচুর ক্যালসিয়াম

ডেউয়া কাঁঠালের মতোই গুচ্ছফল। মার্চে ডেউয়ার প্রায় পাতাহীন ডালপালায় ফুল আসে আর আগস্টে ফল পাকে। এ ফলের বাইরের অংশটি থাকে অসমান, এবড়োখেবড়ো। কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকলে হলুদ হয়। গাছ লম্বা উঁচু হয়। কাঁচা টক টক স্বাদ, কিন্তু পাকলে সেটা তখন অন্য স্বাদ—সেটা টকও নয়, আবার মিষ্টিও নয়। ডেউয়ার আদি জন্মস্থান বঙ্গবর্ম এলাকা। বর্মায় এ ফলের নাম মাইয়াক লুয়াং। অঞ্চলভেদে এই ফল মানুষের কাছে বিভিন্ন নামে পরিচিত।

ভিটামিন সি ও ক্যালসিয়ামের আধার বলা হয় ডেউয়াকে। এ ছাড়া ডেউয়ায় আছে অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। ডেউয়ায় খাদ্যযোগ্য প্রতি ১০০ গ্রাম অংশে রয়েছে খনিজ ০.৮ গ্রাম, খাদ্যশক্তি ৬৬ কিলোক্যালরি, আমিষ ০.৭ গ্রাম, শর্করা ১৩.৩ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৫০ মিলিগ্রাম, লৌহ ০.৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি১ ০.০২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ ০.১৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ১৩৫ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৩৪৮.৩৩ মিলিগ্রাম।

দেখতে অদ্ভুত ও খেতে টক-মিষ্টি ডেউয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। পাশাপাশি এর রয়েছে বেশ কিছু ভেষজ গুণও।

• মেদ ও ভুঁড়ি কমাতে: মেদ ও ভুঁড়ি কমাতে চাইলে ডেউয়ার রস এক থেকে দেড় চামচ ঠান্ডা পানিতে মিশিয়ে রোজ একবার করে এক মাস খেলে উপকার পাবেন। তবে ১২ মাস তো এ ফল পাওয়া যায় না। এ জন্য যখন পাওয়া যাবে, তখন কেটে রোদে শুকিয়ে রাখতে পারেন।

• পেট ফাঁপা সমস্যায়: পেটে বায়ু জমলে পাকা ডেউয়ার রস দেড় চামচ আধা কাপ পানিতে মিশিয়ে অল্প চিনি দিয়ে প্রতিদিন একবার এক সপ্তাহ খেলে উপকার হবে।

• মুখের রুচি ফেরাতে: যাঁদের অসুস্থতার কারণে মুখে রুচি নেই, তাঁরা দু-তিন চামচ ডেউয়ার রস ও সঙ্গে একটু লবণ–গোলমরিচগুঁড়া মিশিয়ে দুপুরবেলা ভাত খাওয়ার আগে খেতে পারেন। এক সপ্তাহ খেলেই মুখে রুচি আসবে।

• পেটের সমস্যায়: অনেকের বিভিন্ন প্রকার খাবার খেলেও পেট পরিষ্কার হয় না, অস্বস্তিতে ভোগেন। তাঁরা কাঁচা ডেউয়া কেটে ৮-১০ গ্রামের মতো বেটে গরম পানিতে মিশিয়ে কিছুক্ষণ রেখে ওই পানি খেলে পেট পরিষ্কার হয়ে যাবে। এটা সকালে বাসি পেটে খেতে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও গ্যাসের কারণে পেটব্যথা কমাতে সহায়তা করে ডেউয়া।

• দাঁতের সমস্যায়: ডেউয়ার ভিটামিন সি ত্বক, চুল, নখ, দাঁত ও মাড়ির নানা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, যা দাঁত ও হাড়ের ক্ষয়রোগ প্রতিরোধ করে। তাই এই ফলকে ক্যালসিয়ামের আধার বলা হয়।

• ডিহাইড্রেশনে: কোনো কারণে বমি বমি ভাব অনুভব হলে তা খেলে দ্রুত সেরে যায়। অত্যধিক তৃষ্ণা নিবারণে কাজ করে টকজাতীয় ফল ডেউয়া।

• ত্বকের সুরক্ষায়: ত্বকের খসখসে ভাব দূর হয়ে মসৃণ ভাব ফিরে আসে। অর্থাৎ শরীরের শুষ্ক ভাব দূর হয়। ডেউয়ায় ট্যানিন থাকে এবং এটি ত্বকের ক্ষত নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়, যা আপনি এ ফল খেলেই পাবেন।

• লিভার সমস্যায়: লিভারজনিত নানা অসুখ নিরাময়ে সাহায্য করে ডেউয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ভিদের মধ্যে কিছু ফার্মাকোলজিক্যাল কার্যকলাপ পাওয়া গেছে এবং এগুলো হলো প্রদাহবিরোধী, অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিক্যানসার ও অ্যান্টি-এইচআইভি বৈশিষ্ট্য, লিভারের সতেজতা হিসেবে কাজ করে।

• স্মৃতিশক্তি বাড়াতে: এ ফল খেলে স্মৃতিশক্তিও বাড়ে। মরিচ, লবণ, চিনি দিয়ে ডেউয়ার ভর্তা খেলে সানস্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

এ ছাড়া ডেউয়ায় বিদ্যমান পটাশিয়াম রক্ত চলাচলে সহায়তা করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। ইউনানি চিকিৎসায় ফল ও ফলের বীজ ব্যবহার করে থাকে। ফল ও গাছের রসকষে অনেক রাসায়নিক দ্রব্য আছে, যেমন ট্যানিন, স্টেরোকিটোন ও আরটোস্টটিনোন।

হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই দেশি ফলগুলো। তাই ফল সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আশা উচিত।

লটকন শক্তিতে কাঁঠালের দ্বিগুণ

লটকন শক্তিতে কাঁঠালের দ্বিগুণ

অনেকটা আঙুরের মতো দেখতে লটকন একটি সুস্বাদু ফল। এটি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতে বেশি হয়। আমাদের দেশেও এই ফলের ব্যাপক চাষ হয়। প্রাচীনকালে এগুলো ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। খাদ্যশক্তির ভালো উৎস লটকন। দেহ সক্রিয় রাখতে ও দৈনন্দিন কাজ করতে খাদ্যশক্তি প্রয়োজন হয়। প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনে ৯২ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়, যা আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

এই ফলে নানা রকম খনিজ উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ক্রোমিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম উল্লেখযোগ্য। এসব উপাদান শরীরকে সুস্থ রাখে।
প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনে ৯ গ্রাম ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্রোমিয়াম থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনে ৫.৩৪ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। লটকনে ভিটামিন ‘বি’ পাওয়া যায়। প্রতি ১০ গ্রাম লটকনে ১০.০৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘বি’ ওয়ান ও প্রতি ১০০ গ্রামে ০.২০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি২ পাওয়া যায়।

  • ক্যানসার প্রতিরোধে: লটকন ক্যানসার প্রতিরোধে ব্যবহৃত একটি ফলও হতে পারে। এই রোগটি এমন একটি রোগ, যা তাড়াতাড়ি এড়ানো উচিত। তার জন্য ক্যানসার প্রতিরোধক হিসেবে আপনি এই ফল খেতে পারেন।
  • অ্যানিমিয়া রোধে: আয়রনের স্বল্পতার কারণে অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা তৈরি হয় শরীরে। লটকনে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। এ কারণে এটি রক্তশূন্যতা দূর করতে সাহায্য করে।
  • ডিহাইড্রেশন কমায়: ডিহাইড্রেশন কাটিয়ে উঠতে লটকন ফলের প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে। পানি ছাড়াও আপনি তৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ফল খাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
  • লাল চোখ নিরাময় করে: লাল চোখ আসলে অনেক কারণের দ্বারা সৃষ্ট চোখের ব্যাধিগুলোর একটি ইঙ্গিত, চুলকানি থেকে শুরু করে। চোখ লাল কমানোর জন্য লটকন খুব কার্যকর।
  • পরিপাকতন্ত্রে সাহায্য করে: লটকনের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার উপাদান পরিপাকতন্ত্রের সঠিক কাজ করতে সাহায্য করে। এটি যথেষ্ট পরিমাণে ফাইবারযুক্ত একটি ফল। এই ফল অন্ত্র ও পাকস্থলীর মতো পরিপাক অঙ্গগুলোর কার্যকারিতা উন্নত করবে। একটি সুস্থ পরিপাক অঙ্গ আপনার পরিপাকতন্ত্রকেও সুস্থ করে তুলবে।

  • রক্তে শর্করার মাত্রা বজায় রাখুন: রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে লটকন ফল বেশ উপকারী। ফলটিতে অতিরিক্ত চিনির উপাদান নেই, তাই এটি আপনার শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াবে না।
  • কিছু চর্মরোগ নিরাময়: বাহ্যিক রোগের জন্য, লটকনকে খুব শক্তিশালী বলে মনে করা হয়। ফলটি বিভিন্ন চর্মরোগ যেমন চুলকানি, পানু, খোসপাঁচড়া ও দাদ সারাতে সক্ষম। কৌশলটি খুবই সহজ, শুধু এই ফলটি বেটে অসুস্থদের ত্বকে লেপে দিতে হয়।
  • শরীরের জন্য শক্তির উৎস: শরীরে শক্তি বাড়াতে লটকন একটি ফল। ফলটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ এবং প্রোটিন থাকে, যা খাওয়া হলে শক্তিতে পরিণত হয়। আপনি যদি এটি আপনার নিয়মিত ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করেন তবে আপনি সারা দিন সক্রিয় থাকবেন।
  • স্নায়ুর দুর্বলতা কমায়: লটকনে কলার মতোই পর্যাপ্ত পটাশিয়াম থাকে, যা স্নায়ুর দুর্বলতা কমায়। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। সেই সঙ্গে এটি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও কমায়।
  • হাড় সুরক্ষায়: লটকন ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। এ কারণে লটকন হাড় সুরক্ষায়ও ভূমিকা রাখে। সঙ্গে থাকে আয়রন, যা রক্ত ও হাড়ের জন্য বিশেষ উপকারী।
  • ভিটামিন সির চাহিদা পূরণ করে: লটকনে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। দিনে দুই-তিনটি লটকন খেলে শরীরের ভিটামিন সির চাহিদা পূরণ হয়। ভিটামিন ‘সি’ ত্বক, দাঁত ও হাড় সুস্থ রাখে। লটকনে ভিটামিন ‘সি’ বেশি থাকায় দিনে দুই-তিনটি লটকন ভিটামিন ‘সি’র সার্বিক চাহিদা পূরণ করতে পারে।

লটকনে রয়েছে অ্যামাইনো অ্যাসিড ও এনজাইম, যা দেহ গঠন ও কোষকলার সুস্থতায় কাজে লাগে। এসব উপাদান রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। নানা রকম পুষ্টি উপাদান যা শরীরকে সুস্থ রাখে ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে। রুচি বাড়াতে লটকন বেশ উপকারী।

লেখক: খাদ্যপথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

ছবি: সেলিনা শিল্পী

কাউফল শক্ত রাখে মাড়ি

কাউফল শক্ত রাখে মাড়ি

কাউফল একধরনের অপ্রচলিত টক স্বাদের ফল। আমাদের গ্রামবাংলায় এটা বিভিন্ন নামে ডাকে। যেমন: কাউয়া, কাগলিচু, তাহগালা, ক্যাফল, কাউগোলা, পাঁচদানা ইত্যাদি। এর গাছ মাঝারি আকৃতির, এর পাতা ও ডালপালা কম, ওপরের দিকে ঝোপালো হয়ে ওঠে। সাধারণত বাড়ির জঙ্গলে এই গাছ দেখা যায়। ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ ও পাকলে কমলা বা হলুদ হয়। ফলের ভেতর চার-পাঁচটি দানা থাকে, যার কারণে অনেকেই এটাকে পাঁচদানা ফলও বলে থাকে। বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ চীন, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশে কাউগাছ দেখা যায়। ফল হিসেবে সরাসরি খাওয়া ছাড়াও এই ফল বেশি ক্ষেত্রে জ্যাম তৈরি করা হয়।

কাউফলের পুষ্টিগুণ

প্রতি ১০০ গ্রামে আছে ৬৩ ক্যালরি, যার কারণে চর্বিসম্পৃক্ত বা ভালো কোলেস্টেরল রয়েছে। উচ্চমাত্রায় ফাইবারে সমৃদ্ধ, কাউফলে ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস এবং প্রতি ১০০ গ্রামে আরডিএ প্রায় ১২%। ভিটামিন সি থাকার সঙ্গে একটি শক্তিশালী জলে দ্রবণীয় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল মানবদেহের ভাইরাল ফ্লু প্রতিরোধ করে। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ফ্রির‌্যাডিক্যাল সাফ করতে সাহায্য করে। এর শক্তি ৬৩%, ক্যালসিয়াম ৫.৪৯ মিলিগ্রাম, শর্করা ১৫.৫ গ্রাম, কপার ০.০৬৯ মিলিগ্রাম, প্রোটিন ০.৫০ মিলিগ্রাম, আয়রন ০.১৭ মিলিগ্রাম, মোট ফ্যাট ০.৪ গ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১৩.৯ মিলিগ্রাম, কোলেস্টেরল ৩.৫% , ম্যাঙ্গানিজ ০.১০ মিলিগ্রাম, ফাইবার ৫.১০ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৯.১২ মিলিগ্রাম, জিংক ০.১২ মিলিগ্রাম।

কাউফলের উপকারিতা

মাড়ির সংক্রমণ রোধে: যাঁদের মাড়িতে গুরুতর সংক্রমণ রয়েছে, তাঁদের জন্য কাউফল হতে পারে একটি ভালো পথ্য, মৌসুমি ফলটি নিয়মিত খেলে মাড়ির সংক্রমণ ভালো হয়ে যায়, মাড়ি মজবুত করে।

মুখের অরুচিভাব দূর করতে: হঠাৎ করে অরুচি হলে কাউফল খেলে মুখে রুচি ফিরে আসে। কাউফল অনেকটা চুষে খাওয়া হয়, তাই এটা চুষে খেলে জিবের ওপরে ভাইরাল প্রলেপ দূর হয়ে যায়, যার কারণে রুচি ফিরে আসে।

অপুষ্টির সমস্যায়: অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা দিলে কাউফল খেলে ভালো উপকার পাওয়া যায়। বিশেষ করে শিশুদের অপুষ্টিজনিত কারণে কাউফল খাওয়া যেতে পারে। এর পুষ্টিগুণের কারণে সহজেই শরীরে একটি ব্যালান্স তৈরি করতে সাহায্য করে।

ঠান্ডার সমস্যায়: ঠান্ডাজনিত সমস্যা দেখা দিলে সকাল-বিকেল কাউফল খেলে উপকার পাওয়া যায়। ভিটামিন সি ঠান্ডাজনিত সমস্যার জন্য বিশেষ উপকারী, তাই ঠান্ডা লাগলে কাউফল কফ বের করতে সাহায্য করে।

আমাশয় নিরাময়ে: পেটের সমস্যা বা আমাশয় হলে কাউফল খেলে দ্রুত নিরাময় হয়ে যায়। এতে থাকা জিংক হজমে ভারসাম্য আনে, সেই সঙ্গে অধিক ফাইবারের কারণে পুরোনো মল পরিষ্কার করে।

মাথাধরা নিরাময়ে: অনেকের বিভিন্ন কারণে মাথা ধরে থাকে। মাথাধরা নিরাময়ের জন্য কাউফল খেলে দারুণ উপকার পাওয়া যায়।

রোগপ্রতিরোধে: কাউফল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে ভালো উৎস, যা রোগপ্রতিরোধে কাজ করতে পারে এবং বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।

খিঁচুনি নিরাময়ে: কাউছাল ও ফল সেদ্ধ করে এই ক্বাথ সকাল-বিকেল সেবন করলে খিঁচুনি রোগ ভালো হয়। এটি একটি প্রাচীন চিকিৎসা, যার কারণে একসময় গ্রামে কাউগাছ রাখার প্রবণতা ছিল।

এ ছাড়া কাউফলে কপার, ম্যাঙ্গানিজ ও ম্যাগনেশিয়াম খুব ভালো পরিমাণ রয়েছে। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। একইভাবে এটা স্ট্রোক এবং করোনারি হার্ট রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

করমচায় মন তাজা

করমচায় মন তাজা

করমচা। টক স্বাদের ছোট আকৃতির মুখরোচক একটি ফল। এই ফল গ্রাম থেকে এখন শহরেও চাষ করা হয়। কারও কারও বাড়রি ছাদ কিংবা বারান্দায়ও দেখা মেলে। একসময়ে গ্রামে করমচার প্রচুর ফলন হতো। করমচা খুবই জনপ্রিয় টকজাতীয় ফল। কাঁটায় ভরা এ গাছ, পাতা ও ফলে নান্দনকিতার ছোঁয়া থাকায় অনেকে সৌর্ন্দযর্বধনের জন্যও এ গাছ রোপণ করে থাকেন। এর গোলাপি রং বাগানের শোভা বাড়িয়ে দেয়।
করমচায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ। এ ফলের অনেক গুণ। এতে আছে ১৮ দশমিক ২ ভাগ জলীয় রস, ২ দশমিক ৩ ভাগ প্রোটিন, ২ দশমিক ৮ ভাগ খনিজ, ৯ দশমিক ৬ ভাগ স্নেহ, ৬৭ দশমিক ১ ভাগ শর্করা। এ ছাড়া খনিজের মধ্যে ক্যালসিয়াম শূন্য দশমিক ১৬ ভাগ, ফসফরাস শূন্য দশমিক ৬ ভাগ এবং লৌহ ৩৯ দশমিক ১ ভাগ।

প্রতি ১০০ গ্রাম করমচায় পাওয়া যায় ৩৬৪ ক্যালরি, রিবোফ্লেভিন শূন্য দশমিক ১ মিলিগ্রাম, নায়াসিন শূন্য দশমিক ২ মিলিগ্রাম, আয়রন ১ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১৬ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ২৬০ মিলিগ্রাম, কপার শূন্য দশমিক ২ মিলিগ্রাম এবং ১০০ গ্রাম তাজা ফলে রয়েছে ২০০ দশমিক ৯৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি করমচায় চর্বি এবং ক্ষতকির কোলস্টেরেল থাকে না।

ভিটামিন সিতে ভরপুর করমচা মুখে রুচি বাড়ায়। এ ফল রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে হৃৎপিণ্ডের সুরক্ষা দেয়। শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কমাতেও সাহায্য করে, যকৃত ও কিডনি রোগ প্রতিরোধে আছে বিশেষ ভূমিকা। এ ছাড়া মৌসুমি সর্দি-জ্বর, কাশিতে করমচা খান বেশি করে।

  • কোলেস্টেরল কমায়: যাঁদের কোলেস্টারলজনিত সমস্যা আছে, তাঁরা মৌসুমে করমচা খাওয়া ভালো, এতে কোলেস্টরল নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। করমচায় চর্বি এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল থাকে না, তাই যাঁদের ওজন নিয়ে সমস্যা তাঁরা খেতে পারেন।
  • ইনফেকশন দূর করে: ভিটামিন সিতে ভরপুর করমচা মুখে রুচি ফিরিয়ে দেয়, ক্ষুধামান্দ্য, অরুচি আর শরীরে জানা-অজানা কোনো ধরনের ইনফেশন আছে, তাঁরা করমচা খেতে পারেন।
  • হৃৎপিণ্ডের সরক্ষা দেয়: করমচার উচ্চমাত্রার পটাসিয়াম রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রেখে হৃৎপিণ্ডের সুরক্ষা দেয়। শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কমাতেও সাহায্য করে।
  • লিভার ও কিডনি ভালো রাখে: যকৃত ও কিডনির রোগ প্রতিরোধে আছে বিশেষ ভূমিকা, সমস্যা হওয়ার আগেই খেতে হয়, সমস্যা তৈরি হলে খাওয়া বাদ দিতে হয়।
  • সিজনাল ফ্লু কমায়: করমচা যেহেতু নির্দিষ্ট মৌসুমেই জন্মে, তাই মৌসুমি সর্দি-জ্বর, কাশিতে করমচা খান বেশি করে। জুস করে খেলে বেশি ফল পাওয়া যায়।
  • পেটের সমস্যা দূর করে: করমচা কৃমিনাশক হিসেবে ওষুধের বিকল্প কাজ করে। এ ছাড়া পেটের নানা অসুখের দাওয়াই করমচা।
  • শরীরে ক্লান্তি দূর করে: করমচা একটি ব্যালেন্সড ফল, তাই শরীরের ক্লান্তি দূর করে শরীরকে চাঙ্গা রাখে।
  • বাতব্যথা কমায়: বাতরোগের ব্যথাজনিত কারণে ব্যথা দূর করতে ও বাত নিরাময়ে করমচা খুব উপকারী।
  • দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে: করমচাতে থাকা ভিটামিন ‘এ’ চোখের জন্য খুবই উপকারী, দৃষ্টিশক্তি প্রখরতা দেয়।
  • ত্বক ভালো রাখে: এটি ত্বক ভালো রাখে ও রোগ প্রতিরোধে কার্যকর।
  • দাঁত ও মাড়ির শক্তি জোগায়: করমচায় ভিটামিন সি বেশি থাকায় দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষা দেয়, অনেক মনে করেন টক বোধহয় দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে, এ ক্ষেত্রে করমচায় খাটে না বরঞ্চ দাঁত ভালো রাখে।

কাঁচা করমচা গায়ের ত্বক ও রক্তনালি শক্ত করে এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। পাতা গরম পানিতে সিদ্ধ করে পান করলে মৌসুমি জ্বর নিরাময়ে উপকার পাওয়া যায়। শিকড়ের রস গায়ের চুলকানি ও কৃমি দমনে সাহায্য করে। যাঁদের রক্তে পটাসিয়ামের মাত্রা বেশি, তাঁদের করমচা না খাওয়াই ভালো। মৌসুমে তাজা করমচা খান নিয়মিত, অনেক রোগ এড়ানো যাবে।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

ছবি: সেলিনা শিল্পী

জাম রক্ত বিশুদ্ধ করে

জাম রক্ত বিশুদ্ধ করে

জামের উপকারিতা

  • মানসিকভাবে সতেজ রাখে:

জামে গ্লুকোজ, ডেক্সট্রোজ ও ফ্রুকটোজ রয়েছে, যা মানুষকে জোগায় কাজ করার শক্তি। বয়স যত বাড়তে থাকে, মানুষ ততই হারাতে থাকে স্মৃতিশক্তি। জাম স্মৃতিশক্তি প্রখর রাখতে সাহায্য করে।

  • ডায়াবেটিস নিরাময়ে সাহায্য করে:

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জাম ভীষণ উপকারী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত জাম খাওয়ার ফলে ৬.৫ শতাংশ মানুষের ডায়াবেটিস কমে গেছে। এটি রক্তে চিনির মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। জাম ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে শরীর সুস্থ রাখে।

  • ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ দূর করে:

জামে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি। যার জন্য এটি দেহে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি পূরণ করে এবং একই সঙ্গে ভিটামিন সি-র অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ করে।

  • মুখের স্বাস্থ্যে:

মুখের দুর্গন্ধ রোধ, দাঁত মজবুত, মাড়ি শক্ত এবং মাড়ির ক্ষয়রোধেও জামের জুড়ি নেই।

  • ইলেকট্রোলাইট বজায় রাখে:

জামে বিদ্যমান পানি, লবণ ও পটাশিয়ামের মতো উপাদান গরমে শরীর ঠান্ডা এবং শারীরিক দুর্বলতাকে দূর করতে সক্ষম। জামে দেখা মেলে বেশি পরিমাণের আয়রনেরও, যা রক্তস্বল্পতা দূর করে।

  • হার্ট ভালো রাখে:

জাম রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃৎপিণ্ড ভালো রাখে। এ ছাড়া শরীরের দূষিত কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমিয়ে দেহের প্রতিটি প্রান্তে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।

  • ওজন নিয়ন্ত্রণ করে:

জামে কম পরিমাণে ক্যালরি থাকে, যা ক্ষতিকর তো নয়ই, বরং স্বাস্থ্যসম্মত। তাই যাঁরা ওজন নিয়ে চিন্তায় আছেন এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, তাঁদের খাদ্যতালিকায় আসতে পারে জাম।

  • উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে:

পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকেরা তাজা ফল ও সবজি খাওয়ার সুপারিশ করে থাকেন। জামে সেই সব উপাদান আছে, যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে।

  • ক্যানসার প্রতিরোধে:

কালোজাম উপকারী, মানুষের মুখের লালার মধ্যে একধরনের রঞ্জক পদার্থ উৎপাদিত হয়, যা থেকে ব্যাকটেরিয়ার জন্ম নেয়। এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া থেকে মুখে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর জাম মুখের ভেতর উৎপাদিত ক্যানসারের সহায়ক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব থেকে দেহকে রক্ষা করে মুখের ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রঙিন ফলের ভেতর যে পরিমাণ যৌগিক উপাদান রয়েছে, এর মধ্যে জামে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ যৌগিক উপাদান রয়েছে, যা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাহায্য করে। জাম লড়াই করে জরায়ু, ডিম্বাশয় ও মলদ্বারের ক্যানসারের বিরুদ্ধে।

  • রোগ প্রতিরোধে:

জামে ফাইটো কেমিক্যালস আর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বিদ্যমান, যা দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, সঙ্গে মৌসুমি সর্দি-কাশি থেকে মুক্তি দেয়। প্রতিরোধ করে ইনফেকশনের মতো সমস্যারও। জামে পাওয়া গেছে অ্যালার্জিক নামের একধরনের অ্যাসিডের উপস্থিতি, যা ত্বককে করে শক্তিশালী। ক্ষতিকর আলট্রাভায়োলেট রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক ও চুলকে রক্ষা করে। এ অ্যালার্জিক অ্যাসিড ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

  • চোখের যত্নে:

বৃদ্ধ বয়সে চোখের অঙ্গ ও সড়বায়ুগুলোকে কর্মময় করতে সাহায্য করে। জাম চোখের ইনফেকশনজনিত সমস্যা ও সংক্রামক (ছোঁয়াচে) রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। রাতকানা রোগ এবং যাঁদের চোখের ছানি অপারেশন হয়েছে, তাঁদের জন্য জাম ভীষণ উপকারী।

  • মানসিক স্বাস্থ্যে:

কালোজাম টিস্যুকে টান টান হতে সাহায্য করে, যা ত্বককে তারুণ্যদীপ্ত হতে সাহায্য করে। জাম ব্রেন অ্যালারট হিসেবে কাজ করে এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

এ ছাড়া জামে প্রচুর পরিমাণে পানি ও ফাইবার থাকে বলে হাইড্রেটেড থাকতে ও ত্বককে স্বাস্থ্যবান করতে সাহায্য করে। ডিটক্সিফায়ার হিসেবেও কাজ করে জাম।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

লিচু স্বাদে ও গুণে অনন্য

লিচু স্বাদে ও গুণে অনন্য

লিচু আমাদের দেশের জনপ্রিয় ও অতিপরিচিত ফল। সুন্দর এ ফলের রয়েছে রোগ নিরাময়ের প্রয়োজনীয় অনেক খাদ্যোপাদান। এসব উপাদান আমাদের শরীরের অনেক সমস্যার সমাধান করে শরীরকে নীরোগ রাখে। লিচুতে খাদ্যশক্তি ও ভিটামিন সি রয়েছে প্রচুর। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে আছে জলীয় অংশ ৮৪.১ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১০ মিলিগ্রাম, মোট খনিজ ০.৫ মিলিগ্রাম, লৌহ ০.৭ মিলিগ্রাম, আঁশ ০.৫ মিলিগ্রাম, খাদ্যশক্তি ৬১ কিলোক্যালরি, ভিটামিন বি১ ০.০২ মিলিগ্রাম, আমিষ ১.১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ০.০৬ মিলিগ্রাম., চর্বি ০.২, ভিটামিন সি ৩১ মিলিগ্রাম, শর্করা ১৩.৬ মিলিগ্রাম।

লিচুর উপকারিতা

হাড় ভালো রাখে: লিচুতে থাকে ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও কপার। এসব উপাদান হাড়ের ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিচু খেলে কমে হাড়ের ভঙ্গুরতা। সেই সঙ্গে হ্রাস পায় অস্টিওপোরোসিস ও ফ্র্যাকচারের আশঙ্কাও। তাই হাড় ভালো রাখতে খেতে পারেন সুমিষ্ট এ ফল।
কিডনির জন্য উপকারী: কিডনি ভালো রাখতে খাবারের দিকে নজর রাখা জরুরি। লিচুতে পর্যাপ্ত পানি ও পটাশিয়াম থাকার কারণে তা কিডনিতে জমে থাকা দূষিত পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করে। এ ফল ইউরিক অ্যাসিডের ঘনত্বও কমায়। যে কারণে কমে কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি।

ভিটামিন বি–সমৃদ্ধ: লিচুতে পাওয়া যায় ভিটামিন সি, কে, ই এবং বি৬। এতে আরও রয়েছে রাইবোফ্লাভিন ও নিয়াসিন। গ্রীষ্মে আপনি নিয়মিত লিচু খেলে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি৬-এর ১০ শতাংশ পাওয়া যায়। এই ভিটামিন সাহায্য করে লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে। সেই সঙ্গে আপনাকে রক্ষা করে প্রদাহজনিত রোগ থেকে। শরীরের বিভিন্ন ধরনের ব্যথা দূর করতে কাজ করে লিচু। শুনতে অবাক করা হলেও এটি সত্যি। লিচু একটি কার্যকর ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। এটি খেলে কমে প্রদাহ। সেই সঙ্গে এটি টিস্যুর ক্ষতি প্রতিরোধ করে।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়: রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে সুমিষ্ট ফল লিচু। এর অলিগোনল ভাইরাসকে বাড়তে বাধা দেয়। তাই গরমের এ সময়ে নিয়মিত লিচু খেলে বাঁচতে পারবেন সর্দি ও সাধারণ ফ্লু থেকে।
ওজন কমাতে সাহায্য করে: যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের জন্য কার্যকর একটি খাবার হতে পারে লিচু। এতে ক্যালরি থাকে খুব কম। যে কারণে ওজন বাড়ার ভয় থাকে না। আঁশযুক্ত হওয়ার কারণে লিচু খেলে তা দীর্ঘ সময় পেট ভরিয়ে রাখে। নিয়মিত লিচু খেলে হজমশক্তি উন্নত হয়।

হার্ট ভালো রাখে: হার্ট ভালো রাখার পক্ষে সহায়ক একটি ফল হলো লিচু। এতে থাকে অলিগোনল, যা নাইট্রিক অক্সাইড তৈরি করতে সাহায্য করে। আমাদের শরীরে রক্ত চলাচলে সাহায্য করে এই নাইট্রিক অক্সাইড। এতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড ভাসকুলার ফাংশন উন্নত করে। ফলে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ করা সহজ হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত লিচু খেলে হার্টের অসুখের ঝুঁকি কমে প্রায় ৫০ শতাংশ।

এ ছাড়া কাশি, পেটব্যথা, টিউমার ও গ্ল্যান্ডের বৃদ্ধি দমনে লিচু কার্যকর। লিচু শরীর ঠান্ডা রাখে। তৃষ্ণা মেটায় ও শরীরের বল বাড়ায়। অত্যধিক ক্লান্তিতে বা দীর্ঘ রোগভোগের পর দুর্বলতায় প্রতিদিন চার-পাঁচটি লিচু খেলে দারুণ উপকার পাওয়া যায়। মস্তিষ্কের দুর্বলতায় স্মৃতিবিভ্রম ঘটলে ভুলোমনা মানুষজন দিনে ৮-১০টি লিচু খেলে স্মৃতি স্বাভাবিক হয়।

মৌসুমের সময় সকালবেলা চার-পাঁচটি করে লিচু খেলে বয়স বাড়লেও শরীরে লাবণ্য বজায় থাকে। লিভার রোগে ভুগলে ঠিকমতো খিদে হয় না। পেট অপরিষ্কার হয়, খাদ্যে অরুচি ভাব হয়। এ ক্ষেত্রে দিনে দুবার লিচুর জুস খেলে বা দুই বেলা পাঁচ-সাতটি লিচু খেলে যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায়।

সতর্কতা

লিচু গরম ফল। এটি বেশি খেলে পেট গরম হয়ে ডায়রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পরিমিত পরিমাণ খাওয়া উচিত।

লেখক: খাদ্যপথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

এক জামরুল তিন কমলা সমান সমান!

এক জামরুল তিন কমলা সমান সমান!

জামরুল খেতে পানসে। এর প্রকৃত কারণটা অবশ্য অনেকেই জানেন না। যে বছর প্রকৃতিতে প্রচণ্ড রোদ পড়ে, সে বছর জামরুল হয় মিষ্টি। আর ছায়ার জামরুল খেতে পানসে। জামরুলের মিষ্টতা বেশি না হলেও এই ফল খেতে সুস্বাদু। জামরুল সাদা, হালকা সবুজ, গোলাপি, লাল এবং কালো বর্ণেরও হয়। জামরুল আজকাল লাল রং ধারণ করে মিষ্টি হতে যাচ্ছে।

সহজলভ্য জামরুল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। এতে খনিজ পদার্থ রয়েছে কমলার তিন গুণ এবং আম, আনারস ও তরমুজের সমান। ক্যালসিয়ামের পরিমাণ লিচু ও কুলের সমান এবং আঙুরের দ্বিগুণ। আয়রনের পরিমাণ কমলা, আঙুর, পেঁপে ও কাঁঠালের চেয়েও বেশি। ফসফরাসের পরিমাণ আপেল, আঙুর, আম ও কমলার চেয়ে বেশি।

জামরুলে জলীয় অংশ ৮৯.১ শতাংশ, ক্যারোটিন আছে ১৪১ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন বি-১ আছে ০.১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-২ আছে ০.৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ‘সি’ ৩ মিলিগ্রাম। ক্যালরি শক্তি: ৫৬ প্রোটিন ০.৫ থেকে ০.৭ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ১৪.২ গ্রাম, খাদ্য আঁশ ১.১ থেকে ১.৯ গ্রাম, ফ্যাট ০.২ থেকে ০.৩ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৯ থেকে ৪৫.২ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ৪ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ১১.৭ থেকে ৩০ মিলিগ্রাম, আয়রন ০.৪৫ থেকে ১.২ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ৩৪.১ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৩৪.১ মিলিগ্রাম, কপার ০.০১ মিলিগ্রাম, সালফার ১৩ মিলিগ্রাম, ক্লোরিন ৪ মিলিগ্রাম, আমিষ ০.৭ গ্রাম, চর্বি ০.২ গ্রাম, খনিজ পদার্থ ০.৩ গ্রাম এবং খাদ্যশক্তি রয়েছে ৩৯ কিলোক্যালরি।

জামরুল খাওয়ার উপকারিতা

• হজমশক্তি বৃদ্ধি: জামরুলের উচ্চ মাত্রার ফাইবার হজমে দারুণ উপকারী। কোষ্ঠকাঠিন্য বলতে কোনো সমস্যাই থাকে না। এর বিচি ডায়রিয়া প্রতিরোধে অনেকটা ওষুধের মতো কাজ করে।

• ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: জাম্বোসাইন একধরনের ক্ষারজাতীয় উপাদান। এটি শর্করাকে চিনিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সুস্থ মানুষের দেহে ডায়াবেটিস বাসা বাঁধা ঠেকিয়ে দিতে দক্ষ জামরুল। কাজেই জামরুল খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে যাবে না।

• ক্যানসার প্রতিরোধ: জামরুলে রয়েছে ক্যানসার প্রতিরোধের অনেক উপাদান। তাই নিয়মিত জামরুল খেলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমায় এবং ক্যানসার প্রতিরোধ করে।

• কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: ফাইবার ও পুষ্টি উপাদানের সম্মিলিত উপস্থিতি দেহের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে দারুণ কার্যকর। অ্যাথেরোসক্লেরোসিসের ঝুঁকিও কমে আসে উল্লেখযোগ্য হারে। কার্ডিওভাসকুলারবিষয়ক জটিলতা হ্রাস পায়। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক আর করোনারি রোগের ঝুঁকিও আপনাকে দুশ্চিন্তায় রাখবে না।

• মস্তিষ্ক ও লিভারের জন্য: মস্তিষ্ক ও লিভারের সুরক্ষায় জামরুল টনিক হিসেবে কাজ করে। একটি ফল যা লিভার ও মস্তিষ্কের সুরক্ষায় কাজ করে। এ ছাড়া হেপাটোপ্রোটেক্টিভ নামক একটি উপাদান আছে, যা লিভার কোষ ধ্বংস থেকে রক্ষা করে।

• বাতে উপকারী: জামরুল ভেষজ গুণসমৃদ্ধ ফল। বাত নিরাময়ে এটি ব্যবহার করা হয়। মৌসুমে যত দিন পাওয়া যায়, তত দিন খেতে হয়।

• চোখের কালি দূর করতে: অঘুম কিংবা দুশ্চিন্তায় যাঁদের চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, তাঁরা সেই কালি দূর করতে নিয়মিত একটি করে জামরুল খেয়ে দেখতে পারেন।

• রোগ প্রতিরোধ: জামরুলের কার্যকর ও শক্তিশালী উপাদানগুলো জীবাণু এবং ছত্রাকনাশক হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকে ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকায় এ ফল। এতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে।

• বিষাক্ত উপাদান পরিষ্কার: প্রতিনিয়ত শরীরে বিষাক্ত উপাদান ঘুরে বেড়ায়। শত শত বছর ধরে দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ ধুয়ে বের করে দিতে জামরুলের কদর রয়েছে। লিভার আর কিডনির বিষ দূর করে বিপাকক্রিয়া সুষ্ঠু রাখতে যেন এক অব্যর্থ টোটকা এই জামরুল।

আমাদের দেশি ফলগুলোর গুণগুলো এমনই। মৌসুমের শুরুতেই ফলগুলো নিয়মিত খাওয়া উচিত, বিশেষ করে যত দিন পাওয়া যায়। ফল খাওয়ার জন্য উপযুক্ত সময় হচ্ছে সকালে নাশতায় ফল খাওয়া এবং দুপুরের আগে, রাতে ফল খাওয়া ঠিক নয় বলে আমাদের প্রাচীন বিদ্যা বলে থাকে।

লেখক: খাদ্যপথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

ছবি: সেলিনা শিল্পী ও শামীমা মজুমদার

দুধ পানের ভালো-মন্দ

দুধ পানের ভালো-মন্দ

বলা হয়, দুধ একটি পরিপূরক খাবার। শিশুকালে মায়ের বুকের দুধ ছেড়ে দিলেও মানুষ অন্য প্রাণীর দুধ খায়। দুই বছর বয়স পেরিয়ে গেলেও সারাজীবন খায়। মানুষ দুধের নানা পদ করে খায়। নানা প্রক্রিয়ায় মানুষ দুধ খায়। অথচ অন্য কোনো প্রাণী তার শিশুকাল পেরিয়ে আর কখনো দুধ খায় না। এক প্রাণী অন্য প্রাণীর দুধ খায় না।

এই যে মানুষের দুধ খাওয়ার অভ্যাস, স্বাদ ছাড়তে পারে না তার পেছনে আছে দুধ খাওয়ার ভালো কিছু দিক।

বিশেষ করে গরুর দুধে ক্যালসিয়াম থেকে শুরু করে দুধ একটি সম্পূর্ণ খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। দুধ ২২টি মিনারেলসমৃদ্ধ। ফলে পুষ্টির জন্য মানুষ নিরাপদ খাদ্য হিসেবে খেয়ে থাকে। দুধে থাকে আয়রন, সেলেনিয়াম, ভিটামিন বি-সিক্স, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, নিয়াসিন, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন এ ছাড়া দুধে অন্যান্য প্রকারের তুলনায় বেশি চর্বি রয়েছে। যেমন স্যাচুরেটেড ফ্যাট ৪.৮ গ্রাম, আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ১.৯ গ্রাম ও কোলেস্টেরল ২৪ মিলিগ্রাম।

গরুর দুধ অনেক মানুষের জন্য একটি দৈনিক প্রধান খাদ্য এবং সহস্রাব্দ ধরে চলে আসছে। যদিও এটি এখনো একটি জনপ্রিয় খাবার। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, দুধ শরীরের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যান্য গবেষণা অবশ্য দুগ্ধজাত খাবারের স্বাস্থ্য উপকারিতা নির্দেশ করে। দুধের নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন।

ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা

অন্যান্য প্রাণীর দুধের তুলনায় গরুর দুধে ল্যাকটোজ বেশি থাকে। ২০১৫ সালের একটি পর্যালোচনা দেখা গেছে, বিশ্বের জনসংখ্যার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষের কোনো না কোনো ধরনের ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা রয়েছে। এ অবস্থার বেশির ভাগ মানুষ প্রাণীর দুধ খেতে পারে না, গরুর দুধে থাকা ল্যাকটোজ মানুষের পক্ষে হজম করা কঠিন হতে পারে, ফলে বমি বমি ভাব, বাধা, গ্যাস, ফোলাভাব ও ডায়রিয়া হয়। দুগ্ধজাত খাদ্য হজমের সমস্যা পরবর্তী জীবনে বিকশিত হতে পারে এবং ফলে লক্ষণগুলো ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে পারে। অনেকে আবার দুধ না খেতে পারলেও টকদই, পনির খেতে কোনো সমস্যা হয় না।

হাড়ের ক্ষতি বাড়ে

দুধে ক্যালসিয়াম থাকার কারণে মানুষ তার শরীরে ক্যালসিয়াম পূরণের জন্য দুধ খেয়ে থাকে; কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে এর বিপরীত! গবেষণা বলছে, গরুর দুধ আসলে আমাদের হাড়ের ক্যালসিয়াম কেড়ে নেয়। প্রাণীর প্রোটিনগুলো ভেঙে গেলে অ্যাসিড তৈরি করে এবং ক্যালসিয়াম হলো একটি চমৎকার অ্যাসিড নিউট্রালাইজার, অ্যাসিডগুলোকে নিরপেক্ষ এবং ফ্লাশ করে ও আমাদের হাড় থেকে ক্যালসিয়াম বের করা হয়। এ কারণেই মেডিকেল স্টাডির পরে মেডিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সবচেয়ে বেশি গরুর দুধ খায় তাদের ফ্র্যাকচার হওয়ার হার তত বেশি। তাই আর্থ্রারাইটিসে যারা ভুগছেন, তাদের গরু দুধের বিকল্প দুধ খেতে বলা হয়।

ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা

দুধ এবং অন্যান্য খাবারের অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দুধ শর্করা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের উচ্চ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। একটি সুইডিশ গবেষণায় দেখা গেছে, যে নারীরা প্রতিদিন দুগ্ধজাত ‘পণ্য’ গ্রহণ করেন, তাদের ওভারিয়ান ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা দ্বিগুণ।

এ ছাড়া গরুর দুধের জন্য ওজন বৃদ্ধি, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, অ্যানাফিল্যাক্সিস, শ্বাসকষ্ট, রক্তাক্ত মল, বাচ্চাদের অ্যালার্জি বাড়তে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদেরও দুধের অ্যালার্জি হতে পারে। ব্রণও ট্রিগার করতে পারে। ইনসুলিন ও ইনসুলিনের মতো গ্রোথ ফ্যাক্টর-1 (IGF-1)–সহ নির্দিষ্ট হরমোনের ওপর দুধের প্রভাবের কারণে হতে পারে। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারসহ কিছু খাবার একজিমাকে আরও খারাপ করতে পারে।

দুধের নানা গবেষণা বলা হচ্ছে, গরুকে বাঁচানোর জন্য নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়টিক, অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করে নানা ক্ষতি করতে সক্ষম। এ ছাড়া গরুর দুধ বাছুরদের পুষ্টির চাহিদার জন্য উপযুক্ত, যাদের চারটি পাকস্থলী আছে এবং কয়েক মাসের মধ্যে শতকেজি ওজন বাড়ে, দুই বছর বয়স হওয়ার আগে তাদের ওজন ৫০০ কেজির বেশি হয়। গ্রোথের এই উপাদান মানুষ খায়! তাই সবার জন্য গরুর দুধ উপযোগী না। সেই সঙ্গে আপনি দুধ সহ্য করতে না পারলে এর বিকল্পও বিবেচনায় রাখতে পারেন।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

দেশি ফলে বেশি বল

দেশি ফলে বেশি বল

দেশি ফলের পুষ্টিগুণ বিদেশি ফলে চেয়ে বেশি। এসব ফল দামেও সস্তা এবং তুলনায় সুলভও। সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর এসব ফল আমাদের রক্ষা করতে পারে নানাভাবে। তাই প্রতি মৌসুমেই উচিত এসব ফল খাওয়া এবং বাচ্চাদের খেতে অভ্যস্ত করা। লিখেছেন আলমগীর আলম

আমাদের দেশে বিভিন্ন মৌসুমে বাহারি ফল জন্মে। এসব দেশি ফল বিদেশি ফলের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। শুধু স্বাদে, গন্ধেই নয় পুষ্টিমানের বিচারেও উৎকৃষ্ট। আজকাল অনেকে অনেক দেশি ফলের নাম শুনলে নাক সিটকান। আধুনিক হতে গিয়ে বাচ্চাদের নামীদামি বিদেশি ফল—আপেল, আঙুর, মাল্টা খাওয়ান। অথচ দেশি ফলে পুষ্টি উপাদান বেশি। বিদেশি ফল আপেলে ভিটামিন ‘সি’ আছে খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রামে মাত্র ৩.৫ মিলিগ্রাম। অন্যদিকে বাংলার আপেল হিসেবে খ্যাত পেয়ারায় ভিটামিন ‘সি’ আছে ২১০ মিলিগ্রাম।

অর্থাৎ পেয়ারায় আপেলের চেয়ে ৫০ গুণের বেশি ভিটামিন ‘সি’ আছে। আঙুরে খাদ্যশক্তি আছে ১৭ কিলোক্যালরি আর কুলে খাদ্যশক্তি আছে ১০৪ কিলোক্যালরি, যা ৬ গুণেরও বেশি। আঙুরে ভিটামিন ‘সি’ আছে ২৮.৫ মিলিগ্রাম, কুলে ভিটামিন ‘সি’ আছে ৫১ মিলিগ্রাম অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ। পাকা আমে ক্যারোটিন আছে ৮৩০০ মিলিগ্রাম, পেঁপের মধ্যে আছে ৮১০০ মিলিগ্রাম, কাঁঠালে আছে ৪৭০০ মিলিগ্রাম। সে তুলনায় আঙুর, আপেল, নাশপাতি, বেদানায় ক্যারোটিন আদৌ নেই। বিদেশি ফল মাল্টা ক্যারোটিনশূন্য অথচ দেশি কমলায় ক্যারোটিনের পরিমাণ ৩৬২ মিলিগ্রাম।

অপুষ্টিজনিত রোগবালাই প্রতিরোধে দেশি ফল

ভিটামিন ‘এ’র অভাবে শিশুদের রাতকানা, অন্ধত্ব রোগ দেখা দেয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার শিশু অন্ধত্ববরণ করে এবং রাতকানা রোগে ভোগে প্রায় পাঁচ লাখ শিশু। হলদে বা লালচে রঙিন ফল যেমন পাকা আম, পাকা পেঁপে, পাকা কাঁঠাল ক্যারোটিনসমৃদ্ধ। এই ক্যারোটিন প্রায় ৬ ভাগের ১ ভাগ ভিটামিন ‘এ’তে রূপান্তরিত হয়ে আমাদের শরীরে কাজে লাগে। এসব ফল অন্যান্য পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ। তাই শিশুসহ সব বয়সীদের উচিত প্রতিদিন বেশি করে ফল খাওয়ার অভ্যাস করা। ভিটামিন ‘সি’ ত্বককে মসৃণ করে, দাঁতের মাড়িকে মজবুত করে ও সর্দি কাশি থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়।

ভিটামিন ‘সি’ রান্নার তাপে প্রায় ৮০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফল তাজা খাওয়া হয় বলে ভিটামিন ‘সি’ নষ্ট হয় না। ফল, বিশেষ করে টক জাতীয় ফল ভিটামিন ‘সি’র রাজা। আমলকী ও অরকুল ভিটামিন ‘সি’র গুদামঘর। ভিটামিন ‘সি’ দৈনিক খেতে হয়। খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম আমলকীতে ভিটামিন ‘সি’ থাকে ৪৬৩ মিলিগ্রাম আর অরকুলে আছে ৪৬৩ মিলিগ্রাম। লেবুতে ৪৭ মিলিগ্রাম, কমলা লেবুতে ৪০ মিলিগ্রাম, বাতাবি লেবুতে ১০৫ মিলিগ্রাম, আমড়ায় ৯২ মিলিগ্রাম, কামরাঙায় ৬১ মিলিগ্রাম, জামে ৬০ মিলিগ্রাম, জলপাইয়ে ৩৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ বিদ্যমান। অন্যগুলো সামান্য একটু খেলেই দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ হবে। লৌহ ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতার কারণে শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, জ্ঞান বিকাশ কমে যায়।

গর্ভকালীন রক্ত-স্বল্পতার কারণে প্রসব-উত্তর রক্তক্ষরণের সময় মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ফলের অবদান যথেষ্ট। বিশেষ করে কালোজাম, খেজুর, কাঁচকলা, পাকা তেঁতুল, তরমুজ লৌহ ঘাটতি পূরণে সহায়ক। ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ায় ডাবের বিশুদ্ধ পানি খুবই উপকারী। এতে আছে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম ও ফসফরাসের মতো পুষ্টিকর উপাদান। ঘন ঘন পাতলা পায়খানা ও বমির ফলে দেহে যে পানির অভাব হয় সে ক্ষেত্রে গ্লুকোজ স্যালাইনের বিকল্প হিসেবে ডাবের পানি অতুলনীয়। দৈনিক ডাবের পানি ডায়াবেটিস রোগীর জন্যও উপকারী।

ভিটামিন বি২-এর অভাবে মুখের কোণে ও ঠোঁটে ঘা হয়, ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়। এ ছাড়া নাকের দুই পাশে চর্মরোগ হয়। এসবের অভাব পূরণে ফল চমৎকার কাজ করে। কাঁঠাল, লটকন, ডেউয়া, আতা, শরিফা ও অন্যান্য ফল ভিটামিন বি২-এর অভাব পূরণে সহায়ক। এসব ফল বেশি বেশি খাওয়া দরকার।

তাই মৌসুম অনুযায়ী দেশি ফলের স্বাদের সঙ্গে ফলের শক্তি আমাদের দেহে কার্যকরী উপকার করে, যা আমরা খুব সহজেই নিতে পারি।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ।
ছবি: শেখ সাইফুর রহমানের ব্যক্তিগত আর্কাইভ, সেলিনা শিল্পী ও শামীমা মজুমদার

আন্তর্জাতিক চা দিবস : চা হতে পারে মহৌষধ

আন্তর্জাতিক চা দিবস : চা হতে পারে মহৌষধ

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের লোভনীয় হাতছানি উপেক্ষা করে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা গড়ার চিন্তা করাও অচিন্তনীয় ব্যাপার। এ যেন ভেজালের রাজ্যে সঠিক আহারে জীবনযাপনও তাই কঠিন। তবে এ ক্ষেত্রে চা একটা বিশেষ ভূমিকা রাখতেই পারে। লিখেছেন আলমগীর আলম

চা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য আশার আলো। কারণ, সবুজ চায়ে ইজিসিজি নামক একধরনের উপাদান পাওয়া যায়, যা রক্তের প্লাটিলেট নিয়ন্ত্রণ করে। প্লাটিলেট রক্ত পরিসঞ্চালনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি মাংসপেশির গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখ। ইজিসিজি শুধু প্লাটিলেট নিয়ন্ত্রণই নয়, বরং টিউমার, কিডনি, লিভারের রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে। এ জন্য ভারতের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকেরা চায়ের নাম দিয়েছেন ‘মহৌষধ’।

কিডনি সমস্যায় চা

রক্ত চলাচল নিয়মিত এবং অব্যাহত রাখার জন্য দিনে ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি পান করা দরকার। এর ফলে কিডনি ভালোভাবে কাজ করবে, প্রস্রাবের মধ্য দিয়ে দেহের বিষ নিঃসৃত হবে এবং প্রস্রাব পরিষ্কার হবে। যখন রক্তের বিষাক্ত পদার্থ কিডনির মাধ্যমে বের করে দেওয়া যায় না, তখন সেসব বর্জ্য সেখানেই জমতে থাকে এবং কিডনির ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। আরও অধিক বিষাক্ত পদার্থ জমে উঠলে রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই কিডনি ও মূত্রনালি ঠিক রাখতে গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কালো চা তৈরির উপায়: ১ চা–চামচ যেকোনো চায়ের পাতা ১ কাপ পানিতে দিয়ে অর্ধেক কাপ হওয়া অবধি ফুটিয়ে নিতে হবে। এবার ছেঁকে নিয়ে অর্ধেক কাপ পানিতে (ফ্রিজের নয়) মেশাতে হবে। অন্তত ১৫ দিন ধরে এই গরম গরম পান করতে হবে।

গবেষণায় যা বলা হচ্ছে

মানসিক চাপ ঝেড়ে ফেলে তরতাজা হয়ে উঠতে চায়ের জুড়ি নেই। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) ডিপার্টমেন্ট অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড পাবলিক হেলথের একদল গবেষক দেখেছেন, যাঁরা ছয় সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন চার কাপ করে ব্ল্যাক টি খান, তাঁদের দেহে মানসিক চাপের জন্য দায়ী হরমোনের নিঃসরণ অনেক কম। এমনকি জটিল সব কাজের পরও খুব দ্রুত তাঁরা সজীব হয়ে ওঠেন। গবেষক দলের সদস্য এন্ড্রু স্টেপটো জানান, ধারাবাহিক মানসিক চাপ অবসাদ এবং হৃদ্‌রোগের জন্য দায়ী। মানসিক চাপের কারণ যে হরমোন সেটির মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে চা কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে প্রকাশিত জাপানি বিশেষজ্ঞদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে সবুজ চা পান অন্তত এক-চতুর্থাংশ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায় বলে দাবি করা হয়েছে। জাপানের তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ৪০ হাজারের বেশি লোকের ওপর গবেষণা করে এ তথ্য তাঁরা দিয়েছেন। যাঁদের ওপর গবেষণা করা হয়েছে, তাঁদের বয়স ৪০ থেকে ৭৯ বছরের মধ্যে। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোট ৪০ হাজার ৫৩০ জন বয়স্ক লোক পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই ১১ বছরে নানা কারণে তাঁদের মধ্য থেকে মোট ৪ হাজার ২০৯ জন লোক মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে সিভিডিতে (কার্ডিও ভাসকুলার ডিজিজ) মারা গেছে ৮৯২ জন এবং ক্যানসারে মারা গেছে ১ হাজার ১৩৪ জন।

এই গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা প্রতিদিন ১ কাপ চা পান করেন, তাঁদের চেয়ে দিনে ৫ কাপ চা পানকারীদের মারাত্মক অসুস্থতজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি ১৬ শতাংশ কম। পাশাপাশি দিনে ৫ কাপ চা পানকারীর হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা ২৬ শতাংশ কম। এ গবেষণায় আরও বলা হয়, সবুজ চা পান পুরুষদের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। দিনে ৫ কাপ চা পানকারী নারীরা দিনে ১ কাপ চা পান কারী নারীদের তুলনায় ৩১ শতাংশ কম ঝুঁকিতে রয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের একদল গবেষক দাবি করেছেন, দিনে ৩ কাপের বেশি চা পান করলে তা পানির চেয়েও বেশি উপকারী। তাঁরা জানিয়েছেন, চা পানির মতোই শরীরের তরলের স্বল্পতা পূরণ করতে পারে। পাশাপাশি হৃদ্‌রোগ ও ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশে রোধ করতে পারে। ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন জার্নাল–এ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটি পানি খুব একটা পান করেন না এবং যাঁরা নিয়মিত দৈনিক তিন বা তারও অধিক কাপ চা পান করেন, এমন একদল স্বেচ্ছাসেবীর ওপর চালানো গবেষণার ফলাফল।

গবেষক কেরি রুক্সটনের মতে, চা পানে শরীরে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট জুগিয়ে শরীরকে বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করে। তিনি ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাত্‍কারে আরও জানান, অনেকেই ভাবে প্রতিদিন চা পান করলে তাদের শরীরে পানি শূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে তৃষ্ণার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে, যা একদমই ভ্রান্ত ধারণা।

মনে রাখতে হবে, কনডেন্সড মিল্ক অথবা গুঁড়া দুধ মিশ্রিত শরবত চা আর এখানে বর্ণনা করা চা এক নয়। সাধারণ চা পাতা গরম পানিতে চিনি ছাড়া তৈরি ও ব্ল্যাক টি আর গ্রিন টি নিয়ে আলেচনা করা হয়েছে৷

লেখক: খাদ্যপথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

শরীর ভালো রাখতে ফাস্টিং

শরীর ভালো রাখতে ফাস্টিং

উপোস বা না খেয়ে থাকা। এর ফলে হজমতন্ত্র বিশ্রাম পায়। শরীর সুস্থ থাকে। কিন্তু এই ফাস্টিংয়েরও আছে নিয়ম। তাই ফাস্টিং করতে হলে নিতে হবে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ। ফাস্টিংয়ের নানা দিক নিয়ে লিখেছেন আলমগীর আলম

ইদানীং ফাস্টিং আধুনিক সমাজে সুস্থ থাকার নতুন ট্রেন্ড। বিশেষ করে আধুনিক খাবারে অভ্যস্ত হয়ে যারা শরীরটাকে বিষিয়ে তুলেছেন, তারা এখন সুস্থতার জন্য ফাস্টিংকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সভ্যতার আদিতে মানুষ হাতের কাছে এত রকমারি খাবারদাবার মোটেই পেত না। হয় শিকার করে, নয়তো বনজঙ্গল ঢুঁড়ে ফল-পাকুড় জোগাড় করতে হতো। একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে খাদ্য জোগাড় করতে বেরিয়ে পড়ত, যতক্ষণ না সে কোনো খাবারের সন্ধান না করতে পারত, ততক্ষণ তার খাবার খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মানুষ খাদ্য সংরক্ষণ করে রাখার কোনো ব্যবস্থাও জানত না। তখন মানুষ একবেলায় খেতে পারত। তাতেই শরীরে খাদ্য জোগানের চাহিদা অনুযায়ী ফিট থাকত। দিনে দিনে মানুষ আগুনে পুড়িয়ে খাবার, কৃষি শিখে খাদ্য রান্না করা শিখেছে। বিবর্তনের ধারায় মানুষের খাদ্য পাওয়ার ওপর শরীরের গঠন, মেজাজ ও লাইফস্টাইল গড়ে উঠেছে।

আমাদের এই অঞ্চলে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর শীতে সবজি, গরমে অঢেল ফল, মিষ্টিপানির মাছ আমাদের খাদ্যের জোগান হচ্ছে। যেটা পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু আমরা পশ্চিমা হতে চাই, পশ্চিমাদের খাবার আমাদের আকৃষ্ট করে, তাদের ঝলসানো খাবার আমাদের আনন্দ দেয় অথচ আমাদের শরীরে এসব খাবার কতটা ক্ষতির কারণ, তা বুঝতে চাই না।

প্রতিদিন একজন মানুষকে এক কেজি ওজনের জন্য ২২ কিলোক্যালরি গ্রহণ করতে হয়। এই হিসেবে একজন মানুষের ওজন ৮০ কেজি হলে তাকে প্রতিদিন গ্রহণ করতে হবে ১৭২০ কিলোক্যালরি। পুষ্টিবিদদের মতে, দিনে সবচেয়ে কম কিলোক্যালরি গ্রহণ করা বলতে বোঝায় ৮০০-১২০০। আর এর চেয়ে কম খাবার গ্রহণ করলে সেটাকে বলে ফাস্টিং।

আমরা এখন খাবারের বিচার করি স্বাদের বিবেচনায়, পুষ্টিগুণ বা প্রয়োজনীয় বিষয়টি আমাদের কাছে মুখ্য থাকে না। শুধু মজাদার খাবার গ্রহণ করতে পারলেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে খাদ্যের মাজাদার গুণ বিবেচনা না করে খাই। আমরা মূলত ঝাল, লবণাক্ত, তৈলাক্ত, বেশি মিষ্টি খাবার পছন্দের তালিকার ওপরে রাখি। প্রোটিন আমাদের খাদ্যতালিকায় সবার ওপরে থাকে; যেমন মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, তেল ও ময়দার আধিক্য খাবারই বেশি। এসব খেলে শরীরে চাহিদার সব মিনারেল পূরণ হয় না, কিন্তু অধিক প্রোটিনের কারণে শরীরে চর্বি জমতে থাকে; যার পরিণতি অসুস্থতা।

তাই আমরা যতটা খাবার খাই, তার একটা ভগ্নাংশেই শরীরের চলে যায়। বাড়তি খাবারই আমাদের নানাবিধ রোগভোগ ও অতিরিক্ত মেদের কারণ। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় শরীর খাবারের জোগান না পেলে হজমে আমূল পরিবর্তন আসে। কিন্তু মানুষ ছাড়া অন্য সব পশুপাখিকেই উপোসের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়, তাতে শরীর মোটেই ভেঙে পড়ে না। উল্টো গ্লুকোজের জোগানে ঘাটতি পড়লে লিভার ফ্যাটি অ্যাসিড থেকে কিটোন তৈরি করতে আরম্ভ করে। সেটাই শরীরকে এনার্জি হিসেবে কাজে লাগায়। ফলে আপনার ওজন কমতে আরম্ভ করে, শারীরিক সুস্থতা বাড়ে।

ফাস্টিং করে যে উপকার পাওয়া সম্ভব

  • কম ক্যালরি গ্রহণের জন্য ওজন কমে
  • ইনসুলিন প্রতিরোধে কার্যকর
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে
  • হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে ও পুনরুদ্ধার করে
  • চর্বি পুড়িয়ে দেহের গঠন ঠিক রাখতে সাহায্য করে
  • দীর্ঘ জীবন লাভের রাস্তা খুলে দেয়
  • নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়
  • হজমশক্তি ভালো থাকে
  • শরীরে কর্মচঞ্চলতা ফিরে আসে
  • ত্বক ভালো রাখে, লাবণ্য ফিরে আসে
  • চুলে উজ্জ্বলতা ফিরে আসে
  • হাড়ে শক্তি সঞ্চারিত হয়
  • উন্নত সেলুলার মেরামতের কাজ করে

ফাস্টিংয়ের নিরাপদ পদ্ধতি

ফাস্টিং করার বেশ কটি পদ্ধতি আছে, তার মধ্যে একটি জনপ্রিয় কৌশল হলো ১৬ ঘণ্টা ফাস্টিং। যেমন আপনি রাতের খাবার সন্ধ্যা সাতটায় খেয়ে পরের দিন দুপুর ১২টায় খাওয়া অর্থাৎ দিনের খাবার মোট আট ঘণ্টার মধ্যেই খাওয়া। আর বাকি সময় শুধু পানি পান করে কাটানো।

বিকল্প পদ্ধতি হচ্ছে, সারা দিনে একবার খাওয়া, এটা একটি কষ্টকর হলেও কার্যকর। এখানে খেয়াল রাখতে হয় এক বেলা যেহেতু খাবেন, তাই সব ভিটামিন, মিনারেল যাতে থাকে, তার জন্য ফল, সবজি সালাদ, বিন, বাদাম, ডিম গুরুত্বপূর্ণ আইটেম। এখন সব ফুডচার্টে কার্বকে পরিহার করার কথা বলা হয়ে থাকে।

আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে সপ্তাহে এক দিন বা দুদিন কোনো ধরনের মাছ, মাংস, ভাত, রুটি না খেয়ে শুধু ফলের জুস, লেবুজল খেয়ে সারা দিন পার করা। এ ক্ষেত্রে যেটা জানা দরকার যে আপনি কী কী ওষুধ সেবন করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে কোন কোন ফল আপনার জন্য ভালো, সেটা বোঝা। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হলে শুধু লেবুজল প্রতি ঘণ্টায় একবার করে আট থেকে দশ ঘণ্টা লেবুজল খেয়ে সারা দিন পার করে পরের দিন স্বাভাবিক খাবারে ফিরে আসা।

যারা ফাস্টিং শুরু করতে চান, তাদের অবশ্যই জানতে হবে যে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে কোনো সমস্যা হবে কি না, বিশেষ করে যারা ইনসুলিন নির্ভর জীবন যাপন করে থাকেন। তবে মনে রাখবেন, এ বিষয়টি নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। এখনো গবেষণা চলছে। এ পর্যন্ত যা ফল পাওয়া গেছে, তা ইতিবাচক। এই ডায়েট শুরু করার আগে অবশ্যই একবার আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। সেই সঙ্গে যদি বাড়তি মিষ্টি আর প্রসেসড খাবার বন্ধ করতে পারেন, তা হলে খুব তাড়াতাড়ি ফল পাবেন।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

প্রতিদিন ঠিকঠাক পানি পান করছেন তো?

প্রতিদিন ঠিকঠাক পানি পান করছেন তো?

আমাদের দেহের ৭০ শতাংশ পানি, পৃথিবীরও ৭০ শতাংশ পানি। পৃথিবীর গঠনের সঙ্গে মানবদেহের এমন মিল! একটু খুঁজলে যে তথ্যটা পাবেন, তা হচ্ছে মানুষের শরীর সঠিক উপায়ে চালাতে এই পরিমাণ পানির প্রয়োজন। এর কম হলেই মানুষের চলার ঘাটতি হবে। তেমনি পৃথিবীর যেখানে পানির ঘাটতি আছে, সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব কম আছে। তাই পানি প্রাণপ্রাচুর্যের একটি বড় উপাদান। লিখেছেন আলমগীর আলম

মানুষ সঠিক উপায়ে ও সঠিক পরিমাপে পানি পান না করলে অনেকগুলো সমস্যা শরীরে দেখা দেবে। সেই সঙ্গে বোনাস, ফ্রি হয়েও কয়েকটি সমস্যা চলে আসবে। দেহে পানির অভাব দেখা দিলে নানা শারীরিক সমস্যা হয়। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি না গেলে পানিশূন্যতার আশঙ্কা থাকে। এতে মানবদেহের শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ ব্যাহত হতে পারে। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, বিশেষ করে ত্বক, চুল—সব ক্ষেত্রেই পানির ভূমিকা অপরিসীম।

শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিলে যেসব সমস্যা হতে পারে

  • মূত্রের পরিমাণ কমে যাওয়া, মূত্রের রং গাঢ় হলুদ হওয়া ও মূত্রত্যাগের সময় জ্বালা ভাব অনুভূত হওয়া। দীর্ঘদিন এভাবে চললে মূত্রে সংক্রমণ হবে।
  • ত্বকের উজ্জ্বলতা হ্রাস পাবে, ত্বকের ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে যাবে, ব্রণ হতে শুরু করবে।
  • পানির ঘাটতির জন্য মাথা ধরা, ক্লান্তিভাব দেখা দেবে। এ ছাড়া মনঃসংযোগের অভাব ও বিরক্তিবোধও দেখা দেবে।
  • মুখে দুর্গন্ধ হয়, মুখের ভেতরের ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা অনেকটাই বেড়ে যায়।
  • পেটের সমস্যা হবে।
  • লিভার পানির সাহায্যে গ্লাইকোজেন তৈরি করে, যা শরীরে এনার্জি জোগায়, কিন্তু আমাদের শরীরে পানির অভাব দেখা দিলে লিভার ঠিকমতো কাজ করে না।
  • পানি কম পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোলন পানি শোষণ করে এবং এখানেই শরীরের কঠিন বর্জ্য জমা থাকে। শরীর মল থেকে পানি শোষণ করে নেয়, ফলে মল কঠিন হয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়।
  • পানি কম পান করলে শরীর থেকে ওই বিষাক্ত পদার্থগুলো বেরোতে পারে না। ফলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও দুর্বল হতে শুরু করে, তাই ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে যায়।

পানির ঘাটতি পূরণ করবেন কীভাবে

মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পানি পান করতে হবে। আমাদের জলবায়ু অনুযায়ী সাধারণত একজন স্বাভাবিক মানুষের আড়াই লিটার পানির চাহিদা থাকে। কায়িক পরিশ্রম থাকলে একটু বেশি পান করার প্রয়োজন হয়।

পানি পানের সঠিক নিয়ম

  • আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে কমপক্ষে ৬০০ মিলি বা তিন গ্লাস পানি পান করবেন একবারে। এরপর এক ঘণ্টার মধ্যে কোনো কিছু না খাওয়া উত্তম।
  • সারা দিন বাকি পানি পান করতে হবে। তবে এক গ্লাস পানি ঢক ঢক করে পান না করে ধীরে ধীরে পান করলে শরীরে পানিশূন্যতা থাকবে না।
  • খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি পান করবেন না। বরং খাওয়ার আধা ঘণ্টা পর পানি পান করবেন। তাতে হজম ভালো হবে।
  • চা পান করলে আগে একটু পানি পান করে নিন। চা আমাদের শরীর থেকে পানি বের করে দেয়।
  • রাতে পানি কম পান করবেন, তাতে মূত্রনালি ও কিডনি ভালো থাকবে।
  • অনেকেই অতিরিক্ত পানি পান করেন, অথচ সেটাও ক্ষতিকর।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

বেগুনকে জাতীয় সবজি করার সুপারিশ

বেগুনকে জাতীয় সবজি করার সুপারিশ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর ২০২১, কভিড-১৯ অতিমারীতেও বছরব্যাপী নানান উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে বছরটি উদযাপন করা হচ্ছ। স্বাধীনতার পর আয়তনে ছোট কিন্তু জনসংখ্যায় বৃহত্তম রাষ্ট্রটির অর্জন কম নয়, খাদ্যনিরাপত্তাসহ বৈশ্বিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক মান সূচকে অভাবনীয় উন্নতি একটি অনন্য বিস্ময়! দেশের অর্থনীতির ভিত এখন অন্য মাত্রায় উপনীত হচ্ছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দেশের ক্রমাগত উন্নতি কোনো অবস্থাতেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

পৃথিবীতে দেশের পরিচিতি অন্য মাত্রায় উপস্থাপন করার জন্য তার নিজস্ব সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ঐতিহ্যগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরতে হয়। নানা ধরনের সূচক আছে, যেমন প্রাণী, উদ্ভিদ, প্রাচীন স্থাপনা, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি। ক্যাঙ্গারুর নাম এলে মানসপটে ভেসে ওঠে অস্ট্রেলিয়ার নাম, আবার কিউইউ ফলের নাম এলে নিউজিল্যান্ডের কথা মনে পড়ে। জলপ্রপাতের নাম এলে নায়াগ্রা বা কানাডার নাম আর হিংস্র প্রাণী বাঘের নাম মনে হলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাংলাদেশ সমার্থক। বাংলাদেশ মহান মুক্তিযুদ্ধের পর পরই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় প্রতীক ঘোষণা করেছে, যেমন জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় পাখি দোয়েল, জাতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন বলধা গার্ডেন, জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ—এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় ঐতিহ্যের সূচকগুলোকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার যে স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও বাংলাদেশের জাতীয় সবজির নাম এখনো ঘোষণা করা হয়নি বা কারো নজরে আসেনি; কেন দেয়া হয়নি তা বোধগম্য নয়। অথচ এ দেশে বহুল প্রচলিত, প্রচলিত, অপ্রচলিত, বাণিজ্যিক চাষ মিলে ২০০টিরও বেশি সবজির ব্যবহার হয়। এর মধ্যে কয়েকটি হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদার জোগান দিয়ে আসছে এবং খাদ্য সংস্কৃতির অন্যতম উপকরণ। বিজ্ঞজনরা মনে করেন অন্যান্য খাতের সূচকের মতো বাংলাদেশের একটি সবজিকে জাতীয় সবজি হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। এতে কোনো আর্থিক সংশ্লেষ নেই, আছে আত্মিক সংশ্লেষ ও ঐতিহ্যের স্বীকৃতি।

সবজির জাতীয় স্বীকৃতির ঘোষণা শুধু বাংলাদেশেই প্রথম হবে এমন নয়, পৃথিবীর অনেক দেশের জাতীয় সবজি আছে। যেমন: যুক্তরাষ্ট্রের পাম্পকিন বা মিষ্টিকুমড়া, চীনের বুক-চুই বা চীনা বাঁধাকপি, ভারতের মিষ্টিকুমড়া বা কদু, কানাডার রুবাব, পাকিস্তানের ঢেঁড়স, চিলির পিন্টু বিন। এভাবে দেখা গেছে যে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠীর একটি জাতীয় সবজি আছে, এমনকি অনেক দেশের তিন-চারটি সবজি মিলে একটি জাতীয় সবজি ডিশ আছে। ফলে বাংলাদেশের জাতীয় সবজি থাকাটা অতিরজ্ঞন বা বিলাসিতা নয়, বরং এটা জাতীয় ঐতিহ্যের অনন্য দৃষ্টান্ত।

এখন আসা যাক কোন সবজিটিকে জাতীয় সবজি হিসেবে বিবেচনায় আনা উচিত এবং জাতীয় সবজি নির্বাচনের মাপকাঠি কী? জাতীয় সবজি চিহ্নিতকরণের কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত দলিল বা সূচক নেই, তবে ইউনেস্কো ২০০৮ সালে জাতীয় হেরিটেজ/নিদর্শন ঘোষণা করার বেশকিছু উপাদান চিহ্নিত করেছে। সে ধরনের উপাদান জাতীয় সবজি নির্বাচনে সূচক হিসেবে নেয়া যেতে পারে।

যেমন প্রথম সূচক হলো কোন সবজি সর্বসাধারণের কাছে অসাধারণ সর্বজনীনতা আছে তা যাচাই করা। সেই অসাধারণ সর্বজনীনতা যাচাই করতে সবজিটির ব্যুত্পত্তিসহ আদিম অবস্থা, গুণমান, পুষ্টিমান, বৈচিত্র্য, দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশগত অবস্থায় উৎপাদন দক্ষতা, জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপকতা, সর্বোপরি ভোক্তাশ্রেণীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি বিবেচনায় নেয়া দরকার।

বাংলাদেশ একটি গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ, দেশটি বিশ্বসেরা নানান ঐতিহ্যে পৃথিবীতে পরিচিতি লাভ করেছে। রকমারি ফসল, নানা প্রাণী, নানা মাছ এখানে প্রাকৃতিকভাবেই বিশেষায়িত। যেমন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল বা বসতি কোথায় তা স্মরণ করলে বাংলাদেশের নাম আসে। বেগুন ঠিক তেমনি সবজি। এর হরেক আকার, আকৃতি, রঙ রয়েছে এবং বাহারি বেগুনেরও অন্যতম আবাসস্থল বাংলাদেশ। বিজ্ঞানী ভেভিলব পৃথিবীর সব উদ্ভিদের শ্রেণীকরণ করেছেন, সেখানে বেগুনের উত্পত্তি ইন্দু-বার্মা অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেজন্য বাংলদেশে এর ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে। বেগুনকে ইংরেজিতে ডাকা হয় ডিম্ব উদ্ভিদ বা এগপ্লান্ট, ব্রিনজাল, ওভারজিন। ব্রিটিশ শাসকরা ডিম্বাকৃতি জনপ্রিয় সাদা বেগুন দেখে এমন নামকরণ করেছিলেন, যদিও ইংরেজিতে এর নাম ওভারজিন। আমরা এটিকে ইংরেজিতে ব্রিনজাল নামে ডাকি। অনেকে আবার নেতিবাচকভাবে বলে থাকেন—‘যার নাই কোনো গুণ তা হলো বেগুন’। আসলে বাংলায় একে বাগুন নামে ডাকা হতো, পরে তা বেগুন হয়েছে। অর্থাৎ বাহারি গুণ যার, তার নাম বাগুন কিংবা বেশি গুণ যার তা হলো বেগুন। বেগুনকে পর্তুগিজরা এখান থেকেই ইউরোপে প্রবর্তন করে, যেমন মেসো আমেরিকার টমেটো রোমানরা ইউরোপে স্থানান্তর করেছিল। ব্রিনজাল শব্দটি এসেছে পর্তুগিজ শব্দ বেরিনজালা থেকে। যাহোক, এগুলো হলো উত্পত্তি ও নামকরণের ঐতিহাসিক তথ্যাদি।

দেশে বেগুন বৈচিত্র্যের পার্থক্য বোঝাতে বলা হয়, ভাষার পার্থক্য হয় প্রতি ২০ কিলোমিটার অন্তর, তেমনি বেগুনের পার্থক্য দেখা যায় প্রতি ২৫ কিলোমিটার অন্তর। রঙ ও আকারের প্রতি ভোক্তার পছন্দের কারণে এমন পার্থক্য দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় জাতের বেগুনের চাষ হয়, যেমন লাফফা (ময়মনসিংহ), তল্লা বা তাল (গফরগাঁও, ময়মনসিংহ), খটখটিয়া (রংপুর), পোতা (চট্টগ্রাম), ইসলামপুরী (জামালপুর), দোহাজারী (চট্টগ্রাম), রাখাইন (পটুয়াখালী), ঝুরি (মুক্তাগাছা), শিংনাথ (দেশের মধ্যাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল), চেগা (যশোর), উত্তরা (রাজশাহী), মেন্টাল (বগুড়া), বোতল (জামালপুর), মুক্তকেশী (মানিকগঞ্জ), ভোলানাথ (নরসিংদী), বোম্বাই (নরসিংদী), ডাব (নেত্রকোনা বা পটুয়াখালী), ঈশ্বরদী লোকাল, ফুলি, হাজারী, ভাঙ্গুড়া, সাহেব বেগুন, ঝুমকা, কাঁটা বেগুন ইত্যাদি। এসব নামকরণের পেছনে আবার কিছু গল্পও আছে। যেমন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের বেগুন তালাকৃতির, তাই তাল বেগুন। এ তাল বেগুন উপহার হিসেবে অনেক অসাধ্য সাধন করে আসছে। শিংয়ের মতো আকার তাই শিংনাথ, যা দেশের মধ্যাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত পাওয়া যায়। নরসিংদীর ভোলানাথ ও বোম্বাই জাতের বেগুন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ঝুরি বেগুন সম্ভবত দেশের সবচেয়ে ছোট বেগুন। বেগুন চাষে অঞ্চলভিত্তিক পছন্দ দেখা যায়, যেমন রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ সাদা বেগুন বা গোলাপি রঙের উত্তরা বেগুন ছাড়া অন্য বেগুন তেমন পছন্দ করে না। চট্টগ্রামে হালকা সবুজ রঙের পোতা বেগুনই চলে, যশোরে চেগা বেগুন ছাড়া অন্য বেগুন চাষও করা হয় না।

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

বেগুনের নানা রকম পদ হয়। যেমন বেগুন পোড়া, বেগুন ভর্তা, বেগুন ভাজা। মাছে-ভাতে বাঙালি আর মাছ রান্নার অন্যতম সবজি বেগুন। কেউ কেউ বেগুন দিয়ে ভেজিটেবল মিট তৈরি করে খান। বেগুনের দোলমা খুবই সুস্বাদু। বেগুনের আচারের কথা শুনলে জিহ্বায় পানি আসে। সেদ্ধ বেগুন কাঁচামরিচ, ধনিয়া পাতা ও সরিষার তেলে ভর্তা যে কি স্বাদ, যারা খেয়েছেন তারা তা অনুধাবন করবেন। আদি যুগে বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও বৌদ্ধ যুগে ফিরে গেলে দেখব নিরামিষ ছিল খাদ্যতালিকার অন্যতম অংশ। সেই নিরামিষে বেগুন হলো অন্যতম উপাদান। অন্তঃসত্ত্বা নারীর সাত মাস সময়ের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান বা সাধভক্ষণ উপলক্ষে কয়েক ধরনের নিরামিষের কথা জানা যায়, তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো মুলা-বেগুন-উড়ুম্বের ফল দিয়ে নিরামিষ। পঞ্চব্যঞ্জনের অন্যতম উপকরণ বেগুন। আমাদের খাদ্যতালিকায় বেগুন যে কত আদি সবজি তা চর্যাপদ কিংবা মঙ্গল কাব্যগুলোয় দেখা যায়। আমাদের ষোলো শতকের কবি মুকুন্দরাম বাঙালি রমণীর রন্ধন তালিকার শাকসবজির বৈচিত্র্যের উপমা দিতে গিয়ে প্রথমেই বাগ্যনের (বেগুন) নাম উল্লেখ করেছেন। আট শতকের পণ্ডিত খনা বেগুন দিয়ে নানান শ্লোক উল্লেখ করেছেন। বেগুনের গুণ কত, তা বোঝা যায় এ আনাজ নিয়ে গল্পের বাহার দেখলেই। বাঙালির অতিপরিচিত কত গল্পেই যে এসেছে এ আনাজের কথা। যেমন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর সেই ‘টুনটুনি আর বিড়ালের কথা’য় টুনটুনি পাখি গৃহস্থদের ঘরের পেছনের বেগুন গাছের পাতায় ঠোঁট দিয়ে সেলাই করে তার বাসা বেঁধেছিল। আবার মনে পড়ছে ত্রৈলোক্যনাথের কথা। তার ডমরুচরিতের একটা গল্পে মরা কুমিরের পেটের ভেতরে বসে এক নারী বেগুন বিক্রি করেছিলেন। হ্যাঁ, সেই বেগুনের কথাই বলছি। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ বছর আগেও সংস্কৃত সাহিত্যে বেগুনের সরাসরি ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে, আছে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে।

আধুনিক বিজ্ঞানানুযায়ী বেগুনে রয়েছে বহু রকরের পুষ্টি, যা অন্য কোনো সবজিতে পাওয়া যায় না বা থাকলেও পরিমাণে কম।

মানুষের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের ৪৭টি উপাদানের সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ আছে। বেগুনে তার বেশির ভাগই কম-বেশি আছে। যেমন এনথোসায়ানিন ফাইটোক্যামিকেলস, যা বেগুন আছে। এতে নাউসিনের পরিমাণ বেশি এবং এই নাউসিনের অক্সিডেন্ট শোষণক্ষমতা অন্য অ্যান্টি অক্সিডেন্টের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফেনলস আছে, যেগুলো শরীরের অক্সিডেন্ট শোষণক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বেগুনের ঔষধি গুণেরও শেষ নেই, বেগুন একেবারে পুড়িয়ে ছাই করে সেই ছাই গায়ে মেখে দিলে চুলকানি ও চর্মরোগ সারে। যুগ যুগ ধরে বেগুন নানা রকম আয়ুর্বেদিক ওষুধের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসেছ। বেগুনের রসে মধু মিশিয়ে খেলে কফজনিত রোগ দূর হয়। আবার মধ্যযুগে বন্য বেগুন খাইয়ে পাগল করারও তথ্য পাওয়া যায়। কচি ও শাঁসালো বেগুন খেলে জ্বর সারে। শরীরে ক্ষতিকর টক্সিন উপাদান বের করতে সাহায্য করে বেগুন। আপনার খাবারের তালিকায় যদি নিয়মিত বেগুন রাখেন তাহলে প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া কমে। এমনকি কিডনির পাথর নাকি গুঁড়ো করে দিতে পারে এ বেগুন। যদিও এ তথ্যগুলোর আধুনিক ক্লিনিক্যাল প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

বেগুন চাষ পদ্ধতির প্রাচীনতা আট শতকের খনার বচন থেকে বোঝা যায়, ‘বলে গেছে বরার বৌ, দশটি মাসে বেগুন রো, চৈত্র মাস দিবে বাদ। ইথে নাই কোন বিবাদ, পোকা ধরলে দিবে ছাই। এর চেয়ে ভালো উপায় নাই, মাটি শুকালে দিবে জল, সকল মাস পাবে ফল।’ বেগুন উৎপাদনের ব্যাপকতা বিচার করলে দেখা যায়, দেশের এমন কোনো জায়গা পাওয়া যাবে না, যেখানে বেগুন চাষ হয় না। যখন বেগুনের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়নি, তখন থেকে এখনো দেশের প্রতিটি বসতবাড়িতে এক-দুটি বেগুনের গাছ আছেই। বসতবাড়ি, সমতল ভূমি, পাহাড়, বৈরী পরিবেশ তথা লবণাক্ত, সাময়িক জলাবদ্ধতা, খরাপ্রবণ এলাকা—সব জায়গায় বেগুন হয়, এমনকি অধুনা ছাদ বাগানেও বেগুন অন্যতম সবজি। দেখা গেছে বেগুন ৮ ডেসিমল/মোল পর্যন্ত লবণাক্ত জমিতে স্বাভাবিক ফলন দেয়, যেখানে টমেটো ৪ ডেসিমল/মোল লবণাক্ততার পর চাষ করা দুরূহ। ঠিক তেমনি জলাবদ্ধতা বা খরার বেলায়ও তা দেখা যায়। ফলে বেগুন আমাদের ইকোলজিক্যাল ফসল, ভৌগোলিক পরিমাপক। দেশে বেগুনের চাহিদা অন্য যেকোনো সবজির তুলনায় বেশি। পরিসংখানে দেখা গেছে দেশে ৫০ বছরের বাণিজ্যিক উৎপাদন বেড়েছে ১ দশমিক ৫ গুণ, আবার চাষের জমির পরিমাণ বেড়েছে চার গুণ। বেগুন রফতানি হয় পৃথিবীর ৪০টি দেশে এবং প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বেগুন চাষ করে লোকসান হয় এমন তথ্য নেই। বেগুন নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, হতে থাকবে। বাংলাদেশ জিএমও বেগুন বাণিজ্যিক ছাড় দিয়ে পৃথিবীর পরিবেশ সচেতন মানুষদের কাছে বিতর্কিত হয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী যে দেশে যে ফসলের উত্পত্তি ও বৈচিত্র্য বেশি, সে দেশে সে ফসলের জিএমও জীববৈচিত্র্য রক্ষা প্রটোকল-বিরোধী।

ভোক্তার কাছে জনপ্রিয়তার বিচারে বেগুন শীর্ষে, গৃহিণী বাজারের থলে হাতে ধরিয়ে দিয়ে যে সবজিটির নাম বলেন তা হলো বেগুন। আমাদের আদি ফসল বেগুন আধুনিক খাদ্যতালিকায় যেমন জনপ্রিয়, আদিকালেও তেমনি ছিল, তা আমাদের কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে, উপাখ্যানে, বিজ্ঞান সংলাপসহ নানা উৎসে বিধৃত। আমাদের কৃষ্টিতে ও সংস্কৃতিতে বেগুনের নাম মিশে আছে, যা অন্য কোনো সবজি ফসলের বেলায় পাওয়া যাবে না। বেগুন চাষের আধিক্যের জন্য বাংলাদেশের বেগুনবাড়ী রেলস্টেশন আছে। আবার ভায়োলেট একটি রঙের নাম, আর বেগুনের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে এ রঙের বাংলা নাম দেয়া হয়েছে বেগুনি। আবার রমজান মাসে বেগুনি নামের রেসিপি মেনুতে না থাকলে ইফতারই অসম্পূর্ণ মনে হয়। রমজান মাসে বেগুনের দাম বেড়ে গেলে তা রাজনৈতিক রূপ পায়। বেগুন বহুল ব্যবহূত, ধনী-গরিব সব মানুষের কাছে সমাদৃত, উত্কৃষ্ট সবজি ও ঐতিহ্যের ফসল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেকোনো বিচারে বেগুনই হওয়া উচিত দেশের জাতীয় সবজি। এটাই সচেতন মানুষের প্রত্যাশা। বাংলাদেশের জাতীয় সবজি হিসেবে বেগুনকে মর্যাদা দিলে বিশ্বে বেগুন নিয়ে আরো সচেতনতা তৈরি হবে, বাংলাদেশ নিয়ে আরো ইতিবাচক আগ্রহ, উৎসাহ বাড়বে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে দেশের কৃষি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বেগুনকে জাতীয় সবজি ঘোষণার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে, যা হবে সুবর্ণজয়ন্তীর বছরের অন্যতম সেরা জাতীয় ঐতিহ্যের স্বীকৃতি।

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

আপনি কি অহেতুক ভয় পান? সহজেই ভয় দূর করার উপায় জেনে নিন।

আপনি কি অহেতুক ভয় পান? সহজেই ভয় দূর করার উপায় জেনে নিন।

ভয় দূর করার উপায় খুঁজতে গিয়ে আমরা কত কি-ই না করি। মানুষ হিসেবে আমাদের কোন না কোন ক্ষেত্রে কমতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্নার মতো ভয়ও আমাদের অতি প্রাকৃতিক একটি বিষয়। তবে কখনও কখনও আমরা অহেতুক ভয় পাই। আমার ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে সহজে ভয় দূর করার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। দুঃখজনক হলেও সত্য বেশিরভাগ মানুষই শুধু ঔষধ খোঁজে, যেকোন সমস্যায় তারা ঔষধের বাইরে কিছু চিন্তাও করতে পারে না। কিন্তু অহেতুক ভয় দূর করার সহজ উপায়ে কোন ঔষধই সত্যিকার অর্থে কাজ করে না।

Ankle Incline Slant Board (Plastic) | সায়েটিকা ও হিপ পেইন রিমুভার

ভয় দূর করার উপায়

ভয় দূর করার উপায়

আমি ন্যাচারোপ্যাথি ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ, তাই সহজ উপায়ে ভয় দূর করতে ন্যাচারোপ্যাথি ও আকুপ্রেসার পয়েন্ট নিয়েই আলোচনা করে থাকি। তবে আশার সংবাদ হচ্ছে, বর্তমানে অনেকেই বিভিন্ন সমস্যার আকুপ্রেসার পয়েন্টে আকুুপ্রেসার করে সমাধান পেয়েছে এবং তারা আমাকে কখনও কল করে, কখনওবা এসএমএস করে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। আবার কেউ কেউ তো সরাসরি কমেন্ট করেই ধন্যবাদ জানাচ্ছে। সময়ের স্বল্পতায় সবার মন্তব্য আসলে পাঠকদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

আপনাদের যাদের অহেতুক ভয় পাওয়া জনিত সমস্যা রয়েছে, তারা আকুপ্রেসার ট্রাই করে দেখতে পারেন। আপনি যদি সঠিক উপায়ে আকুপ্রেসার করতে পারেন, আপনার অহেতুক ভয় পাওয়ার সমস্যা শতভাগ সমাধান হয়ে যাবে। আপনার অহেতুক ভয় পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোন কারণ নাই, নিয়মিত আকুপ্রেসার করুন এবং ভিডিওতে দেয়া আমার পরামর্শগুলো মেনে চলুন। আপনার ভয় সহজ উপায়েই দূর হয়ে যাবে।

সহজ উপায়ে ভয় দূর করার উপায় জেনে নিন (ভিডিও): https://youtu.be/JbImB43fjPI

কিডনি ভালো রাখতে আকুপ্রেশার

কিডনি ভালো রাখতে আকুপ্রেশার

বিজ্ঞাপন

কিডনি সমস্যার লক্ষণ

মানুষের শরীরে ৭০ শতাংশই পানি। ফলে কিডনি সমস্যা বোঝা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, এই সমস্যার প্রাথমিক উপসর্গগুলো আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। তাই যখন আমরা টের পাই তখন অনেকের কিছুই করার থাকে না ডায়ালাইসিস ছাড়া। আর ডায়ালাইসিস কোনো চিকিৎসা নয়। প্রাথমিকভাবে ক্ষুধামান্দ্য, বমিভাব, বমি, পায়ে পানি আসা, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের মতো কোনো একটি সমস্যা দিয়ে কিডনি সমস্যার শুরুটা অনুমান করা হয়। অনেকেরই কোনো ধরনের উপসর্গ থাকে না, হঠাৎ প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়, পা ফুলে যায়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে এটা বেশি দেখা যায়। মনে রাখতে হবে, দেহের দুই কিডনিতে আছে ২০ লাখ ছাঁকনি যন্ত্র। ২৪ ঘণ্টায় ১৮০ লিটার রক্ত ছেঁকে বের করে দেড় লিটার বর্জ্য। সেটাই আসলে মূত্র। আর এই ছাঁকনিতে সমস্যা হলেই রক্তে বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে যায়। সেটাই অসুস্থতা।

কিডনি সমস্যা যাঁদের বেশি হতে পারে

কিডনির একটি প্রধান কাজ দেহের পানি ও খনিজের ভারসাম্য ঠিক রাখা, দুর্বল কিডনি তা করতে পারে না। তাই দেহে দেখা দেয় পানি ও খনিজের ভারসাম্যহীনতা। পানির তারতম্য হলে শরীর অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সঠিক উপায়ে পানি পান না করা, অতিরিক্ত পানি পান করা, লবণ বেশি খাওয়া, অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, কোল্ডড্রিংকস খাওয়া, বিশেষ করে বোতলজাত নানান এনার্জি ড্রিংকসে আসক্তি ইত্যাদি।

তা ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘ দিনের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির প্রদাহ কিংবা মূত্রপ্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী কোনো সমস্যা থাকলে কিডনির রোগ হতে পারে। অনেকের জন্মগত কিছু সমস্যার কারণেও এ রোগ দেখা দেয়। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কিডনির সমস্যা হতে পারে, দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ, নানা ধরনের শক্তিবর্ধক ওষুধেও কিডনির সমস্যা হতে পারে। হঠাৎ তীব্র বমি বা পাতলা পায়খানা হলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যদি বমি বা পায়খানার সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া পানি ও লবণের ঘাটতি দ্রুত পূরণ না করেন। অতিরিক্ত আমিষজাতীয় খাবার গ্রহণের কারণেও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আকুপ্রেশার

কিডনি সমস্যা থাকুক বা না থাকুক, নিয়মিত আকুপ্রেশার করা যাবে। বিশেষ করে যাঁরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, আবার অনেকের প্রস্রাব ঘন রঙের হয়ে থাকে, তাঁরা নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে এমন উপসর্গ থাকলেও তা দূর হবে। আর যাঁদের উপসর্গ নেই, তাঁদের কিডনি ভালো থাকবে।

কিডনির আকুপ্রেশার করার আগে দুই হাতের তালু ভালো করে ঘষে নিন, দুই হাত এমনভাবে ঘষবেন, যেন দুই হাত গরম হয়ে ওঠে। তারপর ছবিতে দেখানো পয়েন্টে আকুপ্রেশার করুন। ছবিতে দেখানো পয়েন্টে একশবার চাপ দিন, চাপ এমন হবে যে আপনি যেন তালুতে একটু ব্যথা অনুভব করেন।

এখানে নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে কিডনির ফিল্টার ভালো থাকবে; কারও শরীরে ইউরিয়া বেশি থাকলে সেটাও কমতে শুরু করবে

এখানে নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে কিডনির ফিল্টার ভালো থাকবে; কারও শরীরে ইউরিয়া বেশি থাকলে সেটাও কমতে শুরু করবে

প্রথম পয়েন্টের ঠিক এক ইঞ্চি নিচের দিকে কিডনির পয়েন্ট, এই পয়েন্ট ঠিক বুড়ো আঙুলের শেষ ও মধ্যমা আঙুলের শেষে যেখানে মিশেছে। এখানেও একশবার করে চাপ দিন, এখানে চাপ দিলে অনেকেই ব্যথা অনুভব করতে পারেন, যাঁরা ব্যথা অনুভব করবেন, তাঁরা এক সপ্তাহ আকুপ্রেশার করলে হাতের ব্যথা কমে যাবে।

এই পয়েন্টটা কিডনির পয়েন্ট, যাঁদের সেরাম ক্রিয়েটিনিন লেভেল একটু বেশি, তাঁরা এখানে নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে লেভেল ঠিক থাকবে বরং বাড়তি থাকলে কিছুটা কমবে

এই পয়েন্টটা কিডনির পয়েন্ট, যাঁদের সেরাম ক্রিয়েটিনিন লেভেল একটু বেশি, তাঁরা এখানে নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে লেভেল ঠিক থাকবে বরং বাড়তি থাকলে কিছুটা কমবে

কিডনির সহযোগী পয়েন্ট হিসেবে লিম্ফ পয়েন্ট আকুপ্রেশার করা উত্তম, আমাদের শরীরে লিম্ফ সক্রিয় থাকলে কোষের বর্জ্য বের করতে সাহায্য করে, তাই ছবিতে দেওয়া পয়েন্টে একশবার আকুপ্রেশার করুন, লক্ষ করুন প্রথমে যে পয়েন্টে আকুপ্রেশার করেছেন, তা মধ্যমা আঙুলের নিচে দ্বিতীয়টিও মধ্যমা আঙুল বরাবর এবং এই তৃতীয় পয়েন্টটা একই লাইনে নিচের দিকে নেমে আসবে।

এই পয়েন্টে নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে শরীরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভালো থাকবে; শরীরে ফোড়া টিউমার থাকলে কমতে শুরু করবে

এই পয়েন্টে নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে শরীরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভালো থাকবে; শরীরে ফোড়া টিউমার থাকলে কমতে শুরু করবে

আকুপ্রেশার প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে শোয়ার আগে করবেন। দুই হাতে তিনটি পয়েন্টে একশবার করে সপ্তাহে ছয় দিন করবেন। এক দিন বিরতি দিয়ে আবার শুরু করবেন। এতে ফল পাবেন।

আমাদের বর্তমান জীবনযাপনে কিডনিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে ভেজাল খাদ্য, প্যাকেটজাত লবণাক্ত খাবার আমাদের চারপাশে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত কিডনি সমস্যায় অনেকেই ভুগছেন। শুরু থেকে সচেতনভাবে জীবনযাপন করলে এই কিডনি সমস্যা জটিলতর পর্যায়ে যাওয়া থেকে প্রতিরোধ করা যায়। আজীবন সুস্থ থাকা যায় কিডনির রোগ নিয়েই। খাবারের বেলায় কিডনি রোগীকে সতর্ক থাকতে হয়।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনির সমস্যায় পানি, লবণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমিষজাতীয় খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, নির্ধারিত পরিমাণ মাছ, মাংস ও ডাল খেতে হয়, ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চ পটাশিয়ামযুক্ত কিছু ফল কম পরিমাণে খেতে বলা হয় এবং কারও ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকলে লাল মাংস, কলিজা, মগজ, সামুদ্রিক মাছ প্রভৃতি খাবার খেতে নিষেধ করা হয়। নিয়মিত শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই। অন্য ব্যায়াম করতে না পারলেও অবশ্যই হাঁটুন রোজ।

কিডনি রোগ প্রতিরোধে দরকার সুস্থ জীবনধারা ও সুষম খাদ্যাভ্যাস। কোনো পুষ্টি উপাদান বেশি গ্রহণ করা এবং পরিহার করার বিষয়ে নজর দিতে হয়। ৪০ বছর বয়সের পর কিডনির কর্মক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই একটু একটু করে কমতে থাকে। ব্যথার ওষুধ যতটা সম্ভব কম সেবন করা যায়, ততই কিডনির জন্য ভালো।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

Prothom Alo Link: কিডনি ভালো রাখতে আকুপ্রেশার

সব ভিগানই নিরামিষাশী, কিন্তু সব নিরামিষাশী ভিগান নন

সব ভিগানই নিরামিষাশী, কিন্তু সব নিরামিষাশী ভিগান নন

আমিষ আর নিরামিষ নিয়ে দ্বন্দ্ব যেন থামার নয়। যাঁরা কেবল শাকসবজি খেয়ে জীবন যাপন করেন, তাঁদের বলা হয় ভেজিটেরিয়ান। কিন্তু ‘ভিগান’ শব্দটির সঙ্গে অনেকেরই পরিচয় নেই। আমিষ, নিরামিষের দ্বন্দ্বে ভিগান যুক্ত হয়েছে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে।
বিশ্বব্যাপী এখন ভিগান বা ভিগানিজম নতুন প্রজন্মের এক নতুন ট্রেন্ড। ১৯৪৪ সালে ডোনাল্ড ওয়াটসনের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ভিগান সোসাইটি। ২০১০ সালে জাতিসংঘ ভিগান ডায়েট নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে সাড়া ফেলে দেয়। তখন থেকেই ভিগান ডায়েট নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় মাতামাতি। বিশ্বে ভিগানিজম দিন দিন নিজের জায়গা শক্ত করে নিচ্ছে। প্রায়ই ভিগান আর ভেজিটেরিয়ানদের নিয়ে তৈরি হচ্ছে কনফিউশান। দেখে নেওয়া যাক ভিগান ডায়েট ও ভেজিটেরিয়ানদের কথা।

ভিগান ডায়েট

ভিগানিজম এমন একটি জীবনধারা, যেখানে প্রাণী ও প্রাণিদেহের দ্বারা তৈরি সব খাবার ও ব্যবহার্য পণ্য বর্জন করা হয়। এককথায়, নিরামিষাশীরা যখন প্রাণিজাত সমস্ত খাবারের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন, তখন তাঁদের ভিগান বলে। মাছ-মাংস তো নয়ই, ভিগানরা ডিম, দুধ আর দুধের তৈরি কোনো খাবার, যেমন ছানা, দই, পনির, সন্দেশ, রসগোল্লা এসব কিছু চেখেও দেখেন না।

ভিগানরা কত প্রকার

দিন দিন ভিগানরাও বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়েছেন।
• হোল ফুড ভিগান। তাঁরা ফলমূল, শাকসবজি, শস্য, বাদাম ও বীজ–জাতীয় খাবার খেয়ে থাকেন।
• জাঙ্ক ফুড ভিগান। তাঁরা প্রক্রিয়াজাত ভিগান খাবার খান। যেমন: ভিগান মাংস, ফ্রোজেন ডিনার, নন–ডেয়ারি আইসক্রিমের মতো ডেজার্ট ইত্যাদি।
• র ফুড ভিগান। এই ব্যক্তিরা কেবল কাঁচা খাবার অথবা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিচের তাপমাত্রায় রান্না করা খাবার খান।
• লো ফ্যাট, র ফুড ভিগান। তাঁদের ডায়েটে বাদাম, অ্যাভোকাডো, নারকেলসহ উচ্চ ফ্যাটযুক্ত খাবার সীমিত রাখেন। এর বদলে ফলের ওপর নির্ভর করেন। তাই তাঁদের ‘ফ্রুটারিয়ানস’ও বলা হয়।

কীভাবে ভিগান ডায়েটে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় থাকে

ভিগান ডায়েটের ধারণাটি একেবারেই নতুন। ভিগানদের শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি, লং-চেইন ওমেগা৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, আয়োডিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং জিঙ্ক না–ও থাকতে পারে। এটা এড়াতে তাঁরা দুধ, চা-কফি খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন। তার বদলে শোষণক্ষমতা বাড়াতে খাদ্যতালিকায় বেশি করে ভিটামিন সি ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেয়ে থাকেন। আয়রনের শোষণে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে ভিটামিন সি। অঙ্কুরিত বীজ, উদ্ভিজ্জ দুধসহ সুষম খাদ্য গ্রহণ করে স্বাস্থ্য ভালো রাখেন তাঁরা।

ভিগানদের খাদ্যতালিকায় যা থাকে, যা থাকে না

প্রাণিজাত যেকোনো জিনিসই ভিগানদের খাদ্যতালিকায় থাকে না। মাংস, মাছ, শেলফিশ, ডিম, মধু, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার কিছুই খান না ভিগানরা। তাঁরা প্রাণিজ প্রোটিন বর্জন করে কেবল উদ্ভিজ্জ প্রোটিন খান। ভিগানদের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ডাল, টফু, বাদাম, বীজ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এমনকি প্রাণিজ দুধের বদলে, উদ্ভিদজাত দুধ এবং মধুর বদলে ম্যাপল সিরাপ খান তাঁরা। ভিগানরা প্রধানত তাঁদের খাদ্যতালিকা প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি, ফলমূল ও শস্যের ওপর ভিত্তি করে বানান।

ভিগান ও ভেজিটেরিয়ানের মধ্যে পার্থক্য

ভিগান ও ভেজিটেরিয়ানরা উভয়ই নিরামিষাশী হলেও, তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। ভেজিটেরিয়ানরা মাছ-মাংস না খেলেও তাঁদের খাদ্যতালিকায় দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য, মধু, ডিম এবং বিভিন্ন প্রাণিজ দ্রব্য থাকে। এমনকি প্রাণী জাতীয় পণ্য, যেমন চামড়ার তৈরি জুতা অথবা জামাকাপড় প্রভৃতি ব্যবহার করেন। অন্যদিকে ভিগানরা তাঁদের জীবন থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রাণিজ দ্রব্য ও পণ্য বর্জন করেন। উল, চামড়া বা সিল্কের পোশাকও পরেন না তাঁরা।

ভিগানদের মতে, খাদ্য ও পণ্যের জন্য প্রাণী হত্যা করা অন্যায়। পশুসমাজের ওপর নির্মম অত্যাচার। এসবের ঘোরতর বিরোধী ভিগানরা। এককথায় বলা যায়, সব ভিগান ভেজিটেরিয়ান হলেও, সব ভেজিটেরিয়ান ভিগান নন। ভিগানরা আরও স্বকীয়।
অনেকের প্রশ্ন থাকে, তাহলে ভিগানরা আমিষের ঘাটতি পূরণ করেন কী করে? পৃথিবীতে ভিগানদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে ভিগানরা প্রমাণ করছেন যে প্রাণিজ আমিষ ছাড়াও মানুষ ভালোভাবেই বাঁচতে পারে। সে সঙ্গে প্রাণী রক্ষা আন্দোলনটাও প্রাণ পায়। ভিগানরা মনে করেন, পৃথিবীতে সব প্রাণীর সমান অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশেও ভিগান আন্দোলন চলছে। দিন দিন এর সদস্যসংখ্যাও বাড়ছে।

লেখক: আলমগীর আলম, খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ।

আকুপ্রেশার করে লিভার ভালো রাখুন

আকুপ্রেশার করে লিভার ভালো রাখুন

মানুষের রক্তের মধ্যে কোয়াগুলেশন ফ্যাক্টর হিসেবে আছে অসংখ্য কেমিক্যালস, যা রক্তকে সঞ্চালন অব্যাহত রাখে। সব কটি কোয়াগুলেশন ফ্যাক্টর শুধু লিভার থেকে তৈরি হয়। রক্তের সঞ্চালন এবং জমাট বাঁধার ক্ষমতা একমাত্র লিভারের কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। আমরা যা কিছু খাই, সেই খাবারগুলো পরিপাকতন্ত্রে প্রাথমিক হজমের জন্য পিত্তরস অপরিহার্য। পিত্তরস ছাড়া খাদ্যবস্তু হজম সম্ভব নয়। এই পিত্তরস শুধু লিভার কোষ তৈরি করে।

হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের পর ফ্যাটি লিভারই এখন এ দেশে ক্রনিক লিভার ডিজিজের প্রধান কারণ। পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীদের হার্ট ডিজিজ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও অনেক বেশি থাকে। তবে আমাদের দেশে অ্যাকিউট হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস ই, এ এবং বি ভাইরাস। এর মধ্যে পানি ও খাদ্যবাহিত আর তৃতীয়টি ছড়ায় মূলত রক্তের মাধ্যমে। হেপাটাইটিস এ ভাইরাস প্রধানত শিশুদের জন্ডিসের কারণ, তবে যেকোনো বয়সের মানুষই হেপাটাইটিস ই ও বি ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।

লিভার ঠিক রাখার প্রধানত শর্ত হচ্ছে বিশুদ্ধ খাদ্য ও পানি গ্রহণ, সেই সঙ্গে নিয়মিত আকুপ্রেশার করা হলে লিভার ভালো থাকবে, সেই সঙ্গে লিভারে আক্রান্ত প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সমস্যা থাকলে সেটাও সেরে যাবে। এই প্রচীন চিকিৎসা পদ্ধতি আকুপ্রেশারচর্চা নিজে নিজের চিকিৎসা করে জটিল সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।

লিভার ঠিক রাখতে ও ফ্যাটি লিভার ঠিক করতে এই পয়েন্টগুলোতে আকুপ্রেশার করতে হবে।

আমাদের দেশে লিভারের যে রোগগুলো হয়ে থাকে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো:
• ফ্যাটি লিভার
• ভাইরাল হেপাটাইটিস (যা জন্ডিস নামে পরিচিত)
• লিভার সিরোসিস
• লিভার ক্যানসার
• লিভারের ফোড়া
• পিত্তথলির বা পিত্তনালির রোগ
• লিভারের জন্মগত ও মেটাবলিক রোগ ইত্যাদি
এই সব রোগ হলেও আজ আমরা শুধু ফ্যাটি লিভারের জন্য কীভাবে আকুপ্রেশার করব এবং সুস্থ মানুষ কী করে লিভারকে রোগমুক্ত রাখতে পারব, সেটাই জানানো হচ্ছে।

যেভাবে বুঝবেন ফ্যাটি লিভার হচ্ছে

• হজমের সমস্যা ও অ্যাসিডিটি সমস্যা হতে পারে
• লিভারে চর্বি জমলে স্বাভাবিক কাজ কিছুটা ব্যাহত হয়
• খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায়, খাবারে অরুচি হয়
• দ্রুত ওজন কমা
• বমি বমি ভাব, বমিও হওয়া, খুব দুর্বল লাগা ও কোনো কাজ করতে ইচ্ছা করে না
• কখনো কখনো বিলিরুবিন বেড়ে যায়
• ফ্যাটি লিভারের সব থেকে বড় লক্ষণ স্বাভাবিকের থেকে বেশি কোমরের মাপ বেড়ে যায় তথা ভুঁড়ি বেড়ে যায়
• ফ্যাটি লিভার হলে মাথাব্যথা, মন খারাপ ও ডিপ্রেশন, আচমকা কাঁপুনিসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়

ফ্যাটি লিভারের জন্য আকুপ্রেশার কীভাবে করবেন

ফ্যাটি লিভারের আকুপ্রেশার শুরু করতে হলে প্রথমে যে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে তা হলো যে কারণে আপনি আক্রান্ত হয়েছেন, সেই ছিদ্রটা প্রথমে বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ খাদ্যে শৃঙ্খলা আনতে হবে। লিভারের বিভিন্ন রোগের খাবারের ব্যাপারে বিভিন্ন রকম বাছ-বিচার আর সতর্ক থাকা, এসব রোগীকে ভালো থাকতে যেমন অনেকখানি সাহায্য করে তেমনি অজ্ঞতা বা ভুল ধারণার কারণে অনেক সময়েই লিভারের রোগীরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন। এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান খুবই জরুরি।

ডান হাতের এই পয়েন্ট লিভারের, এখানে চাপ দিন ১০০ বার করে।

ডান হাতের এই পয়েন্ট লিভারের, এখানে চাপ দিন ১০০ বার করে।

আকুপ্রেশার শুরু করার প্রথম ধাপটি হচ্ছে দুই হাতের তালুতে ঘষতে হবে দুই মিনিট, এমনভাবে ঘষতে হবে যেন দুই হাতের তালু গরম হয়ে যায়।

তারপর ডান হাতে কড়ে আঙুলের নিচের রেখা যে পয়েন্টটি দেখানো হয়েছে, তাতে প্রথম পয়েন্ট ১০০ বার করে চাপ দিন, চাপ এমনভাবে দেবেন যেন খুব বেশি জোরেও না আবার আস্তেও না। সঠিক স্থানে চাপ দিলে হাতের পয়েন্টে মৃদু ব্যথা অনুভূত হবে। তারপর আরেকটু নিচের পয়েন্ট চাপ দিন, এটা আমাদের গলব্লাডারের পয়েন্ট, গলব্লাডার লিভারের পরম বন্ধু, তাই লিভার সমস্যায় গলব্লাডারও ভালো রাখতে হবে।

লিভার ঠিক রাখার জন্য গলব্লাডার ঠিক করতে হলে এখানে ১০০ চাপ দিন।

লিভার ঠিক রাখার জন্য গলব্লাডার ঠিক করতে হলে এখানে ১০০ চাপ দিন।

এরপরে এর নিচে অ্যাপেন্ডিক্স পয়েন্টে ও ঠিক একইভাবে চাপ দিতে হবে। প্রতিটি পয়েন্টে ১০০ করে চাপ দিয়ে এবার স্টমাক পয়েন্ট লম্বালম্বিভাবে বুড়ো আঙুলের নিচের রেখা থেকে কবজির মাঝ বরাবর স্থানে চাপ দিতে হবে, এখানে লম্বালম্বিভাবে তিনটা স্থানে চাপ দিতে হবে, যাতে ওপর–নিচ থেকে মাঝেও একটি চাপ পড়ে। খেয়াল করবেন যে এখান আপনি তীব্র ব্যথা অনুভব করতে পারেন। যদি ব্যথা পান তাহলে বুঝতে হবে আপনার হজমে গন্ডগোল আছে।

এরপর আপনি বাঁ হাতের স্টমাক পয়েন্টে (প্রথম ছবিতে দেওয়া পয়েন্ট) চাপ দিন; এখানেও ১০০ বার করে চাপ দিন, এখানে চাপ শেষ হলেই কবজির নিচে পয়েন্ট দুই হাতেই একশবার করে করে চাপ দিন।

পেটের সমস্যা থাকলে এখানে চাপ দিলে পেটের সমস্যা কমবে।

পেটের সমস্যা থাকলে এখানে চাপ দিলে পেটের সমস্যা কমবে।

মনে রাখতে হবে সব কটি পয়েন্টেই ১০০ করে চাপ দিতে হবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেই আকুপ্রেশার করা উত্তম। তারপর রাতে শোয়ার আগে রাতের খাবারের অন্তত এক ঘণ্টা পর আকুপ্রেশার করা উত্তম। সপ্তাহে ছয় দিন নিয়মিত আকুপ্রেশার করবেন, সপ্তাহে এক দিন বিরতি দেবেন। এভাবে এক মাস আকুপ্রেশার করেই দেখুন, এতে আপনি কী কী উপকার পান। নিয়মিত ও সঠিক উপায়ে আকুপ্রেশার করা গেলে আপনি এই ফ্যাটি লিভারসংক্রান্ত সমস্যায় উপকার পাবেন।

লিম্ফ গ্রন্থি আমাদের শরীরে জমে থাকা বর্জ্য বের করতে সাহায্য করে, এটাই লিম্ফ পয়েন্ট।

লিম্ফ গ্রন্থি আমাদের শরীরে জমে থাকা বর্জ্য বের করতে সাহায্য করে, এটাই লিম্ফ পয়েন্ট।

ফ্যাটি লিভারে কী খাবেন, কী খাবেন না

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসার প্রধান দিকটাই হচ্ছে লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনা। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম করা এবং পাশাপাশি খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া। শুধু যে রেড মিট যেমন খাসি বা গরুর মাংস, ডিমের কুসুম, চিংড়ি মাছ, পনির, মাখন, বিরিয়ানি ইত্যাদি হাই-ফ্যাট খাবার পরিহার করতে হবে তা–ই নয়, পাশাপাশি অতিরিক্ত শর্করা যেমন ভাতের ব্যাপারেও খুব সাবধান থাকতে হবে।

কারণ, অতিরিক্ত শর্করাযুক্ত খাবার খেলে তা লিভারে গিয়ে চর্বি হিসেবেই জমা হতে থাকে। একইভাবে সাবধান থাকতে হবে বাইরের খাবার, প্যাকেট খাবার, ফাস্ট ফুড এবং জাঙ্ক ফুডের ব্যাপারেও। পাশ্চাত্যের মতো ফাস্ট ফুড কালচারের ব্যাপক প্রসারের ফলে এ দেশেও এখন বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের প্রাদুর্ভাব খুব বেশি, শিশুদের অবিসিটি বেড়ে গেছে।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

প্রথম আলোয় প্রকাশিত: আকুপ্রেসার করে লিভারকে ভালো রাখুন

প্রতিদিন যতটুকু লবণ গ্রহণ করা উচিত

প্রতিদিন যতটুকু লবণ গ্রহণ করা উচিত

রান্নায় লবণ কম হলে যেমন খাওয়া যায় না, তেমনই লবণ বেশি হলেও মুখে তোলা দায়। কম বা বেশি লবণ খাবারের স্বাদ একেবারেই নষ্ট করে দেয়, আবার পরিমাণমতো লবণ সেই খাবারকেই সুস্বাদু করে তোলে। লবণের মূল উপাদান সোডিয়াম ক্লোরাইড, আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না, আমাদের শরীরে ঠিক কতটা লবণের প্রয়োজন, আমরা আমাদের খাদ্যাভ্যাসের দরুন না বুঝেই দৈনিক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লবণ গ্রহণ করে ফেলি। অত্যধিক লবণ শরীরে বিভিন্ন প্রকার সমস্যা তৈরি করে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দৈনিক মাত্র পাঁচ গ্রাম লবণ গ্রহণ করার কথা বলছে। পাঁচ গ্রাম আসলে চা–চামচের সমান পরিমাণ।

লবণ নিয়ে আমাদের কেউ প্রশ্ন করলেই আমরা সাফ বলে দিই আমি লবণ খাই না! কিন্তু আমাদের খাদ্যাভ্যাসই হচ্ছে লবণনির্ভর। ভাত, তরকারি, ডাল, শাক, মাছ, মাংস, ভর্তা সবকিছুতেই লবণ আধিক্য। এমনকি আমরা সালাদ, কাঁচা ফল লবণ দিয়ে খাই। সকালে নাশতা, বিকেলের নাশতা রুটি, পুরি, সমুচা, শিঙাড়া, বড়া, নুডলস সুপ সবই লবণে তৈরি। সব মিলিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন থেকে দুই থেকে তিন গুণ খেয়ে থাকি।

একটি পরিবারের চারজনের মাসে ১ কেজির বেশি লবণ লাগে অর্থাৎ প্রতিজন ২৫০-৩০০ গ্রাম, দৈনিক হিসাবে ৯-১০ গ্রাম লবণ গ্রহণ করি, যা গাইডলাইন থেকে দ্বিগুণ। আর যদি সপ্তাহান্তে পোলাও, বিরিয়ানি, হালিম, নুডলস খেয়ে থাকি, তাহলে লবণ গ্রহণের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। এটা অতি সাধারণ চিত্র আমাদের সব পরিবারে। আর ফাস্ট ফুডে লবণের পরিমাণ বেশি থাকার কারণে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে। লবণের ভালো–মন্দ, লবণের গুণাগুণ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমরা সবাই কি জানি? লবণ আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যের একটি অপরিহার্য অংশ।

লবণ ছাড়া প্রায় প্রতিটি খাবারই অসম্পূর্ণ, লবণ যে শরীরকে শুধু হাইড্রেটেড রাখে তা নয়, থাইরয়েড গ্রন্থি যাতে সঠিকভাবে কাজ করে, তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, শুধু তা–ই নয়. ব্লাডপ্রেশার কম থাকলে বা শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে গেলে লবণ বিশেষভাবে সাহায্য করে। এমনকি লবণের মাধ্যমেই শরীরে আয়োডিনের চাহিদা পূরণ হয়, দেহের মোট তরলের পরিমাণ, অ্যাসিড ও ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য এবং সাধারণ কোষের কার্যকারিতা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।

লবণ খাবার নয়! এর রন্ধন সম্পর্কিত ব্যবহারের আর কোনো ন্যায়সঙ্গতা নেই। পটাশিয়াম ক্লোরাইড, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, বেরিয়াম ক্লোরাইডের চেয়ে বেশি বা ড্রাগজিস্টের অন্য কোনো রাসায়নিক। শরীরের দ্বারা লবণ হজম করা যায় না, লবণের নেই পুষ্টির মূল্য! লবণের কোনো ভিটামিন নেই, জৈব খনিজ নেই! পরিবর্তে, এটি ক্ষতিকারক এবং এতে সমস্যা সৃষ্টি করে কিডনি, মূত্রাশয়, হার্ট, ধমনি, শিরা ও রক্তনালিগুলো।

লবণে জলাবদ্ধ হয়ে টিস্যুগুলোর ফোলা ভাব এবং এডিমা সৃষ্টি করে। লবণ গুরুতর চিকিৎসা সমস্যা সৃষ্টি করে এবং হার্টের বিষ হিসেবে কাজ করতে পারে। এটা স্নায়ুতন্ত্রকেও জ্বালাতন করে। লবণ শরীর, হাড় ইত্যাদি থেকে ক্যালসিয়াম ছিনিয়ে নেওয়ার কাজ করে এবং শ্লেষ্মা আক্রমণ করে শরীরজুড়ে আস্তরণ তৈরি করে। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষতিকর। গবেষণায় দেখা গেছে যে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করলে নানা ধরনের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যেমন: হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড, স্নায়ুর সমস্যা, কিডনি সমস্যা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

মানুষ বুঝে ওঠার আগেই অনেক ক্ষতি হয়ে যায়, ইদানীং লক্ষ করবেন যে আমাদের আশপাশে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগী তো ঘরে ঘরে, যার ফলে মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে।
দৈনিক লবণ গ্রহণের পরিমাণ কমানো উচিত কেন? অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ, মূলত লবণের মাধ্যমে এবং অপর্যাপ্ত পটাশিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের জন্য দায়ী।

গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দৈনিক পাঁচ গ্রামের কম লবণ গ্রহণ কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, স্ট্রোক, কিডনির সমস্যা, হার্ট অ্যাটাক প্রভৃতির ঝুঁকি কমায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বেশির ভাগ মানুষই প্রতিদিন গড়ে ৯-১২ গ্রাম লবণ গ্রহণ করে, যদি বিশ্বব্যাপী লবণ গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়, তাহলে বছরে আনুমানিক ২৫ লাখ মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হতে পারে।

নতুন গাইডলাইন কেন? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী লবণ গ্রহণের পরিমাণ ৩০ শতাংশ হ্রাস করার জন্য বলা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার প্রতিদিনের সোডিয়াম গ্রহণের পরিমাণ দ্রুত বাড়াচ্ছে। এই নতুন গাইডলাইন, সব দেশের বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোতে সোডিয়াম হ্রাস করার জন্য নির্দেশিকা দেবে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন, দ্রুত নগরায়ণ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনগুলো খাদ্যতালিকা রূপান্তরে সহায়তা করছে।

বিশ্বজুড়ে মানুষ বেশি পরিমাণে শক্তি-ঘন খাবার গ্রহণ করে, যা স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট, চিনি ও লবণের পরিমাণ বেশি। লবণ সোডিয়ামের প্রাথমিক উৎস এবং সোডিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে যুক্ত এবং কিডনি, হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

খাদ্যতালিকায় লবণ বেশি আছে এমন প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ না করার জন্য বলা হয়েছে। কারণ, সেগুলোতে বিশেষত লবণ বেশি থাকে (যেমন প্রস্তুত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন বেকন, হ্যাম ও সালামি, পনির, নোনতা খাবার এবং ইনস্ট্রান নুডলস, বড় পরিমাণে প্রায়ই খাওয়া হয়, রুটি ও প্রক্রিয়াজাত সিরিয়াল পণ্য। রান্নার সময় টেবিলে সয়া সস, ফিশ সস ও টেবিল লবণ।

কৌশল করে লবণ গ্রহণের মাত্রা কমানো যেতে পারে, বিশেষ করে সকালে নাশতা যদি ফল দিয়ে করা যায়, সে ক্ষেত্রে কমে গেল, দ্বিতীয়ত, দুপুরে ও রাতে যদি খাওয়ার সঙ্গে অর্ধেক সালাদ খাওয়ার অভ্যাস করা যায়, তাহলে লবণ কমে যাবে। তাতে শরীর ভালো থাকবে এবং লবণের দ্বারা যে ধরনের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তা–ও কমে আসবে।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ।

প্রথম আলো লিংক: প্রতিদিন যতটুকু লবণ গ্রহণ করা উচিত

হার্ট ভালো রাখতে আকুপ্রেশার

হার্ট ভালো রাখতে আকুপ্রেশার

বিবিএসের জরিপ, করোনার চেয়ে ৩৬ গুণ বেশি মৃত্যু হয় হৃদ্‌রোগে। আমাদের সবার মধ্যে একটা উপলব্ধি কাজ করে এমন যে করোনায় অনেক বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু পারসেপশন সব সময় সঠিক হয় না। করোনার চেয়েও বেশি মানুষ মারা গেছে হৃদ্‌রোগে। আপনি কতটুকু সচেতন, আপনি কি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিতে আছেন? যদি ঝুঁকিতে আছেন বলে মনে হয়, তাহলে কী করবেন? সাধারণ হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন। হৃদ্‌রোগে বিকল্প চিকিৎসা আকুপ্রেশার এখন বেশ সাড়া ফেলেছে। আপনি আপনার হাত চেপে জেনে নিতে পারবেন, আপনি হৃদ্‌রোগের কতটুকু ঝুঁকিতে আছেন, বিশেষ করে যদি কোনো উপসর্গ না–ও থাকে।

করোনারি হৃদ্‌রোগ কী

করোনারি হৃদ্‌রোগ (সিএইচডি) করোনারি ধমনির মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে বা পাতলা হয়ে যায়, সাধারণত যা অ্যাথেরোসক্লেরোসিসের দ্বারা সৃষ্ট। ধমনির অভ্যন্তরীণ দেয়ালে কোলেস্টেরল ও চর্বি জমে যায়, তাকে অ্যাথেরোসক্লেরোসিস (ধমনির ‘শক্ত হয়ে যাওয়া’ বা ‘ক্লগিং’ নামেও পরিচিত) বলা হয়ে থাকে। এই চর্বি ধমনিতে রক্ত চলাচলের গতি কমিয়ে দিয়ে হৃৎপিণ্ডে রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এ কারণে হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ কমে যায়। হৃৎপিণ্ডকে স্বাভাবিক রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে অক্সিজেন এবং বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস হৃৎপিণ্ডে পৌঁছাতে পারে না। এ কারণে বুকে ব্যথা হতে পারে। যদি হৃৎপিণ্ডের একটি পেশিতে রক্তপ্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, অথবা শরীর থেকে যে পরিমাণ শক্তি হৃৎপিণ্ডে যাওয়ার কথা, সেগুলো না গেলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

সাধারণভাবে হার্ট–সংক্রান্ত যেকোনো অসুখকেই হৃদ্‌রোগ বলা হয়ে থাকে। যেটাকে এখন বর্তমান সভ্যতার রোগ বলা হয়। এ রোগের কয়েকটি ধাপ আছে, তেমনি আলাদা নামও রয়েছে, যেমন করোনারি হৃদ্‌রোগ, কার্ডিও মায়োপ্যাথি, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদ্‌রোগ, হার্ট ফেইলিউর, হৃৎপিণ্ডের ডান পাশ অচল হয়ে যাওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যাহত হওয়া, ভালভুলার ডিজিজ ইত্যাদি হার্টের অসুখের মধ্যে পড়ে।

মানুষের হৃৎপিণ্ডের মধ্যে করোনারি আর্টারি নামে দুটি ছোট ধমনি থাকে। এই ধমনিই হৃৎপিণ্ডকে সচল রাখতে সাহায্য করে বা হৃৎপিণ্ডকে পুষ্টির জোগান দেয়। কোনো কারণে এই করোনারি আর্টারি যদি ব্লক হয়ে যায়, তাহলে যে এলাকায় ওই আর্টারি বা ধমনি রক্তের পুষ্টি পৌঁছে দিতে পারে না, সেই জায়গার হৃদ্‌পেশি কাজ করে না। তখনই হার্ট অ্যাটাক হয়। এ সমস্যা যেকোনো সময় যে কারও হতে পারে। কাজ করতে করতে, ঘুমের ঘোরে সকাল-রাতে যেকোনো সময় হতে পারে। হঠাৎ ভারী কোনো কাজ করলে, বাইরে ঠান্ডা আবহাওয়ায় থাকলেও এ রোগ হতে পারে। অনেক সময় এই সমস্যাগুলো নিঃশব্দে দানা বাঁধে।

হার্ট অ্যাটাক হতে যাচ্ছে, তখন যে লক্ষণ থাকে

সাধারণভাবে হার্টের অসুখ থাকলে বুকে অসহ্য ব্যথা অনুভূত হয়। সেই সঙ্গে ঘাম হয় এবং শরীর খারাপ ও অস্বস্তি লাগে। ক্রমাগত শরীর খারাপ করতে থাকলে হার্টের অসুখ হতে পারে। হার্টের করোনারি আর্টারি বা ধমনি ব্লকেজ থাকলে মানুষের শরীরে নানা সমস্যা হয়। বুকে ব্যথা, ঘাম, নিশ্বাসে কষ্ট, মাথা ধরা—এসব লক্ষণ দেখলে বোঝা যায়, রোগীর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। হাতে-পায়ে ঝিনঝিনও করতে পারে। মূলত রক্তে এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং এইচডিএলের (ভালো) মাত্রা কমে গেলে মানুষের হার্ট অ্যাটাক হয়।

এমন সমস্যা হলে আপনি নিয়মিত আকুপ্রেশার করতে পারেন। সেই সঙ্গে খাদ্য ও জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে ফেলুন। তাতে আপনার সমস্যাগুলো আস্তে আস্তে দূর হবে এবং সেই সঙ্গে উপসর্গগুলো থাকবে না।

কীভাবে আকুপ্রেশার শুরু করবেন

হার্টের যে সমস্যাই হোক, আপনি আকুপ্রেশার শুরু করার আগে আপনার জীবনধারায় একটু পরিবর্তন আনার চেষ্ট করুন। বিশেষ করে খাদ্যে শৃঙ্খলা আনতে হবে। আপনার খাবার হবে ফল ও সবুজ শাকসবজিনির্ভর। সেই সঙ্গে দানাদার শস্য ও বাদাম খেতে পারবেন। তারপর প্রতিদিন সকালে ২০ থেকে ২৫ মিনিট আকুপ্রেশার করবেন।

আকুপ্রেশার শুরু করার প্রথম নিয়ম হচ্ছে আপনি আপনার দুই হাত ঘষুন। দুই মিনিট এমনভাবে হাতের তালু ঘষবেন, যেন হাত লাল ও গরম হয়ে ওঠে। তারপর ছবিতে দেওয়া পয়েন্টেগুলোর প্রতিটিতে ১০০ বার করে আকুপ্রেশার করুন। হার্টের পয়েন্টগুলো মূলত আমাদের হাতের বাঁ হাতে হয়ে থাকে। আকুপ্রেশার করার জন্য কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। আপনার বাঁ হাত ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দিন।

ছবি– ৪ ক্যাপশন:
বাঁ হাতের সাতটি স্থানে ও ডান হাতের চারটি স্থানে আকুপ্রেশার করবেন। প্রেশার হবে খুব হালকাও না বেশি জোরেও না। আপনি যখন আঙুল দিয়ে বাঁ হাতের পয়েন্টগুলোতে চাপ দেবেন, তখন আপনি হালকা ব্যথা অনুভব করবেন। যেখানে আপনি ব্যথা অনুভব করবেন, সেখানেই আপনার পিনপয়েন্ট। প্রতিদিন সকালে ও রাতে শোয়ার আগে অবশ্যই খালি পেটে আকুপ্রেশার করতে হবে। সপ্তাহে ছয় দিন আকুপ্রেশার করুন, আর এক দিন বিরত থাকুন।

সব কটি পয়েন্টে আপনি এক সপ্তাহ আকুপ্রেশার করলেই টের পাবেন, আপনার শরীরে কিছুটা পরির্বতন আসছে, বিশেষ করে বুকটা হালকা লাগবে, শ্বাস ফেলতে তেমন কষ্ট হবে না, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যে কষ্ট হতো, তা ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকবে। এই নিয়ম তিন মাস করা উচিত। যাঁরা অসুস্থ আছেন, তাঁরাই যে আকুপ্রেশার করবেন, তেমনটি নয়; বরং আপনিও হার্ট ভালো রাখতে নিয়মিত আকুপ্রেশার করতে পারেন।

হার্ট ভালো রাখার জন্য খাবারের মধ্যে আমাদের মৌসুমি ফল অনেক ভালো। সেই সঙ্গে আপেল আর নিয়মিত কলা, পেঁপে খেয়ে শরীরকে সচল রাখা জরুরি। বিশেষ করে সারা দিনে আপনার খাবারে তেল ও লবণের পরিমাণ কমানো আবশ্যক। এ জন্য ফল ও কাঁচা সবজির সালাদ হতে পারে আদর্শ খাবার।

হার্টের সমস্যাগুলো শরীরে ধীরে ধীরে জন্মালেও অ্যাটাক হয় খুব দ্রুত। এ কারণে মানুষের বিপদ বেড়ে যায়। হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় আপনি আকুপ্রেশার করে আপনার পরিবারকে বিপদমুক্ত রাখতে পারবেন।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ।

ছবি: লেখক

Prothom Alo link: হার্ট ভালো রাখতে আকুপ্রেশার

ফুসফুসের সমস্যায় আকুপ্রেশার

ফুসফুসের সমস্যায় আকুপ্রেশার

আমাদের এই ফুসফুসে নানা ধরনের সমস্যায় আধুনিক অনেক কার্যকর চিকিৎসার বিকল্প চিকিৎসা আকুপ্রেশার, নিয়মিত আকুপ্রেশার করে ফুসফুসের নানান সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় ওষুধ ছাড়াই। আকুপ্রেশারের সুবিধা হচ্ছে, এর পয়েন্ট জেনে নিজে নিজেই আকুপ্রেশার করা সম্ভব। আবার রোগ না হলেও নিয়মিত আকুপ্রেশার করে ফুসফুস সতেজ রাখা যায়। ফুসফুস–সংক্রান্ত আকুপ্রেশার করার নিয়ম দেওয়া হয়েছে।

ফুসফুসের সমস্যা: শ্বাসনালির প্রদাহ বা ব্রঙ্কাইটিস, কাশি, হুপিং কাশি, রক্তকাশি, স্বরভাঙা, হাঁপানি, ঘন ঘন নিশ্বাস নেওয়া, ডিফথেরিয়া, বুকে ব্যথা, পার্শ্ব ব্যথা ইত্যাদি সাধারণ সমস্যা ছাড়াও ফুসফুসে ক্যানসার হয়ে মানুষের মৃত্যুহার খুব একটা কম না।

অ্যাজমা: হাঁপানি বা অ্যাজমা একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যার মূল লক্ষণ হলো শ্বাসকষ্ট ও শাঁ শাঁ শব্দে নিশ্বাস ফেলা। মূলত এটা একটা বংশগত রোগ। অ্যালার্জি, তামাকের ধোঁয়া ও রাসায়নিক উত্তেজক পদার্থ হাঁপানির মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়। অ্যাজমা বা হাঁপানি কারও একবার হলে পুরোপুরি নিরাময় হয় না, কিন্তু যথাযথ চিকিৎসাসহ নিয়ম মানলে রোগটি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে এনে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব।

সিওপিডি: ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি একধরনের ফুসফুসের রোগ, যা ফুসফুসে অক্সিজেন প্রবাহের গতি ধীর করে দেয়, ফলে শ্বাস নেওয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। দেখা গেছে, এই রোগে আক্রান্ত ৪০ শতাংশ মানুষই মানসিক কষ্ট ও উদ্বেগের সমস্যায় ভোগেন।

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ: শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বলতে শ্বাসনালির সঙ্গে জড়িত নানা রোগকে বোঝায়। এ ধরনের সংক্রমণকে সাধারণত উচ্চতর শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণ বা নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। উচ্চ শ্বসনতন্ত্রে সাধারণত সংক্রমণের মধ্যে টনসিলাইটিস, ফ্যারিনজাইটিস, ল্যারিনজাইটিস, সাইনোসাইটিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, সর্দি ইত্যাদি অন্যতম।

যক্ষ্মা: বাংলাদেশে ফুসফুসের প্রধান রোগ যক্ষ্মা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৯ সালের যক্ষ্মাবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদন বলছে, যক্ষ্মা রোগের হার সবচেয়ে বেশি, এমন আক্রান্ত ছয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এটি ছোঁয়াচে রোগ বলে যক্ষ্মায় আক্রান্ত একজন রোগী আরও ১০ জনকে আক্রান্ত করতে পারেন।

কোভিড–পরবর্তী উপসর্গ: কোভিড থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের একটা বড় অংশের পালমোনারি ফাইব্রোসিস হয়। ফাইব্রোসিস হলে ফুসফুস শক্ত আকার ধারণ করে, তখনই অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের যাওয়া-আসা ব্যাহত হয়। এ কারণে ফুসফুসের থলিগুলো ফুলতে পারে না, ফলে রোগী দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টে ভোগেন।

আকুপ্রেশার

আকুপ্রেশার শুরু করার প্রথম নিয়মটি হচ্ছে, দুই হাতে তালুতে ভালো করে ঘষুন। দুই মিনিট দুই হাতে তালু ঘষলে হাত দুটি গরম হয়ে যাবে। তারপর দুই হাতের ১০ আঙুলের ডগায় নখের ওপরে (ছবিতে দেওয়া আছে, ঠিক সেভাবেই) এক হাতে অন্য হাত দিয়ে চাপ দিতে হবে। প্রথমে ডান হাতে সব কটি আঙুলে আকুপ্রেশার করে বাম হাতের সব আঙুলে আকুপ্রেশার করবেন। প্রতিটি আঙুলে ৫০টি করে চাপ দেবেন।

তারপর হাতের তালুতে আঙুলের নিচের দিকে হাতের রেখার ওপরে পুরো জায়গাটায় (ছবিতে দেওয়া পয়েন্ট) কড়ে আঙুল থেকে ইনডেক্স ফিঙ্গার পর্যন্ত ধীরে ধীরে চাপ দেবেন, এতে কোনো একটা স্থানে ব্যথা অনুভূত হবে, যেখানে ব্যথা, সেখানেই বেশি চাপ দিতে হবে। এখানে ১০০টি করে চাপ হবে।

তারপর গলার পয়েন্টে আকুপ্রেশার করতে হবে। ছবিতে দেওয়া পয়েন্টে ওপর থেকে নিচের দিকে এখানে ১০০টি করে চাপ দিতে হবে। এই তিন পয়েন্টে আকুপ্রেশার করে পুনরায় দুই হাত দুই মিনিট ঘষুন।

প্রতিদিন দুইবার সকালে খালি পেটে এবং রাতে শোয়ার আগে আকুপ্রেশার করুন। নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে এক মাসের মধ্যেই উপকার পেতে থাকবেন। সেই সঙ্গে যদি কিছু খাদ্যবিধি মানা যায়, তাহলে উপকার দ্বিগুণ হবে।

রোগ অনুযায়ী পথ্য

হলুদ: প্রতিদিন রাতে শোয়ার আগে এক কাপ কুসুম গরম পানিতে আধা চামচ হলুদের গুঁড়া মিশিয়ে খেলে শ্বাসযন্ত্রে বাতাস চলাচল–সংক্রান্ত জটিলতা দূর করে। হলুদে আছে কারকিউমিন, যা ফুসফুস প্রাকৃতিকভাবে পরিষ্কার করে এবং শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান দূর করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

আদা: ঠান্ডা ও কাশির ঘরোয়া সমাধান এর প্রদাহরোধী উপাদান শ্বাসযন্ত্র থেকে বিষাক্ত উপাদান দূর করে। এতে রয়েছে ভিটামিন ও নানা রকম খনিজ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, বিটা ক্যারোটিন ও জিঙ্ক। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, আদা ফুসফুসের ক্যানসারের কোষ দূর করতে সাহায্য করতে পারে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মৌসুমি ঠান্ডা ও সংক্রমণ দূর করতে আদার চা বিশেষ উপকারী। সাধারণত আদা খাওয়ার পরে এক কাপ গরম পানিতে এক চামচ আদার রস মিশিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করলে ফুসফুস তাজা থাকবে।

পুদিনার চা: গরম পুদিনার চা মিউকাস, প্রদাহ ও গলাব্যথা দূর করে। পুদিনার চা ফুসফুসের সংক্রমণ ও নিউমোনিয়ার কারণে জমে থাকা শ্লেষ্মা, প্রদাহ ও গলাব্যথা দূর করতে পারে। সারা দিনে দুইবার পুদিনার চা পান করতে পারেন।

শ্বাস হচ্ছে মানুষের আয়ুর কাউন্টডাউন, যা প্রতি নিয়তই কমছে, তাই কম শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকাটাই প্রধান কাজ। আকুপ্রেশারে ফুসফুসের জটিল থেকে জটিল রোগ সেরে যায়। এই ক্ষেত্রে আকুপ্রেশার খাদ্য, পথ্য ছাড়াও শ্বাসের ব্যায়াম খুবই কার্যকর। বিশেষ করে যোগ ও প্রাণায়াম। ফুসফুস সতেজ রাখতে ধূমপান, ধোঁয়া, ধুলা থেকে দূরে থাকতে হবে, ঠান্ডা খাবার পরিত্যাগ করতে হবে।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আমজনতার আম

আমজনতার আম

কাঁচা বা পাকা দুই ধরনের আমই শরীরের জন্য ভালো। কাঁচা বা পাকা যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, আম সব বয়সী মানুষের শরীরের জন্য ভালো। আমের আঁশে কিছু উপাদান, যেমন ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, আছে প্রচুর পরিমাণে এনজাইম। এ ছাড়া আমে প্রায় ২৫ রকমের বিভিন্ন কেরাটিনোয়েডস উপকারী ব্যাকটেরিয়া আছে; আছে বিটাক্যারোটিন, ভিটামিন ই, সেলেনিয়াম এবং প্রচুর পরিমাণে অ্যাসিড, যেমন টারটারিক অ্যাসিড, ম্যালিক অ্যাসিড ও সাইট্রিক অ্যাসিড। ভিটামিন এ, প্রোটিনসহ আরও অন্যান্য উপাদানও থাকে। ১০০ গ্রাম কাঁচা আমে পটাশিয়াম থাকে ৪৪ ক্যালরি এ ছাড়া ৫৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ও ২৭ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম থাকে।

কাঁচা আমের গুণ

• বাইরে তীব্র রোদের ঝাঁজের সঙ্গে গা-পোড়ানো গরম, এ সময় কাঁচা আমের এক গ্লাস শরবত বানিয়ে খেলে সারা শরীরে এনে দিতে পারে প্রশান্তি।
• যাঁরা ওজন কমাতে বা শরীরের বাড়তি ক্যালরি খরচ করতে চান, তাঁদের জন্য আদর্শ ফল কাঁচা আম। পাকা মিষ্টি আমের চেয়ে কাঁচা আমে চিনি কম থাকে বলে এটি ক্যালরি খরচে সহায়তা করে।
• বুক জ্বালাপোড়া বা অম্লতার সমস্যা, ঢেকুর ওঠা থেকে কাঁচা আম মুক্তি দিতে পারে; অম্লতা কমাতে কাঁচা আমের এক টুকরো মুখে দিতে পারেন।
• ঘুম থেকে সকালে উঠে বমি বমি ভাব হয়; বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বাদের। এ সমস্যা দূর করতে পারে কাঁচা আম এই অস্বস্তি কমাবে।
• লিভারজনিত সমস্যা প্রাকৃতিক বন্ধু কাঁচা আম। কাঁচা আম চিবিয়ে খেলে পিত্তরস বৃদ্ধি পায়। এতে লিভারের স্বাস্থ্য ভালো হয় এবং অন্ত্রের জীবাণু সংক্রমণ রোধে কাজ করে।

• রক্তের আয়রন ঘাটতি পূরণে কাঁচা আম ভালো, রক্তাল্পতা সমস্যা সমাধানে বেশ উপকারী।
• খাদ্য হজমে সহায়তা করে কাঁচা আম এবং পাকা আম অন্ত্রকে পরিষ্কার করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি দেয়।
• শরীরে লবণের ঘাটতি দূর করে।
• কাঁচা আম খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
• কাঁচা আম শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি জোগায়, যা স্কার্ভি ও মাড়ির রক্ত পড়া কমায়। আয়ুর্বেদ মতে, আমচুর স্কার্ভি নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকরী। এ ছাড়া নিশ্বাসের দুর্গন্ধ ও দাঁতের ক্ষয় রোধেও সহায়তা করে।
• কাঁচা আম খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে।

পাকা আমের গুণ

পাকা আম ত্বক সুন্দর, উজ্জ্বল ও মসৃণ করে ত্বকের ভেতর ও বাইরে থেকে উভয়ভাবেই সুন্দর রাখতে সাহায্য করে। ত্বকের লোমের গোড়া পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে ও ব্রণের সমস্যা সমাধানে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
• পাকা আমের আঁশ ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসমৃদ্ধ থাকায় তা হজমে সহায়তা করে। প্রচুর পরিমাণে এনজাইম আমাদের শরীরের প্রোটিন অণুগুলো ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে, যা হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
• আমে প্রায় ২৫ রকমের বিভিন্ন কেরাটিনোয়েডস উপকারী ব্যাকটেরিয়া আছে, যা ইমিউন সিস্টেমকে সুস্থ ও সবল রাখে।
• বিটাক্যারোটিন, ভিটামিন ই এবং সেলেনিয়াম থাকায় পাকা আম হার্টের সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
• আমে রয়েছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, যা আমাদের শরীরের স্নায়ুগুলোতে অক্সিজেনের সরবরাহ সচল রাখে। আমাদের শরীরকে সতেজ রাখে, যার কারণে আম খেলে ঘুম পায়, ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি আম খেলে ঘুমের সমস্যা দূর হবে।
• মৌসুমে প্রতিদিন আম খেলে শরীরে ভিটামিন এ-এর চাহিদা প্রায় ২৫ শতাংশ পূরণ হবে, যা চোখের জন্য খুবই উপকারী, চোখের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং রাতকানা রোগ থেকে রক্ষা করে।

• আমে প্রচুর পরিমাণে টারটারিক অ্যাসিড, ম্যালিক অ্যাসিড ও সাইট্রিক অ্যাসিড আছে, যা আমাদের শরীরে অ্যালকালাই বা ক্ষার ধরে রাখতে সহায়তা করে, শরীরে লিপিড ঠিক রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
• পাকা আমের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট শরীরে ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে। স্তন, লিউকেমিয়া, কোলন ও প্রোস্টেট ক্যানসারের মতো মারাত্মক ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে।
• পাকা আম পটাশিয়ামসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি আমাদের হার্টবিটকে সচল রাখে ও রক্তাল্পতা নিয়ন্ত্রণ করে।
• পাকা আম আমাদের শরীরের রক্ত পরিষ্কারে সহায়তা করে। প্রতিদিন আম খেলে দেহের ক্ষয়রোধ হয় এবং স্থূলতা কমিয়ে দেয়।
• আমে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, সেই সঙ্গে আরও আছে ফাইবার, যা সিরাম কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়, রক্তে উপস্থিত খারাপ কোলেস্টেরল, কম ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

কোন সময় খেলে ভালো

মানুষ আম খাওয়ার জন্য রাতকে বেছে নেয়; অথচ ওটাই আম খাওয়ার খারাপ সময়। সকাল থেকে বিকেল—যেকোনো সময় আম খাওয়া যায়। আম সলিড খাবার ভাত-রুটি খাওয়ার আগে খেতে পারলে ভালো। জুস খেলে পরেও খাওয়া যাবে। তবে কাঁচা আম কোনো অবস্থায় দুপুরের পর খাওয়া ঠিক না।

সতর্কতা

কথায় আছে, অতিরিক্ত কোনো কিছু ভালো নয়। অতিরিক্ত পরিমাণে আম খেলে ডায়রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে৷ কাঁচা আমের কষ মুখে লাগলে ও পেটে গেলে মুখ, গলা ও পেটে সংক্রমণ হতে পারে।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

হজম সমস্যায় আকুপ্রেশার

হজম সমস্যায় আকুপ্রেশার

পেটের সমস্যা শুরু হয় মূলত অতি ভোজন, ভুল ভোজন ও কম ভোজনের কারণে। মূল খাদ্য গ্রহণের নানা অনিয়ম, একটার পর আরেকটা খাওয়া, একসঙ্গে অনেক রকম খাওয়া, দ্রুত খাওয়া, টক-মিষ্টি একসঙ্গে খাওয়া, খাওয়ার সঙ্গে পানি পান করা, কম চিবিয়ে খাওয়া এবং যে খাদ্য যখন খাওয়া নিষেধ তখন তা খাওয়ার জন্য পেটের সমস্যা শুরু হতে থাকে। প্রধানত, পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হওয়ায় এ সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত অ্যাসিড পাকস্থলীর মিউকোসার পর্দা নষ্ট করে পাকস্থলীর সংস্পর্শে আসে এবং প্রদাহ তৈরি করতে পারে। আর হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়াও মিকোসাল পর্দা নষ্ট করে দেয়।

এ কারণে অ্যাসিড পাকস্থলীর সংস্পর্শে এসে প্রদাহের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া কারও পৌষ্টিকতন্ত্র থেকে যদি বেশি পরিমাণে অ্যাসিড ও প্রোটিন পরিপাককারী একধরনের এনজাইম (পেপসিন নামে পরিচিত) নিঃসৃত হতে থাকে, তবে এটি হতে পারে। আবার জন্মগতভাবে কারও পৌষ্টিকতন্ত্রের গঠনগত কাঠামো দুর্বল থাকে, তাহলেও পেপটিক আলসারসহ পেটের হজমপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

আমাদের সমাজে মানুষ পেটের যেকোনো সমস্যাকেই গ্যাস্ট্রিক মনে করে। তবে পেপটিক আলসার এবং নন-আলসার ডিসপেপসিয়া নামে দুটি সমস্যা আছে, যেগুলোকেও অনেকেই গ্যাস্ট্রিক বলে অভিহিত করে। এগুলো কেন হয় আর এ থেকে রেহাই কীভাবে পেতে হয়, তা না জেনে কেবল মুড়িমুড়কির মতো গ্যাসের ওষুধ খেলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, দীর্ঘ মেয়াদে টানা গ্যাস্ট্রিকের বড়ি খাওয়ার নানা জটিলতা আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। যদি পাকস্থলীতে এই বিশেষ জীবাণু হেলিকোব্যাকটার পাইলোরির সংক্রমণ থাকে, তবে সাধারণ গ্যাসের ওষুধে সেটা পুরোপুরি সেরে যাবে না এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও মিটবে না।

পেটের হজমজনিত সমস্যার বিকল্প সমাধান হিসেবে আকুপ্রেশার বেশ কার্যকর একটি পদ্ধতি। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন যাবৎ পেটের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁরা নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
আসুন শিখে নিই পেটের সমস্যা জন্য কীভাবে আকুপ্রেশার করব!

আকুপ্রেশার প্রতিদিন সকালে খালি পেটে করা উত্তম। সে জন্য ঘুম থেকে উঠে তিন গ্লাস কুসুম গরম পানি পান করার অভ্যাস গড়ুন। তারপর আকুপ্রেশার করতে বসুন। প্রথমে দুই হাতের তালু ভালো করে ঘষুন। এমনভাবে ঘষুন যেন তালু গরম হয়ে ওঠে। দুই মিনিট দুই হাতের তালু ঘষলেই যথেষ্ট গরম হয়ে ওঠে।

তারপর ছবিতে দেওয়া পয়েন্টে একবার চাপ দিন। প্রতিটি চাপের স্থায়ীত্ব হবে দুই সেকেন্ড। এভাবে একটি পয়েন্টে ১০০ বার করে চাপ দিন। খেয়াল করে দেখবেন, আপনি যেখানে চাপ দিয়ে ধরবেন, সেখানে ব্যথা অনুভূত হবে। আকুপ্রেশারের নিয়মই হচ্ছে যেখানে আপনি ব্যথা অনুভব করবেন, সেটা আপনার জন্য পিনপয়েন্ট। নিয়মিত আকুপ্রেশার করলেই ব্যথা কমে আসবে। একসময় ব্যথাই থাকবে না। তখন সমস্যাও থাকবে না।
দ্বিতীয় ছবিতে দেওয়া চারটি পয়েন্টেই আকুপ্রেশার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চারটি পয়েন্টে এক, দুই, তিন গুনে ওপর থেকে নিচে নামুন। চারটি পয়েন্টে একবার করে চাপ দিয়ে এক চাপ হিসাবে কাউন্ট করুন। এই হিসাবে আপনি ১০০ বার করে চাপ দিন ঠিক আগের নিয়মেই।

সবার শেষে এই দুটো পয়েন্টে আগের নিয়মেই আকুপ্রেশার করে সকালের কাজটি শেষ করুন। দিনে দুবার আকুপ্রেশার করা যাবে। সকালে খালি পেটে আর রাতে ঘুমানোর আগে এবং খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর। এই নিয়মে সপ্তাহে ছয় দিন আকুপ্রেশার করুন। একদিন বিরতি দিন। তারপর আবার শুরু করুন।
এক সপ্তাহেই আপনি উপকার পাওয়া শুরু করবেন। যাঁদের প্রচুর গ্যাসজনিত সমস্যা ছিল, তাঁদের গ্যাস হওয়ার প্রবণতা কমতে থাকবে। যাঁরা আইবিএস ও কনস্টিপেশনজনিত সমস্যায় আকুপ্রেশার করবেন, তাঁদের একটু সময় লাগবে। কিন্তু দুই সপ্তাহের মধ্যেই উপকার পাওয়া শুরু করবেন।

পেটের যেকোনো সমস্যা সমাধানে খাদ্যবিধি মানা জরুরি। প্রথমত, সকালে কুসুম গরম পানি ও লেবুর রস খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। সকালে নাশতায় তাজা মৌসুমি ফল থাকা জরুরি। তাতে পেটের অস্বস্তি ভাব কমতে শুরু করবে। দুপুর ও রাতে এক কাপ আদাজল হজমের জন্য উত্তম পথ্য। চা–কফি না খেয়ে আদাজল খাওয়া যেতে পারে।

পেট পরিষ্কার করার জন্য অনেকেই ‘অনেক কিছু’ করে থাকেন। কিন্তু অনেক কিছু না করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি, বিশেষ করে ময়দাজাতীয় খাবার বর্জন করতে পারলে খুব দ্রুতই পেটের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

লেখক: খাদ্য–পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আড্ডার মধ্যমণি, স্বাস্থ্যেও সমান

আড্ডার মধ্যমণি, স্বাস্থ্যেও সমান

প্রথম জাতীয় চা দিবসের বিশেষ আয়োজন

পানির পরেই চা বিশ্বের সর্বাধিক উপভোগ্য পানীয়। যেকোনো আড্ডা ও আপ্যায়নে চা প্রধানতম পানীয়; যা দিয়ে মানুষ স্বচ্ছন্দে আপ্যায়িত হয় এবং আপ্যায়ন করতে মানুষ পছন্দ করে। এর একধরনের স্নিগ্ধ, প্রশান্তিদায়ক স্বাদ রয়েছে এবং মানুষ এটি উপভোগ করে। ক্লান্তি ও অবসাদে চা মানুষের মধ্যে প্রশান্তি এনে দেয়। চা শুধু আপ্যায়নের উপচার নয়, স্বাস্থ্যরক্ষায়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য খারাপ গুণ থাকলেও চায়ে পুষ্টিগুণ যা আছে, তাতে চা খাওয়াই যেতে পারে।

চা–গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সিনেনসিস। চায়ে পলিফেনলস, ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং ক্যাটেচিন পলিফেনলস এবং ক্যাটেচিন থাকে, যা ফ্রি র‌্যাডিক্যালস তৈরিতে বাধা দেয় এবং কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। এ কারণে চা ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চায়ে উপস্থিত পলিফেনলসের পরিমাণ ২৫ শতাংশের বেশি, যা দেহের অভ্যন্তরে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। চায়ে ৭ শতাংশ থিওফাইলিন ও থিওব্রোমিন রয়েছে, যা শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির জন্য বিশেষ উপকারী।

আমাদের এ অঞ্চলে চায়ের একটি ইতিহাস আছে, চা খাওয়ার প্রচলন চীন করলেও একে বহির্বিশ্বে পরিচয় করিয়েছে ইউরোপ, বিশেষ করে ব্রিটিশ ও ওলন্দাজরা। এই অঞ্চলে উপনিবেশ করার সঙ্গে চায়ের আমদানি হয়। বিশেষত ব্রিটিশরা স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠার করার পর এখানে চাষ করা শুরু করে, বিশেষ করে বৃষ্টিপ্রধান এলাকা দার্জিলিং ও সিলেট অঞ্চলে চায়ের বাগান করে। এখানে প্রচুর পরিমাণে জন্মানো চা–গাছ ছিল ক্যামেলিয়া সিনেনসিস অসমিকা নামে একটি উপপ্রজাতির। গ্রিন টির চেয়ে আসাম টি বেশি স্বাদযুক্ত কালো রঙের ছিল।

সাধারণভাবে প্রাথমিক ইংলিশ ব্রেকফাস্টের অন্তর্ভুক্ত আসা রং কড়া থাকায় তা লোকজন দুধসহকারে পান করত। বর্তমানে ব্রিটেনে সাধারণ ইংলিশ ব্রেকফাস্ট বা প্রাতরাশের সঙ্গে দেওয়া চা দুধসহকারে পান করা হয় কিন্তু ইউরোপ মহাদেশের অন্যান্য স্থানে চায়ের সঙ্গে দুধ খুব কমই পরিবেশন করা হয়। এর কারণ মূলত ইন্দোনেশিয়ার জাভা থেকে নেদারল্যান্ডসে যে চা যেত, তা ছিল অনেক হালকা এবং তার সঙ্গে দুধ যোগ করার প্রয়োজন হতো না। এর ফলে ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানিতে এই চা–কে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

যেহেতু চা আমাদের প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনের নিত্যসঙ্গী, সেহেতু এই চা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু উপকারী এবং কতটুকু অপকারী, তা জেনে রাখা শ্রেয়।

আমাদের হরেক রকম চা ও তার উপকারিতা

আদা চা: আদা চা খুবই উপকারী; বিশেষ করে সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে এটি ওষুধের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। গরম আদা–চা পান করলে গলাব্যথা কমে যায়। অ্যাসিডিটির বিরুদ্ধেও আদা–চা কাজ করে। এমনকি আদা–চা পান করলে হজমের সমস্যা কমে।

দুধ–চা: ক্লান্তি দূরীকরণে খুবই কার্যকর। নিয়মিত চা পানে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। চা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫ গুণ কমিয়ে দেয়।

লাল–চা: এর মধ্যে থাকা ট্যানিন ফ্লু, ঠান্ডা, ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রমণ ও অন্ত্রের প্রদাহ প্রতিরোধ করে দেহকে সুরক্ষা দেয়। লাল–চা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। হজম ভালো করে। এর মধ্যে থাকা ট্যানিন হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। এটি অন্ত্রের ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করে। লাল–চা অন্ত্রের প্রদাহ রোধেও কাজ করে।

গবেষণায় বলা হয়, লাল–চা কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের জারিত হওয়া প্রতিরোধে কাজ করে। এ ছাড়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মুখের ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান দাঁতের ক্ষয় সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করে। তা ছাড়া এর মধ্যে থাকা ফ্লোরাইড মুখের দুর্গন্ধ দূর করে।

লাল চায়ের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রেক্টাল, জরায়ুর ক্যানসার, ফুসফুস ও ব্লাডার ক্যানসার প্রতিরোধ করে, এটি স্তন ক্যানসার, প্রোস্টেট ক্যানসার ও পাকস্থলীর ক্যানসার প্রতিরোধেও কাজ করে। আমেরিকার ন্যাশনাল টি ইনস্টিটিউটের ‘টি অ্যান্ড ক্যানসার’বিষয়ক একটি নিবন্ধ জানিয়েছে, চায়ের উপকারিতা ক্যানসারের মতো সমস্যায় উপকারী। নিয়মিত এক কাপ রং–চা খেলে স্তন ক্যানসার, কোলোন ক্যানসার ও অন্যান্য আরও কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

চা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট–সমৃদ্ধ হলেও এতে রয়েছে ক্যাফেইন নামক উত্তেজক পদার্থ, সাধারণত চায়ে ক্যাফেইন রয়েছে, বস্তুত ক্যাফেইনের কারণেই ঘুম কম হওয়া, হজমে ব্যাঘাত ঘটা ইত্যাদি সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

চা সম্পর্কে ভুল ধারণা

চা সম্পর্কে আমাদের অনেকের ভুল ধারণা আছে। যেমন চা খেলে রাতে ঘুম আসে না, চা লিভারের ক্ষতি করে, চা চামড়া কালো করে ইত্যাদি। যদিও চা খেলে গায়ের রং কালো হবে না, কারণ ত্বকের রং নির্ভর করে ম্যালানোসাইট কোষের সক্রিয়তার ওপর। চা পান করলে লিভারের কোনো ক্ষতি হয় না, তবে এটা মনে রাখতে হবে যে অতিরিক্ত চা পান করলে বিপরীত প্রতিক্রিয়া হবে; যেমন অবসাদ ও কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। ইদানীং বিভিন্ন স্থানে হরেক রকম চায়ের দোকান গড়ে উঠেছে। সেখানে দুধের সর দিয়ে চা বানানো হয়, তা কিন্তু চা আর থাকে না, বরং সেটা দুধের পদ হয়ে যায়। ওটা মোটেও চা নয়।

চা বানানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, প্রথমে পানি বেশ কিছুক্ষণ ফুটতে দিতে হবে। এরপর চুলা থেকে নামিয়ে পানিতে প্রতি কাপের জন্য এক চা-চামচ করে পাতা দিয়ে কেটলি ঢেকে রাখতে হবে, যাতে চা ঠান্ডা হয়ে না যায়। চার থেকে পাঁচ মিনিট পর কাপে ঢেলে নিয়ে পান করতে হবে।

আড্ডা হোক আর আপ্যায়ন, কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে চা খাওয়ার প্রচলন কোনো অবস্থায় ভালো কিছু নয়। তাই এটা পরিহার করা উচিত। আর চিনি খাওয়াও ক্ষতিকর। তাই যতটা পারা যায় চিনি পরিহার করেই চায়ের আসল স্বাদ গ্রহণ করা।

জাতীয় চা দিবসে চা হয়ে উঠুক আড্ডার মধ্যমণি!

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

দারুচিনি শুধু মসলা নয়, এর বেশি কিছু

দারুচিনি শুধু মসলা নয়, এর বেশি কিছু

দারুচিনি হলো এই গ্রহের সবচেয়ে বেশি অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ভেষজ। এর মিষ্টি স্বাদ ও সুন্দর সুবাসের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধরে প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতিতেই আদৃত হয়ে আসছে। দারুচিনিতে রক্তের শর্করা রোধ করাসহ উন্নত অসাধারণ ঔষধি গুণাবলি রয়েছে, যা প্রদাহ কমাতে ও স্নায়বিক স্বাস্থ্য উন্নীত করতে সহায়তা করে। এ ছাড়া সুগন্ধি মসলা হিসেবে দারুচিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত। শুধু রান্নায় গন্ধ বৃদ্ধি নয়, শরীর ও ত্বক উভয়ের জন্যই দারুচিনি ব্যবহার করা যায়। এর অনেক উপকারিতা রয়েছে। চলুন জেনে নিই দারুচিনি আমাদের শরীরের কী কী উপকারিতা সাধন করে থাকে।

গাঁটের ব্যথায়

অনেকেই গাঁটের সমস্যায় ভুগছেন। এ ক্ষেত্রে দারুচিনিকে জয়েন্টের ব্যথা কমানোর ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। উষ্ণ গরম পানির মধ্যে এক চামচ মধু আর দারুচিনিগুঁড়া ভালোভাবে মিশিয়ে নিন, এরপর শরীরের ব্যথা স্থানে আস্তে আস্তে মালিশ করুন। ২-৩ দিন ভালোভাবে মালিশ করুন। কিছুদিন পর দেখবেন ব্যথা কমে যাবে।

পেটের সমস্যায়

দারুচিনি পেটের জন্য ভীষণ উপকারী। এটি অ্যাসিডিটির সমস্যা দূর করে ও পেটের ব্যথা উপশম করে। পেট পরিষ্কার করতে রাতে শোবার আগে দারুচিনির সঙ্গে হরীতকীর গুঁড়া মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। অ্যাসিডিটি রোধ করতে মধুর সঙ্গে দারুচিনি মিশিয়ে খেলে অ্যাসিডিটি ভালো হয়ে যায়।

রক্তে এলডিএল হ্রাসে

প্রতিদিন আধা চা–চামচ দারুচিনির গুঁড়া রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল এলডিএলের মাত্রা কমায়। প্রতিদিন ২ ইঞ্চি পরিমাণ দারুচিনি দুই কাপ পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি এক কাপে নিয়ে এসে সেই পানি গরম–গরম চায়ের মতো করে দিনে তিন বার পান করলে কোলেস্টেরলের সমস্যা সমাধান হয়ে যায়, ডায়াবেটিস না থাকলে দারুচিনির পানিতে এক চা–চামচ মধু মিশিয়ে পান করতে পারেন।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসে

রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। প্রতিদিন ২ ইঞ্চি পরিমাণ দারুচিনি দুই কাপ পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি এক কাপে নিয়ে এসে গরম–গরম চায়ের মতো করে দিনে তিনবার খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের জন্য অনেক উপকারী, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।

শরীরের ছত্রাকজনিত সমস্যায়

অনেকে শরীরের নানান স্থানে ছত্রাকজনিত সমস্যা ভুগে থাকেন। তাঁদের জন্য দারুচিনি একটি আদর্শ সমাধান। ইস্ট ছত্রাকজনিত ইফেকশন প্রতিরোধ করতে প্রতিদিন ২ ইঞ্চি পরিমাণ দারুচিনি দুই কাপ পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি এক কাপে নিয়ে এসে গরম–গরম চায়ের মতো করে দিনে তিনবার পান করলে দারুচিনির গুণাবলি চমৎকারভাবে কাজ করে। ছত্রাকজনিত সমস্যা সমাধান হয়, বিশেষ ক্ষেত্রে ছত্রাকে উষ্ণ গরম পানির মধ্যে এক চামচ মধু আর দারুচিনিগুঁড়া ভালোভাবে মিশিয়ে নিন, এরপর শরীরের ছত্রাক স্থানে আস্তে আস্তে মালিশ করুন। ২-৩ দিন ভালোভাবে মালিশ করুন। কিছুদিন পর দেখবেন ছত্রাক কমে যাবে।

হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে

হৃদ্‌রোগের অনেক ধরন রয়েছে, তার মধ্যে অনেকের বুকে চিনচিন ব্যথা, হাঁটতে কষ্ট হয়, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হয়, তাঁদের জন্য দারুচিনি বেশ উপকারী। ১০০ গ্রাম জিরার গুঁড়া, ১০০ গ্রাম ধনিয়ার গুঁড়া, ৫০ গ্রাম দারুচিনির গুঁড়া একসঙ্গে মিশিয়ে এই মিশ্রণ এককাপ গরম পানিতে এক চা–চামচ মিশিয়ে চায়ের মতো পান করলে হৃদ্‌রোগীদের জন্য দারুণ উপকারী। এটি রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে, উচ্চরক্তচাপ ও কোলেস্টেরেলের সমস্যাও দূরে রাখে।

লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া প্রতিরোধে

মরণব্যাধি লিম্ফোসাইটিক লিউকোমিয়ার বিস্তার রোধ করে দারুচিনি। রক্ত জমাট না বাঁধার অসুখ হিমোফিলিয়া প্রতিরোধ করতে দারুচিনি বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন ২ ইঞ্চি পরিমাণ দারুচিনি দুই কাপ পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি এক কাপে নিয়ে এসে গরম–গরম চায়ের মতো করে দিনে তিনবার অথবা ১০০ গ্রাম জিরার গুঁড়া, ১০০ গ্রাম ধনিয়ার গুঁড়া, ৫০ গ্রাম দারুচিনির গুঁড়া একসঙ্গে মিশিয়ে এই মিশ্রণ এক কাপ গরম পানিতে এক চা–চামচ মিশিয়ে চায়ের মতো করে পান করলে লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়ার জন্য খুবই উপকারী। এটি রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে, যার ফলে লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়ার প্রকোপ কমে যায়, প্রোটিন–জাতীয় খাদ্য পরিহার করে প্রাকৃতিক খাদ্যবিধি মেনে চললে এই ব্যাধি ভালো হয়ে যায়।

বাতের ব্যথা ও শরীরের হাড়ের ব্যথায়

বাতের ব্যথা ও শরীরের হাড়ের ব্যথায় আধা চামচ দারুচিনির গুঁড়া এক চামচ মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ব্যথা দূর হয়। তা ছাড়া দারুচিনি–মিশ্রিত শর্ষের তেল গায়ে মালিশ করলে ব্যথা ভালো হয়। এ ক্ষেত্রে পানি পানের বিষয়টি খুব ভালোভাবে খেয়াল করতে হয়, পানি কমও পান করা যাবে না, বেশিও পান করা যাবে না। তাই পরিমাণের ক্ষেত্রে সচেতন হয়ে পানি পান করতে হবে। কোনো অবস্থাতে পানিশূন্যতায় ভোগা যাবে না।

গলাব্যথা ও খুশখুশে কাশিতে

ঠান্ডায় গলাব্যথা বা খুশখুশে কাশিতে এককাপ গরম পানিতে দারুচিনি, মধু মিশিয়ে সারা দিনে ৬ বার চায়ের মতো করে খেলে গলায় আরাম পাওয়া যায় ও খুশখুশে কাশি কমে যায়।

স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাবে, এটা স্বাভাবিক নিয়ম। নিয়মিত প্রতিদিন একবেলা ২ ইঞ্চি পরিমাণ দারুচিনি দুই কাপ পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি এক কাপে নিয়ে এসে গরম–গরম চায়ের মতো করে পান করলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস হওয়ার প্রবণতা কমে এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। এটা শিশুদের বেলায় প্রযোজ্য নয়।

সারা দিনে ২ চা–চামচের বেশি দারুচিনি খাওয়া যাবে না, দারুচিনি খাওয়ার কারণে ডায়রিয়া ও মাথা ধরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যাঁদের এমন উপসর্গ দেখা দেবে, তাঁদের দারুচিনি না খাওয়াই উত্তম। বাজারে দারুচিনির নামে অনেক ধরনের গাছের ছাল দারুচিনি বলে বিক্রি হয়ে থাকে, কেনার আগে গন্ধ এবং একটু ভেঙে মুখে দিয়ে দেখুন ঝাঁজালো স্বাদ কি না। নিশ্চিত হলেই নেবেন। প্যাকেটজাত দারুচিনি পরিহার করুন।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

প্রথম আলো থেকে সরাসরি পাঠ করতে এখানে ক্লিক করুন

গাঁজানো রসুন-মধু : উত্তম ভেষজ প্রতিকার

গাঁজানো রসুন-মধু : উত্তম ভেষজ প্রতিকার

রসুন ও মধুর মিশ্রণ হলো এক উত্তম ভেষজ প্রতিকার, যা সর্দি-কাশি নিরাময়ের পাশাপাশি ওজন হ্রাস করতে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই মিশ্রণের প্রাকৃতিক যৌগ রয়েছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে দেহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

রসুন ও মধু

রসুনে অ্যালিসিন রয়েছে, একটি অর্গানসালফার যৌগ, যা প্রতিরোধের মাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে। প্রাকৃতিক গবেষণায় বলা হয়, রসুন থেকে অর্গানসালফার যৌগিক সম্ভাব্যভাবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও কার্ডিওপ্রোটেক্টিভ ক্রিয়াকলাপগুলো থাকে।

মধুতেও এমন জৈব যৌগ থাকে, যা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল বৈশিষ্ট্যযুক্ত। ফলে রসুন ও মধু—এ দুটি উপাদান একত্র হলে শরীরে প্রতিরোধব্যবস্থা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। এ জন্য এই মিশ্রণ একটি শক্তিশালী ঘরোয়া উপায় হিসেবে বিবেচিত। ভেষজ প্রতিকার হিসেবে রসুন ও মধু রাখার সর্বাধিক সাধারণ উপায় সম্পর্কে জানানো হলো।

গাঁজানো রসুন-মধুর রেসিপি

উপকরণ

রসুনের কোয়া ১২টি, মধু ২৫০ গ্রাম
(পরিমাণ বেশিও করতে পারেন কিন্তু এই অনুপাতে করতে হবে।)

প্রণালি

গাঁজানো রসুনের মধু তৈরি করতে একটি পরিষ্কার হিটারপ্রুফ গ্লাস জার নিন। সেই জারে খোসা ছাড়ানো রসুনের কোয়া দিন। এবার এর মধ্যে মধু ঢেলে দিন। মুধ এমনভাবে ঢালুন, যাতে রসুনের কোষগুলো যেন মধুতে ডুবে যায়। এরপর জারের মুখটি ভাল সুতি কাপড় দিয়ে বেঁধে তিন দিন রেখে দিন।

তিন দিন পর জারের কাপড় খুলে চা–চামচ দিয়ে রসুনগুলো নেড়ে দিন। আবার মুখ বেঁধে রেখে দিন আরও এক সপ্তাহ। এরপর আবারও জারের মুখ খুলে রসুনগুলো নেড়ে দিন। এভাবে আরও তিন সপ্তাহ করুন। মোট এক মাস সময় হলেই রসুন-মধু ফারমান্টেড হয়ে খাবার উপযুক্ত হয়ে যাবে। এই গাঁজানো রসুন-মধুর জারটিকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখতে হবে। কোনোভাবেই গরম করা যাবে না, গরম জায়গায় রাখা যাবে না, এমনকি ফ্রিজেও রাখা যাবে না।

ব্যবহারবিধি

গাঁজানো রসুন-মধু টনিকটি দিনের যেকোনো সময় খেতে পারবেন। দিনে এক কোয়া রসুনসহ এক চা–চামচ মধু সেবনযোগ্য।

উপকারিতা

বিকল্প প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ড্রাগ

২০১৩ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে তাজমা মধুর (স্টিংলেস মৌমাছির ইথিওপিয়ায় উত্পাদিত মধু) সঙ্গে মিশ্রণে রসুনের যে শক্তিশালী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণ রয়েছে, তা গবেষকেরা উদ্ঘাটন করেন। তাঁরা দেখতে পান যে রসুন-মধুর মিশ্রণ সালমোনেল্লা, স্টাফিলোকক্কাস অরিয়াস, লায়রিয়া মনসিটিজেনস ও স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর।

ভেষজ টনিক এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে, যা প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণ করে। অন্য একটি গবেষণায় এই ফলাফলের সত্যতা নিশ্চিত করেছে এবং এ–ও প্রমাণ করেছে যে যখন গাঁজানো রসুন-মধু একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তখন তারা একে অপরের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘায়িত বা উন্নত করে, নিজের গুণকে বৃদ্ধি করে।

গাঁজানো রসুন-মধু সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হ্রাস

রসুন, তাজা, গুঁড়া—বিভিন্নরূপে দীর্ঘকাল ধরে শক্তিশালী প্রাকৃতিক খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যা হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা যায়, রসুন রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি রক্ত জমাট বাঁধাও প্রতিরোধ করে। একইভাবে মধু ফিনলিক যৌগে সমৃদ্ধ, যা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে ও কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে। এ কারণে হৃদরোগজনিত সমস্যায় গাঁজানো রসুন-মধু অনেক বেশি ঔষধি হিসেবে কাজ করে, রক্ত সাবলীল থাকার কারণে হার্টে ব্লক হওয়ার প্রবণতা কমে যায়। যাদের ব্লক আছে, তা আর বাড়তে দেয় না। হার্টরেট ঠিক রাখে, যাতে শরীরে কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয়।

প্রাকৃতিক ঠান্ডা ও ফ্লু থেকে মুক্তি দেয়

মধুর শক্তিশালী অ্যান্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রসুনের প্রধান উপাদান অ্যালিসিন শরীরের শ্বেত রক্ত কোষে রোগ প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়া উন্নত করতে সহায়তা করে। বিশেষত, যখন তাদের মধ্যে সাধারণ সর্দি ও ফ্লু হওয়ার কারণ রয়েছে, এমন ভাইরাসের মুখোমুখি হয়। গাঁজানো রসুন, বিশেষত সর্দি ও ফ্লুর তীব্রতা হ্রাস করতে সহায়তা করে। যাঁরা বছর ধরে ঠান্ডা বা ফ্লুতে আক্রান্ত থাকেন, তাঁদের জন্য এটা বিকল্প ওষুধ হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত খেলে আস্তে আস্তে ঠান্ডা লাগার প্রবণতা কমে আসবে। শিশুদের ঠান্ডা লাগার ক্ষেত্রেও বিশেষ উপকারী।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে
আমরা জানি, আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার একটি বড় আশ্রয় হলো আমাদের শরীরে ইমিউন সিস্টেম। এই ইমিউন সিস্টেমকে সঠিক রাখার জন্য গাঁজানো রসুন-মধু বিশেষ ভূমিকা রাখে। আমাদের শরীরে রক্তপ্রবাহ ও শরীরে পিএইচের মাত্রা স্থিতিশীল রেখে ইমিউন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে, যা আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের দুর্গ তৈরি করতে সহায়তা করে।

অন্যান্য স্বাস্থ্যসুবিধার মধ্যে রয়েছে

• ওজন হ্রাস-বৃদ্ধি করতে পারে।
• মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে।
• ইরেকটাইল ডিসফাংশনের প্রাকৃতিক নিরাময় হিসেবেও কাজ করে।
• মুড ভালো রাখে।
• শরীরে কফ জমতে পারে না, যা শিশুদের খুবই প্রয়োজন।
• রক্তে চিনির প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে মাথা ঠান্ডা রাখে।
• স্মরণশক্তি হ্রাসের প্রবণতা কমায়।
• এনার্জি লেবেল বজায় রাখে।

আরেকটা দিক দেখে নেওয়া ভালো

সাধারণত, ভেষজ প্রতিকার হিসেবে মধুতে রসুন অল্প পরিমাণে থাকে। এই মিশ্রণ ক্ষতিকারক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে না। আপনার নিশ্বাসে দুর্গন্ধ বা সম্ভবত শরীরের গন্ধ থাকতে পারে। অতিরিক্ত পরিমাণে, কাঁচা রসুন অম্বল বা অস্থির পেটের কারণ হতে পারে। রসুন ও মধু উভয়ই নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। পরাগজনিত অ্যালার্জি যাদের আছে, তাদের মধু খাওয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। মধুতে প্রাকৃতিক চিনি থাকে; তাই ডায়াবেটিসের রোগীদের পরিমিত খাওয়া উচিত।

এই গাঁজানো রসুন-মধুর উপকার পেতে হলে খাঁটি মধুর বিকল্প নেই। আর দেশি এক কোয়া রসুন আদর্শ।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

গাঁজানো রসুন-মধু সংগ্রহ করতে এখানে ক্লিক করুন

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

স্বাস্থ্যকর নয় ঠান্ডা পানি

স্বাস্থ্যকর নয় ঠান্ডা পানি

এই গরমে ঠান্ডা পানি যেন সুহৃদ। বাইরে থেকে ফিরে ঘর্মাক্ত অবস্থায় ফ্রিজ থেকে বের করে ঢক ঢক করে পান করে ফেলি ঠান্ডা পানি। অথচ এর কুফল সম্পর্কে আমরা অবহিত থাকি না।

ব্যথা উপশমে আকুপ্রেশার

ব্যথা উপশমে আকুপ্রেশার

ব্যথা কমানোর বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি আকুপ্রশার। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করা যেতে পারে দিনে ও রাতে। তাতে সমস্যা সমাধান হবে। উপশম হবে ব্যথার।

আমাদের সমাজে এখন প্রধান ব্যাধি শরীরজুড়ে ব্যথা; কারও কোমরব্যথা, কারও হাঁটুব্যথা কিংবা ঘাড়, গোড়ালি, পিঠ, পেশির ব্যথা। তার সঙ্গে কমন একটি ব্যথা হচ্ছে মাথাব্যথা। ব্যথা কমানোর জন্য ভূরি ভূরি ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া আর নানা ধরনের প্রলেপ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা নানা নামের মলম। যতক্ষণ ওষুধের কার্যক্ষমতা আছে, ততক্ষণ ভালো। কিন্তু সেটা কমে গেলে ব্যথা আবার ফিরে আসে। মানুষ অধৈর্য হয়ে পড়ে আর ব্যথা বাড়তে থাকে। নানা ধরনের ব্যায়াম করার চেষ্টায়ও কমতি থাকে না। কিন্তু ব্যথা থেকেই যায়।

ব্যথার জন্য প্রচলিত চিকিৎসা ছাড়াও বিকল্প চিকিৎসা আকুপ্রেশার দিয়ে ব্যথা কমানো যায়। এর ভালো দিক হচ্ছে নিজে নিজেই ব্যথা কমানোর আকুপ্রেশার করা যায়। শুধু হাত দিয়ে নিজেই আকুপ্রেশার করে অনেক জটিল সমস্যা সমাধান করা সম্ভব!

কোমর ব্যথার নানা কারণ

আমরা সাধারণত দেখে থাকি মেরুদণ্ডের মাংসপেশি, লিগামেন্ট মচকানো বা আংশিক ছিঁড়ে যাওয়া, মেরুদণ্ডের মধ্যবর্তী ডিস্ক সমস্যা, ডিস্কের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে কোমরব্যথা হয়ে থাকে। চলাফেরা, খুব বেশি ভারী ওজন তোলা, মেরুদণ্ডের অতিরিক্ত নড়াচড়া, একটানা বসে বা দাঁড়িয়ে কোনো কাজ করা, কম্পিউটার ও মোবাইল অধিক হারে ব্যবহার, মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া, সর্বোপরি কোমরের অবস্থানগত ভুলের জন্য এ ব্যথা দেখা যায়।

অন্যান্য কারণের মধ্যে আছে বয়সজনিত মেরুদণ্ডের ক্ষয় বা বৃদ্ধি, অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা গেঁটে বাত, অস্টিওপোরেসিস, এনকাইলজিং স্পন্ডেইলাইটিস, মেরুদণ্ডের স্নায়বিক সমস্যা, টিউমার, ক্যানসার, বোন টিবি, কোমরের মাংসে সমস্যা, বিভিন্ন ভিসেরার রোগ বা ইনফেকশন, বিভিন্ন স্ত্রীরোগজনিত সমস্যা, মেরুদণ্ডের রক্তবাহী নালির সমস্যা, অপুষ্টিজনিত সমস্যা, অতিরিক্ত ওজন প্রভৃতি।

কোমরব্যথার লক্ষণ

কোমরের ব্যথা আস্তে আস্তে বাড়তে পারে বা হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে। নড়াচড়া বা কাজকর্মে ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে। ব্যথা কোমরে থাকতে পারে বা কোমর থেকে পায়ের দিকে নামতে পারে অথবা পা থেকে কোমর পর্যন্ত উঠতে পারে। অনেক সময় কোমর থেকে ব্যথা মেরুদণ্ডের পেছন দিক দিয়ে মাথা পর্যন্ত উঠতে পারে। রোগী অনেকক্ষণ বসতে বা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ব্যথার সঙ্গে পায়ে শিন-শিন বা ঝিন-ঝিন জাতীয় ব্যথা নামতে বা উঠতে পারে, হাঁটতে গেলে পা খিঁচ ধরে আসে বা কোমর আটকে (লক) যেতে পারে, ব্যথা দুই পায়ে বা যেকোনো এক পায়ে নামতে পারে। অনেক সময় বিছানায় শুয়ে থাকলে ব্যথা কিছুটা কমে আসে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে রোগীর কোমর ও পায়ের মাংসপেশির ক্ষমতা কমে আসে এবং শুকিয়ে যেতে পারে, সর্বোপরি রোগী চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
মুক্তি দিতে পারে আকুপ্রেশার।

আকুপ্রেশার হচ্ছে শরীরের অভ্যন্তরে প্রবহমান জৈব বিদ্যুৎ দ্বারা চালিত একটি চিকিৎসাপদ্ধতি; রোগী নিজেই নিজের চিকিৎসা করতে পারবেন শুধু নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে চাপ দিলেই ঠিক নির্দিষ্ট স্থানের ব্যথা কমে আসে। এখনো এটা নিয়ে বিস্তর ট্রায়াল হয়নি, তবে নানা উপায়ে স্বীকার করা হচ্ছে, আকুপ্রেশার কার্যকর একটি চিকিৎসাপদ্ধতি বিশেষ করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত পেইন ম্যানেজমেন্ট থেরাপি। উন্নত বিশ্বে এখন বিভিন্ন থেরাপি সেন্টারে আকুপ্রেশার স্থান করে নিয়েছে।

কীভাবে আকুপ্রেশার শুরু করব?

আপনার শরীরে যে ব্যথাই থাকুক, দুহাতের তালুতে দুই মিনিট ঘষতে হবে যাতে করে হাতের তালু দুটো গরম হয়ে যায়, তারপর গরম হাত দুটো এক হাত অন্য হাতে চাপ দিতে হবে, এতে সময় নেবেন তিন মিনিট। এবার কোমরের ব্যথার জন্য তর্জনী বা ইনডেক্স ফিঙ্গারের উপরিভাগে কবজি থেকে আঙুলের নখ পর্যন্ত আস্তে আস্তে করে চাপ দিতে হবে, বিশেষ করে থাম্ব বা বুড়ো আঙুল আর তর্জনী যেখানটা মিলেছে সেটায় চাপ দিলে ব্যথা অনুভব হবে, যেখানে ব্যথা হবে সেখানে নিয়মিত ১০০ বার চাপ দিতে হবে। একটি চাপের সঙ্গে আরেকটি চাপের মধ্যে দুই সেকেন্ড বিরতি দিয়ে চাপ দিতে হবে। ঠিক ছবিতে দেওয়া চিহ্নে চাপ দিতে হবে। দুই হাতে একই নিয়মে আকুপ্রেশার করতে হবে, সারা দিনে দুবার খালি পেটে নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে কোমরের ব্যথা থেকে মুক্তি পাবেন।

যাদের হাঁটুতে ব্যথা আছে তারা কোমরের পয়েন্ট ছাড়াও কড়ে আঙুলের নখের সাইড থেকে কবজির হাড় পর্যন্ত পাশ দিয়ে বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে চাপ দিলে ব্যথা পাওয়া যাবে, যা হাঁটুর পয়েন্ট হিসেবে ধরা হয়, বিশেষ করে কবজির উপরিভাগে এবং ঠিক কড়ে আঙুলের শুরু হয়েছে, এমন স্থানে চাপ দিলে কাঁধে ব্যথা আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। ঠিক এই সাইডে ওপর থেকে নিচে প্রতিটি স্থানে চাপ দিয়ে নামতে হবে, এভাবে ১০০ বার করে দুই হাতে চাপ দিলে হাঁটু, হাতের কনুই ও কাঁধের ব্যথা কমে আসবে। এটাও দুই হাতে সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে শোয়ার আগে নিয়মিত আকুপ্রেশার করতে হবে।

আকুপ্রেশার করার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো মনে রাখতে হয়

যেহেতু আক্রান্ত হাতও আপনার, মুক্তির হাতও আপনার, তাই বলে সারা দিন হাত চাপা যাবে না। নিয়মিত ডোজের মতো করে সকালে খালি পেটে এবং রাতে শোয়ার আগে উত্তম সময়। অফিসে যাওয়া এবং আসার সময় গাড়িতে বসে আকুপ্রেশার করতে পারবেন। দিনে দুবেলার বেশি নয় এবং সপ্তাহে ছয় দিন আকুপ্রেশার করুন এক দিন বিরতি দিন, তাতে উপকার বেশি পাবেন। নিয়মিত আকুপ্রেশার করলে হাত ঝিনঝিন করা, অবশ হয়ে যাওয়া ও স্নায়ুজনিত সমস্যায় অনেক উপকারে আসে।
প্রাকৃতিক নিয়মে ব্যথা কমানোর জন্য আদাজল উত্তম পথ্য
প্রতিদিন দুবেলা খাওয়ার আধঘণ্টা পরে এক কাপ পানিতে এক টেবিল চামচ আদার রস দিয়ে জ্বাল দিতে হবে, সেই আদাজল চায়ের মতো করে খেলে ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, সেই সঙ্গে হজমের সমস্যারও উপকার হয়।
এই আধুনিক যুগেও কোমরব্যথা একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাস্থ্য সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।

লেখক: আলমগীর আলম
খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ।

নানা রোগ প্রতিরোধের নিদান

নানা রোগ প্রতিরোধের নিদান

গোল্ডেন মিল্ক। এটি আসলে প্রাণিজ বা উদ্ভিজ্জ দুধের সঙ্গে কয়েকটি উপাদান মিশিয়ে তৈরি করা হয়। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসায় এর ব্যবহার রয়েছে। হালে পশ্চিমা বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থায় নানা রোগ প্রতিরোধের নিদান হিসেবে গোল্ডেন মিল্ক পানে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

ভয় তাড়াবে এলাচি

ভয় তাড়াবে এলাচি

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

এলাচ বা এলাচি (ইলেট্টারিয়া কার্ডামম)। এর অন্যান্য নাম হচ্ছে কার্ডামম, মালাবার কার্ডামম, সিলন কার্ডামম। মসলা হিসেবে বহুল ব্যবহৃত। এটি একটি সুগন্ধি গাছ। এলাচি সুগন্ধিযুক্ত একটি মসলা। এলাচিকে বলা হয় মসলার রানি। খাবারে অতিরিক্ত স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয় এটি। এলাচিতে রয়েছে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, পলিস্যাচুরেটেড ফ্যাট, মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটসহ কিছু ঔষধি গুণ, যা সেবনে মানবদেহের অনেক সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম এ ছোট মসলা। এলাচির মধ্যে কালো এলাচি বেশি কার্যকর। আমাদের দেশে যে এলাচি পাওয়া যায়, তাতেও কাজ হবে। এখানে দেওয়া হলো এলাচির উপকারিতা।

অস্থিরতা বা পালপিটিশন কমাতে

ছবি: উইকিপিডিয়া

অনেকের অস্থিরতার সমস্যা রয়েছে—কোনো কারণে কিংবা অকারণে নানান বিষয়ে অস্থির হয়ে পড়েন। কোথাও যাচ্ছেন, রাস্তায় হঠাৎ জ্যাম, তখনই অস্থিরতা বেড়ে গেল। আবার কোনো পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হলে তার নাম মনে করতে পারছেন না—সেই থেকে শুরু হয়ে গেল অস্থিরতা। এ অস্থিরতা থেকে ঘাম হয় আর বুকের মধ্যে একধরনের অচেনা অনুভূতি কাজ করতে থাকে। বুক ধড়ফড় করতে থাকে।

এমন সমস্যার জন্য এলাচি খুব কার্যকর। নিয়মিত প্রতিদিন দুবেলা দুটি করে এলাচি মুখে রেখে আস্তে আস্তে চিবিয়ে খেলে এর উপকারিতা পাওয়া যাবে; অথবা দুটি এলাচি গরম পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি চায়ের মতো করে খেলেও উপকার পাওয়া যায়।

হার্ট ও হার্টের ভালভ সুস্থ রাখে

যাঁরা হার্টের ও হার্টের ভালভের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য এলাচি একটি আদর্শ পথ্য। প্রতিবার খাওয়ার পর একটি এলাচি চিবিয়ে খেলে হার্ট সুস্থ থাকবে। অথবা দুটি এলাচি গরম পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি চায়ের মতো করে খেলেও উপকার পাওয়া যাবে।

ছবি: উইকিপিডিয়া
ছবি: উইকিপিডিয়া

ভয়জনিত সমস্যা

যাঁদের হার্টের সমস্যা নেই কিন্তু ভয়জনিত সমস্যা আছে, নানাভাবে ভীতি কাজ করে; ভিড়ের মধ্যে সমস্যা, অন্ধকারে সমস্যা, উচ্চ শব্দে সমস্যা, উত্তেজনা সহ্য হয় না; তাঁদের জন্য নিয়মিত প্রতিদিন দুবেলা দুটি করে এলাচি মুখে রেখে আস্তে আস্তে চিবিয়ে খেলে এর উপকারিতা পাওয়া যাবে।

মাড়ির রক্তপাত ও দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে

আপনি কি মুখের দুর্গন্ধ, মাড়ি দিয়ে রক্তপাত অথবা দাঁতের ক্ষয় হওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যায় ভুগছেন? তাহলে খাওয়ার পর একটি এলাচি মুখে নিয়ে চিবাতে পারেন। কেননা এলাচির তেল মুখের সমস্যা দূর করতে কার্যকর একটি ওষুধ। প্রতিদিন দুবেলা দুটি করে এলাচি মুখে রেখে আস্তে আস্তে চিবিয়ে খেলে এর উপকারিতা পাওয়া যাবে।

ছবি: উইকিপিডিয়া

এলাচি চা

পেটের অস্থিরতা ও হজমে সহায়ক

আমরা প্রতিদিন হরেক ধরনের খাবার গ্রহণ করে থাকি; প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনে নানান খাবার একসঙ্গে খেলে এবং অতিভোজনে পেটে অস্থিরতা তৈরি হয়, পেটে গ্যাস জমে, অজীর্ণ হয়; এমন অবস্থায় একটি এলাচি মুখে দিয়ে চিবিয়ে খেলে পেট ফাঁপার সমস্যা আস্তে আস্তে প্রশমিত হতে থাকবে। পেটের সমস্যা তৈরি হলে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়, যাতে পরে কঠিন সমস্যা দেখা দেয়, সে জন্য দুটি এলাচি এক কাপ পানিতে গরম করে চায়ের মতো করে পান করলে এ জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

প্রস্রাবের সমস্যা সমাধানে

বয়স বাড়ার সঙ্গে যেসব সমস্যা বেড়ে যায়, তার মধ্যে একটি হলো প্রস্রাবের গন্ডগোল। বিশেষ করে যাঁদের প্রস্রাব হতে চায় না, তাঁদের জন্য দুটি এলাচি এক কাপ পানিতে গরম করে চায়ের মতো করে পান করলে এ জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।

ছবি: উইকিপিডিয়া

ক্যানসার প্রতিরোধে

এলাচি ক্যানসার প্রতিরোধে বিশাল ভূমিকা রাখতে সক্ষম, যা শুধু প্রতিরোধেই কাজ করে না, প্রাথমিক স্তরে ক্যানসার নির্মূলেও কাজ করে। এ জন্য ক্যানসার প্রতিরোধে নিয়মিত প্রতিদিন দুবেলা দুটি করে এলাচি মুখে রেখে আস্তে আস্তে চিবিয়ে খেলে এর উপকারিতা পাওয়া যাবে।

শ্বাস–প্রশ্বাসজনিত সমস্যা

শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা, হুপিং কাশি, ফুসফুসে সংক্রমণ ও হাঁপানির সমস্যায় যাঁরা ভুগে থাকেন, তাঁদের জন্য এলাচি খুবই উপকারী। নিয়মিত প্রতিদিন দুবেলা দুটি করে এলাচি মুখে রেখে আস্তে আস্তে চিবিয়ে খেলে এর উপকারিতা পাওয়া যাবে; অথবা দুটি এলাচি গরম পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি চায়ের মতো করে খেলেও উপকার পাওয়া যাবে।

ছবি: উইকিপিডিয়া

বিভিন্ন কারণে মাথাব্যথা

মাথাব্যথার অনেক কারণ থাকে। সে জন্য স্থায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন। মাথাব্যথা থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি পেতে চাইলে একটি এলাচি চিবিয়ে খেলে কিছুক্ষণের জন্য মাথা ব্যথা সারবে। সেই সঙ্গে এলাচি তেলের ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যায়।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়

উচ্চ কিংবা নিম্ন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ—উভয়ই রক্ত সঞ্চালনব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালনব্যবস্থা যদি ঠিক করা যায়, তাহলে উচ্চ এবং নিম্ন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এসে যায়। এ জন্য কোনো ধরনের ওষুধের প্রয়োজন পড়ে না। কেবল নিয়মিত প্রতিদিন দুবেলা দুটি করে এলাচি মুখে রেখে আস্তে আস্তে চিবিয়ে খেলে এর উপকারিতা পাওয়া যাবে অথবা দুটি এলাচি গরম পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি চায়ের মতো করে খেলেও উপকার পাওয়া যায়।

ছবি: ইভা এলিয়াস, পেকজেলসডটকম

শরীরকে বিষমুক্ত রাখতে

এলাচিতে প্রচুর ম্যাঙ্গানিজ আছে, যা শরীরে ক্ষতিকর উপাদানগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার এনজাইম তৈরি করে শরীরকে বিষমুক্ত রাখে। খাবারের পাশাপাশি চায়ের সঙ্গেও এলাচি খেতে পারেন, যা শরীরকে বিশেষ সুবিধা দেয়।

এ মসলা আপনার জীবনকে সহজ করে দিতে পারে। আমাদের প্রাকৃতিক উপাদানগুলো এমনই, যার রাসায়নিক পদার্থ অনেক জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে। বিশেষ করে এ সময়ে যাঁদের মধ্যে প্যানিক কাজ করছে, তাঁদের জন্য এলাচি হতে পারে একটি পথ্য।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

বিলম্বের ঘুমে জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়

বিলম্বের ঘুমে জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

যুক্তরাজ্যের একদল গবেষক চার লাখ মানুষের ওপর গবেষণা করে দেখেছেন, যারা রাতে দেরি করে ঘুমাতে যান, সকালে ঘুম থেকে দেরি করে ওঠেন, তারা কোনো না কোনোভাবে নানান মানসিক রোগে আক্রান্ত। এমন তথ্য নিয়ে যুক্তরাজ্যে বেশ সাড়া পড়েছে, বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে—যারা এ কাজটি প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, পড়াশোনার কারণে হোক বা কাজের কারণে কিংবা নিছক আড্ডার কারণেই যারা বেশি রাতে ঘুমাতে যান, তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৩৩ হাজার যুক্তরাজ্যবাসীর ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়।

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী যারা বেশি রাতে ঘুমান এবং সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন, তাদের মধ্যে যে সমস্যাগুলো দেখা যায়, সেগুলো হলো—

  • অকালমৃত্যুর ঝুঁকি
  • গড় আয়ু কমে যাওয়া: ৬.৫ বছর কম গড় আয়ু
  • বিভিন্ন মানসিক রোগ: ৯০ ভাগের
  • ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা: ৩০ ভাগ মানুষের
  • হজমশক্তিতে ব্যাঘাত
  • নার্ভাস সিস্টেমে জটিলতাঅন্ত্রের জটিলতা

যুক্তরাজ্যের এই গবেষণা রিপোর্টের ফলে সে দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এখন চাকরি নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে, রাতে কয়টায় ঘুমাতে যান এবং সকালে কয়টায় ঘুম থেকে ওঠেন?

আমাদের দেহ ঘড়ি সূর্যের সময়ের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত। ছবি: জোহানেস প্লেনিও, পেকজেলস ডট কম

যুক্তরাজ্যের এই অবস্থা আমাদের সমাজে এখন ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। এখন গ্রামগঞ্জেও মধ্যরাতে চা পাওয়া যায়, অর্থাৎ চা খাওয়ার লোক থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। আর শহুরে মানুষের জীবনব্যবস্থা আরও বেশি রাত জাগানির্ভর। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ মানুষ অফিস বা কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরেন ৯টা থেকে ১০ টায়, নিম্ন আয়ের মানুষ আরও দেরিতে ফেরেন ঘরে। রাতে খাবারের রেস্টুরেন্ট বেশি ব্যস্ত থাকে। বিরিয়ানি খাওয়া নতুন প্রজন্ম রাত গভীর হলেই খেতে যায়। ঢাকা শহরে এখন অনেক রেস্টুরেন্ট পাড়ার মতো কিছু এলাকা গড়ে উঠেছে, সেখানে রাত ২টা–৩টা পর্যন্ত খাবার পাওয়া যায় এবং রীতিমতো ভিড় থাকে।

নতুন প্রজন্ম আরেকটি রোগে আক্রান্ত, তা হচ্ছে মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটারে বেশি রাত কাটানোর অভ্যাস। এটি যে কী পরিমাণে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা হয়তো আমরা এখন বুঝতে পারছি না। কিন্তু সময়ে যখন বুঝব, হয়তো তখন আর কিছুই করার থাকবে না। একটি ভঙ্গুর সমাজ, মানসিক রোগীভরা একটি সমাজ বিশাল সংখ্যায় রাষ্ট্রের কল্যাণ করা থেকে বঞ্চিত হয়ে উঠবে।

আমাদের দেহে একটি ঘড়ি আছে, যা সূর্যের সময়ের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত। সেই ঘড়ির সময় অনুসারে রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত হজম করার চুল্লি সচল থাকে, তারপর আস্তে আস্তে নিভে যায়। গভীর রাতে খাবার খেলে সে খাবার শরীরের স্বয়ংক্রিয় হজম চুল্লি বন্ধ থাকার কারণে ঠিকমতো হজম না হয়ে পাকস্থলীতে পচতে থাকে। ফলাফল হলো স্বাস্থ্যহীনতা, ভুঁড়ি বেড়ে যাওয়া, হজমের গন্ডগোল থেকে ক্রনিক আইবিএসে রূপ নেওয়া, যার চিকিত্সা অনেক জটিল। লাইফস্টাইল পরিবর্তন ছাড়া এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ বন্ধ থাকে। এতে যারা আক্রান্ত হন, তাদের মানসিক বিপর্যয় ছাড়াও ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে জীবন যাপন করতে হয়।

রাতে আমাদের শরীর কোনো কিছু গ্রহণ করার কাজ করে না বরং ত্যাগ করার কাজ করে, যেমন রাত ১১টা থেকে লিভার তার কাছে জমে থাকা বর্জ্য বা টক্সিন অটো ডিটক্সিফিকেশন করতে থাকে। রাত এগারোটায় যদি আমরা ঘুমের মধ্যে না থাকি, তাহলে লিভার অটো ডিটক্সিফিকেশন করতে পারে না। এর ফলাফল হজমের গন্ডগোল এবং ত্বকের রং কালো হয়ে যাওয়া। তেমনি রাতে হার্ট, ফুসফুস, গলব্লাডার, পাকস্থলী, কিডনি অটো ডিটক্সিফিকেশন করতে থাকে। যদি আমরা রাতে না ঘুমাই, তখন শরীর অটো ডিটক্সিফিকেশন করতে পারে না। পরিণতিতে শরীরের টক্সিন না বেরিয়ে শরীরে থেকে যায়, যা আমাদের স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ব্যাহত করে। এতে শেষ পর্যন্ত শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগের উপসর্গ তৈরি হয়, যার ফলে মৃত্যু হওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।

এ থেকে মুক্তি পেতে কী করবেন

সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে, সকালে ঘুম থেকে উঠে মুক্ত বাতাসে হাঁটলে নির্মল বায়ু পাওয়া যায়, যা সকালে ওজন স্তরে থাকে বলে হালকা থাকে। সে বায়ু থেকে শ্বাস নিলে শরীরে অক্সিজেন প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, শরীরের ভেতরে অক্সিজেন নিজেই অনেক বিচ্যুতি দূর করে দেয়। ভোরের আলো ভিটামিন ডি ভরা। সকালের সে সূর্যকিরণ শরীরে হাড় মজবুত করে, শরীরে কোনো ধরনের ব্যথা হয় না। সকালে হাঁটতে পারলে শরীরের সব অর্গান সচল হয়। কায়িক পরিশ্রম শরীরে কোনো ধরনের চর্বি জমতে দেয় না; ফলে ওজন বাড়ে না, ডায়াবেটিস হয় না, হার্টের সমস্যা হয় না, মস্তিষ্ক শক্তিশালী থাকে—কঠোর পরিশ্রমেও তা ঠিকমতো কাজ করে এবং স্মরণশক্তি অটুট থাকে। এ ছাড়া দিনে কর্মঘণ্টা বেড়ে যায় এবং রাতে ঘুম তাড়াতাড়ি ঘুমানো সম্ভব হয়।

ভোরের আলোয় ভিটামিন ডি থাকে। ছবি: জিল ওয়েলিংটন, পেকজেলস ডট কম

দেহঘড়ি ঠিক রাখুন

আমাদের দেহঘড়িকে সঠিক উপায়ে চলতে দেওয়ার জন্য সূর্যের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। রাত যেহেতু ঘুমানোর জন্য, তাই ঘুমাতে হবে রাতে, দিন জেগে থাকার জন্য; তাই জেগে থাকতে হবে, কর্মময় থাকতে হবে। এটিই সাধারণ সূত্র।

রাত জাগার অভ্যাস পরিবর্তন করে সকালে ঘুম থেকে উঠে কর্মময় হওয়ার অভ্যাস গড়লে শরীরও ভালো থাকবে এবং অনেক কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে। তাই রাতকে ঘুমানোর জন্য রেখে সকালে কর্মময় থাকুন।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শরীর সুস্থ রাখার চাবিকাঠি

শরীর সুস্থ রাখার চাবিকাঠি

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়ুন

অ্যাসিড উৎপাদনকারী খাদ্য অ্যাসিড–বৃষ্টির মতো হজমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং দিনের পর দিন অ্যাসিড খাবারের প্রভাব চলতে থাকলে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে গিয়ে প্রথমে পেটের পীড়া দেখা দেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে নানা রকমের ডিজেনারেটিভ রোগ, যেমন গ্যাস্ট্রিক, আলসার, হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগের জায়গা তৈরি করে।

আমাদের শরীরে একটি রাসায়নিক মান ঠিক করে চলার বিষয় আছে, যাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় পিএইচ (পটেনশিয়াল অব হাইড্রোজেন) বলে। মাটি ও পানির যেমন নির্দিষ্ট পিএইচ ব্যালান্স আছে, মানুষের দেহেরও এমন ব্যালান্স থাকে, যা আমরা প্রোফাইল চেক করলে পেয়ে থাকি। এই পিএইচ ঠিক থাকলে আমরা সুস্থ, না থাকলে অসুস্থ। অনেক সময় ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রে লেখা থাকে ‘বডি কন্ডিশন’ অ্যাসিডিক কিংবা অ্যালকালাইন। আমাদের শরীরের এ অবস্থা জানান দেয়, আমাদের পিএইচ কোন অবস্থায় আছে। অ্যাসিডিক হলে আপনি অসুস্থতার জায়গায় অবস্থান করছেন, অ্যালকালাইন হলে আপনি ভালো কন্ডিশনে আছেন।

মাঝে মাঝে প্রকৃতিতে অ্যাসিড–বৃষ্টি হয়। অ্যাসিড–বৃষ্টি হলে গাছের পাতা এবং বোঁটা শুকিয়ে পাতার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। এই অ্যাসিডের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে গাছের শিকড় মাটি থেকে প্রয়োজনীয় অ্যালকালাইন চরিত্রের পুষ্টি (ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম) শুষে নিয়ে পাতাকে জোগান দেয়। তারপর ধীরে ধীরে পাতা আবার নতুন জীবন ফিরে পায়।

ঠিক তেমনি অ্যাসিড উৎপাদনকারী খাদ্য অ্যাসিড–বৃষ্টির মতো হজমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং দিনের পর দিন অ্যাসিড খাবারের প্রভাব চলতে থাকলে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে গিয়ে প্রথমে পেটের পীড়া দেখা দেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে নানা রকমের ডিজেনারেটিভ রোগ, যেমন গ্যাস্ট্রিক, আলসার, হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগের জায়গা তৈরি করে। অথচ এটা এখন প্রমাণিত যে অ্যালকালাইন খাবার বেশি খেয়ে শরীরকে অ্যালকালাইন করতে পারলে রোগ থাকে না।

সুস্বাস্থ্যের জন্য আদর্শ রক্তের পিএইচ স্তরগুলো সামান্য অ্যালকালাইন যুক্ত (৭.৩৬৫ থেকে ৭.৪৫–এর মধ্যে) হওয়া দরকার। পিএইচ হলো হাইড্রোজেন আয়ন ঘনত্বের একটি পরিমাপ। পিএইচ স্কেল ০-১৪ পর্যন্ত হিসাব করা হয়। নিরপেক্ষ পিএইচ ৭.০। পিএইচ উচ্চতর (৭–এর বেশি) বেশি অ্যালকালাইন বা বেসিক, তবে ৭–এর চেয়ে কম পিএইচ অ্যাসিডিক। তাই লিপিডে দেখা যায়, অসুস্থ মানুষের মধ্যে খুব কমই ৭ মাত্রা পিএইচ পাওয়া যায়।

পি.এইচ এর বিশ্বজনীন সূচক কাগজ তারতম্যের রঙ দেখাচ্ছে ছবি: উইকিপিডিয়া

মানুষ যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশু অ্যালকালাইন থাকে। শিশু ধীরে ধীরে যখন খাদ্য গ্রহণে বৈচিত্র্য আনতে থাকে, রান্নাজাতীয় খাবার বেশি খেতে থাকে, তখনই অ্যালকালাইন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুটিও অ্যাসিডিক হয়ে ওঠে।

আপনার রক্তের পিএইচ ভারসাম্য বজায় রাখা নিশ্চিত করার জন্য শরীর জটিল প্রক্রিয়া অতিক্রম করে। আপনার দেহের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোকে সমর্থন করার জন্য কেবল একটি ভারসাম্যযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করতে হবে!

অ্যালকালাইন এবং অ্যাসিডিক খাবারের চার্ট

বেশির ভাগ শাকসবজি, বেশির ভাগ ফল, ছোলা, মুগ ও মসুর ডাল—এ খাবারগুলো অ্যালকালাইন খাবার হিসেবে বিবেচিতছবি: আবেট ল্লেসার, পেকজেলস ডট কম

অ্যালকালাইন খাবার ও পানীয়

বেশির ভাগ শাকসবজি, বেশির ভাগ ফল, ছোলা, মুগ ও মসুর ডাল—এ খাবারগুলো অ্যালকালাইন বা লো-অ্যাসিডযুক্ত খাবার হিসেবে বিবেচিত। এগুলোকে আপনি আপনার ডায়েটের জন্য বিবেচনা করতে পারেন। সয়া (তবে আমরা যে সয়াবিন তেল নামে যা খাই, তার পিএইচ ঠিক নেই), অলিভ অয়েলসহ ছোট একটি তালিকা দেখে নিন।

উচ্চ অ্যালকালাইন খাবার

লেবু (যা অ্যাসিডিক হলেও শেষ পরিণতিতে এটা অ্যালকালাইনে পরিণত হয়ে দেহের ভারসাম্য রক্ষা করতে বেশ কার্যকর), কুল, তরমুজ, পাকা আম, পাকা পেঁপে, আনারস, আঙুর, ক্যাপসিকাম, কিশমিশ, খেজুর।

মাঝারি অ্যালকালাইন খাবার

বেশির ভাগ শাক (যা প্রাকৃতিক উপায়ে বেড়ে ওঠে), শজনে ডাঁটা, কাঁচা পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম, বেগুনসহ বেশির ভাগ সবজি। ফলের মধ্যে কলা, কমলা, কাঁঠাল, বেদানা, নাশপাতি, পেয়ারা ও বেল।

ডাবের পানি কম অ্যালকালাইন খাবারছবি: এনি লেন, পেকজেলস ডট কম

কম অ্যালকালাইন খাবার

ডাবের পানি, শসা, ঢ্যাঁড়স, পেঁয়াজ, মুলা, টমেটো, সেদ্ধ ডিম, পানিফল, সয়া দুধ, মাশরুম।

উচ্চ অ্যাসিডিক খাবার

সব ধরনের ফাস্ট ফুড উচ্চ অ্যাসিডিক খাবার ছবি: ইঞ্জিন আকিয়ার্ট, পেকজেলস ডট কম

অ্যাসিডিক খাবার ও পানীয় বিশেষত অ্যাসিডযুক্ত বা ৪ বা ৭ এর নিচে কম পিএইচসহ কিছু খাবারের মধ্যে রয়েছে সব ধরনের কার্বনেটেড পানীয় বা কোমল পানীয়, সোডা ওয়াটার, শক্তি পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস, কিছু দুগ্ধজাতীয় পণ্য, চিনি, অ্যালকোহল, মাংস ও সব ধরনের ফাস্ট ফুড। সব ধরনের মিষ্টি বা মিষ্টান্ন, সাদা ময়দার তৈরি সব খাবার, সাদা চালের তৈরি সব খাবার, সব ধরনের পোলট্রি মাংস, চাষের মাছ।

মাঝারি অ্যাসিডিক খাবার

চিনাবাদাম, কাজুবাদাম, মাখন, ঘি, পনির, কর্নফ্লেক্স, মুড়ি, সুজি, খই ও যব।

বেশির ভাগ গরমমসলা কম অ্যাসিডিক খাবারছবি: উইকিপিডিয়া

কম অ্যাসিডিক খাবার

নারকেল, বার্লি, মধু, বেশির ভাগ গরমমসলা, আমন্ড বাদাম।

অ্যালকালাইন খাবার আমাদের দেহে রক্তের পিএইচ যা হওয়া দরকার, ঠিক সেখানে রাখার জন্য দুর্দান্ত কাজ করে। অ্যালকালাইন যুক্ত খাবার, যেমন শাক, ফল এবং কাঁচা সবজি পাওয়ার হাউস হিসেবে এ উদ্ভিজ্জ খাবারগুলো আমাদের দেহকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ এবং ফাইটোকেমিক্যাল সরবরাহ করে।

স্বাভাবিক পিএইচ মাত্রা রাখার জন্য প্রতিদিন ৭০ শতাংশ অ্যালকালাইন এবং ৩০ শতাংশ অ্যাসিডিক খাবার গ্রহণ করলে শরীর সঠিক মাপে চলে আসবে, শরীর ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে। আমাদের শরীরে ক্রনিক সমস্যা থাকলেও ভালো হতে থাকবে।

অ্যাসিডিক খাবার রক্তের পিএইচের মাত্রা কমিয়ে দিয়ে রক্তের গতি মন্থর ও দূষিত করে ফেলে, যা অ্যাসিডিক কন্ডিশন। এই অবস্থা শরীরে রোগ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে, যার শুরু হয় পেট থেকে অর্থাৎ হজমের সমস্যা দিয়ে।

স্বাভাবিক পিএইচ মাত্রা রাখার জন্য প্রতিদিন ৭০ শতাংশ অ্যালকালাইন এবং ৩০ শতাংশ অ্যাসিডিক খাবার গ্রহণ করলে শরীর সঠিক মাপে চলে আসবে, শরীর ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে। আমাদের শরীরে ক্রনিক সমস্যা থাকলেও ভালো হতে থাকবে। যদিও আমরা উল্টো পথেই চলছি, তাই শরীর ঠিক রাখার জন্য অ্যাসিড অ্যালকালাইনের দিকে খেয়াল রেখে প্রাকৃতিক নিয়মে সুস্থ থাকা সম্ভব। আমরা যদি অ্যাসিডিক খাবারগুলো কমিয়ে দিয়ে অ্যালকালাইন খাবারগুলো গ্রহণ করতে থাকি, তাহলে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা হবে, যা সুস্থ থাকার চাবিকাঠি। দেহের এই ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে খাবার দিয়ে। কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট দিয়ে সেটি করা সম্ভব নয়।

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়ুন

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

বিশুদ্ধ ও পরিমিত পানি পান একধরনের চিকিৎসা

বিশুদ্ধ ও পরিমিত পানি পান একধরনের চিকিৎসা

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

জাপানের দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, শুধু বিশুদ্ধ ও পরিমিত পানি পানে অনেক রোগের উপকার পাওয়া যায়। ফলে নিয়ম মেনে পানি পান করার রেওয়াজ জাপানিদের মধ্যে চালু আছে। পরিমিত পানি পান করে যেসব সমস্যায় উপকার পাওয়া যায়, সেগুলো হলো মাথাব্যথা, শরীরে বিরামহীন ব্যথা বা যন্ত্রণা, হার্টের রোগ, বাতের ব্যথা, দ্রুত হৃৎস্পন্দন, অতিরিক্ত ওজন, অ্যাজমা, টিবি, কফ রোগ, মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্ক ঝিল্লির প্রদাহ) কিডনি এবং মূত্রবিষয়ক রোগ, বমি, গ্যাস্ট্রিক, ডায়রিয়া, ডায়াবেটিস, সব ধরনের চোখের রোগ, ক্যানসার, মস্তিষ্কের সমস্যাজনিত সব ধরনের রোগ, কান, নাক ও গলার সব ধরনের সমস্যা।

শরীরের পানি থাকার আদর্শ পরিমাপ

  • আমাদের শরীরে ৭২ ভাগ পানি
  • আমাদের রক্তের ৮৩ ভাগ পানি
  • হাড়ে ২২ ভাগ পানি
  • মস্তিষ্কে ৭৪ ভাগ পানি
  • পেশিতে ৭৫ ভাগ পানি
  • চোখে ৮০ ভাগই পানিঅর্থাৎ আমাদের শরীরের দুই-তৃতীয়াংশই হচ্ছে পানি। শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর সঠিক কর্ম সম্পাদনের জন্যও প্রয়োজন পানি।

পানি শরীরের অভ্যন্তরে যে কাজটি করে

  • পানি রক্ত ও কোষে অক্সিজেন এবং অনান্য পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে।
  • সারা শরীরের রক্ত সরবরাহ ও সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় পানি পানে।
  • পানি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। পানির অভাবে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
  • পানি হজম শক্তি বাড়ায়, হজম প্রক্রিয়া ঠিক রাখে।
  • আমাদের শরীরে ঠিকভাবে খাবার হজম হওয়ার জন্য পরিমিত পানির দরকার। তাই আঁশজাতীয় খাবারের পাশাপাশি, পরিমিত পানিও পান করতে হবে।
মাথাব্যথার অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো পানিশূন্যতা। এ ক্ষেত্রে দুই গ্লাস পানি খেয়ে ২০ মিনিট বিশ্রাম নিন দেখবেন মাথাব্যথা বন্ধ হয়ে গেছে।

পরিমিত পানি পানে যে উপকার হয়

  • পানি কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। ঠিকমতো পান না করলে শরীর সব পানি শুষে নেয়, এতে কোলন শুষ্ক হয়ে যায়, ফলে শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ ঠিকমতো নির্গত হয় না। তাই পানির পরিমাণ ঠিক থাকলে কোলনে কোনো বর্জ্য জমতে পারে না।
  • পানি কিডনির পাথর হওয়া থেকে বাঁচায়। কারণ, এটি ইউরিনের লবণ ও খনিজ ভেঙে দেয়, ফলে কিডনিতে পাথর হয় না।
  • ব্রেনের ৮৫ শতাংশ হচ্ছে পানি। একটু পরপর পানি পান করলে তাই মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকা যায় এবং শারীরিক শক্তি বাড়ে।
  • পানি রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, তাই উচ্চ রক্তচাপ কমে।
  • ত্বকে টক্সিন জমতে দেয় না, স্বাভাবিক রঙের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দেয়।
  • শরীরে বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না, বলিরেখা দূর করে।
  • চুলের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দেয়।

অক্সিজেনের পরই পানি আমাদের জীবনধারণের জন্য দ্বিতীয় উপাদান। অন্যদিকে ২৫ ভাগ অক্সিজেন পানি থেকে আসে। মাথাব্যথার অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো পানিশূন্যতা। এ ক্ষেত্রে দুই গ্লাস পানি খেয়ে ২০ মিনিট বিশ্রাম নিন দেখবেন মাথাব্যথা বন্ধ হয়ে গেছে।

পানি পানের আদর্শ পদ্ধতি

  • রাতে শোয়ার আগে ভালোমতো দাঁত ব্রাশ করতে হবে।
  • ভোরে উঠে দাঁত ব্রাশ করার আগে ৬০০ মিলি (তিন গ্লাস) কুসুম গরম পানি পান করতে হবে এবং এক ঘণ্টা পেট খালি রাখতে হবে। এই তিন গ্লাসের মধ্যে মাঝের গ্লাসে এক টেবিল চামচ লেবুর রস দিয়ে পানি পান করুন।
  • সারা দিনে আরও ৮ গ্লাস পানি পান করুন।
  • সকালে তিন গ্লাস পানি ছাড়া বাকি সারা দিনের পানি এক গ্লাস একসঙ্গে না খেয়ে আস্তে আস্তে করে পান করুন।
  • খাবারের সঙ্গে সঙ্গে পানি পান না করে প্রতিবার খাবার শেষ করে ৩০ মিনিট পর এক গ্লাস পানি পান করতে হবে।
  • শরীর খারাপ লাগলে কিংবা জ্বর জ্বর ভাব হলে কোনো ধরনের খাবার না খেয়ে প্রতি ঘণ্টায় এক গ্লাস হালকা কুসুম গরম পানি পান করুন। ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যেই বুঝতে পারবেন পানি কী উপকার করেছে।

দেহের একটি মাপ আছে পানি পান করার

আমরা প্রতিদিন বিভিন্নভাবে (যেমন প্রস্রাব, ঘাম, শ্বাসপ্রশ্বাস ইত্যাদি) শরীর থেকে পানি হারাই। আমাদের ফুসফুস থেকে নিশ্বাসের সঙ্গে দৈনিক দুই থেকে চার কাপ পানি বের হয়ে যায়। অন্যদিকে দৈনিক ছয়বার বাথরুমে গেলে আরও ছয় কাপ পানি দেহ থেকে কমে যায়। প্রতিদিন কতটুকু পানি পান করতে হবে, তা দেহের উচ্চতা ও কাজের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।

সবার জন্য একই মাপে পানি পান করা যাবে না, যে মাপটি এখন পর্যন্ত আদর্শ মনে করা হয়, তা হলো কেজি হিসেবে দেহের ওজনকে ৩০ দ্বারা ভাগ করলে ভাগফলের পরিমাণ অনুযায়ী পানি পান করতে হবে। অর্থাৎ আপনার ওজন ৭০ কেজি হলে (৭০/৩০ = ২.৩) ২ দশমিক ৩ লিটার পানি পান করতে হবে। এর অর্থ হলো, প্রতিদিন ৮ গ্লাসের (প্রতি গ্লাস ২০০ মিলি) অধিক পানি পান করা বাঞ্ছনীয়।

অতিরিক্ত পানি পানের বিপদ

বেশি পানি খেলে বমি বমি ভাব, ক্লান্তি, ঘুম ঘুম ভাব, অতিরিক্ত প্রস্রাব এবং মাথাব্যথা হতে পারে। হার্টের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে। হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। কিডনির ছাঁকনি প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায় অতিরিক্ত পানি। শরীরের কোষ ফুলতে থাকে। মাথার কোষও ফুলে যেতে পারে। পরিণাম ব্রেন স্ট্রোক। বুকে ব্যথা, লিভারের সমস্যা, পেটে যন্ত্রণা হতে পারে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি শরীরে গেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
কখনোই একসঙ্গে অনেক পানি পান করবেন না। ভারী পরিশ্রম অথবা ব্যায়ামের সময় সবারই একটু একটু পানি পান করা উচিত। যতটুকু তৃষ্ণা ততটুকু পানি, কখনো তার চেয়ে বেশি নয়! বেশি হলেই পানির অপর নাম কেবল জীবন নয়, তা হবে মরণও।

লেখক: খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ।

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

ওষুধমুক্ত জীবনের জন্য গ্লাইসেমিক সূচক জানা জরুরি

ওষুধমুক্ত জীবনের জন্য গ্লাইসেমিক সূচক জানা জরুরি

আধুনিক চিকিৎসায় ডায়াবেটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; মানুষ এখন ডায়াবেটিস নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। অথচ ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা সুগার লেভেলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মানুষের নানা ধরনের রোগের গভীরে প্রভাব বিস্তার করে; যা এমনকি মানুষের জীবন হরণের কারণও হতে পারে। বিশেষ করে কিডনি বিপর্যয়, দৃষ্টিশক্তি হারানো, দাঁত ও ত্বকে প্রভাব ইত্যাদি। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুগার লেভেলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সুগার লেভেল সঠিক মাত্রায় রাখার জন্য ইনসুলিন ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম উপায় বলে স্বীকৃত।

ডায়াবেটিস রোগে যাঁরা ভুগছেন এবং যাঁদের রক্তে চিনির মাত্রা বেশি থাকে, তাঁদের কার্বোহাইড্রেট কম খেতে বলা হয়। কিন্তু কার্বোহাইড্রেট আমাদের প্রধান খাদ্য উপাদান, তাই কার্বোহাইড্রেট খেতেই হবে। আর কার্বোহাইড্রেট সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, কোলাজেনের কারণে রক্তের চিনি কোষে পৌঁছায় না। যখন আমরা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাই, আমাদের শরীর কার্বোহাইড্রেট থেকে চিনি ও শ্বেতসার ভেঙে শর্করা বা গ্লুকোজ তৈরি করে, যা রক্তের সঙ্গে মিশে যায়।

আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা ইনডেক্স মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীদেরও সুগার লেভেল বাড়বে না। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট–জাতীয় খাবার খেলেও সেটা হবে না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই ইনডেক্স মেনে চলতে পারলে ওষুধমুক্ত থাকা সম্ভব বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অভিমত।

ডায়াবেটিসকে বলা হয় লাইফস্টাইল ডিজিজ। লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে টাইপ টু ডায়াবেটিসে খাদ্য ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে ওষুধমুক্ত জীবন যাপন করা সম্ভব। এই লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে যে জ্ঞান জরুরি, তা হচ্ছে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সম্পর্কে জানা। আমরা যে খাবার গ্রহণ করি, তার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বলে একটি সূচক আছে; যার ইনডেক্স যত বেশি থাকে, তা ততই শরীরের জন্য খারাপ।

আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা ইনডেক্স মেনে খেলে ডায়াবেটিস রোগীদেরও সুগার লেভেল বাড়বে না। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট–জাতীয় খাবার খেলেও সেটা হবে না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই ইনডেক্স মেনে চলতে পারলে ওষুধমুক্ত থাকা সম্ভব বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অভিমত।

তাহলে কোন কার্বোহাইড্রেট খাব?

প্রতিদিনের ক্যালরির প্রায় ৪৫–৬৫ ভাগ আসা উচিত কার্বোহাইড্রেট থেকে। কার্বোহাইড্রেট থেকে আমরা এনার্জি বা ক্যালরি পাই, যা আমাদের কোষের শক্তি, দৈহিক তেজ, কর্মক্ষমতা, তাপ উৎপাদন ও চর্বি গঠনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। এ–জাতীয় খাবারই আমাদের দেহ গঠন ও দেহ সংরক্ষণের প্রধান উপাদান। আমাদের দেহে প্রতি ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ৪.১ ক্যালরি দেয়।

বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে, যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি থাকে, সেসব কার্বোহাইড্রেট রক্তে তাড়াতাড়ি মিশে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, আর যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম বা মাঝারি থাকে, সেগুলো রক্তে তাড়াতাড়ি মিশে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে না। তাই যাঁদের শরীরে ব্লাড সুগার সাধারণের চেয়ে বেশি, তাঁদের যেসব কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি থাকে, তা কম খাওয়া ভালো।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের প্রকারভেদ

সাধারণভাবে, কোনো খাবার যত বেশি প্রক্রিয়াজাত হয়, তত বেশি তার জিআই হয় এবং কোনো খাবারে ফাইবার বা ফ্যাট বেশি থাকলে জিআই কম হয়।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তিন প্রকারের হয়—নিম্ন, সহনীয় ও উচ্চ। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স, এটি আপনার রক্তে শর্করার উত্থানকে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ করে, তার ওপর ভিত্তি করে একটি খাদ্যকে একটি সংখ্যা বা স্কোর দেয়। খাঁটি গ্লুকোজকে (চিনি) ১০০-এর মান দেওয়া হয়, এমন খাবারগুলো শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে র‌্যাঙ্ক করা হয়। কোনো খাবারের গ্লাইসেমিক সূচক যত কম হয়, সেই খাবার খেয়ে ধীরে ধীরে রক্তে শর্করার উত্থান ঘটে। সাধারণভাবে, কোনো খাবার যত বেশি প্রক্রিয়াজাত হয়, তত বেশি তার জিআই হয় এবং কোনো খাবারে ফাইবার বা ফ্যাট বেশি থাকলে জিআই কম হয়।

এবার জানতে হবে কোন কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা কতটা আছে। নিচে অনেকগুলো কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের মধ্যে গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা কত তা দেওয়া হলো।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা ধরা হয় নিম্ন ৫৫-এর নিচে, সহনীয় ৫৬ থেকে ৬৯, উচ্চ ৭০ থেকে ওপরে

  • সাদা ময়দার রুটি ৭৫-৭৭
  • লাল গমের আটার রুটি ৫৩-৫৫
  • ময়দার পরোটা ৭৭-৮০
  • ঘরে বানানো লাল আটার চাপাতি ৫২-৫৬
  • সাদা চালের ভাত ৭৩-৭৭
  • লাল চালের ভাত ৬৮-৬৯
  • বার্লিতে মাত্র ২৮ (যা খুবই নিরাপদ)
  • মিষ্টি ভুট্টা ৫২-৫৭
  • চালের নুডলস ৫৩-৬০
  • কর্নফ্লেক্স ৮১-৮৭
  • বিস্কুট ৬৯-৭১
  • ওটস ৫৫-৫৭
  • ইনস্ট্যান্ট ওটস ৭৯-৮২

ফল

  • আপেল ৩৬-৩৮
  • কমলা ৪৩-৪৬
  • কলা ৫১-৫৪
  • আনারস ৫৯-৬৭
  • আম ৫৬-৫৯
  • তরমুজ ৭৬-৮০
  • খেজুর ৪২-৪৬তবে ফলের জুস করলে ইনডেক্স বেড়ে যায়

সবজি

  • আলু ৮৭-৯১
  • গাজর ৩৯-৪৩
  • মিষ্টি আলু ৬৩-৬৯
  • মিষ্টিকুমড়া ৬৪-৭১
  • কাঁচকলা ৫৫-৬১
  • মিক্সড ভেজিটেবল সুপ ৪৮-৫৩ (টেস্টিং সল্ট ছাড়া)

দুগ্ধজাত খাদ্য

  • পূর্ণ ননীযুক্ত দুধ ৩৯-৪২
  • ননীমুক্ত দুধ ৩৭-৪১
  • আইসক্রিম ৫১/৫৪
  • দই ৪১/৪৩
  • সয়ামিল্ক ৩৪/৩৮

অন্যান্য

  • ডার্ক চকলেট ৪০-৪৩
  • পপকর্ন ৬৫-৭০
  • পটেটো চিপস ৫৬-৫৯
  • রাইস ক্র্যাকার্স ৮৭/৮৯
  • সফট ড্রিংকস ৫৯-৬২
  • সাধারণ চিনি ১০৩-১০৬
  • মধু ৬১-৬৪এই তালিকা ধরে খাওয়ার ক্ষেত্রে ইনডেক্স মেনে চলা যায় তাহলে ডায়াবেটিস রোগীদের সুগার লেভেল আস্তে আস্তে কমতে থাকবে এবং হয়তো একসময় ইনসুলিনের প্রয়োজন না–ও হতে পারে। তাই কম ইনডেক্সের খাবার গ্রহণের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

    লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ।

রসুনের গুণ ভালো করে জানুন

রসুনের গুণ ভালো করে জানুন

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

রসুন আমাদের দৈনন্দিন খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; এই রসুনে রয়েছে থিয়ামিন (ভিটামিন বি১), রিবোফ্লাবিন (ভিটামিন বি২), নায়াসিন (ভিটামিন বি৩), প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড (ভিটামিন বি৫), ভিটামিন বি৬, ফোলেট (ভিটামিন বি৯) ও সেলেনিয়াম। সেলেনিয়াম ক্যানসার প্রতিরোধে দারুণ কাজ করে। রসুনের মধ্যে রয়েছে এলিসিন নামে এক জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা ক্যানসারসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দূর করতে কার্যকর। এই এলিসিন নামে যে কম্পাউন্ড রসুনে পাওয়া যায়, তার কারণে রসুনকে সুপারফুডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রাচীন ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে জানতে পারবেন, তখন রসুন কিন্তু শুধু বিভিন্ন অসুখ সারানোর জন্যই ব্যবহার হতো। মিসরীয়, ব্যাবিলনীয়, গ্রিক, রোমান ও চৈনিক সভ্যতায় ওষুধ হিসেবে রসুন ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এমনকি সকালে খালি পেটে রসুন চিবানোও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি

রসুনের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণ একে অনেকটা ওষুধের মতোই তৈরি করেছে, যার দরুন রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। খালি পেটে রসুন খেলে এই উপকার বেশি। বর্তমানে এই অতিমারি পরিস্থিতিতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুব জরুরি, তাই প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন খেতে পারেন।

 

রক্ত সঞ্চালনক্ষমতা বাড়ায়

প্রতিদিন সকালে খালি পেটে দুই কোয়া রসুন খেলে রক্ত সঞ্চালনক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যার দরুণ রক্ত বাধাগ্রস্ত হয়ে যেসব রোগের সৃষ্টি করে, তা আর হতে পারে না।

পুরুষের যৌনক্ষমতা বাড়াতেও বেশ সহায়ক

পুরুষের যৌনক্ষমতা নানান কারণে কমে যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে দুই কোয়া রসুন খেলে ধীরে ধীরে যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে দুই ধরনের মতামত থাকলেও পুরুষের ক্ষমতার মূল উৎস হচ্ছে রক্তের সাবলীল গতি। রসুনে এই কাজ করে বলেই যৌনক্ষমতার কথা বলা হয়ে থাকে।

হৃৎপিণ্ডের শক্তিবর্ধক

যাঁরা হৃদপিণ্ডের ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে বিব্রত আছেন, মাঝেমধ্যে বুকের বাঁ পাশে ব্যথা অনুভূত হয়, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হয়, তাঁদের জন্য প্রতিদিন সকালে খালি পেটে দুই কোয়া রসুন পানি দিয়ে গিলে খেয়ে ফেলতে হবে, এতে করে হৃদপিণ্ড শক্তিশালী হবে, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির কারণে হৃদপিণ্ডের ব্লকগুলো আর বাড়বে না এবং ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারবে না, বুকের ব্যথা কমে যাবে, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হবে না।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে

উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জন্য অনেক পথ্যের অন্যতম রসুন। শরীরের এলডিএল বেড়ে যাওয়ার কারণে রক্তচাপ বেড়ে যায়, প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন সকালে খালি পেটে খেলে উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা থাকবে না।

 

সংক্রমণ প্রতিরোধে

মানুষের শরীরে যেকোনো সময়ে সংক্রমণ ঘটতে পারে। সংক্রামক রোগ এমন একটি অবস্থা, যার কোনো পূর্বলক্ষণ থাকে না। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে দুই কোয়া রসুন খেলে শরীর সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।

ফুসফুসের সংক্রমণ প্রতিরোধে

ফুসফুসে বিভিন্ন কারণে সংক্রমণ হতে পারে। অ্যালার্জি সমস্যা, ঠান্ডা লাগার প্রবণতা থেকে ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটতে পারে, যা থেকে মুক্তি পেতে রসুন পিষে রস খেলে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধ করে, সঙ্গে হলুদগুঁড়া গরম পানি দিয়ে চায়ের মতো খেলে সংক্রমণ থাকে না। আর প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন খালি পেটে খাওয়া ফুসফুসের সংক্রমণ রোধে অত্যন্ত কার্যকর।

রক্ত পরিশোধিত করে

প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন খালি পেটে খেলে রক্তের পরিশোধনক্ষমতা বেড়ে গিয়ে রক্ত চলাচলে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসে, তাতে শরীর ভালো থাকে, নিরোগ দেহের জন্য সাবলীল রক্ত চলাচল অত্যন্ত কার্যকর একটি উপায়।

ত্বক ভালো রাখে

প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন খালি পেটে খেলে ত্বক ভালো থাকে, ত্বকে বার্ধ্যকের ছাপ পড়ে না, চেহারায় কোনো দাগ থাকলে কমে যায়।

 

শরীরে অবাঞ্ছিত ফোলা বা গোটা

অনেকের শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ফোলা পিণ্ড থাকে, বাড়ে কমে না, ব্যথাও করে না, কিন্তু ফোলাটা মিশেও না, এমন ফোলা বা গোটা শরীর থেকে মুছে ফেলতে প্রতিদিন ছয়-আট কোষ রসুন সকালে খালি পেটে এবং দুপুর ও রাতে খাবার পর দুইটি করে রসুন কোষ খেলে ফোলাটা ধীরে ধীরে মিশে যাবে। অথবা দুই কোয়া রসুন হালকা করে ভেজে তা খেতে হবে।

সেল ড্যামেজ রোধ করে

রসুনে উপস্থিত অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট ‘সেল ড্যামেজ’ ও ‘এজিং’ রোধ করে। ব্রেনের সেল ড্যামেজ কম হয়ে আলঝেইমারস ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

হাড়ের শক্তি বাড়ায়

একটা বয়সের পর বিভিন্ন কারণে নারীদের হাড়ের শক্তি কমে যায়। প্রতিদিন ২ গ্রাম করে রসুন খেলে নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রায় ভারসাম্য থাকে, যাঁদের কম থাকে, তাঁদের কিছুটা বাড়ে। ফলে হাড়সংক্রান্ত সমস্যা অনেকটা কমে যায়। এমনকি যে নারীদের মেনোপোজ হয়ে গেছে, তাঁরাও নিয়মিত রসুন খেলে অনেক উপকার পাবেন।

রসুনের বিভিন্ন ডোজ হয়ে থাকে, রান্নায় ও নানা ভর্তায় রসুনের উপস্থিতি থাকে। রসুনের গুণ পেতে সকালে খালি পেটে খাওয়া উত্তম, আমাদের গ্রামবাংলায় রসুন–মুড়ি খাওয়ার একটা প্রবণতা আছে, এতে কিছু উপকার হলেও বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় কিছু ভালো ফল পাওয়া গেলেও সব ঔষধি গুণ পাওয়া যাবে না।

অনেকের ধারণা, অ্যাজমার জন্যও রসুন উপকারী, কিন্তু ব্যাপারটা ভিন্ন, এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিফাঙ্গাল সক্রিয়ভাবে কাজ করে কিন্তু অ্যালার্জিক অ্যাজমা থাকলে রসুন অ্যালার্জি বাড়াতে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে। এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে রসুন এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শই দেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকের রসুনে অ্যালার্জি হয়ে থাকে, আর নিয়মিত এটি খেলে যদি কোনো অসুবিধা বোধ করেন, তখন রসুন না খাওয়াই ভালো, তবে স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি এটি নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। অনেক ধরনের রসুন বাজারে পাবেন, তার মধ্যে দেশি এককোষী রসুন সবচেয়ে ভালো।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পেঁয়াজের ঝাঁজ, রোগ নিরাময়ই কাজ

পেঁয়াজের ঝাঁজ, রোগ নিরাময়ই কাজ

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পেঁয়াজ একটি সর্বজন পরিচিত কন্দমূল। সূর্যের কিরণ বিশেষভাবে গ্রহণ করতে পারে বলেই এর পাতা গাঢ় সবুজ। পেঁয়াজ প্রাকৃতিকভাবে ভেষজগুণের আধার; বাংলার ঘরে ঘরে এটি কাঁচা যেমন খাওয়া হয়, তেমনি রান্নায় ব্যবহার হয়ে থাকে। পেঁয়াজের সবুজ গাছ ও কলি আমরা রান্না করে খেয়ে থাকি। তবে এই কলি সামান্য লবণ মাখিয়ে চিবিয়ে রস খেয়ে ছিবড়া ফেলে দিলে অনেক বেশি উপকার পাওয়া যায়।

পেঁয়াজে আছে ভিটামিন বি১ (থায়ামিন), বি২ (রিবোফ্লাবিন), বি৩ (নিয়াসিন), বি৫ (প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড), বি৬, বি৯ (ফোলেট) ও ভিটামিন সি। পেঁয়াজ শরীরে শক্তি জোগায়, বিভিন্ন ভিটামিনের গুণ দিয়ে দেহকে সাবলীল রাখতে কাজ করে, হার্টের কার্যক্ষমতা ও কার্ডিভাসকুলার ফাংশন ঠিকঠাক রাখতে সাহায্য করে।

নানা রোগের প্রতিকার হিসেবে পেঁয়াজ ব্যবহার হয়ে থাকে; যেমন:

সর্দি–জ্বর: শরীর গরম, কপাল ভার, নাক বন্ধ, মনে হয় জ্বর আসছে। সে ক্ষেত্রে পেঁয়াজের রস নাকে একটু টানলে সর্দি বেরিয়ে যাবে এবং জ্বর ভাবও চলে যাবে।

হার্টের সমস্যা: যাঁদের কার্ডিভাসকুলার ফাংশনে সমস্যা আছে, তাঁরা প্রতিদিন দুই চা–চামচ পেঁয়াজের রস খেলে সমস্যা সমাধানের পথে হাঁটবেন, আর নিয়মিত খেলে হার্টের সমস্যা হবে না। হার্টের সমস্যায় প্রতিদিন খাবারের আগে সালাদ খাওয়া উত্তম অভ্যাস, এই সালাদে একটি বড় উপাদান পেঁয়াজ থাকা জরুরি।

চোখের জ্যোতি ঠিক রাখে: নিয়মিত পেঁয়াজের রস খেলে যাঁদের দৃষ্টির সমস্যা আছে, তাঁদের সেরে যাবে (বয়সজনিত ক্ষীণ দৃষ্টি ছাড়া)।

অ্যাজমার সমস্যা: যাঁদের অ্যাজমার সমস্যা আছে, তাঁরা নিয়মিত দুবেলা এক চা–চামচ করে পেঁয়াজের রস খেলে অ্যাজমার সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন। বিশেষ করে রাতে শোবার আগে এক কাপ গরম পানিতে এক চা–চামচের চার ভাগের এক ভাগ হলুদের গুঁড়া, এক চা–চামচ পেঁয়াজের রস মিশিয়ে খেলে অ্যাজমাজনিত সমস্যার উপকার পাবেন।

মল অপরিষ্কার হলে: এক টেবিল চামচ পেঁয়াজের রস, সমপরিমাণ গরম পানি মিশিয়ে পান করলে পেট পরিষ্কার হবে। এটা দুপুরের খাবারের পরে খেলে উপকার পাওয়া যায়।

প্রস্রাব ধারণক্ষমতা বাড়াতে: প্রস্রাবের বেগ হলে আর দাঁড়ানো যায় না, দেরি হলে বেসামাল হয়ে কয়েক ফোঁটা বেরিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ১ চা–চামচ পেঁয়াজের রস আধা কাপ পানিতে মিশিয়ে রাতে শোবার আগে খেতে হবে। ৪ সপ্তাহ খেলে প্রস্রাবের ধারণক্ষমতা বাড়বে, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়ার সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

নাক দিয়ে রক্ত পড়লে: শরীর গরম হয়ে অনেক সময় নাক দিয়ে রক্ত পড়ে। পেঁয়াজের রস নাকে টানলে রক্ত পড়া বন্ধ হবে।

অর্শ: অর্শের কারণে রক্ত পড়তে থাকলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ১ চা–চামচ পেঁয়াজের রস সমপরিমাণ পানি মিশিয়ে খেলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। দুপুরে সবজি, সালাদে পেঁয়াজসহ খেতে পারলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমতে থাকবে এবং পায়ুপথের যেকোনো সমস্যাই সমাধান হতে থাকবে।

অত্যধিক গরমে: প্রচণ্ড গরমে পিপাসা পেলে হঠাৎ পানি পান করলে সর্দি হয়। এ সময় খাবার অথবা সালাদের সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ খেলে পিপাসা কম লাগবে এবং পথেঘাটে হিটস্ট্রোকের ভয় থাকে না।

হেঁচকি উঠলে: ১ চা–চামচ পেঁয়াজের রস ২ চা–চামচ পানি মিশিয়ে ২-৩ বার একটু একটু করে খেলে হেঁচকি ওঠা বন্ধ হবে।

কানে পুঁজ: অনেক সময় বাচ্চাদের কানে ঘা হয়ে পুঁজ হয়; এ ক্ষেত্রে পেঁয়াজের রস একটু গরম করে ২-১ ফোঁটা কানে দিলে ঘা সেরে যায়। আয়ুর্বেদ নিয়মানুসারে, এটা কানের জন্য অব্যর্থ ওষুধ।

বমি বমি ভাব বা বমি হলে: ৪-৫ ফোঁটা পেঁয়াজের রস ১ কাপ কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে পান করলে বমি বন্ধ হবে।

বিষফোড়া ফাটাতে: যেকোনো জায়গায় হোক না কেন, ফোড়া টন টন করছে, কিন্তু ফাটছে না। পেঁয়াজের রস একটু গরম করে লাগিয়ে দিলে ওই বিষফোড়া ফেটে যাবে।

মাথাধরায়: সর্দি–জ্বরে মাথাব্যথা হলে ২-৩ ফোঁটা পেঁয়াজের রস নাকে টানলে তৎক্ষণাৎ মাথাধরা এবং ব্যথা কমে যাবে।

মুখে ইনফেকশন: মুখের ভেতর এবং দাঁতের অনেক রোগ ও ইনফেকশন থাকলে তা থেকে বাঁচা যায়, যদি প্রতিদিন ১-২টি করে কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়।

কোমড় ও ঘাড়ের ব্যথায় ম্যাজিক চিকিৎসা, বিনা খরচে নিজে নিজে করার নিয়ম। By Alamgir Alam

 

পেঁয়াজের গন্ধ কমাতে

মানুষের শরীরের যে ছয়টি রসের প্রয়োজন (নোনতা, মিষ্টি এবং টক), তার মধ্যে পেঁয়াজ ৩টি দিতে পারে। কিন্তু একটু বেশি ব্যবহার করলে মুখে গন্ধ, নিশ্বাসে গন্ধ থেকে যায়; ফলে মানুষের মধ্যে কথা বলার সময় অস্বস্তি বোধ হয়। এই গন্ধ তাড়ানোর জন্য পেঁয়াজকে চার ভাগ করে সারা রাত টক দইয়ে ভিজিয়ে রাখলে গন্ধ কমে এবং গুণ যোগ হয়ে এক অমূল্য খাদ্যদ্রব্যে পরিণত হবে।

পেঁয়াজ দিয়ে আপনি উপকার পেতে হলে কাঁচা খাওয়াই জরুরি, অথবা রস করে খেতে পারেন। আমরা সাধারণত রান্নায় যে পেঁয়াজ খাই, তা দিয়ে উপকার হলেও ঔষধি গুণের উপকার পাওয়া যাবে না। তাই প্রতিদিন পেঁয়াজসহ সালাদ খাওয়ার অভ্যাস করতে পারলে শরীর সুস্থতা থাকবে, কোনো রোগে আক্রান্ত থাকলে সেটাও নিরাময় হবে।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

সরাসরি প্রথম আলো থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

রোগ সারাতে হলুদের কার্কিউমিন

রোগ সারাতে হলুদের কার্কিউমিন

আদিকাল থেকে আমরা হলুদের নানা ধরনের ব্যবহার দেখে আসছি—রূপচর্চা, রান্না, ব্যথা নিবারণ ইত্যাদিতে। তবে ঔষধিগুণের কারণে ওষুধ হিসেবেও এর ব্যবহার হয়ে আসছে। হলুদে আছে কিছু বিশেষ উপাদান, যা শরীরের অনেক সমস্যার কার্যকরী সমাধান। হলুদে অ্যান্টি–ইনফ্লামেশন, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, অ্যান্টিসেপটিক, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও কার্কুমিন উপাদান আছে, যা আমাদের শরীরের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন এমন রোগের ক্ষেত্রে।

হলুদে তিনটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হলো কার্কিউমিন, ডেমথক্সাইকুরকুমিন এবং বিসডেমেথক্সাইকুরকুমিন। এর মধ্যে কার্কিউমিন হলো স্বাস্থ্যের পক্ষে সর্বাধিক সক্রিয় এবং সবচেয়ে উপকারী যার বিশ্বাসযোগ্য উৎস হলো হলুদ। বেশির ভাগ হলুদে প্রায় ২-৮ শতাংশ প্রতিনিধিত্বকারী কার্কুমিন হলুদকে তার স্বতন্ত্র রং এবং স্বাদ দেয়; কার্কিউমিন তার প্রদাহবিরোধী, অ্যান্টিটিউমার এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট প্রভাবগুলোর জন্য পরিচিত।

এগুলো আমরা নানাভাবে আমাদের প্রয়োজনে স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব, তা জানিয়ে দেওয়া হলো:

ক্যানসার প্রতিরোধে

নিয়মিত হলুদের গুঁড়া খেলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়; বিশেষ করে ক্যানসার প্রতিরোধ করে। ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি এবং ছড়িয়ে পড়া রোধে হলুদ সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি মুখগহ্বরের ক্যানসার রোধে খুবই কার্যকরী।

শ্বাসজনিত সমস্যা

যাঁদের অ্যাজমা ছাড়াও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য হলুদের গুঁড়া অত্যন্ত উপকারী; নিয়মিত হলুদগুঁড়া গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে প্রতিদিন রাতে শোয়ার আগে খেলে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

লিভারের ইনফেকশন

লিভারের ইনফেকশন আছে, জন্ডিস হয়ে থাকলে প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে এক কাপ গরম পানির সঙ্গে এক চা–চামচ হলুদগুঁড়া মিশিয়ে খেলে লিভারের ইনফেকশন কমে যায়, এই চিকিৎসা দীর্ঘ মেয়াদে করতে হয়। আবার সকালে খালি পেটে দুই চা–চামচ কাঁচা হলুদের রস খেলে লিভারে বাইলের উৎপাদন বেড়ে যায়। এই বাইলই শরীর থেকে বিষ, বর্জ্য নির্মূল করতে ভূমিকা পালন করে। এই বাইল দেহ থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোলেস্টেরল বের করে দেয় এবং পাকস্থলী থেকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে।

টক্সিন মুক্ত করতে

যদি শরীর অসুস্থ হয়ে যায় অথবা নানা রকম রোগের উপসর্গ দেখা দেয়, তবে দেহকে সম্পূর্ণ টক্সিনমুক্ত করলে সব রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালে এবং রাতে হলুদগুঁড়া এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে খেতে হবে।

শিশুদের লিউকেমিয়া সারায়

শিশুদের লিউকেমিয়া এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, বিশেষত অ্যান্টিবায়োটিক নিয়মিত খাওয়ার ফলে শিশু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য অ্যান্টিবায়োটিকে আর কাজ হচ্ছে না। এমন শিশুদের জন্য কাঁচা হলুদের রস এক চা–চামচ কুসুম গরম পানি ও মধু মিশিয়ে খেতে হবে, দীর্ঘ মেয়াদে কাঁচা হলুদ খেলে লিউকেমিয়া সেরে যায়।

আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোধে সাহায্য করে

গাঁটের প্রদাহ আর্থ্রাইটিসের একটি প্রচলিত কারণ। হলুদের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি–ইনফ্লামেটরি বা প্রদাহরোধী গুণ। এটি আর্থ্রাইটিস রোধে সাহায্য করে। হলুদে উপস্থিত কারকুমিন বিভিন্ন ক্রনিক (যেসব রোগ প্রতিকার করা যায় না) রোগের চিকিৎসায় বেশ কার্যকর। দেড় ইঞ্চি থেকে দুই ইঞ্চি কাঁচা হলুদের তরল নির্যাস ১৫-১৬টি কালো গোলমরিচগুঁড়া গরম পানিসহ চায়ের মতো সকালে খালি পেটে খেলে আর্থ্রাইটিসজনিত সমস্যা দূর হবে।

ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ দূর করে

কম সময়ের প্রদাহ শরীরের জন্য উপকারী এবং এটি রোগের সঙ্গে লড়াই করে। তবে দীর্ঘ সময়ের প্রদাহ বা ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন জীবননাশের কারণও হয়। হলুদ এই দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ দূর করতে সাহায্য করে। সকালে কাঁচা হলুদের রস এক চা–চামচ কুসুম গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাবেন এবং রাতে হলুদের গুঁড়া গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন দূর হয়ে যায়।

মস্তিষ্ককে কার্যক্ষম রাখে

BDNF (Brain-derived neurotrophic factor) হরমোন অথবা ব্রেন-ডিরাইভড নিউরোট্রোপি মস্তিষ্কে নিউরনের ভাগ এবং সংখ্যা বৃদ্ধিতে কাজ করে, যা মস্তিষ্কের রোগের ঝুঁকি কমায়। বয়স বাড়লে মস্তিষ্কের এই কার্যকারিতা কমে যায়। যদি খাদ্যতালিকায় হলুদ থাকে, এই হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে, স্মৃতিশক্তি এবং বুদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। সকালে কাঁচা হলুদের রস এক চা–চামচ কুসুম গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাবেন এবং রাতে হলুদের গুঁড়া গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হবে।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়

রক্তনালির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত হয়, এতে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে। খাদ্যতালিকায় হলুদ থাকলে রক্তনালির কার্যক্রম ভালো থাকে। এর ফলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমে। সকালে কাঁচা হলুদের রস এক চা–চামচ কুসুম গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হবে এবং রাতে হলুদের গুঁড়া গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হবে।

হলুদের গুণ পেতে হলে অবশ্যই গুঁড়ার ক্ষেত্রে প্যাকেটজাত হলুদ না নিয়ে খোলা হলুদ কিনে নিজেই পিষে নিন, তাতে ভালো ফল পাওয়া যাবে। কাঁচা হলুদের ক্ষেত্রে ফ্রিজে না রেখে পেস্ট করতে পারলে ভালো। আর যদি অর্গানিক হলুদ পাওয়া যায়, সেটায় ভালো ফল পাওয়া যাবে। হলুদ ঔষধিগুণে ভরা; এর নির্দিষ্ট ডোজ আছে তাই অতিরিক্ত খেলে পেটের সমস্যা তৈরি হয়। এ জন্য অতিরিক্ত না খেয়ে বর্ণিত ডোজে খাওয়া উত্তম।
অনেকে হলুদ গায়ে মাখেন, এটা আয়ুবের্দিক মতে বহুগুণের, বিশেষ করে শরীরে কোনো ধরনের শুষ্ক চর্মরোগ থেকে থাকে তার জন্য ভালো। সপ্তাহে দুই দিন গায়ে মাখলেই যথেষ্ট।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

আদা সকল রোগ নিরাময়ে দাদা

আদা সকল রোগ নিরাময়ে দাদা

কথায় বলে ‘আদা সকল রোগ নিরাময়ে দাদা’। যার অর্থ আমাদের শরীরে সব রোগ নিরাময়ের জন্য আদা যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আদায় রয়েছে পটাশিয়াম, আয়রণ, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন এ, বি৬, ই ও সি এবং অ্যান্টি–ব্যাকটেরিয়াল এজেন্ট ও অ্যান্টি–ইনফ্লামেটরি এজেন্ট বিদ্যমান। যার কারণে সব বয়সী মানুষ আদা খেতে পারেন, বিশেষ করে শিশুদের জন্য আদা–মধু–জল সুস্থ দেহ ও সতেজ মনের জন্য খুবই কার্যকর।

জেনে নেওয়া যেতে পারে আমাদের কোন কোন সমস্যা নিবিড়ভাবে কাজ করে আদা।

আদা সকল রোগ নিরাময়ে দাদা

ছবি: উইকিপিডিয়া

আমাশয়, পেটফাঁপা, পেটব্যথা

যাঁরা এসব সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য খাওয়ার পর এক কাপ গরম পানিতে এক চা–চামচ আদার রস মিশিয়ে খেলে আমাশয়, পেটফাঁপা, পেটব্যথা দূর হবে। যাঁরা এ সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন, তাঁরা এক চা–চামচ করে আদার রস, লেবুর রস ও মধু, একত্রে এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে দিনে এবং রাতে নিয়মিত খেলে সুফল পাবেন।

হাঁপানি ও ফুসফুসে সংক্রমণ

ফুসফুসের ধমনিতে কোনো সংক্রমণ থাকলে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হলে অথবা হাঁপানি থাকলে প্রতিদিন দুবেলা এক চা–চামচ করে আদার রস, লেবুর রস, মধু এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে খেলে এবং ঠান্ডাজাতীয় খাবার এড়িয়ে চললে ১৫ দিনের মধ্যে এর সুফল পাবেন।

আদা ও লেবুর রসের সঙ্গে মধু দারুণ কার্যকর

ছবি: অ্যাঞ্জেল জে, পেকজেলসডটকম

শরীরের ভেতরের বায়ু ও কোষ্ঠবদ্ধতা, পেটে গ্যাস, কোনো খাবার খেলেই গ্যাস বের হতে থাকে, সেই সঙ্গে কোষ্টকাঠিন্য, প্রতিদিন মলত্যাগ হয় না, মলে দুর্গন্ধ এবং শক্ত, তাঁদের জন্য প্রথম সাত দিন এক চা–চামচ আদার রস এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে ছয় থেকে সাতবার খেতে হবে। এতে সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে; তারপর প্রতিদিন দুবেলা এক চা–চামচ করে আদার রস, লেবুর রস ও মধু এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে খেতে হবে। তাহলে গ্যাসের স্থায়ী সমাধান মিলবে। মনে রাখতে হবে, গ্যাসের সমস্যার প্রধান কারণ শরীর বিরুদ্ধ খাবার; আসলে যে খাবার আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকর তা এড়িয়ে গেলে কোনো ওষুধেরই প্রয়োজন হয় না।

অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাড়ের জয়েন্টের ব্যথা

মূলত এ রোগগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। শরীরের ওজন ঠিক রেখে, নির্দিষ্ট ব্যায়াম ও দুবেলা এক চা–চামচ করে আদার রস, লেবুর রস, মধু এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে খেলে এর তীব্রতা কমে। যেহেতু এ রোগ হওয়ার অন্যতম কারণ শরীরে পানি ও ক্যালসিয়াম ঘাটতি, সেহেতু পানি খাওয়ার প্রবণতা বাড়াতে হবে।

আদা সকল রোগ নিরাময়ে দাদা ছবি: উইকিপিডিয়া

হৃদ্‌রোগ
হৃদ্‌রোগের বিভিন্ন উপায় আছে প্রাকৃতিক উপায়ে নিরাময়ের জন্য। যাঁদের হৃদ্‌রোগ আছে কিন্তু উচ্চরক্ত চাপ নেই, তাঁরা দুবেলা এক চা–চামচ করে আদার রস, লেবুর রস ও মধু এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে খাবেন। সেই সঙ্গে গ্যাসজনিত সমস্যা থাকলে সাত দিন এক চা–চামচ আদার রস গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে ছয় থেকে সাতবার খাবেন। ধৈর্যসহ নিয়মিত এ নিয়মে চললে হৃদ্‌রোগের সমস্যা দূর হতে থাকবে।

জ্বর জ্বর, বমি বমি ভাব
এক চা–চামচ আদার রস গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে ছয় থেকে সাতবার খেলে জ্বর জ্বর ভাব ও বমি বমি ভাব কেটে যাবে।

মাইগ্রেন, সাইনাস, গলা ও মাথাব্যথায়

তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য সামান্য লবণ দিয়ে কাঁচা আদা চিবিয়ে খেতে হবে। কিন্তু রোগ সারাতে হলে প্রতিদিন দুবেলা এক চা–চামচ করে আদার রস, লেবুর রস ও মধু গরম এক কাপ পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে খেলে মাইগ্রেনের সমস্যা দূর হবে।
আহারে রুচি আসে, ক্ষুধা বাড়ায়, হজমে সহায়তা করে
সামান্য লবণ দিয়ে কাঁচা আদা চিবিয়ে খেলে আহারে রুচি আসে।

কাশি কমায়, কফ দূর করে
প্রতিদিন দুবেলা এক চা–চামচ করে আদার রস, লেবুর রস ও মধু এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে খেলে কাশি কমে, কফ দূর হয়।

আদার গুঁড়াও কার্যকর ছবি: পিকজাবে, পেকজেলসডটকম

পাকস্থলী ও লিভারের শক্তিবর্ধক
সমপরিমাণে আদার গুঁড়া, মধু ও আমলকীর গুঁড়া একসঙ্গে মিশিয়ে রেখে প্রতিদিন তিনবার চা হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া প্রতিদিন দুবেলা এক চা–চামচ করে আদার রস, লেবুর রস ও মধু এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে খেলে পাকস্থলী ও লিভারের শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে

প্রতিদিন দুবেলা এক চা–চামচ করে আদার রস, লেবুর রস ও মধু এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে চায়ের মতো করে খেলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজে আসবে। ডায়েবেটিস রোগীদের মধু বাদ দিয়ে খেতে হবে।

আমাদের প্রাচীন চিকিৎসাব্যবস্থায় আদা একটি অপরিহার্য উপাদান। এর গুণাগুণের কারণে আমাদের খাদ্যে এর প্রচলন চলে এসেছে। আমরা প্রতিদিন রান্নায় যে আদা খেয়ে থাকি, তাতে কিছু উপকার হলেও ঔষধি উপকার পেতে হলে নিয়ম করে আদা খেতে হবে আর যেখানে আদা ছেঁচে বা পিষে খাওয়ার কথা বলা হয়েছে তা শুধু যখন খাবেন, তখনই ছেঁচে বা পিষে খেতে হবে।

আদা একবারে পিষে ফ্রিজে রেখে দেয়া উচিৎ নয় ছবি: উইকিপিডিয়া

অনেকেই এক মাসের প্রয়োজনীয় আদা একবারে পিষে ফ্রিজে রেখে দেন। এ আদা দিয়ে কিন্তু ঔষধি উপকার পাওয়া যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথের তথ্য অনুযায়ী, আদার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হজমে সমস্যা ও পেটফোলা ভাব দেখা দিতে পারে অতিমাত্রায় আদা খাওয়া হলে। প্রতিটি উপাদানেরই নিজস্ব ডোজ থাকে, তেমনি আদার বেলায় ১৫ গ্রাম রস সারা দিনে খাওয়া উচিত। যাঁরা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাঁরা মধু কম খাবেন।

লেখক: খাদ্য, পথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ

লেখাটি প্রথম আলোতেও প্রকাশ করা হয়েছে। প্রথম আলোর লিংক: এখানে ক্লিক করুন

আলসারেটিভ কোলাইটিস : উপসর্গ, চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিরোধের উপায়

আলসারেটিভ কোলাইটিস : উপসর্গ, চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিরোধের উপায়

পেটের সমস্যায় বেশিরভাগ মানুষই ভোগেন। পেট ব্যথা থেকে পেট খারাপ তাঁদের সবসময়েই সঙ্গী। আর পেটের সমস্যায় ভোগা মানেই নিজের প্রিয় খাবারগুলি থেকে আলাদা হওয়া।আর সেটা যে কী কষ্টের, যার হয় সে জানে! এই পেটের সমস্যাগুলির মধ্যে একটা হল ‘আলসারেটিভ কোলাইটিস ‘। এই রোগের সাথে ক্রোনস ডিজিজের অনেকটা মিল আছে। এই দুই অসুখকে একসাথে ” ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ ” বলা হয়। সাধারণত সব বয়সের মধ্যেই এই রোগ বেশি দেখা দেয়।

আলসারেটিভ কোলাইটিস কী ?
আমাদের বৃহদত্ন্ত্রকে কোলন বলা হয়। আর এই কোলনের ভিতরে যদি কোনও ক্ষতি হয়, যেমন-জ্বালা, ফুলে যাওয়া, ঘা হওয়া, তখন তাকে বলে কোলাইটিস। মনে করা হয়, কোলনের ভেতরের স্তর অর্থাৎ মিউকোসা দুর্বল হলে এ রোগ হতে পারে। আলসারেটিভ কোলাইটিস হচ্ছে পেটের প্রদাহজনিত যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা। এর ফলে বৃহদান্ত্র ও কোলনে প্রদাহ ও ঘা হয় যা রোগীর পেটে মর্মান্তিক ব্যথার সৃষ্টি করে। ছোটো ছোটো আলসার বা ঘা গুলো পুরো কোলনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। আলসারগুলো একে অন্যের সাথে আটকে থাকে। এই রোগ জীনগত কারণে বা পরিবেশগত কারণে হতে পারে।

কী কী উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা যায়?
ক) বারবার পাতলা পটি হওয়া
খ) মলের সঙ্গে রক্ত পড়া
গ) পেটে ব্যাথা, মলদ্বারের ব্যথা
ঘ) ওজন কমে যাওয়া
ঙ) খেতে ইচ্ছে না হওয়া

রোগ নির্ণয় :
যান্ত্রিক পদ্ধতি ছাড়া এই রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আর কোনও বিকল্প নেই। সিগময়েডস্কপি , কোলোনোস্কপি , বেরিয়াম ইনেমা , আলট্রাসোনোগ্রাফি – এই গুলির মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় করা হয়। এছাড়াও, রক্তাল্পতা এবং সংক্রমণের কোনও লক্ষণ জানার করার জন্য রক্ত পরীক্ষাও করা হয়।

চিকিৎসা :
সাধারণত কোলাইটিস যদি ইনফেকশন থেকে হয় তাহলে কিছুদিন অ্যান্টিবায়োটিক খেলে ঠিক হয়ে যায়। কেউ যদি সুগারের পেশেন্ট হয় তাহলে এই রোগে তাকে ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক নিষেধ মেনে চলতে হয়। তবে, আলসারেটিভ কোলাইটিস যদি তীব্র আকার ধারণ করে তাহলে এর চিকিৎসা হিসেবে সাধারণত স্টেরয়েড ও সালফাস্যালাজিন দেওয়া হয়। কম মাত্রায় এই স্টেরয়েড দেওয়া হয়। তবে কারোর ক্ষেত্রে যদি এগুলোও না কাজ করে তখন এই রোগ সারানোর শেষ অস্ত্র হিসেবে অপারেশনকে বেছে নিতে হয়। এক্ষেত্রে কোলন বা পুরো বৃহদন্ত্রই কেটে বাদ দেওয়া হয়।

সময়মতো চিকিৎসা না করালে এক্ষেত্রে আরও খারাপ কিছু হতে পারে, যেমন-
ক) কোলনে ক্যান্সার হতে পারে,
খ) চামড়ার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লাল দাগ হতে পারে,
গ) জণ্ডিস হতে পারে,
ঘ) লিভারের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে,
ঙ) শরীরে কোমর, মেরুদণ্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা হতে পারে।

প্রতিরোধের উপায় :
পুরোটা ঠিক করা না গেলেও কিছু কিছু জিনিস মেনে চললে এই রোগ অনেকটা প্রতিরোধ করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে। সেগুলি হল-
ক) আলসারেটিভ কোলাইটিসের রোগীদের জন্য হলুদ অনেক কার্যকরী। বিশেষ করে হলুদের কারকিউমিন থেরাপির মতো কাজ করে।
খ) বেশিরভাগ ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খেলে আলসারেটিভ কোলাইটিসের রোগীদের জন্য উপকারী হতে পারে। এর ফলে নিয়মিত শরীর থেকে বর্জ্যের সাথে বিষাক্ত ও রাসায়নিক উপাদানও বেরিয়ে যায়।
গ) গবেষণায় দেখা যায় যে, বেশিরভাগ মানুষের আলসারেটিভ কোলাইটিসের সমস্যাকে বৃদ্ধি করে স্ট্রেস। তাই স্ট্রেস কমানো উচিত।
ঘ) স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া উচিত। ফ্যাট জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
ঙ) রোজকার ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করা প্রয়োজন।

ডাইভার্টিকিউলিটিস : এই রোগের কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

ডাইভার্টিকিউলিটিস : এই রোগের কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

পরিপাকতন্ত্রের সাথে যুক্ত এই ডাইভার্টিকিউলিটিস । এটি পরিপাকতন্ত্রের প্রাচীরে হয়। এগুলো সাধারণত কোলন বা বৃহদন্ত্রের নীচের দিকে দেখা যায়। কখনোও কখনোও এক বা একাধিক থলিতে ইনফেকশন, ইনফ্লামেশন বা জ্বালা হয়। এর ফলে তলপেটে খুব ব্যাথা, জ্বর, বমিভাব ও মলত্যাগের ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা দেয়।

বর্তমানে ডাইভার্টিকিউলিটিস একটি খুব সাধারণ রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি হজম সংক্রান্ত একটি সমস্যা যা কোলনকে প্রভাবিত করে (বৃহদন্ত্র)। এই রোগে, বৃহদন্ত্রের প্রাচীরে ছোটো ছোটো পিন্ড তৈরি হয়। এই ডাইভার্টিকুলাগুলিতে প্রদাহের সৃষ্টি হলে তখন তাকে ডাইভার্টিকিউলিটিস বলে।

ডাইভার্টিকিউলিটিস মূলত কোলনের নীচের বাম প্রান্তে হয়। এটি পুরুষ ও মহিলা উভয়েরই হতে পারে। বিশেষত ৪০ বছর বয়সের পরে এই রোগ দেখা দেয়। গবেষকদের মতে, 8সাধারণত ৮০ শতাংশ মানুষ ডাইভার্টিকিউলিটিসের কোনও লক্ষণ অনুভব করেন না। যখন এই ডাইভার্টিকুলাগুলি তৈরি হতে থাকে তখন কোনও উপসর্গ বোঝা যায় না। প্রাথমিক অবস্থায় নিয়মিত সঠিকভাবে জীবনযাপন করলে ও সঠিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে এটি সারানো যায়। তবে এই রোগ মারাত্নক রুপ ধারণ করলে অবশ্যই সার্জারির দিকে এগোতে হয়।

ডাইভার্টিকিউলিটিসের লক্ষণ ও উপসর্গ : ডাইভার্টিকিউলিটিসের লক্ষণগুলি হালকা থেকে গুরুতর হয়। রোগের তীব্রতার উপর নির্ভর করে হঠাৎ বা বেশ কয়েকটি দিনে এই রোগের বৃদ্ধি হতে পারে।
১) পেট ব্যাথা, বিশেষ করে পেটের বাম দিকে ব্যাথা
২) বমি বমি ভাব
৩) কোষ্ঠকাঠিন্যতা
৪) মলত্যাগে রক্ত পড়া
৫) জ্বর
৬) ডায়রিয়া
৭) ক্লান্তিবোধ করা

এই রোগের কারণ :
চিকিৎসকদের মতে, কোলনের ভেতরের প্রাচীরের কোনও দুর্বল অংশে চাপ পড়লে সেখানে ডাইভার্টিকিউলিটিসের সৃষ্টি হয়। সাধারণত, ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার মলত্যাগে সহায়তা করে। আর, খাবারে আঁশের পরিমাণ কম থাকলে মলত্যাগে সমস্যা দেখা দেয়। মলত্যাগে দীর্ঘসময় লাগে যার ফলে কোলনে চাপ পড়ে। আর কোলনে চাপ পড়া মাত্র কোলনের ভিতরের দেয়ালের দুর্বল অংশে ডাইভার্টিকিউলিটিসের সৃষ্টি হয়।

ডাইভার্টিকিউলিটিসের মূল কারণ এখনও অজানা,কিন্তু এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে যা ডাইভার্টিকিউলিটিস হতে সাহায্য করে। কারণগুলি হল-
১) কম ফাইবারযুক্ত খাবার খেলে
২) রেড মিট
৩) শরীরচর্চা না করলে
৪) ধূমপান
৫) ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি
৬) জীনগত
৭) দীর্ঘদিন ধরে কোনও যণ্ত্রণানাশক ওষুধ খেলে
৮) কোষ্ঠকাঠিন্যের ধাত
৯) ওজন বেশি বা শরীরে মেদ বৃদ্ধির কারণে

রোগনির্ণয় :

ডাইভার্টিকিউলিটিস হলে রোগ শনাক্ত করতে,একজন চিকিত্সক রোগীর কী কী উপসর্গ দেখা দিচ্ছে তা জিজ্ঞাসা করেন এবং দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা নিয়েও রোগীকে প্রশ্ন করেন। রোগ শনাক্ত করতে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। চিকিৎসকরা মলদ্বার পরীক্ষার সাথে সাথে সম্পূর্ণ শারীরিক পরীক্ষা করে থাকেন।
পরীক্ষাগুলি এক বা একাধিক হতে পারে-
১) কোলোনোস্কোপির মাধ্যমে চিকিৎসকরা অন্ত্রের ভেতরের সমস্যাগুলি নির্ধারণ করেন। ২) কতটা সংক্রমণ হয়েছে তা দেখতে মূত্র এবং মল পরীক্ষা করা হয়।
৩) প্রদাহ বা কিডনিজনিত সমস্যার দেখার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
৪) এম আর আই,সিটি স্ক্যান,আল্ট্রাসাউন্ড এবং এক্স-রে করা হয়।
৫) মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রেগনেন্সি টেস্ট কর হয়।

এই রোগের চিকিৎসা :
রোগ নির্ণয়ের পরে,একজন চিকিত্সক রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে চিকিত্সা ব্যবস্থা করেন। কিছু প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যায়। যেমন-ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া,প্রয়োজনমতো জল পান করা,নিয়মিত শরীর চর্চা করা। এগুলির ফলে অন্ত্রের ক্রিয়া উন্নত করা যায়। এছাড়া,চিকিত্সার অন্যান্য পদ্ধতিগুলির মধ্যে রয়েছে:
১) মেট্রোনিডাজল এবং অ্যামোক্সিসিলিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ
২) সংক্রমিত ডাইভার্টিকুলা অপসারণের জন্য সার্জারি

ডাইভার্টিকিউলিটিস প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে যে খাবারগুলি
আগেই আলোচনা করা হয়েছে,খাবারে যদি উচ্চ ফাইবারযুক্ত থাকে তাহলে ডাইভার্টিকিউলিটিস হতে বাধা দিতে পারে। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য যে খাবারগুলি সবচেয়ে উপযুক্ত তা দেওয়া হল-
১) মটরশুটি,বিনস
২) ব্রাউন রাইস
৩) আপেল এবং নাশপাতির মতো উচ্চ ফাইবারযুক্ত ফল
৪) শাকসবজি
৫) মাছ,ডিম
৬) ওটস

এই রোগে যে খাবারগুলি এড়িয়ে যাবেন কিছু নির্দিষ্ট খাবার রয়েছে যা ডাইভার্টিকিউলিটিস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে এড়ানো উচিত। এই ধরনের খাবারগুলি হল-
১) রেড মিট
২) পপকর্ন
৩) বাদাম

মেনিনজাইটিস : রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

মেনিনজাইটিস : রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ বছরের কম বয়সের শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ মেনিনজাইটিস। ২০১২ সালে, ভারত সরকার সারাদেশে ইউনিভার্সাল টিকাদান কর্মসূচিতে (UIP) পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন প্রবর্তন করে। যদিও বর্তমানে মেনিনজাইটিসের প্রকোপ হ্রাস পেয়েছে, তবুও এটি প্রতিরোধে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

মেনিনজাইটিস কী?
মেনিনজাইটিস হল মেরুদণ্ড এবং মস্তিষ্কের চারপাশে আচ্ছাদনকারী ঝিল্লি প্রদাহ। মূলত জীবাণুর সংক্রমণের কারণেই এই প্রদাহের সৃষ্টি হয়। শিশু, কিশোর এবং প্রাপ্তবয়স্ক সকলেরই মেনিনজাইটিস হতে পারে, যদিও মেনিনজাইটিসের ধরণটি বয়স অনুসারে পরিবর্তিত হয়। মেনিনজাইটিস বা মস্তিষ্কপর্দার প্রদাহ মস্তিস্ক বা সুষুম্নাকান্ডের আবরণকারী পর্দা বা মেনিনজেসের প্রদাহজনিত একটি রোগ। মেনিনজাইটিস একটি জরুরী অবস্থা, যেখানে দ্রুত চিকিৎসা অপরিহার্য।

মেনিনজাইটিসের বিভিন্ন প্রকার ও কারণ :
মেনিনজাইটিস ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস, প্রোটোজোয়ার ইত্যাদি কারণে হয়। মেনিনজাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ ধরন হল ব্যাকটিরিয়া এবং ভাইরাস। তবে বিভিন্ন ধরনের ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় বা ক্যান্সারের কারণেও মেনিনজাইটিস হতে পারে।

ক) ভাইরাল মেনিনজাইটিস:
মেনিনজাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ ধরন হল ভাইরাল মেনিনজাইটিস। এটি নিজে থেকে নিরাময় হয়। ব্যাকটেরিয়া জনিত মেনিনজাইটিসের চাইতে কম ভয়ংকর। ভাইরাল মেনিনজাইটিসের প্রধান জীবাণু এন্টেরোভাইরাস। এর বাইরেও কিছু ভাইরাস এই রোগের সৃষ্টি করে যা মশার মাধ্যমে একজনের কাছ থেকে অন্য জনের দেহে ছড়াতে পারে।
খ) ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস: এই ধরনের মেনিনজাইটিস সংক্রামক। ব্যাকটিরিয়া মেনিনজাইটিস স্ট্র্যাপ্টোকোকাস নিউমোনিয়া, নাইসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজিনেসিস এবং স্টেফিলোকোকাস অরিয়াসের মতো নির্দিষ্ট ধরণের ব্যাকটিরিয়া দ্বারা সৃষ্ট হয়। যদি চিকিৎসা না করা হয়, তবে মারাত্মক অবস্থা হতে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু এবং ২০ থেকে ৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্করা বিভিন্ন ব্যাকটিরিয়ার সংক্রমণেই মারা যায়।
গ) ফাংগাল মেনিনজাইটিস: একটি বিরল ধরণের মেনিনজাইটিস, ফাংগাল মেনিনজাইটিস ক্রিপ্টোকোকাস, ব্লাস্টোমাইসেস, হিস্টোপ্লাজমা এবং কক্কিডায়োআইডেস ইমিটিসের মতো ছত্রাকজনিত কারণে ঘটে। ছত্রাকটি শরীরে সংক্রামিত হয় এবং রক্ত ​​প্রবাহে ছড়িয়ে যায়, সেখান থেকে মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডে যায়। রোগ প্রতিরোধকারী ক্ষমতা হ্রাসের ওষুধ সেবনকারী, এইডস/এইচআইভি আক্রান্ত রোগী ও বয়স্ক মানুষ ফাংগাল মেনিনজাইটিসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ঘ) প্যারাসাইটিক মেনিনজাইটিস: প্যারাসাইটিক মেনিনজাইটিস অ্যাঞ্জিওস্ট্রংগিলাস ক্যান্টোনেনসিস, গ্যান্থোসটোমা স্পিনিজেরাম, সিস্টোসোমার মতো পরজীবীদের কারণে ঘটে। প্যারাসাইটিক মেনিনজাইটিস সরাসরি সংক্রামক নয়, এটি একটি ব্যক্তির থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে যায় না।
ঙ) জীবাণুবিহীন মেনিনজাইটিস: জীবাণুর বাইরেও কিছু কারণে মেনিনজাইটিস হতে পারে। শরীরে ক্যান্সারের বিস্তার, স্বয়ং-অনাক্রম্য ও কিছু বিশেষ ওষুধ সেবন করলে মেনিনজাইটিস হয়।

এই রোগের লক্ষণ :
এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলি কয়েকদিনের মধ্যেই বিকাশ লাভ করে। ভাইরাল এবং ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসের লক্ষণগুলি শুরুতে একই রকম হতে পারে।এই রোগের লক্ষণগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল। শিশুদের মধ্যে ভাইরাল মেনিনজাইটিসের লক্ষণগুলি হল- জ্বর, বিরক্তি ভাব, খিটখিটে মেজাজ, অতিরিক্ত ক্লান্তি, খেতে অনীহা, ত্বকে লাল লাল র‍্যাশ, নিদ্রাহীনতা ইত্যাদি। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ভাইরাল মেনিনজাইটিসের লক্ষণগুলি হল- জ্বর, বমি, মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, হৃদরোগ, আলো ও শব্দ অসহনশীলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, খেতে অনীহা, ত্বকে লাল লাল র‍্যাশ, নিদ্রাহীনতা ইত্যাদি। ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসের লক্ষণগুলি হঠাৎ বিকাশ লাভ করে, সেগুলি হল- বমি, জ্বর, বিরক্তি ভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, আলো ও শব্দ অসহনশীলতা, নিদ্রাহীনতা, ইত্যাদি। ফাংগাল মেনিনজাইটিসের লক্ষণগুলি হল- জ্বর, মাথাব্যথা, আলো ও শব্দ অসহনশীলতা, বমি, ইত্যাদি।
প্যারাসাইটিক মেনিনজাইটিসের লক্ষণগুলি ফাংগাল মেনিনজাইটিসের মতোই হয় এবং রোগীর শরীরে র‍্যাশ হতে পারে।

রোগনির্ণয় : চিকিৎসক বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা এবং চিকিৎসার ইতিহাসের ভিত্তিতে এই রোগ নির্ণয় করেন। এছাড়াও, চিকিৎসক মেরুদণ্ডের পাশাপাশি মাথা, কান, গলা এবং ত্বকের চারপাশের সংক্রমণও পরীক্ষা করেন।
রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রে কম্পিউটারাইজড টোমোগ্রাফি (CT) এম আর আই(MRI), রক্ত ​​পরীক্ষা, চেস্ট এক্স-রে ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়।

চিকিৎসা : এই রোগে দায়ী পরজীবি শনাক্ত করে সে অনুযায়ী ব্যাকটেরিয়া নিরোধক (অ্যান্টিবায়োটিক), ভাইরাস নিরোধক ( অ্যান্টিভাইরাল) অথবা ছত্রাক নিরোধক (অ্যান্টিফাঙ্গাল) ঔষধ ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও স্টেরয়েড এবং লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়।

রোগ-প্রতিরোধের উপায় :
মেনিনজাইটিস ছড়িয়ে পড়া রোধ করার কিছু উপায়- ক) ভালো করে হাত ধোয়া উচিত
খ) স্বাস্থ্যকর থাকুন
গ) কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় মুখ ঢাকা রাখুন
ঘ) গর্ভবতী মহিলাদের খাওয়ার অভ্যাস সম্পর্কে অতিরিক্ত সতর্ক হওয়া উচিত
ঙ) এছাড়াও, টিকা গ্রহণের কারণে মেনিনজাইটিস প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

জব বার্ন-আউট কী? জেনে নিন এর লক্ষণ

জব বার্ন-আউট কী? জেনে নিন এর লক্ষণ

যতদিন যাচ্ছে, যুগ যত বদলাচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রতিযোগিতা, বাড়ছে ব্যস্ততা। বর্তমানে প্রিয়জনের সাথে দেখা হওয়া, কথা বলা সবটাই আটকেছে মোবাইল ফোনে বা ইন্টারনেটে। অতীতের মতো এক জায়গায় বসে আড্ডা দেওয়া, একসাথে বসে খাওয়া-এগুলি আর হয় না বললেই চলে। এখন সবসময়ই মানুষ দৌড়চ্ছে লক্ষ্যের পিছনে, সাফল্যের পিছনে। এরফলে, প্রত্যেক মানুষই কোনও না কোনও সময় ক্লান্তি, একঘেয়েমি, দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্ণতা বা স্ট্রেসের স্বীকার হচ্ছে। আর এগুলিরই চূড়ান্ত পরিণতি হল বার্ন-আউট।

বার্ন-আউট কী ?
বার্ন-আউট হল একটি প্রক্রিয়া। এর ফলে, একজন মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে ক্লান্তি, একঘেয়েমি, দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্ণতা বা স্ট্রেসের লক্ষণগুলো জমা হতে থাকে। সচেতনতাই হল স্ট্রেস থেকে মুক্তির মূল চাবিকাঠি। স্ট্রেসে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক ভাবে এর থেকে মুক্তির পথ বেছে নেওয়া যায়। কিন্তু, বহু স্ট্রেসে আক্রান্ত হলে সহ্যক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। এইসময় মানুষ বার্ন-আউটে আক্রান্ত হয়। তখন সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা মাথায় আসে। বার্ন-আউট সবচেয়ে বেশি তাদেরই হয়, যারা নিজের কাজের প্রতি সবচেয়ে বেশি মনোযোগী ও নিবেদিত। বার্ন-আউটের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি হল ক্লান্তি, হতাশা, একঘেয়েমি, চাপ, অবসাদগ্রস্ত ইত্যাদি অনুভব করা।

জব বার্ন-আউট কী ?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বার্ন-আউটে তারাই আক্রান্ত হন, যারা নিজের পেশাগত বা ক্যারিয়ারগত সমস্যায় ভোগেন। একেই বলে জব বার্ন-আউট। এক্ষেত্রে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, একজন ব্যক্তি অনুভব করেন যে, তিনি তাঁর পেশায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, এগিয়ে যেতে পারছেন না, অথবা তিনি নতুন কোনও দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলতে পারছেন না, সহকর্মী বা বসের ব্যবহারে মানসিক চাপ বোধ হচ্ছে। তাঁর কাজটিও নিজের কাছে বিরক্তিকর এবং একঘেয়েমি মনে হতে পারে। এইরকম পরিস্থিতিতে আপনি পড়লে ধরে নিতে পারেন আপনি নিজের পেশায় বার্ন-আউট করে গিয়েছেন। চাকরি না পাওয়া এবং সঠিক ক্যারিয়ারের পথ বেছে না নিতে পারায়ও কেউ কেউ বার্ন আউট হয়ে পড়েন। এছাড়াও, এগুলির পাশাপাশি যদি কারও পারবারিক জীবনে অশান্তি হয়, তাহলে বার্ন-আউটের আকার ভয়াবহ হতে পারে ৷

জব বার্ন-আউটের লক্ষণ :
১. কাজের চাপে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচণ্ড ক্লান্ত, বিষণ্ণ, অবসাদগ্রস্ত, হতাশ
২. পেশাগত বা ক্যারিয়ারগত সমস্যা
৩. পেশায় ক্লান্তি, বিরক্তি, একঘেয়েমি
৪. সহকর্মীর সাথে খারাপ ব্যবহার
৫. পেশাগত কোনও সমস্যার সমাধান করতে না পারায়, ভেঙে পড়া
৬. কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলতে না পারা
৭. কর্মস্থলে জোর করে উপস্থিত থাকা
৮. সহকর্মী বা বসের ব্যবহারে মানসিক চাপ বোধ হওয়া, ইত্যাদি।

এইসব সমস্যার শুরু থেকেই যদি কাছের মানুষ বা বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করা হয় তাহলে সহজেই খুব কম সময়ের মধ্যে এর সমাধান হতে পারে ৷ তবে সাধারণত, মানুষ পারিবারিক সমস্যার চেয়ে পেশাগত সমস্যার কারণেই বেশি ভেঙে পড়ে বা অবসাদগ্রস্ত হয় ৷ এক্ষেত্রে, সমস্যার শুরু থেকেই সমাধান করা উচিত ৷ বসের সাথে কথা বলে আপনি আপনার সহায়ক শিডিউল বেছে নিতে পারেন। কাজের বাইরে আপনি যা পছন্দ করেন, তার জন্য সময় বের করে নিতে পারেন। চিকিৎসা করানো ও থেরাপিস্টের কাছে মাঝে মাঝে যেতে পারেন।

সিজোফ্রেনিয়া : কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা

সিজোফ্রেনিয়া : কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা

সিজোফ্রেনিয়া হল একপ্রকার জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ব্যাধি। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর চিন্তাধারা এবং অনুভূতির প্রকাশের মধ্যে সঙ্গতি থাকে না ৷ রোগী বাস্তবতার বোধ বা উপলব্ধি হারিয়ে ফেলে, প্রায়ই হ্যালুসিনেশনে ভোগে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিক বা কর্মক্ষেত্রে অক্ষমতাজনিত অসুবিধার সম্মুখীন হন ৷

সিজোফ্রেনিয়ার প্রকারভেদ :
সিজোফ্রেনিয়া বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে, যথা – প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া, হেবিফ্রেনিক সিজোফ্রেনিয়া, ক্যাটাটনিক সিজোফ্রেনিয়া, সিম্পল সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি। ১) প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া : এক্ষেত্রে, কোনও ব্যক্তির নির্দিষ্ট কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস বা ধারণা, বিভ্রান্তি থাকতে পারে, হ্যালুসিনেশন হয়, যার সাথে বাস্তবতার কোনও সম্পর্ক নেই। যেমন- এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বিশ্বাস করতে পারে যে, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর লোকেরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, কেউ তাকে বিরক্ত করছে।
২) হেবিফ্রেনিক সিজোফ্রেনিয়া : এর মূল বৈশিষ্ট্য হল, এতে আক্রান্ত রোগীরা অগোছালো চিন্তাভাবনা এবং বিশৃঙ্খল আচরণ করে। এক্ষেত্রে রোগীর সাধারণত অসংলগ্ন এবং অযৌক্তিক চিন্তাভাবনা থাকে। এটি দৈনিক ক্রিয়াকলাপ যেমন রান্না করা, খাওয়া, নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া ইত্যাদিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
৩) ক্যাটাটনিক সিজোফ্রেনিয়া : এই ধরনের সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী শারীরিকভাবে অদ্ভুত আচরণ করতে পারে, হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে রোগীর পেশি চালনার ভঙ্গি অস্বাভাবিক হ​য়, যেমন- হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ থেমে যাওয়া, নিশ্চুপ হয়ে অদ্ভুত ভাবে বসে থাকা,অকারণে মারামারি, অন্যরা যা বলছে তা বারবার বলা, ইত্যাদি।
৪) সিম্পল সিজোফ্রেনিয়া : এক্ষেত্রে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণগুলি হালকা হয় এবং উগ্রতা প্রদর্শন করে না। যেমন- দুর্বল স্বাস্থ্যবিধি এবং অন্যান্য ছোটখাটো শারীরিক ও মানসিক সমস্যা।

সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ :
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণগুলি হল হ্যালুসিনেশন, ভুল ধারণা, অবাস্তব চিন্তাভাবনা, অকারণ সন্দেহ, বিভ্রান্তি, বিড়ম্বনা ইত্যাদি।

সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত সব রোগীর লক্ষণ এক হয় না। লক্ষণগুলি রোগীর ওপর নির্ভর করে। কোনও কোনও রোগীর ক্ষেত্রে এই রোগের লক্ষণগুলি কয়েক মাস বা বছর ধরে ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করতে পারে বা হঠাৎ করে দেখা দিতে পারে। এই রোগের কিছু লক্ষণ হল-
ক) রোগী এমন কিছু শুনতে পায় বা দেখতে পায় যেটা বাস্তবে থাকে না
খ) কথা বলা বা লেখায় অদ্ভুত বা অযৌক্তিক ধরন, আচরণ
গ) গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে উদাসীন বোধ করা
ঘ) পড়াশুনায় বা বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে অদ্ভুত পরিবর্তন
ঙ) ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি এবং চেহারায় পরিবর্তন
চ) অযৌক্তিক, রাগ বা প্রিয়জনদের প্রতি ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া
ছ) ঘুমে ব্যাঘাত ঘটা
জ) অনুপযুক্ত বা অদ্ভুত আচরণ

এই রোগীরা সকলেই প্রায় বাস্তবজগত থেকে বিচ্ছিন্ন। কারও কারও কথাবার্তায় প্রথম থেকেই স্বাভাবিকতা ও বাস্তববিমুখীনতার পরিচয় পাওয়া যায়। হ্যালুসিনেশন এবং ডিলিউশন যাদের থাকে তাদের সাধারণ মানুষই অস্বাভাবিক এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে উন্মাদ বলে বুঝতে পারে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগীর অসাধারণ জ্ঞান বাড়ির লোকেদের বিস্মিত করে, তাঁরা রোগীকে নিয়ে গর্বিত রোধ করেন। সিজোফ্রেনিয়ার পজিটিভ উপসর্গগুলি হল-

ডিলিউশন : এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত ভুল ধারণা বা বিশ্বাস বহন করে, যার সাথে বাস্তবের কোনও মিল থাকে না। যেমন- কেউ তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে।
হ্যালুসিনেশন: এমন কিছু দেখা, অনুভব করা, স্বাদ গ্রহণ, শ্রবণ বা গন্ধ পাওয়া যার আসলেই বাস্তবে কোনও অস্তিত্ব নেই। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অবাস্তব জিনিস অনুভব করে।
বিশৃঙ্খল চিন্তাভাবনা এবং কথাবার্তা: এক্ষেত্রে রোগী খুব আকস্মিকভাবে একটি বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে যায়। রোগীরা বারবার কোনও কথা, শব্দ বা ছড়া পুনরাবৃত্তি করতে পারে।
বিশৃঙ্খল আচরণ: এক্ষেত্রে রোগীর মধ্যে স্বাস্থ্যকর আচরণে সমস্যা হয়। যেমন- খুব দ্রুত চিন্তাধারা বদলানো, ভুলে যাওয়া, কোনও সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির পুনরাবৃত্তি, শব্দ বা অনুভূতি ঠিক মতো বুঝতে না পারা ইত্যাদি।

সিজোফ্রেনিয়ার কারণ :
এই রোগের সঠিক কারণ জানা যায়নি। তবে, যে যে কারণগুলিকে এই রোগের জন্য দায়ী করা হয়, সেগুলি হল-
ক) জেনেটিক বা বংশগত এই রোগ থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও দেখা যায়। বাবা, মা-এর মধ্যে কারুর এই রোগ থাকলে সন্তানেরও হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
খ) ভাইরাস সংক্রমণ, মানসিকভাবে অত্যন্ত চাপগ্রস্থ পরিস্থিতি, ইত্যাদির কারণে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
গ) মস্তিষ্কে রাসায়নিক উপাদানের ত্রুটি এবং নিউরোকেমিক্যাল উপাদানে কোনও ঘাটতি হলে এই রোগ হয়।
ঘ) জন্মকালীন কোনও জটিলতা থাকলেও এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঙ) গর্ভাবস্থায় কোনও মা যদি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন এই রোগ হতে পারে।
চ) কিছু উত্তেজক মাদকদ্রব্য এবং ওষুধ এই রোগের কারণ।

এই রোগের চিকিৎসা :
এই রোগের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এই চিকিৎসার প্রধান মাধ্যম হল অ্যান্টিসাইকোটিক ঔষুধ। এটি বিভিন্ন উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি, বিভিন্ন থেরাপি ও মনোচিকিৎসাও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন মানসিক চিকিৎসা দ্বারা এর বিভিন্ন উপসর্গকে ভালো করা যায় এবং রোগীর সামাজিক সহায়তাও প্রয়োজন হয়।
এছাড়া, রোগীকে অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে তার মাথায় ইলেকট্রোড লাগানো হয় এবং ছোটো কারেন্টের শক দেওয়া হয়। এতেও রোগীর মানসিক অবস্থা এবং চিন্তার উন্নতি হয়।

অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম :      কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা

অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম : কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা

অতিক্রান্ত হচ্ছে সময়। এগোচ্ছে মানব সভ্যতা। শিক্ষা সংস্কৃতি থেকে প্রযুক্তিগত দিক, কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত হচ্ছে সবকিছুর। বর্তমান মানব সভ্যতার এই উন্নতি অনেকাংশে এগিয়ে দিচ্ছে সারা বিশ্বকে। কিন্তু সবকিছুর উন্নতি হলেও মানুষের দৈহিক রোগ কিন্তু পিছু ছাড়ছে না। মনুষ্যজাতির অগ্রসরে কোথাও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিভিন্ন শারীরিক রোগগুলি। সম্পর্ক, কাজকর্ম ও সামাজিক মেলামেশার উপরেও প্রভাবিত হচ্ছে শারীরিক রোগ। আজ আমরা এরকম একটি রোগ সম্পর্কে আলোচনা করব। যার নাম ‘অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম’।

অস্ট্রীয় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ হ্যান্স অ্যাসপারগার এর নামানুসারে এই লক্ষণসমূহের নামকরণ হয়েছে। এটি একটি স্নায়ুগত বিশৃঙ্খলাজনিত রোগ লক্ষণ সমষ্টি। যাকে ইংরেজিতে Autism Spectrum Disorder বা ASDs বলে। অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম হল অর্টিজম স্পেক্ট্রামের অংশ। যাকে বলে ‘নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার’। অর্টিজম স্পেকট্রাম থাকার কোন দৃষ্টিগোচর বৈশিষ্ট্য নেই তাই তাকে “গোপন অক্ষমতা” বলা হয়। এরা সাধারণত প্রবল উদ্দীপকের অনুভূতি সহ্য করতে পারে না এবং প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। বাস্তব জীবনে চলবার জন্য প্রয়োজনীয় নানা দক্ষতার অভাব দেখা যায়।

সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতবর্ষের তুলনায় বাইরের দেশে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের ২০১৪ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী প্রতি ৬৮ জন নবজাতকের মধ্যে ১জন অ্যাসপারগার সিন্ড্রোমে আক্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১.১ শতাংশ মানুষের অটিজম স্পেকট্রামে রয়েছে। আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী উল্লেখ্য, প্রতি হাজারে ১-২ জনের অর্টিজম এবং এক হাজারে ৬ জন এ এস ডি(ASDs) রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

রোগের কারণ
এই রোগের প্রকৃত কারণ কিন্তু এখনও পর্যন্ত অজ্ঞাত। তবে, মেয়েদের তুলনায় পুরুষদের এই রোগ বেশি হয়। তবে প্রাথমিকভাবে বলা যায়-
১) জিনগত, পরিবেশগত ও পরিবার গত কারণে এগুলি দেখা দেয়।
২) গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত নেশা করা বা রাসায়নিক বিক্রিয়ার সম্মুখীন হওয়া বা ভাইরাসঘটিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণেও হতে পারে।
৩) সেবন করা কিছু ওষুধ থেকেও এই রোগ হতে পারে। যেমন,ভ্যাল্প্রোইক অ্যাসিড এবং থ্যালিডোমাইড (এটি গর্ভাবস্থায় খাওয়া হয়)।
৪) বিলম্বিত গর্ভধারণের ফলেও শিশুর অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম হওয়ার বিপদ বেড়ে যায়। ৫) বয়ঃবৃদ্ধির সময়ে সামাজিক সংকেত বুঝতে না পারার ফলে বা অন্যের সাথে আলাপচারিতায় জড়তা হওয়ার ফলে জন্মানো হতাশা, উদ্বিগ্নতা ও কি করতে হবে তা বুঝতে না পারার ক্ষমতা থেকেও এই লক্ষণ সমষ্টি প্রকাশ পায়।

লক্ষণ
এই রোগের যে লক্ষণগুলি দেখে বোঝা যায় কোনও শিশু বা ব্যাক্তি অ্যাসপারগারে আক্রান্ত, সেগুলি হল-
১) জন্মের পর প্রথম বছর বয়সের মধ্যে শিশুদের এই ধরনের রোগ লক্ষণ সমষ্টি প্রকাশ পেয়ে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। সঠিক বা প্রত্যাশিত সামাজিক আচরণ করতে এরা ব্যর্থ হয়। অন্যের মনের অবস্থা বোঝার ক্ষমতার অভাব দেখা দেয়।
২) অস্বাভাবিক কথাবার্তা বলা ও কোনও কিছুর প্রতি নিবিড়ভাবে আগ্রহের অভাব।
৩) একটি জিনিস বা ধারনাকে বোঝানোর জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বর্ণনা প্রদান করা।
৪) ক্ষেত্র অনুযায়ী স্বরের উচ্চতা নীচতা ব্যবহারের ও মুখের ভাব-ভঙ্গি বোঝা বা বোঝানোর অভাব।
৫) চোখ বা মুখের দিকে চেয়ে কথা না বলা।
৬) একই ধরনের বাধা দেওয়া কাজ বারংবার করা বা একই কথা বারবার বলা ইত্যাদি এই রোগের লক্ষণ।
৭) এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শিখন-এর সমস্যা থাকতে পারে। সুনির্দিষ্ট কিছু কাজ কিংবা বিষয়ে প্রবল আকর্ষণ থাকতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রখর ও দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিশক্তি থাকতে পারে। যেমন- এই ধরনের শিশুর কোনো যান্ত্রীক মডেলের সম্পর্কে আগ্রহ থাকলে সে হয়ত অগুনতি যান্ত্রীক মডেলের নাম্বার এবং বিবরণ সহজেই শিখে ফেলতে পারে। কিন্তু অন্য অনেক সাধারণ কাজ এরা করে-উঠতে পারে না।
৮)জীবনযাত্রার বা পড়াশোনার পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটানো হলে অ্যাসপারগারে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রবল সমস্যা হয় এবং শিক্ষার্থীর বিকাশেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উল্লেখ্য, অ্যাসপারগারে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অনেক সময় আক্রমণাত্মক বলে মনে করা হয়ে থাকে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে অ্যাসপারগারের লক্ষণে আক্রান্ত মানুষ সাধারণতঃ অন্যকে আক্রমণ করেনা, বরং অন্যের সামাজিক অত্যাচার সহ্য করে থাকে।

চিকিৎসা
এই রোগের তেমন কোনও ঔষধগত (Medicinal Treatment) চিকিৎসা নেই। তবে এই রোগের উদ্বিগ্নতা কমানোর ঔষধ ব্যবহার করা যেতে পারে। দৈনিক ভিটামিনযুক্ত খাবার ও মৎস্য তেল (Fish oil) খাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এছাড়া আকুপাংচার (Acupunctere) , স্পীচ থেরাপির সাহায্যে ভাব আদান-প্রদানের দক্ষতা বাড়ান, মিউজিক থেরাপি ও ম্যাসাজ এই প্রবণতা দূর করার সহায়ক হতে পারে। এই রোগ সারিয়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় দায়িত্ব নিতে হয় মূলত বাবা-মা বা রোগীর সহচার্যে থাকা সকলকেই। রোগীকে ক্ষেত্রনুযায়ী উপযুক্ত কথা বলা শেখানো, সামাজিক মেলবন্ধন তৈরি করার প্রবণতা বাড়ানো, কথা বলার কৌশল ও বলার সময় মুখের ভঙ্গিমা ঠিক করার কৌশল নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শারীরিক, সামাজিক, ব্যবহারিক শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই রোগ সম্পূর্ণভাবে ঠিক করা যায়না। তবে পারস্পারিক সহযোগিতা, বোঝাপড়া এবং সঠিক প্রশিক্ষণ রোগীকে দীর্ঘসময় সুস্থ ও উন্নত জীবনযাপন করতে সাহায্য করে।

কারপাল টানেল সিন্ড্রোম : কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

কারপাল টানেল সিন্ড্রোম : কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

কারপাল টানেল সিন্ড্রোম একটি সাধারণ অবস্থা, যা কব্জির প্রদাহজনিত রোগ। এক্ষেত্রে হাতের কব্জি, হাতের তালু ও আঙুলগুলো অসাড় হয়ে যায়, ব্যথা, ঝিনঝিন করে, কখনও ফুলে যায়। হাতের তালুকে কারপাল টানেল বলা হয়ে থাকে। কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম এক হাতে বা উভয় হাতেই হতে পারে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, কারপাল টানেল সিন্ড্রোম সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ দিকে যায় এবং স্নায়ুর ক্ষতি করে। মেয়েদের মধ্যে এই সমস্যার প্রবণতা বেশি হয়। বিশেষ করে, গর্ভাবস্থায় প্রায়ই এই সমস্যা প্রকট আকারে দেখা দেয়। কারপাল টানেল সিনড্রোমের কারণ এটি মিডিয়ান স্নায়ুতে চাপের কারণে ঘটে এবং অতিরিক্ত প্রদাহের কারণে ফুলে যায়।

কারপাল টানেল সিনড্রোমের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সাধারণ কারণ হল-
ক) উচ্চ রক্তচাপ
খ) গর্ভকালীন সময়ে ও মেনোপজের পর নারীদের এই সমস্যা বেশি হতে পারে
গ) থাইরয়েডের সমস্যা
ঘ) ডায়াবেটিস
ঙ) কব্জিতে কোনও সমস্যা
চ) অটোইমিউন ডিসঅর্ডারস (আর্থ্রাইটিস)
ছ) কী বোর্ড বা মাউস ব্যবহার করার সময় কব্জি বিশৃঙ্খল ভাবে রাখা
জ) দীর্ঘ সময় ধরে বারবার একই কাজ
ঝ) চাপ দিয়ে কাজ করা
ঞ) কিছুজনের ক্ষেত্রে এটি বংশগত হতে পারে কারপাল টানেল সিনড্রোমের লক্ষণ

কারপাল টানেল সিনড্রোমের প্রথম লক্ষণ হল,
কব্জিসন্ধিতে ব্যাথা বা অস্বস্তী লাগা, বেশী সময় কাজ করতে না পারা। হাতের পেশীতে খুব ঘন ঘন ব্যাথা হওয়া এবং হাত অসাড় মনে হওয়া, হাতে শক্তি না পাওয়া। অন্যান্য লক্ষণগুলি হল –
ক) হাতে ব্যথা এবং জ্বালা অনুভব করা
খ) আপনার হাতের আঙুলে অসাড়তা এবং ব্যথা
গ) হাতের পেশীগুলিতে দুর্বলতা
ঘ) রাতে কব্জি ব্যথা যা ঘুমের ব্য়াঘাত ঘটায়

কারপাল টানেল সিনড্রোমের ঝুঁকি
ক) মহিলাদের এই সিনড্রোম হওয়ার সম্ভাবনা তিনগুণ বেশি থাকে পুরুষদের তুলনায়।
খ) এই অবস্থাটি সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যে দেখা যায়।
গ) লাইফস্টাইল এবং অভ্যাস যেমন বেশি লবণ গ্রহণ, ধূমপান, হাই বডি মাস ইনডেক্স (BMI) কারপাল টানেল সিনড্রোমের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ঘ) ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং বাতের কারণে বেশি হতে পারে।
ঙ) দীর্ঘ সময় ধরে বারবার একই কাজ করার কারণেও এর ঝুঁকি বাড়ে।

কারপাল টানেল সিন্ড্রোমের নির্ণয়
এই চিকিৎসার ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসক সর্বপ্রথম রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস সম্পর্কে জানেন তারপর শারীরিক পরীক্ষা করেন। শারীরিক পরীক্ষাটি হাত, কব্জি, কাঁধ এবং ঘাড়ের উপর হয়ে থাকে। হাতের পেশীগুলির, আঙ্গুলগুলির শক্তিও পরীক্ষা করা হয়।

কারপাল টানেল সিনড্রোমের চিকিৎসা
এই অবস্থায় লক্ষণগুলির তীব্রতা এবং ব্যথার মাত্রার উপর নির্ভর করে চিকিৎসা করা হয়। এই রোগের উপষমের জন্য শল্যচিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপি এবং আরও অন্যান্য ধরনের চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসার কয়েকটি বিকল্পের নিম্নরূপ –
ক) স্টেরয়েড
খ) ফিজিওথেরাপি
গ) অকুপেশনাল থেরাপি
ঘ) যোগা বা শরীরচর্চা
ঙ) আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি
চ) সার্জারি

যদি কাজ করার সময় আপনার হাতগুলি বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে তবে প্রতি ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য বিরতি নিন এবং আপনার হাত প্রসারিত করুন, হাতের ভঙ্গিতে মনোযোগ দিন। এগুলি ছাড়াও এমন কিছু ক্রিয়াকলাপ এড়িয়ে চলুন যা আপনার কব্জিকে এই সিন্ড্রোমের দিকে ঠেলে দেয়।

 

শিগেলোসিস : কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

শিগেলোসিস : কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত শিগেলোসিস বা রক্ত আমাশয় আমাদের হজম ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। এটি শিগেলা নামক একটি ব্যাকটেরিয়ার গোষ্ঠীর দ্বারা হয়। শিগেলা দূষিত জল এবং খাবার বা দূষিত মলের মাধ্যমে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শিগেলা সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে, যদিও এটি যেকোনও বয়সেই হতে পারে। সাধারণত ছোটো বাচ্চাদের মধ্যে দেখা যায় কারণ তারা প্রায়ই নিজেদের আঙ্গুলগুলি মুখে ঢুকিয়ে রাখে। তাই, ব্যাকটিরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

শিগেলোসিসের লক্ষণসমূহ
এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হল ডায়রিয়া। ব্যাকটেরিয়া সংস্পর্শে আসার এক বা দুই দিন পর থেকে লক্ষণগুলি দেখা দেয়। তবে, এটি বিকাশ হতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নিতে পারে। শিগেলোসিসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলি হল-
ক) ডায়রিয়ার সাথে প্রায়ই রক্ত ​​বা শ্লেষ্মা বেরোয়
খ) জ্বর
গ) পেটে ব্যথা বা টান অনুভব করা
ঘ) বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া

শিগেলোসিসের কারণ
ব্যাকটিরিয়া যখন আমাদের পাচন পদ্ধতিতে প্রবেশ করে তখন সংক্রমণটি বিকাশ লাভ করে। ব্যাক্টেরিয়াগুলি বিষক্রিয়া ছড়াতে থাকে যার কারণে অন্ত্র জ্বালা করে। এর কারণগুলি হল –
ক) হাত না ধুয়ে খাওয়া বা মুখে ছোঁয়া
খ) দূষিত খাবার খাওয়া
গ) দূষিত জল পান করা

শিগেলোসিসের ঝুঁকির কারণ
ক) বয়স
খ) শিগেলা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে সংস্পর্শে আসার ফলে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গ) বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া হয় এইরকম কেন্দ্রগুলিতে, কমিউনিটি ওয়েডিং পুল, নার্সিংহোম, জেল ইত্যাদিতে শিগেলার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।
ঘ) স্যানিটেশনের অভাব রয়েছে এমন অঞ্চলে থাকা।

শিগেলোসিসের নির্ণয়
এই অবস্থার প্রাথমিক লক্ষণ হল ডায়রিয়া, যা অন্যান্য ডিজিজকেও চিন্হিত করতে পারে। রোগীর শিগেলোসিস হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে একজন চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস ও বিভিন্ন পরীক্ষা করেন। শিগেলা ব্যাকটিরিয়া বা টক্সিনের উপস্থিতির জন্য চিকিৎসক রোগীর মল পরীক্ষা করারও পরামর্শ দেন।

শিগেলোসিসের চিকিৎসা
এই সংক্রমণ সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে চলে। এর চিকিৎসাগুলি হল –
ক) তীব্র শিগেলা সংক্রমণের ক্ষেত্রে, অ্যান্টিবায়োটিকগুলি অসুস্থতার সময়কাল হ্রাস করতে সাহায্য করতে পারে। তবে, চিকিৎসকরা অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের বিরুদ্ধে পরামর্শ দেন কারণ কিছু শিগেলা ব্যাকটিরিয়া ড্রাগ-প্রতিরোধী তাই কেবল সংক্রমণ তীব্র হলেই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
খ) স্বাস্থ্যকর প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, ডায়রিয়ার নানান প্রভাবগুলি প্রতিরোধ করার জন্য জল পান করা যথেষ্ট। বাচ্চারা ওরাল রি-হাইড্রেশন সমাধান থেকে উপকৃত হতে পারে। গুরুতরভাবে ডিহাইড্রেটেড ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন।

শিগেলোসিস প্রতিরোধ
শিগেলার ভ্যাকসিন তৈরির জন্য এখনও গবেষণা চালানো হচ্ছে। তবে, এইমূহূর্তে চিকিৎসকরা এই অবস্থার সূত্রপাত রোধ করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলির পরামর্শ দেয়- ক) ছোটো বাচ্চাদের হাত ধোওয়ার সময় খেয়াল রাখুন
খ) ঘন ঘন, ভাল ভাবে হাত ধোবেন
গ) দূষিত পুকুর, সুইমিং পুল এড়িয়ে চলুন
ঘ) ডায়রিয়ায় আক্রান্ত এমন ব্যক্তির সঙ্গে যৌন ক্রিয়াকলাপ এড়িয়ে চলুন
ঙ) আপনার ডায়রিয়া হলে অন্যের জন্য খাবার প্রস্তুত করবেন না
চ) ব্যবহৃত ডায়াপার সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করুন

ভ্যারিকোস ভেইন : কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা

ভ্যারিকোস ভেইন : কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা

জাগতিক ও প্রাকৃতিকগত কারণে মানুষ বর্তমানে বিভিন্ন রোগ ব্যাধীর সম্মুখীন হচ্ছে। তেমনই এক রোগ ভ্যারিকোস শিরা বা ভ্যারিকোস ভেইন। এই রোগের ফলে, শিরাগুলি বৃহৎ আকারে ফুলে যায় এবং পাকানো শিরাগুলি সাধারণত আমাদের পা-কে প্রভাবিত করে। অনুমানিক প্রায় ২৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্করা ভ্যারিকোস শিরা দ্বারা আক্রান্ত হন। তবে, মহিলাদের মধ্যে এই রোগের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কি এই রোগ, কেনই বা হয়, এর প্রকৃত কারণ কী, এই সমস্ত উত্তর পেতে পড়ুন আজকের নিবন্ধটি।

Varicose Veins

ভ্যারিকোস ভেইন কি ও কেন হয়? ভ্যারিকোস ভেইন হল রক্তনালীর একটি সাধারণ রোগ। ত্বকের নীচে জন্মানো ফোলা ও প্যাঁচানো শিরাকে ভ্যারিকোস ভেইন বলে। এই রোগ শরীরের যেকোনও অংশেই দেখা দিতে পারে। তবে, সাধারণত পায়ে ভ্যারিকোস ভেইন দেখা দেয়। মানব দেহের পায়ের শিরাগুলি দুই সারিতে বিভক্ত থাকে। এই দুই সারির মাঝে থাকে সংযোগকারী আন্তঃশিরা। এই শিরাগুলির একমুখী ভালভ্ রয়েছে, যার অর্থ রক্ত কেবল এক দিকে ভ্রমণ করতে পারে। রক্ত প্রবাহকালে কোনও কারণে যদি শিরার রক্ত নিয়ন্ত্রণকারী ভাল্ব ঠিকমতো কাজ না করে কিংবা গাত্রগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রক্ত পিছনের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রক্ত হৃদপিণ্ডে ভ্রমণের পরিবর্তে শিরাগুলিতে সঞ্চারিত হতে থাকে। ফলস্বরূপ, রক্তনালিগুলি ফুলে ওঠে এবং প্রসারিত হয়। একেই ‘ভ্যারিকোস ভেইন’ বলে।

ভ্যারিকোস ভেইন-এর লক্ষণগুলি
১) শিরাগুলির আকার বড় হয় এবং ফুলে যায়।
২) গাঢ় বেগুনি বা নীল রঙের শিরার জন্ম নেয়।
৩) ত্বকে ক্ষতর সৃষ্টি হয়।
৪) সারা শরীরে ব্যথা এবং অস্বস্তি অনুভব হয়।
৫) পায়ে অসহ্য ব্যথা হয়।
৬) পায়ের মাংসপেশীতে টান ধরা বা খিঁচুনি হওয়া।
৭) পায়ের পাতায় বা পায়ের ত্বকে ইনফেকশনের লক্ষণ দেখা দেয় এবং পায়ে শক্ত পিন্ড দেখা দেয়।
৮) পায়ের ত্বকের চারপাশে ফুসকুড়ি ও লালচে ভাব হতে পারে। ৯) দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার বা দাঁড়িয়ে থাকার পরে চরম ব্যথা অনুভব হওয়া।

ভ্যারিকোস ভেইনের ঝুঁকির কারণগুলি
১) বার্ধক্যজনিত কারণ – বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভ্যারিকোস ভেইনে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা দেয়। কারণ, বার্ধক্যজনিত কারণে শিরার ভালভ্ দুর্বল হয়ে পড়ে।
২) লিঙ্গ – মহিলাদের ক্ষেত্রে এই রোগের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায়, মাসিকের আগে বা মেনোপজের সময় হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। কারণ, মহিলাদের হরমোন শিরার প্রাচীরকে শিথিল করে। এছাড়াও, জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ি গ্রহণের ফলে ভ্যারিকোস ভেইন হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
৩) পারিবারিক ইতিহাস – যদি আপনার পরিবারের সদস্যদের ভ্যারিকোস ভেইন থাকে তবে আপনারও সেটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
৪) স্থূলতা – স্থূলত্বের কারণে শিরাগুলিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
৫) গর্ভাবস্থা – যখন কোনও মহিলা গর্ভবতী হন, তখন দেহে রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা সেই মহিলার পায়ে ফোলা শিরা সৃষ্টি করতে পারে।
৬) দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা – আপনি যদি দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন বা বসে থাকেন তবে রক্ত ভালভাবে প্রবাহিত করতে অক্ষম হয় যার কারণে ভ্যারিকোস ভেইনের দেখা দেয় ।

চিকিৎসা
নিজের যত্ন নেওয়া এবং সংক্ষেপণ স্টকিংস হল ভ্যারিকোস ভেইন এর চিকিৎসা পদ্ধতি। যদি এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলির সাথে অবস্থার উন্নতি না হয় তবে, চিকিৎসক নিম্নলিখিত চিকিৎসা বিকল্পগুলির পরামর্শ দেবেন –
স্ক্লেরোথেরাপি (Sclerotherapy) – এটি একটি দ্রবণ। সাধারণত একটি লবণের সমাধান। এর মাধ্যমে সরাসরি শিরায় ইনজেকশনের ব্যবস্থা করা হয়। এটি রক্তনালীগুলিকে নাড়া দেয় এবং রক্তকে স্বাস্থ্যকর শিরাগুলির মাধ্যমে ভ্রমণ করতে বাধ্য করে। দাগযুক্ত শিরাটি স্থানীয় টিস্যুতে পুনরায় সংশ্লেষিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত এটি ম্লান হয়ে যায়।
লেজারের চিকিৎসা (Laser treatment) – এই চিকিৎসা পদ্ধতিটির সাহায্যে ছোট ভ্যারিকোস ভেইন বন্ধ করতে ব্যবহৃত হয় এবং এটি ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে যায় ও অদৃশ্য হয়।
অ্যাম্বুলেটরি ফ্লেবেক্টোমি (Ambulatory phlebectomy) – এর মাধ্যমে ছোট ছোট শিরাগুলিকে ত্বকের পাঙ্কচারের মাধ্যমে মুছে ফেলা হয়।
ক্যাথেটার-সহায়তা পদ্ধতি (Catheter-assisted procedures) – একটি পাতলা টিউব একটি বড় শিরাতে প্রবেশ করানো হয় এবং ক্যাথেটার টিপটি রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি বা লেজার শক্তির মাধ্যমে গরম করা হয়। ক্যাথেটারটি বার করার সময় তাপটি শিরাটিকে ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে এটি ভেঙে যায়।

রোগ প্রতিরোধ
১) নিয়মিত শরীরচর্চা ও ব্যায়ামের করুন। পায়ের রক্ত চলাচলকে বৃদ্ধি করতে রোজ হাঁটুন। ২) শরীরের ওজন কমান ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হন। কম লবণযুক্ত খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস করুন।
৩) উঁচু হিলযুক্ত জুতা ব্যবহার করবেন না। সমান আকৃতির জুতো পরুন, যাতে কাফ মাসলের ক্রিয়াশীলতা বৃদ্ধি পায়, যা শিরার জন্য উপকারী।
৪) কোমর, পায়ে,হাতে ও কুঁচকিতে আঁটোসাঁটো কিছু পরবেন না, যাতে রক্ত চলাচলে সমস্যা দেখা না দেয়।
৫) দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকবেন না।
৬) বেশিক্ষণ পা ভাঁজ করে বসবেন না।

 

‘পলিসিস্টিক ওভারি’ একটি নারীদের রোগ ।

‘পলিসিস্টিক ওভারি’ একটি নারীদের রোগ ।

সাধারণত ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS) হতে দেখা যায়। PCOS-এ আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে পুরুষ হরমোন অ্যান্ড্রোজেনের লেভেল অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে মহিলাদের মধ্যে একটি একটি সাধারণ ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে, মহিলাদের ডিম্বাশয়ে সিস্ট দেখা দেয়। সাধারণত এই রোগের কারণ হিসেবে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অগোছালো জীবনযাত্রাকেই দায়ী করা হয়। যাদের PCOS হয় তাদের গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদিও চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা যায়, কিন্তু কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি আছে যেগুলি অনুসরণ করলেও এর থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

মেথি
মেথি ইনসুলিনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে, মেথি শরীরের গ্লুকোজ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায় যা ওজন কমাতে সহায়তা করে। মেথি বীজ সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখুন এবং সকালে খালি পেটে পান করুন। মেথি বীজ পিসিওএস নিয়ন্ত্রণেও খুব উপকারি।

মেথি

মধু
আমরা সবাই জানি যে, মধু আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারি। মধু গ্রহণের মাধ্যমেও পিসিওএস নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এক চামচ মধু, লেবু, হালকা গরম জলে মিশিয়ে সকালে খালি পেটে পান করুন। এটি PCOS-এর অবস্থার উন্নতি করার পাশাপাশি ওজন কমাতেও সহায়তা করে।

মধু

ফ্ল্যাক্সসিড
ফ্ল্যাক্সসিড ফাইবার, ওমেগা-৬ এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ। শরীরে অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের আধিক্য, অর্থাৎ যে কারণে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম দেখা দেয়, ফ্ল্যাক্সসিড তা কম করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি কোলেস্টেরল এবং উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করে। এই বীজ জলে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে তারপর পান করতে পারেন এবং এটি গুঁড়ো করে সকালে খালি পেটে জলে মিশিয়েও খেতে পারেন।

ফ্ল্যাক্সসিড

দারুচিনি
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য দারুচিনি অত্যন্ত উপকারি। এটি ব্লাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া, দারুচিনি PCOS নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করতে পারে। দই এবং মিল্কশেকের সাথে এটি খাওয়া যেতে পারে। এক গ্লাস গরম জলে এক চা চামচ দারুচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে পান করুন।

দারুচিনি

দুধ চায়ের জায়গায় খাওয়া শুরু করুন টার্মারিক টি!

দুধ চায়ের জায়গায় খাওয়া শুরু করুন টার্মারিক টি!

সারা বিশ্বের মধ্যে যে কটা দেশে প্রথম বারের জন্য চা পানের রেওয়াজ শুরু হয়েছিল তার মধ্যে এদেশের স্থান ছিল একেবারে উপরের দিকে। কারণ চা নামক যে একটা পানীয় রয়েছে সে নিয়ে প্রচার শুরু হয়েছিল ভারতের মাটি থেকেই। তাই প্রতিটি ভারতীয়ের সঙ্গেই চায়ের সম্পর্কটা যে বেশ গভীর, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এই কারণেই শুধু বাঙালির নয়, প্রতিটি ভারতবাসীরই হুলদ গুঁড়ো দিয়ে বানানো চায়ের উপরকারিতা সম্পর্কে জানা উচিত। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে এক কাপ ফোটানো জলে পরিমাণ মতো হলুদ গুঁড়ো, তার সঙ্গে মধু এবং অল্প করে আদা মিশিয়ে পান করলে শরীরে ভিটামিন সি সহ অন্যান্য ভিটামিনের প্রবেশ তো ঘটেই। সেই সঙ্গে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, পটাসিয়াম সহ আরও নানাবিধ মিনারেলের ঘাটতি দূর হয়। ফলে শরীর এতটাই চাঙ্গা হয়ে ওঠে যে ছোট-বড় একাধিক রোগ ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না। সেই সঙ্গে আরও একাধিক উপকার পাওয়া যায়। যেমন ধরুন…

১. ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে:

১. ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে: একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত হলুদ গুঁড়ো দিয়ে বানানো চা পান করা শুরু করলে শরীরে কার্কিউমিন নামক উপাদানের প্রবেশ ঘটে, যা শরীর থেকে টক্সিক উপাদানদের বার করে দেওয়ার পাশাপাশি হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটানোর মধ্যে দেহের ইতিউতি জমে থাকা মেদকে ঝরিয়ে ফলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে সময় লাগে না। তাই তো বলি বন্ধু, অল্প সময়ে যদি মেদ ঝরাতে চান, তাহলে রোজের ডায়েটে টার্মারিক টিকে জায়গা করে দিতে ভুলবেন না যেন!

২. দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটে:

২. দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটে: একেবারে ঠিক শুনেছেন বন্ধু! চোখের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাস্তবিকই টার্মারিক টি বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আসলে হলুদের অন্দরে উপস্থিত বেশ কিছু উপকারি উপাদান, শরীরে প্রবেশ করার পর এমন খেল দেখায় যে রেটিনার ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন কমে, তেমনি চোখে প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে যাতে অন্ধত্বের মতো ভয়ঙ্কর কিছু না ঘটে, সেদিকেও খেয়াল রাখে। তাই তো বলি বন্ধু, যারা দিনের মধ্যে ৮-৯ ঘন্টা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করুন, তাদের নিয়ম করে হলুদ গুঁড়ো দিয়ে বানানো চা পান করা উচিত।

৩. রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে:

৩. রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে: বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে হলুদে উপস্থিত কার্কিউমিন রক্তে জমতে থাকা এল ডি এল বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ফলে স্বাভাবিভাবেই হার্টের কোনও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়। আসলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা যত কমতে শুরু করে, তত হার্টের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে। সেই সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনাও হ্রাস পায়।

৪.ক্যান্সারের মতো মারণ রোগ দূরে থাকে:

৪.ক্যান্সারের মতো মারণ রোগ দূরে থাকে: সম্প্রতি প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুসারে হলুদে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি প্রপাটিজ, শরীরে যাতে ক্যান্সার সেল জন্ম নিতে না পারে সেদিকে খেয়াল করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্যান্সার রোগ ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না। এবার নিশ্চয় বুঝতে পরেছেন হলুদ চা খাওয়া কতটা প্রয়োজন।

৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে:

৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে: নানাবিধ পুষ্টিকর উপাদানে সমৃদ্ধ হলুদ দিয়ে বানানো চা খেলে শরীরের অন্দরে বেশ কিছু পরিবর্তন হতে থাকে, যার প্রভাবে ধীরে ধীরে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়তে শুরু করে। ফলে রোগমুক্ত জীবন পাওয়ার স্বপ্ন একেবারে হাতের মুঠোয় চলে আসে।

৬. স্কিন টোনের উন্নতি ঘটে:

৬. স্কিন টোনের উন্নতি ঘটে: নিয়মিত হলুদ মেশানো চা খাওয়া শুরু করলে দেহের অন্দরে এমন কিছু উপাদানের মাত্রা বাড়তে থাকে, যার প্রভাবে ত্বকের স্বাস্থ্যের এত মাত্রায় উন্নতি ঘটে যে ছোট-বড় সব ধরনের স্কিন ডিজিজের প্রকোপই কমতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, সোরিয়াসিস এবং একজিমার মতো মারাত্মক ত্বকের রোগের চিকিৎসাতেও এই বিশেষ পানীয়টি নানাভাবে সাহায্য করে থাকে।

৭.হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটে:

৭.হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটে: বাঙালি মানেই জন্ম খাদ্যরসিক, আর পেটুক মানেই বদহজম রোজের সঙ্গী! তাই তো প্রতিটি বাঙালির নিয়ম করে হলুদ চা খাওয়া উচিত। কারণ হলুদে উপস্থিত একাধিক উপকারি উপাদান পাকস্থলিতে উপস্থিত উপকারি ব্যাকটেরিয়ার শক্তি বাড়িয়ে দেয়। ফলে হজন ক্ষমতা এতটা বেড়ে যায় যে বদ-হজম দূরে পালায়।

৮. স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটে:

৮. স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটে: হলুদে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা রক্তে উপস্থিত ক্ষতিকর উপাদানদের শরীরে থেকে বার করে দেয়। ফলে ব্রেন সেল ড্যামেজের আশঙ্কা কমে। অন্যদিকে কার্কিউমিন মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু অংশের ক্ষমতা এতটা বাড়িয়ে দেয় যে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়। সেই সঙ্গে বুদ্ধির জোরও বাড়তে থাকে।

৯. হার্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়:

৯. হার্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়: একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত হলুদ দিয়ে বানানো চা খেলে হার্টে রক্ত সরবরাহকারি আর্টারিদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হার্টের কোনও ধরনের ক্ষতি হওয়ার বা হার্ট ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে। শুধু তাই নয়, স্ট্রোকের মতো মারণ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমাতেও হলুদ বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই হার্টকে যদি দীর্ঘদিন চাঙ্গা রাখতে চান, তাহলে হলুদ দিয়ে বানানো চা খাওয়া মাস্ট!

১০. অ্যালঝাইমার্সের মতো রোগকে দূরে রাখে:

১০. অ্যালঝাইমার্সের মতো রোগকে দূরে রাখে: বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে হলুদে উপস্থিত কার্কিউমিন নামক উপাদান ব্রেন সেলের যাতে কোনও ভাবে ক্ষতি না হয়, সেদিকে নজর রাখে। তাই তো নিয়মিত হলুদ দিয়ে বানানো চা খাওয়া শুরু করলে ব্রেন পাওয়ার এতটা বৃদ্ধি পায় যে মস্তিষ্ক সম্পর্কিত কোনও রোগই ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না। তাই তো বলি বন্ধু যাদের পরিবারে এই ভয়ঙ্কর রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের নিয়মিত হলুদ চা খাওয়া শুরু করা উচিত। এবার নিশ্চয় বুজে গেছেন বন্ধু, সাধারণ চায়ের পরিবর্তে টার্মারিক টি খাওয়ার প্রয়োজন কতটা…!

অ্যাপথাস আলসার

অ্যাপথাস আলসার

অ্যাপথাস আলসার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বতস্ফূর্তভাবে ভালো হয়ে যায়। এ কারণেই মুখের আলসার সম্পর্কে সাধরণ মানুষ মজা করে বলেন যে, মুখের ঘাঁ ওষুধ খেলে ভালো হতে সময় লাগে ১৪ দিন আর ওষুধ না খেলে সময় লাগে ৭ দিন। বিষয়টি নিয়ে হাস্যরস করা যায় ঠিকই কিন্তু বেশি ব্যথা থাকলে অবশ্যই ওষুধ সেবন করতে হবে। তাছাড়া মুখের আলসারটি অ্যাপথাস আলসার না অন্য খারাপ কিছু সেটি অবশ্যই জানা জরুরী।
অ্যাপথাস আলসার না হয়ে মুখের আলসারটি খারাপ কিছু হলে আলসার নিয়ে মুখের হাসি বা হাস্যরস বিলীন হতে সময় লাগবে না।

অ্যাপথাস আলসার কোথায় হয়?
মুখের যে অংশগুলো সাধারণত চলমান বা নড়াচড়া করে সেখানেই অ্যাপথাস আলসার হয়ে থাকে, যেমন-জিহবা, ঠোট ও চিবুকের অভ্যন্তরের আবরণের উপর। এছাড়া মাড়িতে অ্যাপথাস আলসার হতে পারে।

অ্যাপথাস আলসার দেখতে কেমনঃ
অ্যাপথাস আলসার সাদা অথবা হলুদ ডিম্বাকৃতির হয়। চারপাশে প্রদাহযুক্ত লাল বর্ডার লাইন দেখা যায়। লাল বাউন্ডারির মধ্যে ধুসর, সাদা বা হলুদ এলাকা হয় ফিব্রিন গঠনের কারণে। ফিব্রিন একটি প্রোটিন যা রক্ত জমাট বাঁধার সাথে সম্পৃক্ত।

অ্যাপথাস আলসারের কারণ সমূহ:
প্রকৃত কারণ এখনো অজানা। সম্ভাব্য কারণ সমূহ যার প্রভাবে অ্যাপথাস আলসার হতে পারে, সেগুলো হলোঃ
ক) আঘাত জনিত কারণে যেমন, টুথব্রাশের খোঁচা।
খ) মানসিক চাপ।
গ) ঘুমের ব্যাঘাত বা অপর্যাপ্ত ঘুম।
ঘ) অতিরিক্ত সাইট্রাস ফল সেবন, যেমন, কমলা অথবা লেবু।
ঙ) খাদ্যে এলার্জি জনিত কারণে।
চ) রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যা।
ছ) ভিটামিন বি১২, আয়রন এবং ফলিক এসিডের অভাবজনিত কারণে।
জ) নিকোরোডিল এবং কিছু কেমোথেরাপির কারণেও অ্যাপথাস আলসার হতে পারে।
ঝ) ক্রনস ডিজিজে ও অ্যাপথাস আলসার হতে পারে।
ঞ) টুথব্রাশের অ্যাবরেশনের কারণে অ্যাপথাস আলসার হতে পারে।
ট) ধারালো বা অ্যাব্রেসিভ খাবার যেমন, টোস্ট, চিপস দ্বারা কোনো ক্ষত।
ঠ) দাঁত দ্বারা কামড়ানোর ফলে কোনো ক্ষত।
ড) ডেন্টাল ব্রেস মিউকাস মেমব্রেনের ক্ষতিসাধন করে অ্যাপথাস আলসার সৃষ্টি করতে পারে।
ঢ) সিলিয়াক ডিজিজের ক্ষেত্রেও অ্যাপথাস আলসার হতে পারে।
পুষ্টি: বার বার অ্যাপথাস আলসারের ক্ষেত্রে জিংকের অভাবের যোগসূত্র থাকতে পারে। এক্ষেত্রে জিংক সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।

চিকিৎসা:
*মশলাযুক্ত খাবার গ্রহণ কমাতে হবে।
*কসমেটিক মাউথ ওয়াশ অর্থাৎ হালকা গরম পানি ও লবণ মিশিয়ে কুলকুচি করা যেতে পারে।
*ভিটামিন বি১২ দেওয়া যেতে পারে।
*অ্যামলেক্সানকস্ ওরাল পেস্ট অ্যাপথাস আলসার সারাতে সাহায্য করে এবং ব্যথা কমায়।
তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে ভাইরাসের কারণেও মুখে কিছু আলসার দেখা যায় যা দেখতে অ্যাপথাস আলসারের মত দেখা যায়। তাই যে কোন ঘাঁ বা আলসার হলেই তাকে অ্যাপথাস আলসার হিসেবে ধরে নেয়া ঠিক নয়। সঠিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে হবে। তবেই আলসার এর সঠিক চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব।

শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও সমান ভাবে জরুরি

শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও সমান ভাবে জরুরি

মানসিক সুস্থতা ও সুস্থ ভাবাবেগ আমাদের সার্বিক সুস্থতার এক গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। শারীরিক সুস্থতার জন্যে আমরা অনেক কিছু করি – জিম যাই, হাঁটতে বেরোই, সাঁতার কাটি বা অন্যান্য খেলাধুলা করি।ঠিক একই রকম ভাবে, আমরা সুস্থ ভাবাবেগ ও মানসিকতার অধিকারী হবারও চেষ্টা করতে পারি।

একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হল, যে কোনও মানসিক রোগ নেই মানেই সেই ব্যক্তি মানসিক ভাবে সুস্থ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই ধারনাটির সাথে একমত নন।

সুস্থ ভাবাবেগ কেন জরুরি?
মানসিক আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা ও তার ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ কাজ না। কারণ এই বিদ্যা রপ্ত না হলে জীবনে বিভিন্ন দুঃখ-কষ্ট, ব্যক্তিগত সম্পর্কে সমস্যা, ও অন্যান্য মানসিক ব্যধির উদয় হতে পারে। সুস্থ ভাবাবেগ ও মনের অধিকারী হলে আমরা নিশ্চিন্তে যে কোনও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে পারি। তাছাড়া এর ফলে আমরা  দৈননিন জীবনে আরও  কর্মঠ হয়ে উঠতে পারি। একজন মানসিক সুস্থ ব্যক্তি নিজের সাথে ও অন্যের সাথে আরও ভাল সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হন, আর যে কোনও বাঁধা কাটিয়ে জীবনে এগিয়ে চলতে পারেন।

একজন কাউন্সেলর মতে, “আমাদের বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। অপছন্দের পরিস্থিতি ও লোকেদের মাঝে বাস করতে হয়। আমরা সেই সমস্ত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি। অথচ তার বদলে আমাদের চারিপাশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে ফেলা কিন্তু অনেক বেশি সহজ। এই পরিস্থিতিগুলো অনুযায়ী যত নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারব, ততই মানসিক সুস্থতার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাব।”

মনের যত্ন নিন
কথাটা কি খুব খাপছাড়া ও কঠিন লাগল? বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে দৈনন্দিন জীবনে সামান্য পরিবর্তন আনলেই কিন্তু এই কাজটা খুব সহজ হয়ে উঠবে। আপনি সেই জন্যে নিচে লেখা পরামর্শগুলি মেনে দেখতে পারেন:

১.     শরীরের যত্ন নিন
শারীরিক সুস্থতার সাথে মানসিক সুস্থতার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এর জন্যে আপনি পুষ্টিকর খাবার খান, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, নিয়মিত ব্যায়াম করুন, এবং শরীরের যত্ন নিন। এর ফলে আপনার শরীর রোজকার ধকলের সাথে যুঝে উঠতে পারবে। ভিটামিন বি-১২ ও ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার আপনার মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলিকে চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত বিশ্রামও খুবই প্রয়োজনীয়; কারণ ঘুমের সময় আমাদের শরীর সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলিকে সারিয়ে তোলে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে আপনি ক্লান্ত ও খিটখিটে হয়ে পড়বেন। নিয়মিত ব্যায়াম আপনার খিদে বাড়াতে সাহায্য করবে; ফলে আপনার ভাল ঘুম হবে, এবং সব মিলিয়ে আপনি মানসিক ভাবে সুস্থ থাকবেন।

২.    ব্যায়াম করুন, ফুসফুসে টাটকা বাতাস ভরুন
সূর্যের আলো আমাদের শরীরে সেরটিনিন নামে একটি রাসায়নিকের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। এই সেরিটিনিন আমাদের মস্তিষ্ককে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। ফলে সূর্যের আলোয় আমাদের মন ভাল হয়ে যায়। কায়িক পরিশ্রমও সুস্থ মনের জন্যে জরুরি। ব্যায়ামের ফলে শরীরে স্ফূর্তি আসে, ক্লান্তি ও মানসিক চাপ হ্রাস পায়। মনকে চাঙ্গা রাখতে নিজের পছন্দের কোনও কাজ করুন।

৩.     নিজের যত্ন নিন
মানসিক সুস্থতা ও সুস্থ ভাবাবেগ পেতে নিজের যত্ন নেওয়া দরকার। মনের মধ্যে আবেগ চেপে রাখবেন না। অবদমিত আবেগ প্রকাশের ফলে মানসিক চাপ ও জটিলতা কমে যায়। নিজের জন্যে কিছুটা সময় আলাদা রাখুন; নিজের মনের কথা শুনুন, বই পড়ুন, ব্যক্তিগত শখ-আহ্লাদ মেটান, বা এমনি হাত-পা ছড়িয়ে সব কাজ ভুলে একটু আরাম করুন।

মনোযোগ বাড়াতে সব যন্ত্রপাতি দূরে সরিয়ে নিজের আশেপাশের দুনিয়াটাকে উপলব্ধি করুন। নিমহ্যান্সের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক ডাঃ এম মঞ্জুলার কথা অনুযায়ী, “ভূত ও ভবিষ্যৎ ভুলে বর্তমানে থাকার নামই মনোযোগ। খামখেয়ালের স্রোতে না ভেসে গিয়ে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী চিন্তায় সাড়া দেওয়া; একবারে একটি কাজেই মন দেওয়া, পরের ছিদ্রান্বেষণ না করে যে কোনও পরিস্থিতিতে স্থির ও অবিচল থাকার নামই মনোযোগ।  এর ফলে আপনি চারপাশে থেকে আরও বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন যা আপনাকে যে কোনও অবস্থায় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করবে।”

৪.     পছন্দের লোকজনের সাথে সময় কাটান
পছন্দের লোকের সাথে সময় কাটালে নিজের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা জন্মায়। বন্ধুবান্ধব, পরিবার, সহকর্মী এবং প্রতিবেশীদের সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখুন। এর ফলে আপনি সবার সাথে নিজেকে যুক্ত অনুভব করবেন। সহকর্মীদের সাথে একদিন খেতে যান, বা অনেকদিন বাদে কোনও পুরানো বন্ধুর সাথে দেখা করুন। একটি মিষ্টি হাসি ও স্নেহের আলিঙ্গনের বিকল্প কোনও প্রযুক্তি হতে পারে না।

৫.     কোনও শখ গড়ে তুলুন বা নতুন কিছু করুন
পছন্দ অনুযায়ী কাজ করলে পরে মনও ভাল থাকে। এর ফলে মাথায় দুশ্চিন্তা আসে না এবং অবদমিত আবেগগুলিও প্রকাশ পায়। তাছাড়া শখের কাজকর্ম করলে আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পায়।

নতুন কাজের সঙ্গে যুক্ত হলে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি হয়, ফলে বাইরের জগতে আপনি নিজেকে আত্মবিশ্বাসের সাথে মেলে ধরতে শেখেন। নতুন জিনিস শিখলে মনের একঘেয়ে চিন্তা কেটে যায়, মনঃসংযোগ বাড়ে, এবং নতুন কিছু শেখার আনন্দে মন ভাল থাকে।

৬.     দুশ্চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন
আমাদের সবারই বিভিন্ন লোকজন বা পরিস্থিতির কারণে দুশ্চিন্তা হয়। এই কারণগুলিকে প্রথমে চিহ্নিত করুন, তারপর সেগুলির উপর পুনরায় বিচার করুন। আপনি সেগুলি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে পারেন, যদি তা সম্ভব হয়। অনেক সময় সঠিক পরিকল্পনার অভাবে আপনি সেই ব্যক্তিদের বা পরিস্থিগুলিকে সামলাতে পারেন না। এই জন্যেই স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট শেখা জরুরি।

“আপনি যদি পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন, তবে পরীক্ষার প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। পরীক্ষা আপনার জীবনের মাপকাঠি না, সেটা সাময়িক এবং আবশ্যিক। কিছু ক্ষেত্রে আপনি দুশ্চিন্তার উৎসগুলিকে এড়িয়ে চলতে পারেন, কিন্তু আপনাকে এটাও বুঝতে হবে যে সবসময়ে তা সম্ভব না। কাজেই আপনাকে নিজেই দুশ্চিন্তাকে সামাল দেওয়ার কোনও পন্থা খুঁজে বের করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ আপনি কোনও বন্ধুর সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন, ধৈর্য ধরে নিজের উপরে বিশ্বাস রাখতে পারেন, পরিস্থিতিকে পুনরায় ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করতে পারেন, প্রাণায়াম করতে পারেন, একটু হাঁটতে যেতে পারেন, গান শুনতে পারেন, ব্যায়াম করতে পারেন, ইত্যাদি।”

৭.     নিজের উপরে ভরসা হারাবেন না
আমরা সকলেই আলাদা, এবং আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই নিজস্ব ক্ষমতা এবং দুর্বলতা ররেছে। নিজের দুর্বলতাকে মেনে নিয়ে নিজের ক্ষমতার উপরে ভরসা রাখলে জীবনে এগিয়ে চলার সাহস পাওয়া যায়।  সবারই কোনও না কোনও দুর্বলতা থাকে, আপনারও আছে; কেউই নিখুঁত নয়। আপনি নিজের দুর্বলতাকে দূর করার প্রয়াস করতে পারেন, অথবা সেগুলোকে নীরবে মেনে নিতে পারেন। আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মত আপনিও নিখুঁত নন, এটা মেনে নেওয়াটাই কিন্তু সুস্থ মানসিকতার পরিচয়। নিজের ক্ষমতা বুঝে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য তৈরি করুন। সর্বপরি না বলতে শিখুন। এটা কোনও অন্যায় নয়।

৮.     আশির্বাদ কুড়োন
একঘেয়ে শোনালেও এটা সত্যি যে, যা পেয়েছেন তা নিয়ে কৃতজ্ঞ হলে, যা পাননি  তাই নিয়ে কষ্ট কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে এর ফলে মনের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা জন্ম নেয়। একটি কৃতজ্ঞতা খাতা বানান। প্রত্যেকদিন রাত্রে শোবার আগে লিখে ফেলুন যে, আপনি আজ কেন ও কিসের জন্য কৃতজ্ঞ। নিজের মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ জাগিয়ে তুললে, সবার আশীর্বাদ মনে রাখলে,দেখবেন প্রত্যেকদিনই আপনার কৃতজ্ঞতার কারণের অভাব হচ্ছে না।

৯.     নিজেকে মেলে ধরুন
অনেক সময়ই আমরা নিজের আবেগ মেলে ধরতে লজ্জা পাই।  নিজের মনোভাব মেলে ধরতে পারা, মনকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। অনেকেই নিজের ইচ্ছা বা ভাবনা চেপে রাখেন, যা খুবই ক্ষতিকর। এর ফলে সেই মানসিকতা আরও বেড়ে যায়।  ফলে দুশ্চিন্তাও পাল্লা দিয়ে বাড়ে। ফলে অন্য কোনও দিকে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আবেগ চেপে রাখার ফলে গুরুতর রকম ডিপ্রেশন আর অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার দেখা দিতে পারে। সামান্য রাগ বা দুঃখও চেপে রাখা উচিত নয়। শুধু জানতে হবে যে সবদিক বজায় রেখে আবেগের বহিঃপ্রকাশের উপায় কী। ডাঃ মঞ্জুলা বলেন, “কোন আবেগই, মূলত, ভাল বা খারাপ নয়। সমস্ত আবেগই প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। সেই আবেগের মাত্রা ও বহিঃপ্রকাশের ধরণের উপর নির্ভর করে এই ভাল বা খারাপ হওয়া নির্ভর করে।”

১০. সাহায্য চান
এই দুনিয়াতে আক্ষরিক অর্থে সুখী ও নিশ্চিন্ত জীবন কেউ কাটান না। কাজেই মন খারাপ হলে, বিপদে পড়লে, হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়লে, বিচলিত হলে, রেগে গেলে, অথবা পরিস্থিতির সাথে খাপ না খাওয়াতে পারলে, বিশ্বাসযোগ্য কোনও ব্যক্তি যেমন – আপনার জীবনসঙ্গী, বন্ধু, অভিভাবক, ভাই-বোন বা আত্মীয়ের সাথে কথা বলুন। তাতেও না হলে একজন কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন। দেরি করবেন না। এতে লজ্জার কিছুই নেই; বরং একে আশার আলো হিসেবে দেখুন। জীবনের বাঁধা বিপত্তিতে একলা চলতে হবে না।  প্রাণোচ্ছল জীবনের এটাই একমাত্র রাস্তা। 

পুরুষেরা বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ইতি টানতে এই পরামর্শগুলো মেনে চলুন

পুরুষেরা বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ইতি টানতে এই পরামর্শগুলো মেনে চলুন

পৃথিবীর সমস্ত মানুষই চায় বিবাহের পর তাদের জীবনে খুদে কারোর উপস্থিতি। কিন্তু এই চাওয়া পাওয়া তো সবসময় পূর্ণ হয় না। কারণ, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে অনিয়মিত জীবনযাত্রা, বেশি বয়সে বিয়ে, মাত্রাতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, শরীরে ফ্যাট, খাওয়া-দাওয়ার অযত্ন ও মানসিক চাপ সন্তান জন্ম দেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, অর্থাৎ দেখা দিচ্ছে বন্ধ্যাত্ব। আর এই বন্ধ্যাত্ব এমন একটি সমস্যা যা বহু বিবাহিত দম্পতির মন এবং জীবনকে জর্জরিত করে তোলে, পাশাপাশি বিচ্ছেদও ঘটে সম্পর্কের। একটা সময় ছিল যখন বন্ধ্যত্বের সমস্যার জন্য দায়ী করা হতো কেবলমাত্র নারীদের। তবে আধুনিক গবেষণা ও বিজ্ঞান তাদের এই ধারণাকে ভুল বলে প্রমাণিত করেছে। এই সমস্যার জন্য শুধু নারী নয়, পুরুষরাও সমানভাবে দায়ী। বেঙ্গালুরুর একটি মেডিক্যাল টেকনোলজি সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে ১০-১৫ শতাংশ বিবাহিত দম্পতি বন্ধ্যাত্বের মুখোমুখি হন। এখনও পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭.৫ মিলিয়ন দম্পতি বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগছেন। বর্তমান সময়ে পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রেই বন্ধ্যাত্বের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের সমস্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বন্ধ্যাত্বের জন্য দায়ী পুরুষেরাই।

তবে চিন্তা করার কোনও কারণ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে সাধারণ কিছু নিয়ম কানুন মেনে চললে ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটালেই সুস্থ সবল প্রজনন ক্ষমতা ধরে রাখতে সমস্যা হবে না কারুরই। আসুন তবে জেনে নিন পুরুষেরা প্রজনন ক্ষমতা বাড়াতে ও বন্ধ্যত্ব প্রতিরোধে কী করবেন।

বন্ধ্যাত্বের কারণ কী?
১) খাদ্যাভাসের জটিলতা
২) মাত্রাতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ
৩) শরীরে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
৪) অনুপযুক্ত পুষ্টি
৫) বীর্যপাতকে ঘিরে সমস্যা
৬) অ্যান্টি-স্পার্ম অ্যান্টিবডিগুলির উপস্থিতি
৭) বেশি মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ, ধূমপান ও ড্রাগ সেবন
৮) প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে এমন কিছু ওষুধ খাওয়া
৯) আধুনিক জীবনযাত্রা বন্ধ্যাত্ব প্রতিরোধে কী করবেন

বন্ধ্যাত্ব প্রতিরোধে কী করবেন

১) ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন
নিয়ন্ত্রনহীন জীবনযাত্রার কারণে আমরা অনেকেই মোটা হয়ে যাই এবং ওজন দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায়। এটি বন্ধ্যাত্বের একটি বড় কারণ। সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে হলে স্বাভাবিক ওজন এবং নীরোগ শরীর থাকাটা আবশ্যক। বেশি বা খুব কম ওজন সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই উচ্চতা ও বয়স অনুযায়ী ওজনকে নিয়ন্ত্রণ করুন। এই মাত্রাতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি কেবলমাত্র পুরুষদের জন্য নয়, নারীদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যার ফলে বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে। বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণে ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিকভাবে ডায়েট মেনে চলুন এবং শরীরচর্চা করুন।

২) খাদ্যাভ্যাস
খাদ্যাভ্যাস বন্ধ্যাত্বের আরেকটি অন্যতম কারণ। অসময়ে খাওয়া, সঠিক খাদ্যের পরিবর্তে বাইরের অতিরিক্ত জাঙ্কফুড গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব বাবা হওয়ার স্বপ্নকে ভেঙে দিতে পারে। তাই বন্ধ্যাত্ব প্রতিরোধ করতে বিভিন্ন ভিটামিন, আয়রন ও জিঙ্ক সমৃদ্ধ সঠিক খাদ্য পাতে রাখুন। মৌসুমী ফল, আমন্ড, শাকসবজি, কুমড়োর বীজ, ডার্ক চকোলেট, আমলকি, রসুন, মধু, ব্রকলি, চেরি, বিট, গাজর, দুধ, দই ও ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ খাবার খান। তেলে ভাজা জাতীয় খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলুন।

৩) শরীরচর্চা
কেবলমাত্র ওজনের ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্য শরীরচর্চার প্রয়োজন তা কিন্তু নয়, শরীরের পুরুষ হরমোনগুলির অতিরিক্ত ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করবে ব্যায়াম। তাই রোজ যোগাসন বা ব্যায়াম করুন।

৪) চাপমুক্ত থাকুন
বন্ধ্যাত্বের আরেকটি বড় সমস্যা হলো মানসিক চাপ। বর্তমান দিনে এটি মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্ধ্যাত্ব প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নিজেকে চাপমুক্ত রাখুন। মনকে ভালো রাখতে নিজের পছন্দের কাজগুলো করুন এবং অবসর সময়ে নিজেকে বিশ্রাম দিন।

৫) পর্যাপ্ত ঘুম
বর্তমান দিনে ব্যস্ত রুটিনের কারণে আমরা সকলেই ঘুম-কে প্রায় ভুলতে বসেছি। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুম না হলে দেখা দিতে পারে বন্ধ্যাত্বের সমস্যা। তাই রুটিন মাফিক নিয়মিত সঠিক সময়ে ঘুমোতে যান এবং সঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠুন। প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমোন।

৬) মেথি গ্রহণ করুন
মেথি একটি জনপ্রিয় ঔষধি ও রন্ধন দ্রব্য। বন্ধ্যাত্ব প্রতিরোধ করতে মেথির ভূমিকা কিন্তু অপরিসীম। ৩০ জন পুরুষের উপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, সপ্তাহে চার বার করে ৫০০ মিলিগ্রাম মেথির জল গ্রহণের ফলে তাদের ইরেক্টাইল ফাংশন এবং যৌন ক্রিয়াকলাপের মাত্রা যথেষ্ট হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

থাইরয়েড ক্যান্সার,             জানুন এই রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে

থাইরয়েড ক্যান্সার, জানুন এই রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে

ম্যানি ও কিজি-কে নিশ্চয়ই মনে আছে আপনাদের। ‘দিল বেচারা’ সিনেমাতে অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করে নেওয়া দুই তরুণ অভিনেতা। এই ছবিতে ম্যানি অর্থাৎ সুশান্ত সিং রাজপুত এবং কিজি অর্থাৎ সঞ্জনা সাঙ্ঘি দুজনেই দু’ধরনের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। একজন অস্টিওসারকোমা এবং অপরজন থাইরয়েড ক্যান্সার। ছবির এই স্টোরিলাইন দর্শকের মনকে আবেগময় করে তুলেছিল। ছবিতে সঞ্জনা সাঙ্ঘি থাইরয়েড ক্যান্সারে ভুগছিলেন এবং তাকে সর্বদাই একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার বহন করতে দেখা যায়। যার ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, এটা কেমন ধরনের অসুখ! তবে চলুন জেনে নিন থাইরয়েড ক্যান্সার রোগটি আসলে কী?

থাইরয়েড ক্যান্সার কী?
থাইরয়েড ক্যান্সার হয় থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে। এই থাইরয়েড গ্ল্যান্ড আমাদের স্বরগ্রন্থির নিচে থাকে। থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। যখন থাইরয়েড গ্রন্থির কোষ সাধারণ অবস্থার থেকে অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে এবং টিউমারের সৃষ্টি করে, তখন থাইরয়েড ক্যান্সার দেখা দিতে পারে।

থাইরয়েড ক্যান্সারের প্রকার
প্যাপিলারি,
ফলিকুলার,
মেডালারি ও
অ্যানাপ্লাস্টিক-এই চার ধরনের থাইরয়েড ক্যান্সার হতে পারে।

থাইরয়েড ক্যান্সার হওয়ার প্রধান কারণ
থাইরয়েড ক্যান্সারের সঠিক কারণ এখনও পর্যন্ত বের করা যায়নি। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে থাইরয়েড ক্যান্সার হয় বলে মনে করা হয়। এছাড়াও,
১) মাথা এবং ঘাড়ে অত্যধিক রেডিয়েশনের প্রভাবে এই ক্যান্সার দেখা দিতে পারে।
২) স্থূলতা।
৩) দীর্ঘদিন ধরে থাইরয়েড গ্রন্থির অস্বাভাবিক বৃ‌দ্ধি হতে থাকলে থাইরয়েড ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকে।
৪) ক্রনিক হেপাটাইটিস-সি থেকে থাইরয়েড ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকে৷

লক্ষণ
১) গলায় হঠাৎ কোনও মাংস পিণ্ড দেখা দেওয়া। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাংস পিণ্ড দৃশ্যমান হয় না।
২) খাবার গিলতে সমস্যা।
৩) শ্বাস নিতে অসুবিধে।
৪) গলার আওয়াজ কর্কশ হয়ে যাওয়া বা বসে যাওয়া।
৫) ঘাড়ের চারপাশে ও গলায় ব্যথা।
৬) খাবার প্রতি অনীহা এবং ওজন কমে যাওয়া।
৭) গরম হওয়া সহ্য করতে না পারা।
৮) হালকা কাশি।
৯) ঋতুচক্রে অনিয়ম।

ঝুঁকি
১) ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সের পর এই রোগ বেশি দেখা দেয়। তবে বর্তমান দিনে অল্প বয়সিদের মধ্যেও দেখা দিচ্ছে।
২) পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
৩) বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা দিচ্ছে।

রোগ নির্ণয়
১) এই ধরনের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবহেলা না করে এন্ডোক্রিনোলজিস্টের পরামর্শ নিন৷
২) T4,TSH রক্ত পরীক্ষা এবং হাই রেজোলিউশন আল্ট্রাসাউন্ড টেস্টের মাধ্যমে নির্ণয় করা যেতে পারে।
৩) বায়োপসি ও এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমেও নির্ণয় করা হয়।
৪) থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে ক্যান্সার রয়েছে কিনা তা নির্ণয় করতে সরু সূচ দিয়ে গ্ল্যান্ড থেকে রস টেনে নিয়ে তার পরীক্ষা করা হয়, যাকে বলে ‘এফএনএসি’৷

চিকিৎসা
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও গবেষণা পদ্ধতির কারণে প্রায় ৯৪ শতাংশ রোগী খুব তাড়াতাড়িই সেরে ওঠেন। তাই ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।
১) ক্যান্সার থাক বা সন্দেহের পর্যায় থাক, দুই অবস্থাতেই ডাক্তাররা সার্জারি করে থাকেন। কতটা সার্জারি করবেন, কতগুলো গ্ল্যান্ড বাদ দেবেন তা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর বিবেচনা করে সার্জারি করা হয়। সার্জারির পর বায়োপসিতে পাঠানো হয়। এরপরই জানা যাবে ক্যান্সারের বিস্তার এবং ক্যান্সারের স্টেজ সম্পর্কে।
২) রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।
৩) বেশি মাত্রায় তেজস্ক্রিয় আয়োডিন খাওয়ানোর মাধ্যমেও চিকিৎসা করা হয়।
৪) থাইরক্সিন জাতীয় ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে রোগীকে সুস্থ করে তোলা হয়।

অস্টিওসারকোমা ,               জানুন এই রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে

অস্টিওসারকোমা , জানুন এই রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে সুশান্ত সিং রাজপুত ও সঞ্জনা সাঙ্ঘি অভিনীত ‘দিল বেচারা’ সিনেমাটি। ছবির গল্প এবং অভিনয় মন ছুঁয়ে গেছে দর্শকের। সিনেমাতে দেখা গেছে এই দুই তরুণ অভিনেতা দুই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত। এখানে সুশান্ত সিং রাজপুত অর্থাৎ ম্যানি একজন অস্টিওসারকোমা রোগীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। যিনি চেয়েছিলেন তার জীবনকে পুরোপুরিভাবে উপভোগ করতে, কিন্তু সিনেমার শেষে দেখা যায় প্রাণচঞ্চল এই ছেলে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে কী এই অস্টিওসারকোমা? যার কবলে পড়ে মৃত্যু হল ম্যানির। চলুন তবে জেনে নেওয়া যাক এই রোগটির সম্পর্কে।

অস্টিওসারকোমা কী?
সার্কোহেল্প (Sarcohelp.org) এ প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, অস্টিওসারকোমা হল এক ধরনের হাড়ের ক্যান্সার বা বোন ক্যান্সার, যা শরীরের লম্বা হাড়ে হতে দেখা যায়। আক্রান্ত স্থানে টিউমারের মত ফুলে যায়। ক্যান্সার সোসাইটি জানাচ্ছে যে, সমস্ত হাড় সংক্রান্ত ক্যান্সারের মধ্যে অস্টিওসারকোমা-ই সবথেকে বেশি হতে দেখা যায়। এটি মূলত হাড়ের অস্টিওব্লাস্ট কোষে দেখা যায়।

কাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়?
এটি সব থেকে বেশি দেখা যায় শিশু ও কিশোর বয়সে। মূলত টিন-এজারদের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। যদিও অস্টিওসারকোমা যেকোনও বয়সে যে কারোর মধ্যেই দেখা দিতে পারে। মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বয়স্কদের মধ্যে এই রোগ দেখা দিলে রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ শরীরের অন্যান্য অস্থিতে ছড়িয়ে পড়ে।

শরীরের কোথায় কোথায় দেখা যায়?
জন হপকিন্স মেডিসিন এর মতে, এই ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাঁটুর চারপাশ। এছাড়াও, পায়ের ওপরের অংশে বা থাইতে, পায়ের নীচের অংশে, বাহুর হাড়, কাঁধ ও মাথার খুলিতেও দেখা যায়।

অস্টিওসারকোমা হওয়ার কারণ কী?
সার্কোহেল্প (Sarcohelp.org) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত এই রোগের সঠিক কারণ আবিষ্কার করা যায়নি। তবে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন, হাড় ইমপ্লান্ট, হাড়ে জোরালো আঘাত এবং জিনগত কোনও রোগ, ইত্যাদি কারণে এটি দেখা দিতে পারে।

প্রকারভেদ
অস্টিওসারকোমাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়।
১) হাই গ্রেড
২) ইন্টারমিডিয়েট গ্রেড
৩) লো গ্রেড

রোগের লক্ষণ
১) আক্রান্ত হাড়ে ব্যথা এবং ফোলাভাব।
২) সময়ের সাথে সাথে এই ব্যথা বাড়ে।
৩) পায়ের হাড়ে হলে মাঝেমাঝেই খুঁড়িয়ে চলতে হয়।
৪) অসুখটি খুব বেড়ে গেলে হাড় ভেঙেও যেতে পারে এবং অসহ্য যন্ত্রণা হয়।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
লক্ষণগুলির উপর ভিত্তি করে পরিবার এবং ব্যক্তিগত ইতিহাস জানার পর একটি পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় করা হয়। রোগ নির্ণয় সংক্রান্ত পরীক্ষাগুলি এক বা একাধিক বার করতে হতে পারে। বায়োপসি, এক্স-রে, বোন স্ক্যান, এমআরআই, সিটি স্ক্যান এর মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে এবং ক্যান্সারের স্টেজ এর উপর ভিত্তি করে কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। এছাড়াও সার্জারির মাধ্যমে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়।

নাক ডাকার সমস্যা?                স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগে আক্রান্ত নন তো?

নাক ডাকার সমস্যা? স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগে আক্রান্ত নন তো?

প্রত্যেক মানুষের কাছেই নাক ডাকার সমস্যা অত্যন্ত বিরক্তিকর। যদিও যিনি নাক ডাকেন তিনি বিশেষ টের পান না। কিন্তু যারা সেই ডাক শোনেন, তাঁরা খুবই বিরক্ত হয়ে ওঠেন। আপনি যদি ভাবেন যে নাক ডাকা অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা, তাহলে ভুল করছেন। কারণ, নাক ডাকা কিন্তু কোনও ক্ষেত্রে জটিল রোগেরও ইঙ্গিত হতে পারে। ঠান্ডা লেগে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, বয়স বাড়লে এবং শরীরের মাত্রাতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির কারণে নাক ডাকার সমস্যা মাথায় চড়ে বসে। কিন্তু আর একটি ভয়াবহ রোগের কারণেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার নাম ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’। এই রোগ অনেকটা নিঃশব্দ ঘাতকের মতো, অর্থাৎ ঘুমের মধ্যেই অকাল মৃত্যু হতে পারে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির।

যদিও, ENT স্পেশালিস্টদের মতে, সব নাক ডাকাই ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ নয়। কিন্তু ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ রোগ থাকলে নাক ডাকার সমস্যা থাকবেই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মূলত উচ্চ রক্তচাপ, টনসিলের সমস্যা, স্থূলতা, কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগের মতো সমস্যার কারণে শরীরে বাসা বাঁধে এই প্রাণঘাতী ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’। আমেরিকান জার্নাল অফ এপিডেমিওলজি-তে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি মানুষ ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ রোগে আক্রান্ত। অন্য একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ভারতবর্ষে প্রায় ৩৬.৩৪ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। তবে চলুন, জেনে নেওয়া যাক ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ সম্পর্কে বিস্তারিত।

স্লিপ অ্যাপনিয়া কী?

স্লিপ অ্যাপনিয়া হল একটি ঘুমের অসুখ। ঘুমানোর সময় এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়, শ্বাস নেওয়া ক্রমাগত বন্ধ হয়ে যায়। অক্সিজেন সাপ্লাই কমে গিয়ে কখনও কখনও মানুষের মৃত্যু পর্যন্তও ঘটে। এই রোগের সাধারণ একটি লক্ষণ হচ্ছে ‘নাক ডাকা’। সাধারণত মহিলাদের তুলনায় পুরুষরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

প্রকারভেদ
এই রোগ সাধারণত দুই প্রকারের হয়।
১) অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া – এটি রোগের সাধারণ অবস্থা। যেখানে নাক থেকে শ্বাসনালীর মধ্যেকার কোনও একটি অংশ অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে শ্বাস নিতে সমস্যা হয় এবং নাক ডাকে।
২) সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া – এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে মস্তিষ্ক সঠিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী পেশিগুলোকে সঠিক সময়ে সংকেত প্রেরণ করতে পারে না।

রোগের লক্ষণ
১) জোরে জোরে নাক ডাকা।
২) ঘুমানোর সময় হাঁপানো বা শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া।
৩) খিটখিটে ও বদমেজাজি হয়ে পড়া।
৪) রাতে ঘুম না হওয়ার কারণে সারাদিন ধরে ঝিমুনি ভাব।
৫) মাথা যন্ত্রণা
৬) অনিদ্রা
৭) মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া
৮) রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া

রোগের কারণ
১) শরীরে অত্যাধিক ফ্যাট জমা হওয়া এবং ওজন বৃদ্ধি হওয়ার ফলে এই রোগ দেখা দেয়। ২) বিশেষত গলা ও বুকের চারপাশের অঞ্চলে স্থূলতা।
৩) বয়সজনিত কারণে দেখা দিতে পারে। মূলত ৩০ থেকে ৬৫ বছর বয়সীদের মধ্যে।
৪) মাত্রাতিরিক্ত ধূমপানের ফলে।
৫) বংশগত কারণে।
৬) টনসিলের বৃদ্ধি পাওয়া।
৭) শিশুদের ক্ষেত্রে, স্বাভাবিক সময়ের আগে জন্মগ্রহণ করলে এই রোগ দেখা দিতে পারে। ৮) কিডনি এবং হৃদযন্ত্রের বিকলতা।

রোগ নির্ণয়
প্রথম অবস্থায় রোগের লক্ষণের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসকেরা রোগ নির্ণয় করে থাকেন। লক্ষণ দেখে যদি নির্ণয় সম্ভব না হয় তবে Polysomnography টেস্ট করা হয়। যার সাহায্যে রোগীর নিঃশ্বাসের গতিবিধি, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা পরিমাপ করা হয়।

চিকিৎসা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগের চিকিৎসা রোগের মাত্রার উপর নির্ভর করে করা হয়। তবে কিছু ঔষধপত্র সেবন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন করলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যেমন – ওজন কমানো এবং ধূমপান ত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়। সিরিয়াস ক্ষেত্রে ‘কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে’ প্রেসার ঠিক রাখার জন্য মাস্ক দেওয়া হয়। এছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারও করে থাকেন চিকিৎসকেরা।

প্রতিরোধের উপায়
১) ওজন নিয়ন্ত্রণে এনে শরীরকে স্লিম ও ফিট রাখতে হবে।
২) ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকতে হবে।
৩) খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৪) খাবার পরেই না ঘুমিয়ে ১৫-২০ মিনিট হাঁটাচলা করার পর তবে ঘুমোনো উচিত।
৫) নিয়মিত ব্যায়াম ও মর্নিং ওয়াক, সাঁতার কাটা এবং সাইকেল চালানোর অভ্যাস করুন। ৬) ঘুমোনোর ভঙ্গিমা পরিবর্তন করতে হবে, যেমন – চিত হয়ে শোওয়ার পরিবর্তে এক পাশ ফিরে শোওয়ার অভ্যাস করুন।
৭) শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেশি দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করবেন।

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা PCOS

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা PCOS

মোটা হয়ে যাচ্ছেন? মহিলারা এই রোগে আক্রান্ত নন তো? দেখুন এর লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে

আধুনিকীকরণ এবং বিশ্বায়নের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে মানুষের জীবনযাপনের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। যার ফলে দিন দিন বেড়ে চলেছে রোগের প্রকোপ। হৃদরোগ, ক্যান্সার, ফুসফুসের সংক্রমণ, ডায়াবেটিস ইত্যাদির মতোই বর্তমান দিনে মহিলাদের কিছু বিশেষ শারীরিক রোগ দেখা দিচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা PCOS। চিকিৎসকেরা একে ওভারিয়ান সিস্ট হিসেবেও বলে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রথম দিকে বাড়ির মহিলা এবং পরিবারের লোকেরা এই সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না। এর লক্ষণগুলি অর্থাৎ হঠাৎ করে মোটা হয়ে যাওয়া, মাথা থেকে চুল পড়া, মুখে ব্রণ এবং ঋতুস্রাবের সমস্যাকে বয়ঃসন্ধির ব্যাপার ভেবে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে পরবর্তীকালে এটি বড় আকার ধারণ করে।

২০১২ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বে মোট ১১৬ মিলিয়ন মহিলা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম দ্বারা আক্রান্ত। ভারতবর্ষের প্রায় ১০ শতাংশ মহিলা এই রোগে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে প্রতি পাঁচ জন মহিলার মধ্যে একজন মহিলার এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কী এই পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম? চলুন জেনে নেওয়া যাক এই রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত।

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মহিলার ডিম্বাশয়ে এত বেশি ডিম্বাণু থাকে, যা বেরোতে সক্ষম হয়ে ওঠে না। সেই ডিম্বাণুর ঘরগুলোকে অনেকটা সিস্টের মতো দেখায়। একেই বলে পলিসিস্টিক ওভারি। আর ডিম্বাশয়ের এই অবস্থানের কারণে শারীরিক যেসব উপসর্গ দেখা দেয়, তা হল পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম। এই রোগের ফলে মেয়েদের শরীরে পুরুষ হরমোনের আধিক্য ঘটতে থাকে। যার ফলে শরীরের নানা অংশে অবাঞ্ছিত রোম গজিয়ে ওঠে। এটি মূলত প্রজনন সিস্টেমের ওপর প্রভাব ফেলে, যার ফলে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। বন্ধ্যাত্বের সাধারণ কারণগুলির মধ্যে এটি একটি কারণ হতে পারে। সাধারণত ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

PCOS হওয়ার কারণ কী?

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা PCOS কেন হয় তার সঠিক কারণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে কারণ হিসেবে তিনটে দিক উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ১) জিনগত কারণ। একজন মহিলার PCOS হওয়ার ঝুঁকি প্রায় 50 শতাংশ বৃদ্ধি পায় যদি তার পরিবারের কারুর থেকে থাকে। আবার কারুর ডায়াবেটিস থাকলেও পলিসিস্টিক ওভারি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। ২) পরিবেশগত কারণ। ৩) জীবনযাত্রার কারণেও হতে পারে, যেমন – অনিয়মিত খাদ্যাভাস, ফাস্টফুডের প্রতি ঝোঁক, ফ্যাট জাতীয় খাবার খাওয়া, উশৃঙ্খল জীবনযাপন করা এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার মতো অভ্যাসের ফলে এই সমস্যা দেখা দেয়।

লক্ষণ
১) অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি ও মোটা হয়ে যাওয়া। এই উপসর্গ প্রথম প্রথম দেখা যায় না। পরের দিকে প্রকাশিত হয়।
২) ঋতুস্রাবের সমস্যা, যেমন – অনিয়মিত পিরিয়ড বা পিরিয়ড না হওয়া।
৩) ব্লাড ক্লট।
৪) মাথার সামনের অংশ থেকে চুল পড়ে যাওয়া।
৫) মুখে অযাচিত চুলের বৃদ্ধি।
৬) মুখে ব্রণ।

রোগ নির্ণয়
লক্ষণগুলির উপর নির্ভর করে আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়। এছাড়া, রক্ত পরীক্ষা এবং টেস্টোস্টেরন, প্রোল্যাক্টিন, ট্রাইগ্লিসারাইডস, কোলেস্টেরল, থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (টিএসএইচ) এবং ইনসুলিনের মাত্রা পরীক্ষার মাধ্যমেও নির্ণয় করা হয়।

চিকিৎসা
চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময়ে যদি এই সমস্যা ধরা পড়ে তবে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে দ্রুত সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়। তবে ওষুধ প্রয়োগের আগে চিকিৎসকেরা রোগীর ওজন কমানোর বিষয়ে জোর দেন। পাশাপাশি সুষম খাবার গ্রহণ, ব্যায়াম ও ধূমপান ত্যাগের কথাও উল্লেখ করেন। যেহেতু ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমের কারণে বন্ধ্যাত্বের সৃষ্টি হয়, তাই যারা গর্ভধারণের চেষ্টা করছেন তাদের ক্ষেত্রে একটি ছোট্ট অস্ত্রোপচার করা হয় যার নাম ল্যাপারোস্কপি ওভারিয়ান ড্রিলিং।

ঝুঁকি
১) বন্ধ্যাত্ব
২) গর্ভাবস্থায় সুগারের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। টাইপ টু ডায়াবিটিস দেখা দেয়।
৩) লিভারের সমস্যা
৪) কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
৫) নিদ্রাহীনতা, উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতা।
৬) জরায়ু থেকে রক্তপাত
৭) অকাল জন্ম
৮) স্তন ক্যান্সার
৯) এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার

প্রতিরোধের উপায়
১) খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন করুন। জাঙ্ক ফুড ও ফাস্টফুড খাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিতে হবে। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ খাবার খান। জল প্রচুর পরিমাণে পান করতে হবে।
২) নিয়মিত শরীরচর্চা মাস্ট।
৩) নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৪) ধূমপান, মদ্যপান, চা ও কফি খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
৫) উশৃঙ্খল জীবনযাপন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

অহেতুক ভয় না পেয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসা করান এবং প্রতিরোধ করার জন্য এসমস্ত নিয়মগুলি মেনে চলুন। অবহেলা করলে শুধুমাত্র বন্ধ্যাত্বই নয়, অন্যান্য শারীরিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে। তাই নিজের প্রতি যত্ন নিন ও সুস্থ থাকুন।

 

নারীর হঠাৎ গরম লাগার সমস্যা

নারীর হঠাৎ গরম লাগার সমস্যা

কাজের মধ্যে হঠাৎ প্রচণ্ড গরম লেগে ঘেমে-নেয়ে অস্থির। অফিসে মিটিংয়ে, ক্লাসে কিংবা বাড়িতে রান্না বা অন্য কাজের মধ্যে হঠাৎ মনে হলো যেন গরমে গায়ে জ্বালা শুরু হচ্ছে। কখনো তো মুখ-কানও লাল হয়ে যায়। নারীদের এ সমস্যার নাম হট ফ্লাশ। মেনোপজ বা মাসিক বন্ধ হওয়ার দু-এক বছর আগে থেকে হট ফ্লাশ শুরু হতে পারে। টানা ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এ সমস্যা। নারীদের দিনে ৫ থেকে ১০ বার আকস্মিক হট ফ্লাশ হতে পারে। এর বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেতে হবে।

৪০ থেকে ৪৫ বছর বয়সের পর থেকে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে আসাই হট ফ্লাশের কারণ। মেনোপজের পর তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। কারও যদি কোনো কারণে অস্ত্রোপচার করে জরায়ু বা ডিম্বাশয় অপসারণ করতে হয়, তাহলে তাঁদের এ সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বেশি। কারণ, এতে হরমোনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। হট ফ্লাশ থেকে পরিত্রাণ পেতে কিছু নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আসতে হবে।

■ হালকা রঙের পাতলা সুতি কাপড়ের পোশাক পরে বাইরে যাবেন। ভারী কাপড়চোপড়, অতিরিক্ত মেকআপে গরম লাগার অনুভূতি বাড়াবে।

■ চা-কফি, স্যুপসহ গরম ও মসলাদার খাবার এড়িয়ে চলুন। প্রচুর পানি পান করুন। শীতল ও কম তেল-মসলার খাবার খান। প্রচুর সালাদ ও সবুজ শাকসবজি খান। 

■ খুব গরম লাগলে একটু বরফ মুখে নিয়ে চিবুতে পারেন। তবে কোমল পানীয় এড়ানোর চেষ্টা করুন।

■ অফিসে কিংবা বাড়িতে কাজের সময় খোলামেলা বাতাসযুক্ত জায়গায় বা ফ্যানের নিচে বসুন। 

■ সয়া, কালিজিরা, ছোলা, ডালজাতীয় খাবারে প্রাকৃতিক ফাইটো ইস্ট্রোজেন আছে। এগুলো খেলে একটু উপকার পাওয়া যায়। তুলসী চা পান করাও আরামদায়ক।

■ নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

■ মানসিক চাপ ও উদ্বেগ এড়ানোর চেষ্টা করুন। এ ক্ষেত্রে যোগব্যায়াম, মেডিটেশন কার্যকরী।

■ চিকিৎসকের পরামর্শে হরমোন সাপ্লিমেন্ট, সিনথেটিক ইস্ট্রোজেন বা ক্লোনিডিন, অ্যান্টি ডিপ্রেসেন্ট ডুলেক্সেটিন-জাতীয় ওষুধ সেবন করতে পারবেন। তবে এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক। কাজেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোমতেই এগুলো সেবন করা যাবে না।

Acute Encephalitis Syndrome

Acute Encephalitis Syndrome

আমাদের দেশে প্রতিবছর গরমের সময় শিশুদের প্রচন্ড জ্বর হয়, এর মধ্যে বেশ কিছু শিশু মারা যায়, এই শিশু মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয় অজ্ঞাত রোগ কখনও ডেঙ্গু, টাইফয়েড বলে ধারণা করা হয়। এই শিশু মৃত্যুতে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে কিন্তু প্রতিবছরই এমন পরিনতি উপস্থিত হয়, এবং বলা হয়, আগে বেশি ছিলো, এখন কমে এসেছে।

এই জ্বরের একটি নাম Acute Encephalitis Syndrome যার লক্ষণ প্রচন্ড জ্বর, বমি হওয়া, ডায়রিয়া হওয়া, প্রলাপ বকা, ব্রেণের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া ও চরম দুর্বল হয়ে যাওয়া। এই রোগের ল্যাবটারি টেষ্টে আরও কয়েকটি নাম সামনে আসে যেগুলোকে – Progressive Encephalitis Syndrome- Chronic Encephalitis Syndrome- Acute Encephalitis Syndromeইত্যাদি নামে চিহ্নিত করা হয়, এর বাহিরেও এই সিন্ডমের আরও কয়েকটি নাম আছে সেগুলোও নামে আসে, এতে এতো বড় বড় নামের কারণে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পরে, মনে হয়, না জানি কি কঠিন রোগে শিশু আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। আসলে যে নামেই এই রোগে নাম করণ হউক না কেন তার মূলে রয়েছে ব্রেণে ইনফ্লামেশন, অর্থাৎ ব্রেণে একধরণের ঘা। ঘায়ের কারণ কি ?

এটাকি ব্যাকটেরিয়া রিজন, প্যাথাজন রিজন নাকি অটো ইউমিউন রেসপন্স ? যে কারণেই হোক না কেন এটা মূলত সিম্পটম (উপসর্গ) একই ধরণের হয়ে থাকে।
প্রচন্ড জ্বর,
বমি হওয়া,
ডায়রিয়া হওয়া,
প্রলাপ বকা,
ব্রেণের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া,
মেমোরি লস হওয়া (চেনা মানুষকে চিনতে না পারা একটি লক্ষণ)
হেলসুলেশন ও
চরম দুর্বল হয়ে যাওয়া।
এটা কোন সাধারণ ফ্লু না কারণ এটা জ¦রের সাথে ব্রেণের সম্পর্ক থাকায় নিউরোলজিকাল সমস্যা তৈরি হয়। রোগটি কেন হয় ?

প্রথম কারণ : শরীরে পানিশূণ্যতা
দ্বিতীয় কারণ : খাদ্যের ঘাটতিতৃতীয় কারণ : দূর্বল ইমিউনিটিসেই সাথে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয় আক্রান্ত হয়ে গেলে হয়ে পরে ইনসেফিলিটিস। এতে করে মৃত্যু হওয়ার কথা না কিন্তু সমাজে শিশুর মৃত্যু হচ্ছে বিশেষ করে বাংলাদেশে ও ভারতে। এই জ্বরের কারণে মৃত্যু হওয়ার কথা না থাকলেও যেহেতু শিশুর মৃত্যু ঘটছে সেহেতু এনিয়ে প্রচুর গবেষণার পর কারণ হিসেবে নির্ণয় করা হয় –
• Antibiotic• Coked food•
Antipathetic Drug Antibiotic: কনভেশনাল প্রোটোকলের আওতায় এই রোগের চিকিৎসার জন্য যে এন্টিবায়টিক দেয়া হয় তা শরীরে ডিহাইড্রেশন তৈরি করে, যেহেতু এমনিতে শিশুর শরীর ডিহাইড্রেট হয়ে আছে সেহেতু ওষুধের কারণে নতুন করে ডিহাইড্রেট হওয়ার দরুন শিশু মৃত্যুর কোলে ঢোলে পরে।
Coked food : রান্না করা খাবার খাওয়ার মত শরীর উপযুক্ত থাকেনা দূর্বল ইমিউনিটির কারণে, যার দরুণ শিশু যে কোন খাবার খেলেই বমি করে দেয়, পেটে সমস্যা তৈরি করে, কোনমতে জোর করে খেতে পারলেও ডায়রিয়া হয়ে বেড়িয়ে যায়। শরীর যেহেতু রান্না করা কোন খাবার গ্রহণের মত উপযুক্ত থাকে না তাই শরীর আরও বেশি দূর্বল হয়ে পরে।

Antipathetic Drug জ¦র কমানোর জন্য ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে আসলে শিশু আরও দূর্বল হয়ে পরে, যেখানে স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণের কোন ক্ষমতা শরীরের থাকেনা সেখানে ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে আরও বেশি ক্ষতি হয়ে যায়।এই থেকে বাঁচার উপায় ?
১. ডিহাইড্রেশন থেকে বেড় করে আনতে হবে।
২. খাদ্যের ঘাটতি পূরণ করা৩. ইমিউন সিস্টেম ঠিক করা

এই তিনটি কাজের মধ্যে প্রথমে যে কাজটি করতে হবে তাহল, শরীরে ইমিউন সিস্টেম ঠিক করা। যা এই কাজটি করতে হবে জ¦র বেড়ে উঠার ৪ থেকে ৫ ঘন্টার মধ্যেই। ইমিউন সিস্টেম ঠিক করার সহজ কৌশল হলো ভিটামিন সি জাতীয় ফলের জুস পান করতে হবে নিয়ম করে ও আকুপ্রেসার করা। এটাকে বলা হয় FENTON reaction টকফলের জুস পান ও আকুপ্রেসার করলে ৪ থেকে ৫ ঘন্টার মধ্যেই ইমিউন সিস্টেম কার্যকর হয়ে ওঠে। তারপর মিনারেল ব্যালেন্স করতে হবে।

যেহেতু জ্বরের কারণে ডিহাইড্রেশন আছে সেহেতু প্রথমে মিনারেল ব্যালেন্স করার উপযুক্ত উপায় হচ্ছে ডাবের পানি পান করা। ডাবের পানি পান করলে সাথে সাথে মিনারেল ব্যলেন্স হয়ে যাবে। ডাবের পানি ঘাটতি পূরণ করে সাথে সাথে জ্বরের কারণে গ্লুকোজের ঘাটতি পূরণ করে শরীরে সকল মিনারেল ব্যালেন্স হয়ে যাবে। এতো কোন ধরণের বমি হওয়ার সম্ভবনা থাকবে না।

নিয়ম হলো ঃ
প্রথম দিন: এক ঘন্টা পর পর ৪ বার শুধু টক ফলের জুস খাওয়াতে হবে, এতে লেবু, জামবুড়া, আনারস, কমলা, মাল্টার জুস দিতে হবে, এর মধ্যে লেবুই সবচেয়ে উত্তম। তারপর ডাবের পানি দিতে হবে একগ্লাস করে একঘন্টা পরপর ৪বার। এর মধ্যে জ্বরের প্রকোপ কমে আসবে, ১০০ এর ঘরে থাকবে। সেই দিন আর কোন খাওয়া যাবে না, এর বাহিরে শুধু কুসুম গরমপানি পান করা যেতে পারে এর বাহিরে কোন খাবার অথবা পানীয় পান করা যাবেনা।সাথে, দশ মিনিট করে আকুপ্রেসার করা, আকুপ্রেসার খুবই কার্যকর তাই সঠিক উপায়ে আকুপ্রেসার করা হলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালি হয়ে উঠে। আকুপ্রেসার করার নিয়ম হলো শিশুদের ক্ষেত্রে, পায়ের তলায় আস্তে আস্তে ম্যাসাজ করা, তেল হাতে নিয়ে পায়ের তলায় ম্যাসাজ করে গরম করে ফেলতে হবে। এতে আধাঘন্টায় শিশুর শরীরে এক ধরনের পরিবর্তন আসবে, জ্বর কমে আসতে থাকবে। দুপায়ে পাঁচ মিনিট করে দশ মিনিট দিনে দুবার আকুপ্রেসার করতে হবে।

দ্বিতীয়দিন : এক ঘন্টা পর পর ২ বার শুধু টক ফলের জুস খাওয়াতে হবে, তারপর ২ঘন্টা পর পর দুই গ্লাস ডাবের পানি পান করতে হবে, তারপর ২০০ গ্রাম শসার জুস, ২০০ গ্রাম পরিমাণে টমেটোর জুস কোন কিছু না মিশিয়ে অধের্ক পানি অর্ধেক জুস মিশিয়ে পান করবে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এর বাহিরে শুধু কুসুম গরমপানি পান করা যেতে পারে এর বাহিরে কোন খাবার অথবা পানীয় পান করা যাবেনা। ঠিক একই নিয়মে দুবার দুপায়ে ১০ মিনিট আকুপ্রেসার করতে হবে।তৃতীয় দিন : এক ঘন্টা পর পর ২ বার শুধু টক ফলের জুস খাওয়াতে হবে, তারপর ২ঘন্টা পর পর দুই গ্লাস ডাবের পানি পান করতে হবে, তারপর ২০০ গ্রাম শসার জুস, ২০০ গ্রাম পরিমাণে টমেটোর জুস কোন কিছু না মিশিয়ে অধের্ক পানি অর্ধেক জুস মিশিয়ে পান করবে দুপুর পর্যন্ত। সন্ধ্যায় স্বাভাবিক সবজি ভর্তা, দিয়ে ভাত খাবে, কোন ভাবেই মাছ, মাংস খাবে না। ঠিক একই নিয়মে দুবার দুপায়ে ১০ মিনিট আকুপ্রেসার করতে হবে।এতে করে শরীর ঠিক হয়ে যাবে, কোন ধরণের জ্বরের প্রকোপ থাকবে না, শরীরে শক্তি ফিরে আসবে এবং প্রাণঞ্চল হয়ে উঠবে, কোন ওষধের প্রয়োজন হবে না এই মরণঘাতি Acute Encephalitis Syndrome জ্বর ঠিক করতে তাও মাত্র তিনদিনের মধ্যেই। এই জ্বর সেরে উঠলে কয়েকদিন শরীরটাকে আরাম দেয়ার জন্য বেশি করে ফল সবজি খাওয়া জরুরী। এই নিয়মে চলতে থাকলে ডায়রিয়া হতে পারে তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, শরীর থেকে সকল ধরনের বর্জ্য বেড় হওয়া ও এই চিকিৎসার একটি প্রক্রিয়া।

এই পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী অনেক জনপ্রিয় এবং স্বীকৃত : -Use of Vitamin C as antibiotic – Journal of Applied Nutrition 1953-Mycobacterium tuberculosis is extraordinarily sensitive to killing by a vitamin C- induced Fenton reaction – Nat Commun. 2013-Vitamin C in prophylaxis and therapy of infectious diseases. – Arch Pedriatr.1951 Jan;68(1):1-9. 1953-The treatment of poliomyelitis and other virus diseases with vitamin C. – South med surh, 1949 Jul:111(7): 209-14.-Massive doses of vitamin C and the virus diseases. – South med surh, 1951 Apr:113(4): 101-7.-Ascorbic acid as a chemotherapeutic agent – Arch Pedriatr.1952 Apr;69(4):151-5

আলমগীর আলম, বিশেষজ্ঞ- আকুপ্রেসার ও ন্যাচারোপ্যাথি
২৯ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, তৃতীয় তলা, ঢাকা।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কী খাবেন, কী খাবেন না

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কী খাবেন, কী খাবেন না

শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রথমেই বদলাতে হবে খাদ্যাভ্যাস ও জীবন যাপনের পদ্ধতি। আমাদের খাওয়া-দাওয়া, চাল-চলন ঠিক করার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গি। বিশেষ করে এখন করনাকালে বিশিষ্ট চিকিৎসকগণ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে সব পরামর্শ দিচ্ছেন, সেগুলো মেনে চললেই বাড়বে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে-কোনো ভাইরাস, সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে ওষুধ বা টীকা নয়, সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে- দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যত সুন্দর হবে, যত ভালো হবে, তত মানুষ রোগকে প্রতিরোধ করতে পারবে। এবং রোগ বা ভাইরাস আক্রমণ করলেও দ্রুত প্রতিরোধ ব্যবস্থা আক্রমণকরী শত্রুকে বিনাশ করে সুস্থ করে তুলবে। অন্যের কথায় প্রভাবিত না হয়ে বা মুখরোচক বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট না হয়ে প্রতিদিনের খাবার ঠিক করুন বিজ্ঞানসম্মতভাবে। এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যোগ ব্যায়াম, মেডিটেশন নিয়মিত অনুশীলন করতে পারেন।

আসলে খাবার-দাবার, সঠিক পুষ্টি বিজ্ঞানসম্মত খাবার গ্রহণের যে গুরুত্ব শুধু জানা নয়, সেটা অনুসরণ করার গুরুত্ব তখনই আমরা বুঝতে পারব যখন আমরা সুস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বুঝতে পারব। সুস্বাস্থ্য যে কত বড় সম্পদ এটা একজন মানুষ বোঝেন যখন তিনি অসুস্থ হন তখন। সুস্বাস্থ্য এটা শুধু টাকা দিয়ে কেনা যায় না। এটার জন্যে প্রয়োজন শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আত্মিক- প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্থ জীবনদৃষ্টি।

খাবারের ব্যাপারে সহজ ফর্মুলা হচ্ছে- যে সুপাচ্য-সহজ খাবার গ্রহণ করতে হবে। অতিরিক্ত মসলা, তেল-ঝাল, ভাজাপোড়া বর্জন করবেন। মাঝে মধ্যে একটু মসলা, একটু তেলতেলে জিনিস, একটু ঝাল, একটু ভাজাপোড়া খেলেন। কিন্তু ক্রমাগত অতিরিক্ত মসলা, তেলঝাল, ভাজাপোড়া বর্জন করবেন। সব খাবেন, তবে খাবারটা হতে হবে পুষ্টিবিজ্ঞানসম্মত এবং রুচিসম্মত।

যে সময়ে যে শাক-সবজি পাওয়া যায়, যে সিজনে যে ফল মূল পাওয়া যায়, সেগুলো খাবেন। শাক-সবজির মধ্যে বাঁধাকপি, লালশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, পাটশাক, কচুশাক, সজনে পাতা এবং আঁশজাতীয় যত সবজি, সবুজ শাক-সবজি বেশি খাবেন। খাবারের ব্যাপারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করার জন্যে ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! প্রত্যেকটা অঞ্চলের মৌসুমী ফলে সে মৌসুমের রোগ প্রতিষেধক থাকে। যে অঞ্চলে যে মৌসুমে যে ফল হয়, সেই অঞ্চলে সেই মৌসুমে যে রোগ থাকে সে রোগের প্রতিষেধক ঐ ফলের মধ্যে থাকে। অতএব সবসময় মনে রাখবেন- ফল মানে হচ্ছে দেশজ ফল, আঞ্চলিক ফল এবং মৌসুমি ফল।

কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত ফল পাওয়া গেছে, তার মধ্যে কাঁঠাল হচ্ছে সবচেয়ে পুষ্টিকর এবং এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। শুধু কাঁঠাল নয়, কাঁঠাল-কাঁঠালের বিচি – দুটোই সমান পুষ্টিকর! কাঁঠাল বলকারক, রোগ প্রতিরোধক এবং ত্বকের রং ফর্সাকারক। এখন আমের সিজন, আম খাবেন। যখন পাওয়া যায় পেয়ারা, কুল খাবেন। ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মমতো জামের বিচি, মেথি ও করলা খাবেন। আমলকি খাবেন, জাম খাবেন। আর যাদের ডায়বেটিস আছে তারা রাতের বেলা মেথি ভিজিয়ে রাখবেন আর সকালবেলা মেথি ভেজানো পানি খাবেন। ডায়াবেটিস রোগীরা আরো চমৎকার জিনিস খেতে পারেন- করলা, প্রতিদিন সকালবেলা এক গ্লাস করলার জুস! ইটস এ ওয়ান্ডারফুল! করলার জুস! 

কমলা-মাল্টার চেয়ে জাম্বুরা অনেক অনেক উপকারি। যাদের খুব বেশি ঠান্ডা লাগে, তারা এই যে সামনে জাম্বুরা আসছে, আগস্ট মাস থেকে জাম্বুরা পাওয়া যাবে, প্রত্যেকদিন জাম্বুরা খাবেন। এখন আনারসের সিজন, আনারস খাবেন। ফল জুসের চেয়ে চিবিয়ে খাওয়াটা অনেক অনেক বেশি উপকারি। অর্থাৎ যে মৌসুমে যে ফল পাওয়া যায়, সেই মৌসুমের ফল খাবেন। কিন্তু প্যাকেটজাত ফলের জুস বলে যা পাওয়া যায়, এগুলো নিজেরা খাবেন না, বাচ্চাকেও খাওয়াবেন না। প্যাকেটজাত জুস বলে, টিনজাত জুস বলে যা পাওয়া যায়, এগুলো সতর্কভাবে বর্জন করবেন। আর জুস যদি করতে হয় তো ফ্রেশ ফলের জুস করে খান। তবে জুসের চেয়ে ফল চিবিয়ে খাওয়াটা অনেক অনেক বেশি উপকারী।

ক্যান্সারসহ অন্যান্য জটিল রোগ থেকে বাঁচার একটা বড় পথ হচ্ছে- চিনি না খাওয়া। এটা হচ্ছে হোয়াইট পয়জন বা সাদা বিষ। আর দুধ চা, এটা পেটের জন্যে ক্ষতিকর। মোড়কজাত, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বা ফাস্ট ফুড টেস্টি হওয়ার পেছনে অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে এতে ফ্যাট বা চর্বি ব্যবহার করা হয়। এসব খাবারে টেস্টিং সল্ট, রং, ফ্লেভার, তেল, চিনি ব্যবহার করা হয় বেশি। এগুলো যত বেশি খাবেন। তত আপনার ওজন বাড়বে, তত আপনি স্থুলকায় হবেন এবং তত আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। 

শুধু চিনি নয়, চিনি দিয়ে বানানো সকল খাদ্য পরিহার করবেন। প্রয়োজনে আখ বা খেজুরের গুড় অথবা খেজুর দিয়ে মিষ্টি জাতীয় খাবার ঘরেই তৈরী করে নিন। যেমন- গাজর আর খেজুর দিয়ে বানাতে পারেন সন্দেশ। যেখানে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যগুণ আছে। বর্তমানে বাজারে গাজর এমনটিতেই বেশ সহজলভ্য একটি সবজি। পুষ্টিগুণের বিচারে এটা বেশ স্বাস্থ্যসম্মতও বটে। গাজরের হালুয়ার স্বাদই আলাদা। যে একবার খাবে তার মুখে লেগে থাকবে। আরও রয়েছে- সন্দেশ, বরফিসহ স্বাস্থ্যসম্মত বিভিন্ন খাবার। যা একদিকে যেমন পুষ্টিগুণ সম্পন্ন, আবার সেটা চিনিমুক্ত খেজুরের গুড় দিয়ে বানানো মজাদার খাবার। বাচ্চাদের স্কুলের জন্যও যা হতে পারে চমৎকার টিফিন। তাছাড়া গাজরে রয়েছে ভিটামিন ‘এ’ সহ নানা উপকারী পুষ্টিগুণ, যা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানী আর ডাক্তারদের গবেষণায় দেখা গেছে, চিনি জনস্বাস্থ্যের এক নম্বর শত্রু। এখন উন্নত দেশের স্কুল আর হাসপাতালগুলোও তাদের খাদ্যতালিকা থেকে চিনি বাদ দিয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবার থেকে চিনি সম্পূর্ণ বাদ না দিলে দেখা দিবে ক্যান্সারসহ মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

আমরা জানি, যারা বেশি মিষ্টি খায় তাদের টাইপ-টু ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে শরীরে দেখা দিতে পারে নানা রকম বিষক্রিয়া। এছাড়াও সব ধরনের বিপাকজনিত রোগ, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের আধিক্য, ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস, মেদস্থূলতা ও বার্ধক্য প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ার সঙ্গে চিনির সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছেন তারা। এসব কারণেই বিশ্বজুড়ে এখন চিনির আরেক নাম ‘হোয়াইট পয়জন’।

সফট ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস, এলকোহল- এটা আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একদিকে যেরকম কমায়, আপনার ডায়াবেটিস এবং কিডনি বিনাশের কারণ হয়। সফট ড্রিংকস সবচেয়ে বেশি টেস্টি হয়, যখন এটা চিলড অবস্থায় থাকে। ঠাণ্ডা! যত ঠাণ্ডা তত স্বাদ। আর পানি সবচেয়ে ঠাণ্ডা এবং ঘন হয়, যখন এটার তাপমাত্রা চার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে পৌঁছায়। চার ডিগ্রির নিচে চলে গেলে দ্রুত এটা বরফ হয়ে যায়, জমে যায়। এখন একটা সফট ড্রিংকস যদি জমে যায়, কতক্ষণে এটা গলবে কতক্ষণে আপনি খাবেন! আপনার ধৈর্য থাকবে না। অতএব এই সফট ড্রিংকস যাতে বরফ না হতে পারে, জমতে না পারে এইজন্যে সফট ড্রিংকস কোম্পানিগুলো একটা এন্টিফ্রিজার কেমিকেল ব্যবহার করে- ইথিলিন গ্লাইকল। এই ইথিলিন গ্লাইকল সফট ড্রিংকসের তাপমাত্রা চার ডিগ্রিতে নিয়ে স্থির রাখে, আর নামতে দেয় না। এই ইথিলিন গ্লাইকল, এটা হচ্ছে কিডনির জন্যে অত্যন্ত ক্ষতিকর, অত্যন্ত ক্ষতিকর।

কিডনি বিশেষজ্ঞ মরহুম ডা. ব্রিগেডিয়ার সিরাজ জিন্নাত একবার তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করে বলেন, আমাদের দেশে আজকে যে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কিডনির প্রবলেম, ইউরিনারি প্রবলেম, ডায়াবেটিস হচ্ছে- এর প্রধান কারণ হচ্ছে- এই সফট ড্রিংকস। এসব কোমল পানীয়ের বদলে প্রতিদিন ডাব খাবেন। কচি ডাবের পানি এবং রক্তের যে ফ্লুইড, তরল অংশ- একই উপাদানে তৈরি। যার ফলে কখনো যদি স্যালাইন পাওয়া না যায়, ডাক্তাররা কচি ডাবের পানি সরাসরি আপনার ভেইনে প্রবেশ করিয়ে দেন। অতএব বেশি বেশি ডাব খাবেন।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রতিদিন খাবারে এক কোষ রসুন, ২০/৩০/৪০টা কালোজিরা, একচামচ মধু, একগ্লাস দুধ, একটা কলা এবং একটা ডিম, দুটি খেজুর অবশ্যই রাখবেন। প্রতিদিন খাবারে অবশ্যই রাখবেন সবুজ সালাদ। অর্থাৎ যে সবজিগুলো কাঁচা খাওয়া যায় সেটাই সালাদ। প্রতিদিন ঘরে বানানো দই খাবেন। চিনি ছাড়া, টক দই যেটাকে ইয়োগার্ট বলে,‌ টক দই খাবেন। চীনা বানাম হৃদরোগ প্রতিরোধী এবং টেস্টিসের ক্যান্সার প্রতিরোধক। পুরুষদের একটা বয়সের পরে টেস্টিসে ক্যান্সার হতে চায়, এটার প্রতিরোধক হচ্ছে চীনা বাদাম। যত ধরনের বাদাম আছে খাবেন, বিন খাবেন। সয়াবিন থেকে শুরু করে যতরকম বিন আছে খাবেন। চাল যেরকম কার্বহাইড্রেট, আলুও তেমন কার্বহাইড্রেট। তাই ভাতের বদলে আলু খাবেন, মিষ্টি আলু খাবেন। কারণ, আলুতে ভাতের চেয়েও প্রোটিন বেশি থাকে।

সাদা চালের পরিবর্তে লাল চাল, ঢেঁকিছাটা চাল এবং পুরো খোসাসহ চাল খাওয়ার অভ্যাস যদি আমরা করতে পারি, আমাদের সুস্বাস্থ্যের পরিমাণ, সুস্থ থাকার পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। সব ধরনের ডাল খাবেন। শুধু ভাত না খেয়ে সবজি খিচুড়ি খাবেন এবং শাক-সবজি আধা সিদ্ধ খাবেন। বেশি সিদ্ধ শাক-সবজি হজম হতে বেশি সময় নেয়। অনেকের একটা ভুল ধারণা আছে যে, শাক-সবজি যত সিদ্ধ করা হবে হজম তত দ্রুত হবে। আসলে শাক-সবজি যদি বেশি সিদ্ধ করা হয় তাহলে হজম হতে দেরি হয়!

কারণ, প্রত্যেকটা শাক-সবজির সাথে এনজাইম থাকে যেটা হজম করে, প্রাকৃতিক এনজাইম থাকে শাক-সবজিতে। যখন আপনি বেশি সিদ্ধ করছেন, তখন এই প্রাকৃতিক এনজাইমটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তখন এটা হজম করার জন্যে স্টমাককে আবার নতুন করে এনজাইম তৈরি করতে হয়। দুই দিন নিরামিষ, দুই দিন ছোট মাছ, দুই দিন বড় মাছ ও একদিন মাংস। সবসময় সুষম খাবার খাবেন। অর্থাৎ খাবারের মধ্যে ব্যালেন্স করা। মাছের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক মাছ যত খাবেন তত ভালো। মাংসের ক্ষেত্রে সবসময় মনে রাখবেন–যত পা তত কোলেস্টেরল। আপনি দেখেন, চিংড়ি-কাঁকড়ার অনেক পা। কোলেস্টেরল সবচেয়ে বেশি। তারপরে খাসি, গরু, পাঠা চার পা।

অন্যদিকে, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। আর গরম পানিতে গোসল করতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। আবার প্রতিদিন গরম পানি খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের আলোচিত বিজ্ঞানী ও গবেষক ড. বিজন কুমার শীল বলেন, এই সময় যদি মেডিটেশন বা ধ্যান করা যায়, তাহলে অনেকটা মানসিক স্বস্তি লাভ করা সম্ভব। মেডিটেশন বা ধ্যান করলে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং দুশ্চিন্তা কমে যায়। এর ফলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। আমাদের দেশে অনেকে মেডিটেশন বা ধ্যান করেন, এটা ধর্মীয় কোনো চর্চা নয়, এটা মন ও দেহকে সুস্থ রাখার জন্য। আমি আমার দেহকে সুস্থ রাখার জন্য যদি দৈনিক দশ-বিশ মিনিট চোখ বুজে বসে থাকি এবং আমার মানসিক চাপকে কমাতে পারি- তাহলে তো এটা নিঃসন্দেহে খুবই উপকারী।

বিশিষ্ট চিকিৎসক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, সুস্থতাই বড় সম্পদ। তাই আপনি সুস্থ থাকার জন্য বিজ্ঞান সম্মত খাদ্যাভ্যাস ও জীবন যাপনের পদ্ধতি তৈরী করে নিন। সুস্থ থাকতে রেগে যাওয়া, উৎকণ্ঠা, উদ্বিগ্ন না হয়ে সঠিক জীবনদৃষ্টি ঠিক করে নিন। তাহলেই সুস্থ থাকতে পারবেন আর বলুন- সুস্থ দেহ সুস্থ মন, কর্মব্যস্ত সুখি জীবন। 

পরিশেষে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাটাকে অটুট রাখার জন্যে দুটি কাজ করতে হবে। যে খাবারগুলো, যে পানীয়গুলো এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়– এটাকে বর্জন করতে হবে এবং যে খাবারগুলো আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, যে ফলগুলো সহজলভ্য, সে ফলগুলো খেতে হবে। শাক-সবজি, খাবার সেইভাবে খেতে হবে। তাহলে আমরা খুব সহজভাবে বলতে পারি যে- বিন্দু বিন্দু ছোট ছোট যত্ন স্বাস্থ্য গড়ে তোলে। আর বিন্দু বিন্দু অবহেলা-অযত্ন, অনাচার আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, আপনার স্বাস্থ্য নষ্ট করে দেয়।

ইরেকটাইল ডিসফাংশন: পুরুষের যে জটিলতা আজও ট্যাবু

ইরেকটাইল ডিসফাংশন: পুরুষের যে জটিলতা আজও ট্যাবু

ইরেকটাইল ডিসফাংশন, বা উত্থান ত্রুটি; সহজ ভাষায় যাকে বলা যায় যৌন অক্ষমতা বা দুর্বলতা। পুরুষদের জন্য খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয় এটি। এই একুশ শতকে দাঁড়িয়েও অনেকের কাছেই এটি একটি ট্যাবু। তাই লোকসম্মুখে এই সমস্যাটি নিয়ে কথা হয় না বললেই চলে। রাস্তাঘাটে বিভিন্ন হারবাল প্রতিষ্ঠানের অগুনতি পোস্টার ঠিকই দেখা যায়, এবং হারবাল চিকিৎসালয় বা ওষুধের দোকানে রোগীদের লাইনও লেগে থাকে। অথচ সরাসরি এই সমস্যাটির কথা মুখ ফুটে বলতে লজ্জা পায় বেশিরভাগ মানুষ।

নিছক হাসিঠাট্টার ছলে প্রায়শই এই বিষয়টির অবতারণা করা হয় বটে, কিন্তু কোনো আলোচনার টেবিলেই এই বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সাথে আলোকপাত করা হয় না। সবমিলিয়ে অবস্থাটি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা আছে খুব কম মানুষেরই। কানাঘুষা কিংবা ফিসফিসানির মাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে যেসব ধারণার প্রচলন ঘটেছে, প্রকৃত বাস্তবতার সাথে সেগুলোর শত সহস্র মাইলের দূরত্ব।

তাই আজকের এই লেখার মূল লক্ষ্যই হলো আগ্রহী পাঠকদের সামনে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সঠিক তথ্য তুলে ধরার মাধ্যমে তাদের মনের ভুল ধারণাগুলো একে একে দূর করা। প্রয়োজনের তাগিদে এই লেখার মাঝে এমন অনেক শব্দ বা বাক্যাংশের অবতারণা হয়তো করা হবে, যেগুলো পাঠককে বিব্রত করতে পারে। কিন্তু জ্ঞানের সাথে যেহেতু কোনো আপোষ চলে না, তাই পাঠকের প্রতি বিনীত নিবেদন থাকবে তারা যেন গোটা ব্যাপারটিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন।

ইরেকটাইল ডিসফাংশন কী?

যৌন মিলনের পূর্বশর্ত হলো, পুরুষের লিঙ্গের উত্থান ঘটবে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, মিলনের পূর্বে পুরুষের লিঙ্গের পর্যাপ্ত উত্থান ঘটছে না। কিংবা কারো কারো আবার উত্থান ঘটলেও, তা বেশিক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। এর ফলে পরিপূর্ণ যৌন মিলনও সম্ভব হচ্ছে না। একজন পুরুষের লিঙ্গের এরুপ উত্থানজনিত সমস্যাকেই বলা হয়ে থাকে ইরেকটাইল ডিসফাংশন।

তবে মাঝে মাঝে কোনো পুরুষের লিঙ্গের উত্থানে সমস্যা হলেই এমনটা বলা যাবে না যে তিনি ইরেকটাইল ডিসফাংশনের শিকার। এগুলো নিছকই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু বিষয়টি কপালে ভাঁজের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখনই, যখন একজন পুরুষ ক্রমাগত এই সমস্যার সম্মুখীন হতে থাকেন। এর ফলে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, অবসাদ তাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে, তারা আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগতে থাকেন, এবং তাদের দাম্পত্য সম্পর্কও ঝুঁকির মুখে পড়ে। লিঙ্গের উত্থানে ব্যর্থতা কিংবা তা ধরে রাখতে না পারার পেছনে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষত তা হৃদরোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে।

ইরেকটাইল ডিসফাংশনের লক্ষণ

একজন ব্যক্তি যে ইরেকটাইল ডিসফাংশনের শিকার, তা বলা যাবে যদি তিনি নিয়মিত নিম্নোক্ত সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হন:

  • লিঙ্গের উত্থান ঘটাতে না পারা;
  • লিঙ্গের উত্থান ধরে রাখতে না পারা;
  • যৌন আকাঙ্ক্ষা হ্রাস পাওয়া কিংবা কখনোই আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত না হওয়া।

ছাড়া আরো কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে:

  • দ্রুত বীর্যপাত হওয়া;
  • বিলম্বে বীর্যপাত হওয়া;
  • টেস্টোস্টেরন বা পুরুষের যৌন হরমোনের মাত্রা কম হওয়া;
  • অ্যানোর্গাজমিয়া দেখা দেয়া, অর্থাৎ পর্যাপ্ত উত্তেজনা সত্ত্বেও অর্গাজম লাভে ব্যর্থ হওয়া।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে

ইরেকটাইল ডিসফাংশন হয়েছে, এমন মনে করলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এবং সেক্ষেত্রে অবশ্যই কোনো হাতুড়ে ডাক্তার বা চটকদার বিজ্ঞাপনসম্পন্ন হারবাল চিকিৎসক নয়, বরং যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হবে। তবে যেহেতু অনেকেই লজ্জার কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে সংকোচ বোধ করেন, তাই তারা প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে নিজের মধ্যে নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পারেন:

  • আপনি কি লিঙ্গের উত্থান বা স্থিতাবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট নন?
  • আপনার কি দ্রুত বা বিলম্বে বীর্যপাত ঘটছে?
  • আপনার কি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা আছে?

যদি এই তিনটি প্রশ্নেরই, কিংবা যেকোনো দুটি বা একটির উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। ইরেকটাইল ডিসফাংশনের চিকিৎসায় ইউরোলজিস্ট বা এন্ডোক্রিনোলজিস্টের কাছে যাওয়া উত্তম, তবে ভালো হয় প্রথমে পারিবারিক চিকিৎসক বা যে চিকিৎসকের কাছে নিঃসংকোচে সব সমস্যা শেয়ার করা যায়, তার পরামর্শ গ্রহণ করা।

ইরেকটাইল ডিসফাংশন কেন হয়?

পুরুষের লিঙ্গের উত্থান মূলত যৌনোদ্দীপনার সাথে সম্পর্কিত। আর পুরুষের যৌনোদ্দীপনা খুবই জটিল একটি প্রক্রিয়া, যেটির সাথে সরাসরি সংযোগ রয়েছে তাদের মস্তিষ্ক, হরমোন, আবেগ, স্নায়ু, পেশি ও রক্তসংবহনতন্ত্রের। ইরেকটাইল ডিসফাংশন এগুলোর যেকোনো একটির সমস্যা বা অস্বাভাবিকতার কারণে হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া চাপ, বিষণ্ণতা বা অন্যান্য মানসিক সমস্যার ফলেও ইরেকটাইল ডিসফাংশন হতে পারে, বা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

কখনো কখনো ইরেকটাইল ডিসফাংশনের পেছনে শারীরিক ও মানসিক দু’ধরনের কারণই প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন ধরুন, কোনো একটি ছোটখাট শারীরিক সমস্যার কারণে হয়তো সাময়িকভাবে আপনার যৌন উদ্দীপনার মাত্রা কমে গেল। কিন্তু এ নিয়ে আপনি এত বেশি চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে, সে কারণে পরবর্তীতে আপনার লিঙ্গের উত্থান ঘটা বা ধরে রাখা আরো বেশি কঠিন হয়ে পড়ল। এভাবেই শারীরিক সমস্যার সাথে মানসিক সমস্যা যোগ হয়ে ইরেকটাইল ডিসফাংশনের মাত্রা বহু গুণে বাড়িয়ে দিল।

ইরেকটাইল ডিসফাংশনের শারীরিক কারণ

বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে ইরেকটাইল ডিসফাংশন দেখা দিতে পারে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • হৃদরোগ;
  • রক্তনালী সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া (এথেরোস্ক্লেরোসিস);
  • উচ্চ কোলেস্টেরল;
  • উচ্চ রক্তচাপ;
  • ডায়াবেটিস;
  • ওবেসিটি;
  • মেটাবলিক সিন্ড্রোম- একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চমাত্রার ইনসুলিন, কোমরের কাছে অতিরিক্ত চর্বি ও উচ্চ কোলেস্টেরল একসাথে দেখা দেয়;
  • পারকিনসন ডিজিজ;
  • মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস;
  • পেরোনি’স ডিজিজ – লিঙ্গের ভিতর স্কার টিস্যু জন্মানো;
  • প্রোস্টেট ক্যান্সার;
  • স্লিপ ডিজঅর্ডার বা ঘুমের সমস্যা;
  • শ্রোণী এলাকা বা মেরুদণ্ডে জখম।
  •  
  •  
  •  

রিস্ক ফ্যাক্টর

একজন পুরুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে যৌন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফলে একজন মধ্যবয়সী বা প্রৌঢ় পুরুষের তরুণ বয়সের মতো সহজেই লিঙ্গের উত্থান ঘটে না, আর লিঙ্গ খুব বেশি শক্তও থাকে না। তখন বারবার স্পর্শ করে লিঙ্গ উত্থিত ও শক্ত রাখতে হয়।

তবে আজকাল বয়স বিশ বা ত্রিশের কোঠায় আসা মাত্রও অনেকে ইরেকটাইল ডিসফাংশনের শিকার হচ্ছেন। এর পেছনে পেছনে বেশ কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর কাজ করতে পারে, যেমন:

  • বিভিন্ন মেডিকেল অবস্থা, বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ;
  • তামাক ব্যবহার, যেটি রক্তনালী বা ধমনীতে রক্তপ্রবাহ আটকে দেয়, ফলে সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতা দেখা যায়, যা ইরেকটাইল ডিসফাংশনের জন্ম দিতে পারে;
  • অতিরিক্ত শারীরিক ওজন থাকলে, বিশেষত ওবেসিটি বা অতিস্থূলতার শিকার হলে;
  • কিছু বিশেষ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে, যেমণ প্রোস্টেট সার্জারি বা ক্যান্সারের রেডিয়েশন ট্রিটমেন্ট;
  • কোনো চোট বা জখম, বিশেষত তা যদি স্নায়ু বা উত্থান নিয়ন্ত্রণকারী ধমনীকে আক্রান্ত করে;
  • কিছু বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করলে, যেমন অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, অ্যান্টিহিস্টামিন কিংবা উচ্চ রক্তচাপ, ব্যথা বা প্রোস্টেটে সমস্যার ওষুধ;
  • বিভিন্ন মানসিক অবস্থা, যেমন- দুশ্চিন্তা, চাপ, অন্যমনস্কতা বা অবসাদ;
  • মাদকের নেশা, বিশেষত কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে নেশা করে আসে বা মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ করে।

উদ্ভূত জটিলতা

ইরেকটাইল ডিসফাংশনের ফলে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। যেমন:

  • অসন্তুষ্ট যৌন জীবন;
  • সঙ্গীর সাথে সম্পর্কে অবনতি;
  • মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি;
  • নিজের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা;
  • সঙ্গীকে গর্ভবতী করতে না পারা।
  •  

বাঁচার উপায়

একবার যদি কোনো ব্যক্তি ইরেকটাইল ডিসফাংশনের শিকার হয়েই যান, সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে ওষুধ সেবন করতে হবে, ইনজেকশন নিতে হবে, সার্জারি করাতে হবে, কিংবা নিছকই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হবে। আর যারা এখনো ইরেকটাইল ডিসফাংশনের সম্মুখীন হননি, তাদের উচিত হবে সুস্থতা ধরে রাখার জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো যথাযথভাবে পালন করা:

  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা;
  • শারীরিক সমস্যার অতীত ইতিহাস থাকলে, কিংবা না থাকলেও, প্রতিবছর অন্তত একবার চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চেক-আপ ও মেডিকেল স্ক্রিনিং টেস্ট করিয়ে আসা;
  • ধূমপান পুরোপুরি বর্জন করা, অ্যালকোহল গ্রহণের মাত্রা সীমিত করা কিংবা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা, অবৈধ নেশাদ্রব্য ব্যবহার না করা;
  • নিয়মিত শরীরচর্চা করা;
  • অনিয়মিত খাদ্যগ্রহণের বদলে সুষম ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ করা;
  • রাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমানো ও কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নেয়া;
  • মানসিক চাপ, অবসাদ, দুশ্চিন্তা বা অন্যান্য সমস্যাকে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
  •  
  •  

শেষ কথা

কথিত আছে, ইরেকটাইল ডিসফাংশনের পেছনে ৯০% হাত থাকে মনের, আর ১০% শরীরের। অনেক পুরুষই এই সমস্যার কারণে মানসিক হীনম্মন্যতায় ভোগেন, এবং উপায়ন্তর না দেখে হারবাল চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন, কিংবা রাস্তায় বিক্রি হওয়া তথাকথিত যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ কিনে ব্যবহার করেন। আজকাল তো অনলাইনেও নানা চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে লোক ঠকানোর চেষ্টা চলছে। যেহেতু এটি এমন একটি স্পর্শকাতর সমস্যা, যা নিয়ে সবার সামনে আলোচনা করা যায় না, তাই একপ্রকার অসাধু লোকও এর ফায়দা তুলতে থাকে।

তাছাড়া অধিকাংশ পুরুষের ক্ষেত্রেই ইরেকটাইল ডিসফাংশন কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা নয়, বরং সাময়িক একটি জটিলতা মাত্র। নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমেই এই জটিলতা থেকে দূরে থাকা যায়। কিন্তু ঘটনাচক্রে কারো মধ্যে যদি এই জটিলতা দেখা দিয়েও বসে, তাহলেও তার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মবিশ্বাস হারানোর কিছু নেই। সঠিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অচিরেই তিনি শতভাগ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন ওই ব্যক্তির স্ত্রী। তিনি যদি এমন সমস্যার ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে, তাকে যথাসম্ভব মানসিক সমর্থন জোগান, তাহলেই ওই ব্যক্তির সেরে ওঠার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।

একবার মনের মধ্যে আত্মবিশ্বাসহীনতা জেঁকে বসলেই জল অনেক দূর গড়ায়। তার আগপর্যন্ত ইরেকটাইল ডিসফাংশন কোনো বড় সমস্যাই নয়। আর কোনোভাবে যদি সমস্যাটি সুদূরপ্রসারী হয়েই যায়, সহজে মুক্তি পাওয়া না যায়, সেক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে সুফল পাওয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, সকল জটিলতার মূলে মানুষের মন। এই মনকে যদি বশে রাখা যায়, কোনো নেতিবাচক চিন্তাকে সেখানে আশ্রয় নিতে দেয়া না হয়, তাহলেই জীবনের অধিকাংশ সমস্যার কার্যকর সমাধান লাভ সম্ভব।

  •  
ফল কখন খাবেন কখন খাবেন না

ফল কখন খাবেন কখন খাবেন না

ফল খাওয়া নিয়ে নানা জনের নানা মত। কেউ বলছেন, খালি পেটে পানি আর ভরা পেটে ফল খেতে হয়। আবার কেউ বলেন, সন্ধ্যার আগে ফল খেয়ে নেওয়া উচিত। এমন নানা মতে স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্ত আপনি। কোনটা শুনবেন আর কোনটা শুনবেন না! তার চেয়ে জেনে নিন পুষ্টি বিজ্ঞানীরা কী বলছেন।

পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের কথায়, ফল মানেই প্রচুর প্রাকৃতিক ভিটামিন, মিনারেলস আর ফাইবারের আকর। তাই প্লেটের অর্ধেকটা যদি ফল আর অর্ধেকটা সবজিতে ভরা থাকে তাহলে এমনিতেই পেট ভরবে এবং ভরা পেটে না খালি পেটে ফল খাবেন সেই দ্বন্দ্বও থাকবে না। খবর এনডিটিভি’র। 

এছাড়াও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দাবি, খাওয়ার আধ ঘণ্টা আগে যদি কয়েক টুকরো ফল খেয়ে নেওয়া যায় তাহলে বেশি খাওয়ার সমস্যা থেকে আপনি রেহাই পাবেন। বাঁচবেন ওবেসিটির ঝামেলা থেকেও। 

তবে যেসব ফলে শর্করা বা চিনির মাত্রা বেশি সেগুলি খাবার পাতে খাওয়া উচিত নয়। এতে হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর সব সময়েই ফল ও খাবার খাওয়ার মধ্যে কম পক্ষে আধ ঘণ্টা ফারাক রাখা উচিত। না হলে খাবার বা ফল কোনোটাই হজম হবে না। কারণ ফল নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ খাবার।

কখন ফল খাওয়া উচিত?

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, সকালে উঠে এক গ্লাস পানির পর ফল খেলে শরীর দূষণমুক্ত হবে। হজম ক্ষমতা বাড়বে। আরও বেশি পুষ্টি পাবেন আপনি। তবে সাধারণত সকালের ব্রেকফাস্ট আর দুপুরের খাওয়ার মাঝের সময়ে ফল খাওয়া যেতে পারে। এছাড়া বিকেলে বা সন্ধেয় স্ন্যাকস হিসেবেও ফল বেছে নিন। অর্থাৎ সন্ধ্যার পর ফল খাওয়া যেতেই পারে।

এছাড়া খাওয়ার আগে কয়েক টুকরো ফল খেলে পাকস্থলীতে ফাইবার যায়। যা অন্য খাবার হজম করতে সাহায্য করে। আবার পেটও ভর্তি রাখে। বেশি ফাইবার যুক্ত ফল হল আপেল, ন্যাসপাতি, কলা।

তবে রাতে খাওয়ার পর ফল না খাওয়াই ভালো। কারণ ফলের মধ্যে থাকা চিনি শরীরে বাড়তি এনার্জি জুগিয়ে ঘুমের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। তাই শোওয়ার অন্তত ঘণ্টা দুই আগে ফল খেতেই পারেন।

এমএস/এসি

পিঠ ব্যথা ঘরে ঘরে কেন ? কি করনীয়।

পিঠ ব্যথা ঘরে ঘরে কেন ? কি করনীয়।

মেরুদন্ডের ব্যথা একটি বিশেষ পরিচিত উপসর্গ । মেমূলত কোমর , ঘাড় ও পিঠের ব্যথাকে মেরুদন্ডের ব্যথা হিসেবে ধরা হয় । সমীক্ষায় দেখা গেছে , সারাজীবনে কোনো না কোনো সময় এই ব্যথায় ভোগেননি এমন মানুষের সংখ্যা নগণ্য , মাত্র কুড়ি শতাংশ । অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যথা সাধারণ চিকিৎসায় যেমন ব্যথা কমাবার ওষুধ প্রয়ােগে বা ফিজিওথেরাপিতে কমে গেলেও প্রায় ষাট শতাংশ ক্ষেত্রে সমস্যাটা বারে বারে ফিরে আসে । বারবার অসুবিধা হয় এমন অর্ধেকেরও বেশি রোগীর ক্ষেত্রে মেরুদন্ডের ব্যথা তেমন কষ্টদায়ক নয় । তবে বাকি রোগীদের ২৫ শতাংশ ও ১৪ শতাংশ কিন্তু যথাক্রমে তীব্র কোমর ও ঘাড়ের যন্ত্রণা ভোগ করে থাকেন ।

আমাদের শিরদাঁড়া তৈরি ৩০টি ক্যারামের খুঁটির মতো হাড় দিয়ে যা সাজানো থাকে একটির । ওপর একটি । এই হাড়গুলোকে বলে ভার্টিব্রা বা কশেরুকা । মোট ৭টি ভার্টিব্রা থাকে ঘাড়ে , যাদের বলে সারভাইকাল ভার্টিব্রা বা ঘাড়ের হাড় । বুকের কাছে থাকে ১২টি , যাদের বলে থোরাসিক ভার্টিব্রা । কোমরে থাকে ৫টি , যাদের বলে লাম্বার ভার্টিব্রা । কোমরের নীচে থাকে আরও পাঁচটি ভার্টিব্রা যারা একসঙ্গে জুড়ে তৈরি করে স্যাক্রাম । এই স্যাক্রামের শেষে আঙুলের ডগার মতো ক্ষয়গ্রস্ত একটি ভার্টিব্রা থাকে যা আসলে কয়েকটি ছােট হাড়ের সমষ্টি । এই ছোট হাড়গুলিকে একটি হাড় ধরে নিলে আমাদের শিরদাঁড়ার মোট হাড়ের সংখ্যা ত্রিশটি । দুটি ভার্টিব্রার মধ্যে থাকে ইন্টার ভাটিব্রাল ডিস্ক । এগুলি দেখতে অনেকটা জেলি ভরা চাকতির মতো । এই ডিস্কগুলো থাকার জন্য আমরা সামনে পিছনে ঝুঁকে এপাশ – ওপাশ করতে পারি ।

প্রত্যেকটি ভার্টিব্রার মধ্যে থাকে গোলাকার একটি ফাঁকা অংশ । এই ফাপা অংশগুলো মিলিয়েই তৈরি হয় স্পাইনাল ক্যানাল । যার মধ্যে দিয়ে নেমে আসে স্পাইনাল কর্ড বা সুষুম্না কান্ড । আর এই স্পাইনাল কর্ড থেকেই অসংখ্য স্নায়ুর শাখা – প্রশাখা ছড়িয়ে পড়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে ।

শিরদাড়া শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ । শুধু ভার্টিব্রা তো নয় , বিভিন্ন পেশি , লিগামেন্ট সবাই মিলে শিরদাঁড়ার কাজ করে । দাড়ানো, হাঁটা, বসা, পাশ ফেরা ছাড়াও পুরো শরীরের ভার বহন করা , ছন্দমাফিক চালনা ,করা , এসবই শিরদাড়ার কাজ । এর সাহায্যেই আমরা শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখি । একদিকে ঝোকার সময়ে যেমন সেদিকেই পেশিগুলোর ক্রমশ সংঙ্কোচন হয় , তেমনি উল্টোদিকের পেশিগুলো ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকে । এভাবেই ভারসাম্য রক্ষার ফলে স্পাইনাল কর্ড ও বিভিন্ন নার্ভ নানা আচমকা আঘাত থেকে বাঁচে , তাই শিরদাঁড়া সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

শিরদাড়ার সমস্যা ও উপশম

 শিরদাঁড়ার কোনও অংশে সমস্যা দেখা দিলে ঘাড় , পিঠ , কোমর , পা নানা অংশে ব্যথা হতে পারে । ঘাড়ে ব্যথা হল শিরদাঁড়া নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত সমস্যা । প্রধানত চারটি কারণে এটি হয় স্পন্ডাইলোসিস , ফাইব্রোসাইটিস , হাইপারটেনশন ও অ্যাংজাইটি । এছাড়া আরও নানা কারণ থাকতে পারে ।

সটকা লাগা: এটি খুব প্রচলিত সমস্যা পরিভাষায় রোগটির নাম অ্যাকিউট সারভাইকাল ডিস্ক সিনড্রোম । এই সমস্যা ঘাড়েই বেশি দেখা যায় । হঠাৎ ঘাড় ঘােরাতে গিয়ে কিংবা কোনো ভারী জিনিস তুলতে গিয়ে সমস্যা আসতে পারে । ডিস্কের মধ্যে জেলির মতো যে পদার্থ থাকে তা সামান্য বাইরে এসে নার্ভে চাপ দিলে এই সমস্যা দেখা দেয় । গরম সেঁক ও বিশ্রাম নিলে এই ধরনের ব্যথা দিন সাতেকের মধ্যে ভালো হয়ে যায় ।

শিরদাঁড়ার জন্মগত ত্রুটি

শিরদাড়ার সাধারণত চার ধরনের জন্মগত ত্রুটি দেখা যায় ।

স্পাইনাবাহফিডা: এক হাজার জন শিশুর মধ্যে একজনের হয় । কোমরের লাম্বার ও স্যাক্রাল ভাটিব্রায় নিউরাল আর্চে গ্যাপ থাকে । এতে কোমরে ব্যথা থেকে নিম্নাঙ্গে প্যারালিসিস হতে পারে । রোগ নির্ণয় করে অবিলম্বে চিকিৎসা শুরু করা উচিত ।

স্যাক্রালাইজেশন: ৫ নম্বর ভার্টিব্রার দু ‘ পাশে কিংবা একপাশে দাড়া বেড়ে গিয়ে কোমরে অসহ্য ব্যথা হতে পারে । সেক্ষেত্রে ট্রাকশন , ওষুধ দিয়ে , অপারেশন করে সারিয়ে তোলা হয় ।

 স্পন্ডাইলোলিসথেসিস: কোমরের লাম্বার ৪ বা ৫ নম্বর ভার্টিব্রা অন্যগুলো থেকে এগিয়ে কিংবা সরে আসে । এই ধরনের জন্মগত চোট লেগে ব্যথা বাড়তে পারে ।

স্কোলিওসিস: অনেক সময় শিরদাঁড়া একেবেঁকে থাকে জন্ম থেকে । তাকে বলে স্কোলিওসিস । বাচ্চারা কোমর বা পিঠে ব্যথার কথা বললে অবহেলা না করে এক জন অর্থোপেডিক্সের পরামর্শ নিন ।

শিরদাড়ার অন্যান্য রোগ

 নানা ধরনের সংক্রমণের ফলে শিরদাঁড়ায় অস্টিওমাইলাইটিস রোগটি হতে পারে পায়োজেনিক , টিবি বা সিফিলিস হতে পারে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করালে দিন দশেকের মধ্যেই রোগটি সেরে যায় । এছাড়া শিরদাঁড়ার ভার্টিব্রায় বিনাইন বা ম্যালিগন্যান্ট যেকোনো টিউমার হতে পারে । টিউমার হলে জায়গাটি প্রথমে ফুলে উঠবে । তাই শিরদাঁড়ার কোনও অংশ ফুলে উঠলে একদমই অবহেলা করবেন না ।

অস্টিওপোরোসিস: একটু বেশি বয়সে শিরদাঁড়ায় অস্টিওপোরোসিস হতে পারে , যার ফলে হাড ফাপা ও দুর্বল হয়ে যায় । এছাড়া বয়স হলে মানুষ কুঁজো হয়ে যায় । শিরদাঁড়ার হাড় ক্ষয়ে গিয়ে নরম হয়ে যাওয়ার কারণে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে । তবে বেল্ট ব্যবহার করলে ঝুঁকে পড়া ভাবটা অনেকটা কমে যায় ।

শিরদাঁড়ার টিবি: কোমরের উপর দিকে দুটো ভার্টিব্রা অনেক সময়ে টিবির জীবাণু মাইক্রোব্যাক্টেরিয়ামের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে । এই রোগ শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায় । বাচ্চারা খেলাধুলাের পর এই ধরনের পিঠে ব্যথার কথা বলে । বাচ্চাদের ওজন কমতে পারে , খিদে কমে যায় । রোগ অবহেলা করলে প্যারালিসিস হতে পারে । শিরদাঁড়ার টিবি বছরখানেকের চিকিৎসায় খুব সহজেই সারে ।

সায়টিকা: শিরদাড়ার একদম নীচের ভার্টিব্রা স্যাক্রাম দিয়ে যেনার্ভ রুটগুলো বার হয় সেগুলোকে একসঙ্গে বলা হয় সায়টিকা নার্ভ । এটি আবার নানা শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে ছড়িয়ে পড়েছে কোমর থেকে পায়ের গোড়ালি অবধি পেশির অংশতে । কোনো কারণে শিরদাঁড়ায় কোনো আঘাত লাগলে , ডিস্ক প্রোলান্স হলে , শিরদাঁড়ায় টিউমার হলে , নার্ভে চাপ পড়লে সায়টিকা পেন হতে পারে । সায়টিকার উপসর্গ হল কোমরে ব্যথা । এইব্যথা ক্রমশ পায়ের দিকে নামে । অভিজ্ঞ ডাক্তারের সাহায্যে চিকিৎসা করলে রোগ সারে ।

স্লিপ ডিস্ক: ডিস্কের দুটিঅত্যন্ত প্রয়ােজনীয় অংশ যেমন অ্যানিউলাম ফ্রাইবোসাস অনেক কারণে ক্ষয়ে যেতে পারে । পুষ্টির অভাব , ধূমপান সহ নানা নেশা , পেশাগত কারণে দীর্ঘদিন ধরে শিরদাড়ায় চাপ , অতিরিক্ত দেহের ওজন এবং বার্ধক্যজনিত কারণে ডিস্কের জেলির মতো অংশ বেরিয়ে আসতে পারে । আর একবার বেরিয়ে এলে স্বাভাবিক হয় না । এটা অনেকটা টিউব থেকে টুথপেস্টের বেরিয়ে আসার মতো । একে বলে স্লিপড ডিস্ক । এই জেলি শিরদাঁড়ার চারপাশের নার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে । শুরু হয় ব্যথা । ঘাড়ে , পিঠে , কোমরে — শিরপাড়ার । যেকোনো জায়গাতেই এটা হতে পারে । ব্লিউ ডিস্কের চিকিৎসায় শিরদাঁড়ার ওপর চাপ কমাতে হবে । ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে পিঠের মাংসপেশিগুলোকে সবল করতে হবে । স্লিড ডিস্কের ক্ষেত্রে অনেকসময় হাতের বা পায়ের আঙুলে টান ধরে ঝিনঝিন করে । কারণ নার্ভ রুটের ওপর চাপ পড়ে । তার ফলে দেখা দেয় সমস্যা ।

স্পন্ডাইলোসিস: এই রোগের ক্ষেত্রে হাড়ের ক্ষয় দেখা যায় । ঘাড়ে হলে বলে সারভাইকাল এবং কোমরে হলে লাম্বার স্পন্ডাইলোসিস । শিরদাঁড়ার এই দুটো অংশ সব থেকে বেশি নড়াচড়া করে বলে এখানেই হাড়ের ক্ষয় বেশি হয় । শিরদাঁড়ায় ক্রমাগত চাপ পড়ার ফলে একটু একটু করে বিভিন্ন ভার্টিব্রা ক্ষয়ে যেতে থাকে । বিশেষ করে যারা লেখাপড়ার কাজ করেন । যেমন ক্লার্ক , টাইপিস্ট , লেখক ,টেলারিং কর্মী এইসব মানুষের ঘাড়ের পেশিতে , হাড়ে চাপ পড়ে । ক্ষয়ে যেতে থাকে পেশি ও হাড় । ভারী মাল বইতে গিয়ে মুটে – মজুরদের মধ্যেও এটা হতে পারে । এই রোগের উপসর্গ ঘাড় , কাধ , পিঠ ও কোমরে অসহ্য ব্যথা হয় ঘাড় থেকে হাতে এবং কোমর থেকে ব্যথা ছড়াতে পারে । অনেক সময় আচমকা মাথা ঘুরে যায় , ঘাড় ঘোরাতে শরীর বাঁকাতে ও হাঁটাচলা করতে অসুবিধা হয় । হাত – পা মাঝে মাঝে ঝিনঝিন করে । রোগ নির্ণয় করার জন্য প্রয়োজন শিরদাড়ার যেখানে ব্যথা হচ্ছে সেখানকার এক্স-রে , রক্তের টিসি , ডিসি , ই.এস . আর , সুগার ইত্যাদির পরীক্ষা । বিশেষ ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান এবং ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং বা এম . আর . আই . ।

স্পন্ডাইলোসিস এড়াতে সতর্ক হতে হবে । যেমন টেবিলে বসে ঝুঁকে পড়াশোনা অন্য কাজ করবেন না । দেহের মেদ কমান । খেয়াল রাখতে হবে শিরদাঁড়ায় যেন বার বার চোট না লাগে , টেনশন কমাতে হবে , প্রতিদিন হালকা কিছু ব্যায়াম , কায়িক পরিশ্রম অবশ্যই করা দরকার ।

শিরদাড়ার সমস্যা এড়াতে কীভাবে বসে কাজ করবেন

 টেবিল এবং চেয়ারের হাইট এমন করুন যেন ঝুঁকে বসতে না হয় । কোনো কিছু পড়বার বা লিখবার সময় ঘাড় সোজা রাখুন । ইজিচেয়ার নয় , কাঠের শক্ত সোজা চেয়ারে বসতে হবে । একটানা কাজ না করে ঘণ্টাখানেক বাদে বাদে মিনিট পাঁচেক রিল্যাক্স করুন । বসে বসেই ঘাড়টাকে এপাশ – ওপাশ , সামনে – পিছনে বার কয়েক করুন । কম্পিউটারে কাজ করার সময় চোখের সামনে মনিটর রাখুন , যাতে ঘাড় উঁচু করে কাজ না করতে হয় । ।

কীভাবে গাড়ি চালাবেন: হেলানো সিট চলবে না । সিট থাকবে সোজা । ড্রাইভার ঘাড় সোজা রেখে গাড়ি চালাবেন । স্কুটার বা বাইক চালাবার সময় কুঁজো হবেন না । হেলমেটটা যেন একটু হালকা হয় ।

কীভাবে শোবেন: বালিশ যেটা আপনি মাথায় দেবেন তা নরম হতে হবে । কিন্তু যে গদিতে আপনি শশাবেন সেটাও এমন হবে যা শক্ত ও নরমের মাঝামাঝি । বুকের নীচে বালিশ রেখে ঘাড় নীচু করে কিংবা চিত হয়ে শুয়ে বই পড়বেন না ।

চোখের স্ট্রেন থেকে: আলোতে যারা ঝুঁকে পড়েন , ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভির খুব সামনে থেকে খেলা বা সিরিয়াল দেখেন , যাদের চোখ । ট্যারা চোখে কোনো অসুখ আছে তাদের ঘাড় । ব্যথা করতে পারে । একটানা টেবিল ল্যাম্পের আলোতে পড়বেন না । বরং ৬০ ওয়াটের বালব । টেবিল থেকে চার ফুট উঁচুতে ঝুলিয়ে সেই আলোতে পড়ুন । সম্পূর্ণ অন্ধকার ঘরে টিভি দেখবেন না । ঘরে অন্তত ৪০ ওয়াটের বালব জ্বলবে এবং সেটা থাকবে দর্শকদের পিছনে , টিভি থেকে অন্তত দশ ফুটের দূরত্ব থাকতে হবে ।

ঘরকন্নার কাজ: দাঁড়িয়ে রান্না করতে হবে । মশলা বাটা , কুটননা কাটা টেবিলে রেখে করুন । কাপড় কাচা বসেই করুন , কিন্তু ঘর ঝট দেওয়া – মোছা দাঁড়িয়ে ঝুঁকে না করে বসে বসেইকরা ভালো । কারণ এর ফলে যে ব্যায়ামটা হয় তাতে পেটের চর্বি কমে যায় । ঠাকুর ঘরে পদ্মাসনে বসে ঘাড় সােজা করে পুজো করুন । অল্প সময় নিয়ে প্রণাম করুন । কারণ বেশিক্ষণ ঝুঁকলে ভার্টিব্রায় চাপ পড়ে । ভারী জিনিস তােলার সময় একদম কোমর ভাজ করবেন না । ঝুঁকবেন না , পারলে জিনিসটা দুভাবে ভাগ করে ক্যারি করুন । অনেকসময় জল ভর্তি বালতি অথবা অন্য কোনো জিনিস তুলতে গিয়ে সটকা লাগে ।

পরিবেশ: স্যাঁতাস্যাঁতে  পরিবেশ , অতিরিক্ত ঠান্ডার প্রকোপ , এয়ারকন্ডিশনে অভ্যস্ত থাকতে থাকতে ঘাড়ে ব্যথা ও পেশির আড়ষ্টতা দেখা যায় ।

কী খাবেন না : সব ধরণের রেড মিট , শিম , মিষ্টি পাউরুটি , পালংশাক , মুসুর ডাল , ঘি – মাখনযুক্ত ফ্যাটি ফুড কম খেতে হবে ।

ওজন কমাতে হবে: কোনো জিমে ভর্তি হয়ে যান । ওখানে ফ্রিহ্যান্ড ও মেশিনপত্রের সাহায্যে ব্যায়াম করতে পারবেন । ওরা আপনার ওজন , উচ্চতা , বয়স ও কাজের ধরন অনুযায়ী ডায়েট চার্ট করে দেবেন ।

শিশুদের বেলায় ঘাড় সোজা করে শশায়াবেন । কোলে নেওয়ার সময় অবশ্যই ঘাড়ের তলায় হাত রাখবেন । বেশি জোরে