বেগুনকে জাতীয় সবজি করার সুপারিশ

বেগুনকে জাতীয় সবজি করার সুপারিশ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর ২০২১, কভিড-১৯ অতিমারীতেও বছরব্যাপী নানান উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে বছরটি উদযাপন করা হচ্ছ। স্বাধীনতার পর আয়তনে ছোট কিন্তু জনসংখ্যায় বৃহত্তম রাষ্ট্রটির অর্জন কম নয়, খাদ্যনিরাপত্তাসহ বৈশ্বিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক মান সূচকে অভাবনীয় উন্নতি একটি অনন্য বিস্ময়! দেশের অর্থনীতির ভিত এখন অন্য মাত্রায় উপনীত হচ্ছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দেশের ক্রমাগত উন্নতি কোনো অবস্থাতেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

পৃথিবীতে দেশের পরিচিতি অন্য মাত্রায় উপস্থাপন করার জন্য তার নিজস্ব সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ঐতিহ্যগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরতে হয়। নানা ধরনের সূচক আছে, যেমন প্রাণী, উদ্ভিদ, প্রাচীন স্থাপনা, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি। ক্যাঙ্গারুর নাম এলে মানসপটে ভেসে ওঠে অস্ট্রেলিয়ার নাম, আবার কিউইউ ফলের নাম এলে নিউজিল্যান্ডের কথা মনে পড়ে। জলপ্রপাতের নাম এলে নায়াগ্রা বা কানাডার নাম আর হিংস্র প্রাণী বাঘের নাম মনে হলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাংলাদেশ সমার্থক। বাংলাদেশ মহান মুক্তিযুদ্ধের পর পরই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় প্রতীক ঘোষণা করেছে, যেমন জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় পাখি দোয়েল, জাতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন বলধা গার্ডেন, জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ—এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয় ঐতিহ্যের সূচকগুলোকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার যে স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও বাংলাদেশের জাতীয় সবজির নাম এখনো ঘোষণা করা হয়নি বা কারো নজরে আসেনি; কেন দেয়া হয়নি তা বোধগম্য নয়। অথচ এ দেশে বহুল প্রচলিত, প্রচলিত, অপ্রচলিত, বাণিজ্যিক চাষ মিলে ২০০টিরও বেশি সবজির ব্যবহার হয়। এর মধ্যে কয়েকটি হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদার জোগান দিয়ে আসছে এবং খাদ্য সংস্কৃতির অন্যতম উপকরণ। বিজ্ঞজনরা মনে করেন অন্যান্য খাতের সূচকের মতো বাংলাদেশের একটি সবজিকে জাতীয় সবজি হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। এতে কোনো আর্থিক সংশ্লেষ নেই, আছে আত্মিক সংশ্লেষ ও ঐতিহ্যের স্বীকৃতি।

সবজির জাতীয় স্বীকৃতির ঘোষণা শুধু বাংলাদেশেই প্রথম হবে এমন নয়, পৃথিবীর অনেক দেশের জাতীয় সবজি আছে। যেমন: যুক্তরাষ্ট্রের পাম্পকিন বা মিষ্টিকুমড়া, চীনের বুক-চুই বা চীনা বাঁধাকপি, ভারতের মিষ্টিকুমড়া বা কদু, কানাডার রুবাব, পাকিস্তানের ঢেঁড়স, চিলির পিন্টু বিন। এভাবে দেখা গেছে যে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠীর একটি জাতীয় সবজি আছে, এমনকি অনেক দেশের তিন-চারটি সবজি মিলে একটি জাতীয় সবজি ডিশ আছে। ফলে বাংলাদেশের জাতীয় সবজি থাকাটা অতিরজ্ঞন বা বিলাসিতা নয়, বরং এটা জাতীয় ঐতিহ্যের অনন্য দৃষ্টান্ত।

এখন আসা যাক কোন সবজিটিকে জাতীয় সবজি হিসেবে বিবেচনায় আনা উচিত এবং জাতীয় সবজি নির্বাচনের মাপকাঠি কী? জাতীয় সবজি চিহ্নিতকরণের কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত দলিল বা সূচক নেই, তবে ইউনেস্কো ২০০৮ সালে জাতীয় হেরিটেজ/নিদর্শন ঘোষণা করার বেশকিছু উপাদান চিহ্নিত করেছে। সে ধরনের উপাদান জাতীয় সবজি নির্বাচনে সূচক হিসেবে নেয়া যেতে পারে।

যেমন প্রথম সূচক হলো কোন সবজি সর্বসাধারণের কাছে অসাধারণ সর্বজনীনতা আছে তা যাচাই করা। সেই অসাধারণ সর্বজনীনতা যাচাই করতে সবজিটির ব্যুত্পত্তিসহ আদিম অবস্থা, গুণমান, পুষ্টিমান, বৈচিত্র্য, দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশগত অবস্থায় উৎপাদন দক্ষতা, জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপকতা, সর্বোপরি ভোক্তাশ্রেণীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি বিবেচনায় নেয়া দরকার।

বাংলাদেশ একটি গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ, দেশটি বিশ্বসেরা নানান ঐতিহ্যে পৃথিবীতে পরিচিতি লাভ করেছে। রকমারি ফসল, নানা প্রাণী, নানা মাছ এখানে প্রাকৃতিকভাবেই বিশেষায়িত। যেমন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল বা বসতি কোথায় তা স্মরণ করলে বাংলাদেশের নাম আসে। বেগুন ঠিক তেমনি সবজি। এর হরেক আকার, আকৃতি, রঙ রয়েছে এবং বাহারি বেগুনেরও অন্যতম আবাসস্থল বাংলাদেশ। বিজ্ঞানী ভেভিলব পৃথিবীর সব উদ্ভিদের শ্রেণীকরণ করেছেন, সেখানে বেগুনের উত্পত্তি ইন্দু-বার্মা অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেজন্য বাংলদেশে এর ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে। বেগুনকে ইংরেজিতে ডাকা হয় ডিম্ব উদ্ভিদ বা এগপ্লান্ট, ব্রিনজাল, ওভারজিন। ব্রিটিশ শাসকরা ডিম্বাকৃতি জনপ্রিয় সাদা বেগুন দেখে এমন নামকরণ করেছিলেন, যদিও ইংরেজিতে এর নাম ওভারজিন। আমরা এটিকে ইংরেজিতে ব্রিনজাল নামে ডাকি। অনেকে আবার নেতিবাচকভাবে বলে থাকেন—‘যার নাই কোনো গুণ তা হলো বেগুন’। আসলে বাংলায় একে বাগুন নামে ডাকা হতো, পরে তা বেগুন হয়েছে। অর্থাৎ বাহারি গুণ যার, তার নাম বাগুন কিংবা বেশি গুণ যার তা হলো বেগুন। বেগুনকে পর্তুগিজরা এখান থেকেই ইউরোপে প্রবর্তন করে, যেমন মেসো আমেরিকার টমেটো রোমানরা ইউরোপে স্থানান্তর করেছিল। ব্রিনজাল শব্দটি এসেছে পর্তুগিজ শব্দ বেরিনজালা থেকে। যাহোক, এগুলো হলো উত্পত্তি ও নামকরণের ঐতিহাসিক তথ্যাদি।

দেশে বেগুন বৈচিত্র্যের পার্থক্য বোঝাতে বলা হয়, ভাষার পার্থক্য হয় প্রতি ২০ কিলোমিটার অন্তর, তেমনি বেগুনের পার্থক্য দেখা যায় প্রতি ২৫ কিলোমিটার অন্তর। রঙ ও আকারের প্রতি ভোক্তার পছন্দের কারণে এমন পার্থক্য দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় জাতের বেগুনের চাষ হয়, যেমন লাফফা (ময়মনসিংহ), তল্লা বা তাল (গফরগাঁও, ময়মনসিংহ), খটখটিয়া (রংপুর), পোতা (চট্টগ্রাম), ইসলামপুরী (জামালপুর), দোহাজারী (চট্টগ্রাম), রাখাইন (পটুয়াখালী), ঝুরি (মুক্তাগাছা), শিংনাথ (দেশের মধ্যাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল), চেগা (যশোর), উত্তরা (রাজশাহী), মেন্টাল (বগুড়া), বোতল (জামালপুর), মুক্তকেশী (মানিকগঞ্জ), ভোলানাথ (নরসিংদী), বোম্বাই (নরসিংদী), ডাব (নেত্রকোনা বা পটুয়াখালী), ঈশ্বরদী লোকাল, ফুলি, হাজারী, ভাঙ্গুড়া, সাহেব বেগুন, ঝুমকা, কাঁটা বেগুন ইত্যাদি। এসব নামকরণের পেছনে আবার কিছু গল্পও আছে। যেমন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের বেগুন তালাকৃতির, তাই তাল বেগুন। এ তাল বেগুন উপহার হিসেবে অনেক অসাধ্য সাধন করে আসছে। শিংয়ের মতো আকার তাই শিংনাথ, যা দেশের মধ্যাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত পাওয়া যায়। নরসিংদীর ভোলানাথ ও বোম্বাই জাতের বেগুন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ঝুরি বেগুন সম্ভবত দেশের সবচেয়ে ছোট বেগুন। বেগুন চাষে অঞ্চলভিত্তিক পছন্দ দেখা যায়, যেমন রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ সাদা বেগুন বা গোলাপি রঙের উত্তরা বেগুন ছাড়া অন্য বেগুন তেমন পছন্দ করে না। চট্টগ্রামে হালকা সবুজ রঙের পোতা বেগুনই চলে, যশোরে চেগা বেগুন ছাড়া অন্য বেগুন চাষও করা হয় না।

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

বেগুনের নানা রকম পদ হয়। যেমন বেগুন পোড়া, বেগুন ভর্তা, বেগুন ভাজা। মাছে-ভাতে বাঙালি আর মাছ রান্নার অন্যতম সবজি বেগুন। কেউ কেউ বেগুন দিয়ে ভেজিটেবল মিট তৈরি করে খান। বেগুনের দোলমা খুবই সুস্বাদু। বেগুনের আচারের কথা শুনলে জিহ্বায় পানি আসে। সেদ্ধ বেগুন কাঁচামরিচ, ধনিয়া পাতা ও সরিষার তেলে ভর্তা যে কি স্বাদ, যারা খেয়েছেন তারা তা অনুধাবন করবেন। আদি যুগে বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও বৌদ্ধ যুগে ফিরে গেলে দেখব নিরামিষ ছিল খাদ্যতালিকার অন্যতম অংশ। সেই নিরামিষে বেগুন হলো অন্যতম উপাদান। অন্তঃসত্ত্বা নারীর সাত মাস সময়ের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান বা সাধভক্ষণ উপলক্ষে কয়েক ধরনের নিরামিষের কথা জানা যায়, তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো মুলা-বেগুন-উড়ুম্বের ফল দিয়ে নিরামিষ। পঞ্চব্যঞ্জনের অন্যতম উপকরণ বেগুন। আমাদের খাদ্যতালিকায় বেগুন যে কত আদি সবজি তা চর্যাপদ কিংবা মঙ্গল কাব্যগুলোয় দেখা যায়। আমাদের ষোলো শতকের কবি মুকুন্দরাম বাঙালি রমণীর রন্ধন তালিকার শাকসবজির বৈচিত্র্যের উপমা দিতে গিয়ে প্রথমেই বাগ্যনের (বেগুন) নাম উল্লেখ করেছেন। আট শতকের পণ্ডিত খনা বেগুন দিয়ে নানান শ্লোক উল্লেখ করেছেন। বেগুনের গুণ কত, তা বোঝা যায় এ আনাজ নিয়ে গল্পের বাহার দেখলেই। বাঙালির অতিপরিচিত কত গল্পেই যে এসেছে এ আনাজের কথা। যেমন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর সেই ‘টুনটুনি আর বিড়ালের কথা’য় টুনটুনি পাখি গৃহস্থদের ঘরের পেছনের বেগুন গাছের পাতায় ঠোঁট দিয়ে সেলাই করে তার বাসা বেঁধেছিল। আবার মনে পড়ছে ত্রৈলোক্যনাথের কথা। তার ডমরুচরিতের একটা গল্পে মরা কুমিরের পেটের ভেতরে বসে এক নারী বেগুন বিক্রি করেছিলেন। হ্যাঁ, সেই বেগুনের কথাই বলছি। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ বছর আগেও সংস্কৃত সাহিত্যে বেগুনের সরাসরি ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে, আছে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে।

আধুনিক বিজ্ঞানানুযায়ী বেগুনে রয়েছে বহু রকরের পুষ্টি, যা অন্য কোনো সবজিতে পাওয়া যায় না বা থাকলেও পরিমাণে কম।

মানুষের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের ৪৭টি উপাদানের সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ আছে। বেগুনে তার বেশির ভাগই কম-বেশি আছে। যেমন এনথোসায়ানিন ফাইটোক্যামিকেলস, যা বেগুন আছে। এতে নাউসিনের পরিমাণ বেশি এবং এই নাউসিনের অক্সিডেন্ট শোষণক্ষমতা অন্য অ্যান্টি অক্সিডেন্টের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফেনলস আছে, যেগুলো শরীরের অক্সিডেন্ট শোষণক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বেগুনের ঔষধি গুণেরও শেষ নেই, বেগুন একেবারে পুড়িয়ে ছাই করে সেই ছাই গায়ে মেখে দিলে চুলকানি ও চর্মরোগ সারে। যুগ যুগ ধরে বেগুন নানা রকম আয়ুর্বেদিক ওষুধের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসেছ। বেগুনের রসে মধু মিশিয়ে খেলে কফজনিত রোগ দূর হয়। আবার মধ্যযুগে বন্য বেগুন খাইয়ে পাগল করারও তথ্য পাওয়া যায়। কচি ও শাঁসালো বেগুন খেলে জ্বর সারে। শরীরে ক্ষতিকর টক্সিন উপাদান বের করতে সাহায্য করে বেগুন। আপনার খাবারের তালিকায় যদি নিয়মিত বেগুন রাখেন তাহলে প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া কমে। এমনকি কিডনির পাথর নাকি গুঁড়ো করে দিতে পারে এ বেগুন। যদিও এ তথ্যগুলোর আধুনিক ক্লিনিক্যাল প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

বেগুন চাষ পদ্ধতির প্রাচীনতা আট শতকের খনার বচন থেকে বোঝা যায়, ‘বলে গেছে বরার বৌ, দশটি মাসে বেগুন রো, চৈত্র মাস দিবে বাদ। ইথে নাই কোন বিবাদ, পোকা ধরলে দিবে ছাই। এর চেয়ে ভালো উপায় নাই, মাটি শুকালে দিবে জল, সকল মাস পাবে ফল।’ বেগুন উৎপাদনের ব্যাপকতা বিচার করলে দেখা যায়, দেশের এমন কোনো জায়গা পাওয়া যাবে না, যেখানে বেগুন চাষ হয় না। যখন বেগুনের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়নি, তখন থেকে এখনো দেশের প্রতিটি বসতবাড়িতে এক-দুটি বেগুনের গাছ আছেই। বসতবাড়ি, সমতল ভূমি, পাহাড়, বৈরী পরিবেশ তথা লবণাক্ত, সাময়িক জলাবদ্ধতা, খরাপ্রবণ এলাকা—সব জায়গায় বেগুন হয়, এমনকি অধুনা ছাদ বাগানেও বেগুন অন্যতম সবজি। দেখা গেছে বেগুন ৮ ডেসিমল/মোল পর্যন্ত লবণাক্ত জমিতে স্বাভাবিক ফলন দেয়, যেখানে টমেটো ৪ ডেসিমল/মোল লবণাক্ততার পর চাষ করা দুরূহ। ঠিক তেমনি জলাবদ্ধতা বা খরার বেলায়ও তা দেখা যায়। ফলে বেগুন আমাদের ইকোলজিক্যাল ফসল, ভৌগোলিক পরিমাপক। দেশে বেগুনের চাহিদা অন্য যেকোনো সবজির তুলনায় বেশি। পরিসংখানে দেখা গেছে দেশে ৫০ বছরের বাণিজ্যিক উৎপাদন বেড়েছে ১ দশমিক ৫ গুণ, আবার চাষের জমির পরিমাণ বেড়েছে চার গুণ। বেগুন রফতানি হয় পৃথিবীর ৪০টি দেশে এবং প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বেগুন চাষ করে লোকসান হয় এমন তথ্য নেই। বেগুন নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, হতে থাকবে। বাংলাদেশ জিএমও বেগুন বাণিজ্যিক ছাড় দিয়ে পৃথিবীর পরিবেশ সচেতন মানুষদের কাছে বিতর্কিত হয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী যে দেশে যে ফসলের উত্পত্তি ও বৈচিত্র্য বেশি, সে দেশে সে ফসলের জিএমও জীববৈচিত্র্য রক্ষা প্রটোকল-বিরোধী।

ভোক্তার কাছে জনপ্রিয়তার বিচারে বেগুন শীর্ষে, গৃহিণী বাজারের থলে হাতে ধরিয়ে দিয়ে যে সবজিটির নাম বলেন তা হলো বেগুন। আমাদের আদি ফসল বেগুন আধুনিক খাদ্যতালিকায় যেমন জনপ্রিয়, আদিকালেও তেমনি ছিল, তা আমাদের কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে, উপাখ্যানে, বিজ্ঞান সংলাপসহ নানা উৎসে বিধৃত। আমাদের কৃষ্টিতে ও সংস্কৃতিতে বেগুনের নাম মিশে আছে, যা অন্য কোনো সবজি ফসলের বেলায় পাওয়া যাবে না। বেগুন চাষের আধিক্যের জন্য বাংলাদেশের বেগুনবাড়ী রেলস্টেশন আছে। আবার ভায়োলেট একটি রঙের নাম, আর বেগুনের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে এ রঙের বাংলা নাম দেয়া হয়েছে বেগুনি। আবার রমজান মাসে বেগুনি নামের রেসিপি মেনুতে না থাকলে ইফতারই অসম্পূর্ণ মনে হয়। রমজান মাসে বেগুনের দাম বেড়ে গেলে তা রাজনৈতিক রূপ পায়। বেগুন বহুল ব্যবহূত, ধনী-গরিব সব মানুষের কাছে সমাদৃত, উত্কৃষ্ট সবজি ও ঐতিহ্যের ফসল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেকোনো বিচারে বেগুনই হওয়া উচিত দেশের জাতীয় সবজি। এটাই সচেতন মানুষের প্রত্যাশা। বাংলাদেশের জাতীয় সবজি হিসেবে বেগুনকে মর্যাদা দিলে বিশ্বে বেগুন নিয়ে আরো সচেতনতা তৈরি হবে, বাংলাদেশ নিয়ে আরো ইতিবাচক আগ্রহ, উৎসাহ বাড়বে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে দেশের কৃষি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বেগুনকে জাতীয় সবজি ঘোষণার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে, যা হবে সুবর্ণজয়ন্তীর বছরের অন্যতম সেরা জাতীয় ঐতিহ্যের স্বীকৃতি।

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

মুলার উপকারিতা

মুলার উপকারিতা

শীতকালীন সবজি মুলা। অন্যান্য সবজির তুলনায় কদর কম থাকলেও এর উপকারিতা কিন্তু কম নয়। বরং নানারকম অসুখ-বিসুখ থেকে আপনাকে দূরে রাখতে সাহায্য করবে এই সবজিটি। অনেকেই মুলা খেতে পছন্দ করেন না। কিন্তু এই উপকারিতাগুলো জানলে আর অপছন্দ করতে পারবেন না-

ভাত কিংবা রুটি খাওয়ার সময় কাঁচা মুলা খেলে তাড়াতাড়ি হজম হয় ও রুচি বাড়ে। কচি মূলার সালাদ ক্ষুধা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। যারা জ্বরে ভুগছেন ও মুখের রুচি নেই, তারা মূলা কুচি কুচি করে কেটে চিবিয়ে খান। জ্বর কমবে, মুখের রুচিও বাড়বে।

পাইলসে মূলা অত্যন্ত উপকারী। নিয়মিত মূলা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়, ফলে পাইলস রোগে আরাম হয়। যাদের পাইলসের কারণে রক্ত পড়ে তারা টানা দু সপ্তাহ মুলা খেলে রক্ত পড়া বন্ধ হবে।

রক্ত পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করে মুলা। সেই সাথে লিভার এবং পাকস্থলীর সমস্ত দুষণ এবং বর্জ্য পরিস্কার করে থাকে। মুলা কিডনি রোগসহ মূত্রনালির অন্যান্য রোগে উপকারী।

শ্বেত রোগীদের চিকিৎসায় এন্টি কারসেনোজিনিক উপাদান সমৃদ্ধ মুলার বীজ আদার রস এবং ভিনেগারে ভিজিয়ে আক্রান্ত জায়গায় লাগাতে হবে। অথবা কাঁচা মুলা চিবিয়ে খেলেও কাজ হবে।

যেসব মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, তারা নিয়মিত মুলা খেলে বুকের দুধ বাড়বে।

ত্বক পরিচর্যায়ও মুলা ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করে। কাঁচা মুলার পাতলা টুকরা ত্বকে লাগিয়ে রাখলে ব্রণ নিরাময় হয়। এছাড়া কাঁচা মুলা ফেস প্যাক এবং ক্লিনজার হিসেবেও দারুণ উপকারী।

মুলা জন্ডিসের চিকিৎসায় ভীষণ কার্যকরী। কারণ এটি রক্তে বিলিরুবিন নিয়ন্ত্রণ করে এবং শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়।

মুলা প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি উপাদানে সমৃদ্ধ। এই উপাদান শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। যা বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার চিকিৎসায় কার্যকরী। বিশেষ করে কোলন, কিডনি, ক্ষুদ্রান্ত্র, পেট এবং মুখের ক্যান্সারে খুবই কাজ দেয়।

গুরুপাক খাবারের ফলে যাদের পেটে ব্যথা ও গ্যাস জমা হয়, তারা মূলার রসের সাথে পাতিলেবুর রস মিশিয়ে খেলে ভালো ফল পাবেন।

শালগমের উপকারিতা

শালগমের উপকারিতা

শীতকালীন সবজি হিসেবে পরিচিতি রয়েছে শালগমের। এটি তরকারি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। শালগমে রয়েছে ভিটামিন সি, ই কে। এছাড়াও শালগমে ক্যালরির পরিমাণ খুবই কম থাকে। তাই নিয়মিত শালগম খাওয়া শরীরের জন্য খুবই উপকারি। শালগম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ২০১৩ সালে ব্রিটিশ এক গবেষণা থেকে জানা যায়, শালগম রক্তচাপ কমাতে ভীষণভাবে সাহায্য করে। শালগম পটাশিয়াম সমৃদ্ধ বলে ধমনীকে প্রশস্ত করে ও শরীর থেকে সোডিয়াম বের করে দিতে সাহায্য করে।

ভিটামিন ও পটাসিয়াম ছাড়াও শালগম ক্যালসিয়ামেও সমৃদ্ধ। তাই এটি হাড়ের জন্যও খুবই উপকারি। সুস্থ ও শক্তিশালী হাড়ের জন্য খাদ্য তালিকায় অবশ্যই শালগম রাখতে হবে।

শালগম পরিপাকের উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করে থাকে। কারণ শালগমে প্রচুর ফাইবার থাকে। যা হজমেও ভীষণ ভালো কাজ করে। যদি হালকা কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রবণতা থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে শালগম অনেক উপকারি।

রক্ত জমাট বাঁধাতে শালগম সাহায্য করে থাকে। শালগম হলো ভিটামিন কে এর অনেক ভালো উত্স। যা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। ক্যালসিয়ামকে প্রক্রিয়াকরণ করা ও ধমনীর স্বাস্থ্যের জন্য ভিটামিন কে প্রয়োজন। ধমনীর শক্ত হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে ভিটামিন কে।

দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে শালগম। শরীরের রোগ প্রতিরোধ কোষগুলোর ঠিকভাবে কাজ করার জন্য ও ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধিকে প্রতিরোধের জন্য ভিটামিন এ খুবই প্রয়োজনীয়। শালগম ফলিক এসিডে সমৃদ্ধ যা কোষের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এ ভিটামিন জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে থাকে।

শালগম এজমা, মুত্রথলির সমস্যা, ব্রঙ্কাইটিস, কাশি, লিভারের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি রোধ করা ও টিউমার বৃদ্ধি রোধ করতেও কাজ করে থাকে। তাই শরীর সুস্থ ও ভালো রাখতে নিয়মিত খাবাররের তালিকায় শালগম রাখা খুবই জরুরি।

মিষ্টি আলুর উপকারিতা

মিষ্টি আলুর উপকারিতা

গোল আলুর সকল স্বাস্থ্য উপকারিতাই মিষ্টি আলুতে রয়েছে এবং এছাড়াও মিষ্টি আলু আরো কিছু উপকার করে। লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ফ্রান্সিসকোর স্পোর্টস ডায়েটিশিয়ান ইয়াসি আনসারি বলেন, ‘সাধারণত আপনার খাদ্য তালিকায় যত বেশি রঙিন ফল ও শাকসবজি যোগ করা যায় তত ভালো।’

মিষ্টি আলু বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে এবং তা পুষ্টিতে ভরপুর। এটি আপনার হার্ট ও ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত করে, দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষিত রাখে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায় এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে রক্ষা করে।

মিষ্টি আলুর পুষ্টি উপকারিতা কী?
সকল আলু পুষ্টিতে সমৃদ্ধ এবং আপনার জন্য স্বাস্থ্যকর, বলেন নিউ ইয়র্কে অবস্থিত বিজেড নিউট্রিশনের স্বত্ত্বাধিকারী ও ডায়েটিশিয়ান ব্রিজিটি জিটলিন। কিন্তু মিষ্টি আলুতে (কমলা, হলুদ ও পার্পল রঙের মিষ্টি আলু) গোল আলুর তুলনায় কম ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেট থাকে। মিষ্টি আলুতে উচ্চ মাত্রায় ‘ভিটামিন এ’ থাকে। ‘ভিটামিন এ’ হচ্ছে একটি অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, যা ইমিউনিটি বৃদ্ধি করে এবং সুস্থ ত্বক ও দৃষ্টি বজায় রাখতে সাহায্য করে। একটি মিষ্টি আলু আপনাকে দৈনিক সুপারিশকৃত ১০০ শতাংশের বেশি ভিটামিন এ সরবরাহ করে, ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার অনুসারে।

মিষ্টি আলুতে প্রচুর ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি৬ থাকে, যা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামেরও ভালো উৎস, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে হার্টের স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করে। এছাড়া একটি মিষ্টি আলুতে প্রায় চার গ্রাম উদ্ভিজ্জ ফাইবার রয়েছে, যা আপনাকে স্বাস্থ্যসম্মত ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ক্রনিক রোগের ঝুঁকি কমায়, যেমন- টাইপ ২ ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরল।

মিষ্টি আলুতে উচ্চ কার্বোহাইড্রেট থাকে?
স্টার্চি রুট ভেজিটেবল হিসেবে মিষ্টি আলুতে নন-স্টার্চি ভেজিটেবলের (যেমন- ব্রকলি) চেয়ে বেশি কার্বোহাইড্রেট থাকে। অর্ধ বাটি মিষ্টি আলুতে প্রায় ১৩ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে, যেখানে সমপরিমাণ ব্রকলিতে থাকে প্রায় ৩ গ্রাম। কিন্তু এটি হতে পারে মিষ্টি আলু খাওয়ার অন্যতম কারণ, ভয় পাওয়ার নয়। আনসারি বলেন, ‘নন-স্টার্চি সবজির তুলনায় মিষ্টি আলু বেশি শক্তির যোগান দেয়, যে কারণে এটি দৈনন্দিন কার্যক্রম ও অ্যাথলেটিক পারফরম্যান্সের জন্য একটি ব্যতিক্রমী জ্বালানি উৎস।’ সারকথা হচ্ছে, সকল শাকসবজিই আপনার ডায়েটে যুক্ত করার মতো স্বাস্থ্যকর অপশন এবং তারা বিভিন্ন ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সরবরাহ করে থাকে, বলেন জিটলিন।

মিষ্টি আলু খাওয়ার সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত উপায় কি?
কেনার সময় গাঢ় রঙের মিষ্টি আলু কিনুন। কিছু গবেষণায় পাওয়া গেছে, মিষ্টি আলুর রঙ (এটি কমলা, হলুদ অথবা পার্পল যে রঙেরই হোক না কেন) যত বেশি গাঢ় হবে, পুষ্টিগুণ তত বেশি হবে। খোসা ছাড়িয়ে মিষ্টি আলু খাবেন না। সব ধরনের আলু খাওয়ার সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর উপায় হচ্ছে খোসাসহ খাওয়া, কারণ এতে প্রচুর ফাইবার থাকে, বলেন জিটলিন। খোসায় প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টও থাকে।

মিষ্টি আলু রান্নার সর্বোত্তম উপায়?
আপনি স্টিমিং, রোস্টিং, বেকিং অথবা বয়েলিং যেভাবেই মিষ্টি আলু খান না কেন, পুষ্টি পাবেন। তাই মিষ্টি আলু প্রস্তুতের সকল পদ্ধতিই পুষ্টিকর। আপনি সয়ামিল্ক, প্রোটিন পাউডার ও দারুচিনিসহ স্মুদিতে মিষ্টি আলু মেশাতে পারেন অথবা মিষ্টি আলু ব্লেন্ড করে স্যূপে যোগ করতে পারেন। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ ডেজার্ট হিসেবে মিষ্টি আলুর ভর্তা চমৎকার: এতে মধু যোগ করুন এবং আখরোট ছিটান। মিষ্টি আলুকে বেশিক্ষণ রান্না করবেন না, কারণ দীর্ঘক্ষণ রান্না করলে পুষ্টিগুণ কমে যায়। ফ্যাটের কথা ভুলে যাবেন না। ভিটামিন এ এর মতো ফ্যাট-সলিউবল ভিটামিন ফ্যাট সোর্সের সঙ্গে ভালোভাবে শোষিত হয়, তাই মিষ্টি আলুর সঙ্গে অল্প পরিমাণে ফ্যাট খান। মিষ্টি আলুর সঙ্গে ফ্যাট সমন্বয়ের একটি স্বাস্থ্যসম্মত অপশন হচ্ছে অলিভ অয়েল- বেকিংয়ের পূর্বে মিষ্টি আলুর ওপর অল্প পরিমাণে অলিভ অয়েল ছিটাতে পারেন। অন্য একটি উপায় হচ্ছে অ্যাভোক্যাডো, পিক্যান অথবা আখরোটের পাশাপাশি মিষ্টি আলু খাওয়া।

চালকুমড়া বা জালিকুমড়ার ১৫টি ঔষধি গুণ

চালকুমড়া বা জালিকুমড়ার ১৫টি ঔষধি গুণ

চালকুমরা বা চালকুমড়া বা জালিকুমড়া বা জালি (বৈজ্ঞানিক নাম: Benincasa hispida) কিউকারবিটাসি পরিবারের বেনিনকাসা গণের একটি লতানো প্রজাতি।[১] চালকুমড়া বা জালিকুমড়া বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফল জাতীয় সবজি। সংস্কৃত ভাষায় একে ‘কুষ্মাণ্ড’ বলা হয়। বাজারে আমরা দুরকমের কুমড়া দেখতে পাই— লাল বা হলুদ কুমড়া ((বৈজ্ঞানিক নাম Cucurbita moschata) আর সাদা চাল কুমড়া। দামে অপেক্ষাকৃত কম হলেও দু ধরনের কুমড়াই গুণের আধার।[২]

অন্যান্য তরকারি বা শাক-সবজির তুলনায় সস্তা বলে সকলেই অনায়াসে কুমড়া খেতে পারেন। চালকুমড়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন:

মূল নিবন্ধ: চালকুমরা এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় সবজি

যদিও বলা হয় ‘কুষ্মান্ডম কোমলম্ বিষম’ অর্থাৎ কাঁচা কচি কুমড়া বিষের সমান এবং পুরনো পাকা কুমড়াই ভালো তবুও কাঁচা কুমড়ারও গুণ কিছু কম নেই। আজকাল ডাক্তারি মতে হলুদ রঙের ফল, হলুদ রঙের তরকারি বেশি করে খেতে বলা হয় কারণ এগুলাতেই আছে বেশি মাত্রায় স্বাস্থ্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় ভিটামিন।[২]

চালকুমড়া রান্নার বিভিন্ন ধরন: বাঙালি বাড়িতে কুমড়ার ছক্কার জনপ্রিয়তার কথা কে না জানেন। কুমড়ার ঘ্যাঁট তো প্রায় প্রতিদিনেরই হেলাফেলার খাদ্য: চাল কুমড়ার শুক্তো শিউলি পাতা বা উচ্ছে দিয়ে একটু তেতো স্বাদের করে রান্না করলে তা মুখের রুচি ফিরিয়ে দেয় অর্থাৎ অরুচি দূর করে। তাতে যদি একটু সজনে ডাঁটা দেওয়া যায় তাহলে স্বাদ যেমন বাড়বে—উপকারিতাও বাড়বে। চাল কুমড়ার মোরব্বা হিন্দিতে যাকে পেঠা বলা হয় অবাঙালি মহলে তা খুবই প্রচলিত, স্বাস্থ্যের পক্ষেও উত্তম।[২]

চালকুমড়ার ভেষজ ও ঔষধি গুনাগুণ:
আয়ুর্বেদের মতে, চাল কুমড়া পুষ্টিকারক বীর্যবর্ধক ও গরিষ্ঠ। রক্তের দোষ অর্থাৎ রক্তবিকার দূর করে, বায়ুর প্রকোপ কমিয়ে দেয়। কচি কুমড়া শীতল ও পিত্তনাশক। তবে মাঝারি মাপের কাঁচা কুমড়াকে কফকারক বলা হয়েছে। বড় পাকা কুমড়া শীতল নয়, তবে যদি একটু সোডা বা নুন মিশিয়ে সেদ্ধ করে খাওয়া যায় তাহলে খিদে বাড়িয়ে তোলে অর্থাৎ জঠরাগ্নি প্রদীপ্ত করে, হজম করা যায় তাড়াতাড়ি, মূত্রাশয় পরিষ্কার করে, মানসিক ব্যাধি সারায় এবং শরীরের আরও অনেক দোষ দূর করে। পাকা চাল কুমড়ার বীজ জোলাপের কাজ করে।[২]

পাকা লাল কুমড়ার তুলনায় চাল কুমড়ার অনেক বেশি ভেষজ গুণ আছে। চাল কুমড়া তাড়াতাড়ি হজম হয় অর্থাৎ লঘুপাক, মল ও মূত্র নিঃসরণে সাহায্য করে। কচি চাল কুমড়া পিত্ত নাশ করে। মাঝারি চাল কুমড়া অর্থাৎ যা বেশি কচি বা পাকা নয় খেলে কফ দূর হয়। পাকা চাল কুমড়া খিদে বাড়িয়ে তোলে, কোষ্ঠ পরিষ্কার করে, বীর্যবর্ধক, হার্টের পক্ষে ভাল, মনোবিকার দূর করে, তৃষ্ণা দূর করে, অরুচি নাশ করে, বাত, পিত্ত, কফ দূর করে। চালকুমড়া বহুমূত্র রোগ বা ডায়বেটিসের এবং অশ্মরী অর্থাৎ পাথরি রোগের মহৌষধ। চাল কুমড়ার বীজ থেকে যে তেল বের করা হয় সেই তেলও পিত্তনাশক, শীতল, চুলের বৃদ্ধির পক্ষে ভাল তবে গুরুপাক ও শ্লেষ্মকারক। চাল কুমড়ার লতাপাতারও শর্করা ও পাথরি নাশক গুণ আছে। চালকুমডার শাকও রুচি বাড়িয়ে তোলে।[২] চালকুমড়ার ঔষধি ব্যবহার নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. রক্তপিত্ত: রক্ত উঠলেই টি বি হয়েছে যেমন ধরে নেওয়া উচিত নয়, সেই রকম রক্ত পড়লেই অর্শ হয়েছে একথা ভাবাও সমীচীন নয়; বৈদ্যকের ভাষায় এটিও রক্তপিত্ত রোগের অন্তর্গত। এরকম ক্ষেত্রে পাকা চালকুমড়ার রস ৩ থেকে ৪ চা চামচ একটু, চিনি মিশিয়ে খাবেন। রক্ত ওঠা বা পড়া যেটাই হোক না কেনো, বন্ধ হবে। আরও ভালো হয় একটু, বাসক পাতার রস ঐ সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া।[৩]

২. শরীর পুষ্ট করতে: শরীরের ক্ষয়-ক্ষতিতে মাথা হালকা বোধ, মনে কিছু থাকে না, এক্ষেত্রে এর শুকনো শাঁস চূর্ণ (জল নিংড়ে শুকিয়ে নিতে হয়) ২ থেকে ৩ গ্রাম একটু মধু মিশিয়ে খেতে হবে; এটাতে ঐ দোষটা চলে যায়।[৩] কুমড়া বা চাল কুমড়া খেলে পরিশ্রম করবার ক্ষমতা বেড়ে যায়, শরীর পুষ্ট হয়। কুমড়ার পাকা বীজের শাঁস পিষে নিয়ে ঘিয়ে ভেজে চিনিতে পাক করে লাড্ডু তৈরি করে প্রতিদিন নিয়মিত খেলে এনার্জি বাড়ে এবং অত্যধিক পরিশ্রম করবার জন্যে যে দুর্বলতা আসে তাও দূর হয়।[২]

৩. প্লুরিসি: (আয়ুর্বেদ মতে এটি বাতশ্লেষ্মজ ব্যাধি) হয়েছে, এক্ষেত্রে এই কুমড়ার রস একটু চিনি মিশিয়ে খেতে হয়।

৪. হৃদ্গত রোগ: হৃদযন্ত্রের বৃদ্ধি হলে বা ঝুলে গেলে কি অসুবিধে হয় সব চিকিৎসকই জানেন। এক্ষেত্রে রোগীকে পাকা চালকুমড়ার হালুয়া খাওয়ানোর অভ্যাস করলে ভালো হবে; তবে হালুয়াতে গরুর থেকে ছাগলের দুধ দিলে ভাল হয়। এই সবজি বলকারক, পুষ্টিকর, ফুসফুসও ভাল রাখে।

৫. কোষ্ঠকাঠিন্যে: বালক বা বৃদ্ধ এই দুজনের একই জ্বালা অর্থাৎ সব রকম দাস্ত পরিষ্কারের ওষুধ খাইয়েও ফল হয় না, এ সময় চিকিৎসক বিভ্রান্ত হন। এক্ষেত্রে বৃহদন্ত্রের শুষ্কতা সৃষ্টি আয়ুর্বেদের নিদান। একে স্বাভাবিক করতে গেলে চালকুমড়ার রস ৪ থেকে ৫ চা-চামচ গরম দুখের সঙ্গে খাওয়াতে হয়। এটাতে প্রস্রাব ও দাস্ত দুটোই পরিষ্কার হয়।

৬. যক্ষ্মা সন্দেহে: প্রাথমিক লক্ষণ সব মিলে যাচ্ছে তখন প্রারম্ভিক চিকিৎসা হিসাবে এই চালকুমড়োর রস ৪ থেকে ৫ চা-চামচ একটু চিনি ও দুধ মিশিয়ে দু’বেলা খেতে দিয়ে তার উপকারিতা প্রত্যক্ষ করুন। কোনো কোনো চিকিৎসকের মতে যক্ষ্মা, অর্শ, গ্রহণী (একটানা পেটের অসুখ) প্রভৃতি অসুখেও চালকুমড়া খেলে উপকার হয়।

৭. শুল ব্যাথায়: এ ব্যথা পেটের যে কোনো জায়গায় হোক না কেনও, এই কুমড়ার শাসকে শুকিয়ে পুড়িয়ে (অন্তর্ধুম) তার চূর্ণ (আধ গ্রাম মাত্রায়) গরম জল খেলে উপশম হবেই।

৮. ধী শক্তি রক্ষায়: দুধ আর তামাক যেমন একসঙ্গে খাওয়ার বয়স এককালে থাকাটা হাস্যকর, সেই রকম মাথার কাজ করতে হয় অথচ শুক্রকে ধরে না রাখার মনোবৃত্তি; এক্ষেত্রে তার পরিপূরক হিসেবে কুমড়ার শাঁস বাটা (জল সমেত) মধুর সঙ্গে সরবত করে খেতে হয়; তবে সংযম করে দ্বিতীয়টি সহজ বেগ খেতে হয়।

৯. কামজ উন্মাদ: সব রকম উন্মাদ এক ধারার চিকিৎসায় সারে, এ কথা আয়ুর্বেদ বলেনি। একটি সাধারণ ক্ষেত্র হিসাবে এর বীজের শাঁস বেটে মধু সঙ্গে খেতে দিতে হয়। যেহেতু উন্মাদের ক্ষেত্র শরীরের অন্যান্য স্থানে হয় না।

১০. ক্রিমিতে: এর বীজের শাস ২ গ্রাম আন্দাজ বেটে জলসহ খেতে হয়। চাল কুমড়ার বীজ কৃমি নাশ করে।

১. পেট ফাপা ও প্রস্রাব ভালো হচ্ছে না: এ ক্ষেত্রে কুমড়োর রস পেটে মালিশ করলে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে দুটোই সহজ হয়।[৩] আবার দু-চার চা চামচ চাল কুমড়ার রস বের করে নিয়ে তাতে চিনি মিশিয়ে খেলে অম্বল বা অজীর্ণ রোগ সারে।[২]

১২. জন্ডিসে: চাল কুমড়া হলো পাণ্ডু রোগ বা জনডিসের সবচেয়ে সস্তা ও সুলভ ওষুধ। চাল কুমড়ার টুকরো রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে খেলে বা টাটকা চাল কুমড়ার তরকারি রান্না করে খেলে জনডিস তাড়াতাড়ি সেরে যায়। এ ছাড়া চালকুমড়ার মোরব্বা বা পেঠা এবং কবিরাজি মতে তৈরি অবলেহ খেলেও উপকার পাওয়া যায়।[২]

১৩. উন্মাদনায়: মৃগী ও উন্মাদ রোগের পক্ষেও এটি উপকারী। চালকুমড়ার মোরব্বা নিয়মিত খেলে মাথা গরম হওয়া কমে, মাথা ঘোরা সেরে যায়, উন্মাদ রোগ সারে এবং খুব ভাল ঘুম হয়।

১৪. বিভিন্ন অসুখে: চাল কুমড়ার রস একটু চিনি ও জাফরানের সঙ্গে পিষে খেলে অজীর্ণ ভালো হয়, পুষ্টি বাড়ে, ফুসফুস ভালো থাকে এবং বিভিন্ন রোগে উপকার পাওয়া যায়।

১৫. ডায়াবেটিসে: ডায়বেটিসে চালকুমড়ার রস খাওয়া অতি হিতকর। চাল কুমড়ার মোরব্বা, হালুয়া, অবলেহ ও চাল কুমড়ার বীজের লাড্ডু অনেক রোগ সারিয়ে তোলে।

চাল কুমড়ার মোরব্বা তৈরির পদ্ধতি: একটা পাকা পুরনো শাঁসালো চালকুমড়া নিতে হবে। ছাল ছাড়িয়ে ও বীজ ফেলে দিয়ে ভেতরের নরম অংশ ছোট ছোট টুকরো করে কাটতে হবে। প্রতিটি টুকরো কাঁটা দিয়ে ভাল করে বিঁধে নিন। ফুটন্ত জলে সেদ্ধ করে নিন।

সেদ্ধ হয়ে গেলে জল ঝরিয়ে কাপড়ের ওপর পেতে রাখুন যাতে আর একটুও জল না লেগে থাকে। তারপরে কাপড় দিয়ে প্রতিটি টুকরো মুছে নিন।

অল্প জলে চালকুমড়ার টুকারো ওজনের দু গুণ চিনি দিন। রস তৈরি করে ঘন করে নিন। চালকুমড়ার টুকরো ওই রসে ফুটিয়ে নিন। এলাচের গুঁড়া দিয়ে নামিয়ে নিন।

ঠাণ্ডা হলে কাচের বোয়ামে ভরে রাখুন। প্রতিদিন সকালে নিয়মিত একটি বা দুটি টুকরো করে খান। অন্যান্য ব্যাধির সঙ্গে যদি আপনার মূত্রকৃচ্ছ্রতা (প্রসাব কম হওয়া) থাকে তাও সেরে যাবে।

চাল কুমড়ার অবলেহ:
চালকুমড়ার অবলেহ তিন মাস ধরে নিয়মিত খেলে মুখমণ্ডলে একটা তেজস্বী ভাব আসে, হজম শক্তি বাড়ে। এ ছাড়াও এই অবলেহ খেলে পিত্তজ্বর, তৃষ্ণা, শরীর জ্বালা করা, দুর্বলতা, গা-বমি করা বা বমি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, হার্টের গোলমাল, ক্ষয়রোগ, গলা ভেঙে যাওয়া, স্ত্রীরোগ সারে। এই অবলেহ খুব পুষ্টিকর। নিয়মিত খেলে শরীরে বল হয়। বিশেষ করে শিশুদের ও বৃদ্ধদের পক্ষে শীতকালে তিন মাস ধরে এটি খাওয়া খুবই ভাল। এতে হার্ট ও ফুসফুস ভাল থাকে। মেধারও পুষ্টি হয়। সকালে ও সন্ধ্যেবেলায় এক টেবিল চামচ করে খেলেই উপকার হবে।[২]

চাল কুমড়ার অবলেহ তৈরির পদ্ধতি: খোসা ও বীজ এবং নরম অংশ ফেলে দিয়ে চাল কুমড়ার টুকরা কেটে নিন। একটু বেশি জলে সেদ্ধ করে চাল কুমড়ার রস নিংড়ে বের করে আলাদা করে রেখে দিল।

চালকুমড়ার টুকরাগুলো গাওয়া ঘিয়ে লালচে করে ভেজে নিন। এবারে আগেকার নিংড়ে নেওয়া রস মেশাবেন। চাল কুমড়ার ওজনের সমান মাপে চিনি দিন। অল্প পরিমাণে গুড়া পিপুল, গুড়া শুকনা আদা (শুঠ) জিরেগুঁড়া, এলাচগুঁড়া, ধনেগুঁড়া, তেজপাতা গুঁড়া এবং অল্প দালচিনি গুঁড়া মিশিয়ে ঢিমে আঁচে ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে নাড়তে থাকুন। নামিয়ে নিয়ে ঠাণ্ডা করে বেশি পরিমাণে ভাল মধু মিশিয়ে নিন। কাচের বোয়ামে ভরে রাখুন। প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যেবেলায় এক টেবিল চামচ করে খান, অনেক অসুখ তো সারবেই, সেইসঙ্গে মস্তিষ্কের ও পুষ্টি হবে।[২]

বিশেষ দ্রষ্টব্য: মধু দেওয়ার দরুণ এই অবলেহ পচবে না। অবলেহ হতে যাতে কোনোভাবেই জল না মিশে যায় সেদিকে লক্ষ রাখবেন। বয়াম থেকে অবলেহ বের করবার জন্যে শুকনা চামচ ব্যবহার করবেন। অবলেহতে দেওয়ার সমস্ত মশলা শুকনা তাওয়ায় অল্প ভেজে একসঙ্গে পিষে নিতে পারেন। চালকুমড়ার টুকরা যদি এক কেজি হয় এবং চিনি এক কেজি হয় তাহলে শুঠ বা শুকনা আদা জিরে পিপুল ১ চা চামচ করে দেবেন এবং ধনে, তেজপাতা এলাচ ও দালচিনির গুঁড়া ২ চা চামচ করে দেবেন। মধু মেশাবেন ৬ টেবিল চামচ। চাল কুমড়ার হালুয়া চাল কুমড়ার খোসা ও বীজ বাদ দিয়ে কুরুনি দিয়ে কুরে নিন। ঘিয়ে ভাজুন ও নরম করে নিন কম আঁচে ঢাকা দিয়ে বসিয়ে রেখে।

লাউয়ের বীজের শাঁস পাকা কুমড়ার বীজের শাঁস, খরমুজের বীজের শাঁস এবং বাদাম, মাখানা ও এলাচ সব উপকরণ অল্প পরিমাণে একসঙ্গে হামানদিস্তায় গুড়া করে নিন। এগুলিও ঘিয়ে ভাজুন। ভাজা চাল কুমড়ার মধ্যে এগুলি মিশিয়ে নিন এবং আন্দাজমতো চিনি দিয়ে নাড়তে থাকুন। এইভাবে হালুয়া তৈরি করে নিন। সকালবেলা খালি পেটে এই হালুয়া খেলে বাড়ন্ত শিশু, ছাত্র-ছাত্রী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, দাহ, জ্বালা, পিত্ত ও মাথাগরম প্রকৃতির ব্যক্তি, যাঁদের প্রস্রাব করবার সময় জ্বালা করে, যাঁদের বাত আছে এবং যে সব মহিলারা অতিরিক্ত রক্তস্রাবে ভুগছেন সকলেরই উপকার হবে।[২]

চালকুমড়ার রাসায়নিক গঠন: চালকুমড়ায় আছে (a) Fatty oil, (b) vitamin viz., (c) vitamin-B.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. এম অলিউর রহমান, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৭ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩০৩-৩০৪। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা, ৮৬-৯০।

৩. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ৬৭-৬৮।

শিমের ভেষজ গুণাগুণ

শিমের ভেষজ গুণাগুণ

শিম খেতে তো ভাল লাগে, এটি স্বাদে মিষ্টি কিন্তু খাওয়ার পর পরিপাকে শিম অম্ল বা টক রস উৎপন্ন করে। অনেকের মতে শিম খেলে শরীরের বল বাড়ে, মল পরিষ্কার হয়। কিন্তু সহজে পরিপাক হয় না বলে বায়ু সৃষ্টি করে। শিম শরীরের ভেতরের বিষ নষ্ট করে। কিন্তু সেই সঙ্গে দৃষ্টি শক্তির তেজ কমিয়ে দেয় বলেও অনেকের ধারণা।

শিমের ভেষজ গুণাগুণ:

১. বাত দূর করতে : অনেকে বলেন বেশি শিম খেলে বাত হয় অর্থাৎ শিম বাতল বা বাত-ব্যাধি কারক। কিন্তু শিমের তরকারি যদি রসূন ফোড়ন বা রসুন বাটা দিয়ে রান্না করা যায় তাহলে শিমের এই দোষ আর থাকে না। রসুনের গুণেই বাতব্যাধির আশঙ্কা দূর হয়। সাদা শিম শরীরে বাত ও কফ সৃষ্টি করলেও বিষ নাশ করে। হলদেটে রঙের শিম সবচেয়ে বেশি উপকারী।

২. বায়ু দুর করে: শিম, পরিপাকে মধুর, শীতল অথাৎ শরীর ঠাণ্ডা করে, ভারি অথাৎ গুরুপাক, বলপ্রদ বা বলদায়ক, দাহক, কফকারক বা কফ বৃদ্ধি করে, বাহল অধৎ বাত ব্যাধিকারক, কিন্তু বায়ু ও পিত্ত দূর করে। ঘন সবুজ রঙের চওড়া শিম বায়ু দূর করে, গরিষ্ঠ বা গুরুপাক, শরীর গরম করে, কফ ও পিত্ত বাড়িয়ে তোলে, বীর্য হ্রাস করে, খিদে কমিয়ে দেয়, মলরোধ করে, ভারি কিন্তু রুচিকারক।

৩. রুচি বাড়ায়: বড় আকারের শিম রুচিকর, বাতল, অগিদীপক অথাৎ খিদে বাড়ায় এবং মুখের স্বাদ বাড়িয়ে তোলে। কালচে রঙের শিম স্বাদে কষায়, পরিপাকে মধুর, রুচিকর, খিদে বাড়ায় এবং মল রোধ করে।

৪. বিছের কামড় আরাম: বিছে কামড়ালে শিম পাতার রস লাগালে আরাম পাওয়া যায়।

৫. বুকের দুধ বাড়ায়: অনেকে বলেন শিম মল রোধ করে আবার অনেকের মতে মল নিঃসারণ করে। অনেকের মতে শিম খেলে গ্যাস বৃদ্ধি হয়। কিন্তু শিমের একটি বিশেষ গুণ হল স্তন্যবর্ধন করা । স্তন্যবর্ধক হিসেবে শিম মেয়েদের কাছে আদরণীয়। যে সব মেয়েরা বাচ্চাদের দুধ খাওয়ান শিম খেলে তাঁদের বুকের দুধ বাড়বে।

আয়ুর্বেদ মতে, শিম গুরুপাক, শৈত্যগুণসম্পন্ন, পিত্তনাশক, কোষ্ঠ বায়ুপ্রকোপক, কটু ও মধুররসাঙ্কিা , অগ্নি, বল ও শুক্রক্ষয়কর এবং ব্রণ, জ্বর ও শ্বাস রোগকর। আরও বলা হয় যাঁদের হজম শক্তি দুর্বল তাঁদের পক্ষে শিম না খাওয়াই ভাল।

এ গাঢ় সবুজ রঙের শিমের চেয়ে সাদা শিম পথ্য হিসেবে ভাল। বলা হয় সাদা শিম শ্লেষ্ম, বাত, পিত্ত ও ব্রণদোষ নাশ করে। চুন ও শিম পাতার রসের প্রলেপ লাগালে কানের লতির বা কর্ণমূলের ফোলা সারে এবং গলায় প্রলেপ লাগালে গলার ব্যথা কমে।

শিমের তরকারি রান্না করে খাওয়া যায় শিম বেশি পেকে গেলে শিমের বীজের ডাল রান্না করেও খাওয়া যায়। যোয়ান ফোঁড়ন দিয়ে রান্না করা শিমের তরকারি খেতে অতি সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর। শিম বায়ুকারক। শিমের তরকারি তেল দিয়ে রান্না করলে এই দোষ খানিকটা কমে।

পুষ্টিগুণ: শিমে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, গন্ধক আর লোহা আছে। ভিটামিন এ বেশিমাত্রায় এবং ভিটামিন সি অল্পমাত্রায় আছে । ফ্রেঞ্চ বিন বা ফরাসবিনের চেয়ে শিমের পুষ্টিমূল্য বেশি

তথ্যসূত্রঃ

১. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা,১১৬-১১৭।