নটে শাকের  ঔষধি গুণাগুণ

নটে শাকের ঔষধি গুণাগুণ

শরীরের পক্ষে পুষ্টিকর এবং উপযোগী সব তত্ত্ব পাওয়ার জন্যে এবং ভিটামিন সি পাওয়ার জন্যে সবুজ শাক খাওয়া খুবই জরুরি। প্রায় সব শাকেই অ্যালকলি ক্ষারজ বা ক্ষার পদার্থ বেশি। সবুজ শাকের মধ্যে নটে শাকের আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এটি অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ শাক এবং দামেও সস্তা।

নটে শাক সাধারণত বাজারে দু ধরনের পাওয়া যায় সবুজ নটে ও রাঙা নটে। আর এক রকমের নটে শাক হল কাঁটা নটে। নটে শাকের শিকড় ও পাতা নানা রোগে ওষুধ হিসেবেও খাওয়া হয়। সবুজ নটে শাকের চেয়ে লাল নটে শাকই বেশি উপকারী নটে শাক হিন্দিতে যার নাম চৌলাই গরমকালে আর বষাকালেই অধিক জন্মায়। গরমকালে আর বর্ষাকালের বদহজম বা হজমের গোলমাল থেকে নটে শাক শরীরকে মুক্ত রাখে। এই দুই কেতুতেই এই শাকের ফলন ও হয় খুব এবং বাঙালি বাড়িতে ওই শাকের ভাজা ও চচ্চড়ি খাওয়াও হয় খুব। এই শাক সহজে হজম হয় অর্থাৎ লঘু পাক ও হালকা আহার। নটে শাক ভাজায় আছে অনেক গুণ। কাজেই গরমকালে ও বর্ষাকালে নটে শাক ভাজা তো শরীরের পক্ষে ওষুধের কাজ করে। নটে শাকের কচি পাতা খেলে (ভাজা বা চচ্চড়ি হিসেবে কিংবা সেদ্ধ করে অল্প তেল নুন দিয়ে মেখে ভাতে হিসেবে, বড়ি বেগুন মুল্লো দিয়ে ঘন্ট রান্না করে) মল পরিষ্কার হয়, শরীরের পক্ষে শীতল অথাৎ গরমে শরীর ঠাণ্ডা রাখে, রক্তের দোষ দূর করে অর্থাৎ রক্ত পরিষ্কার করে এবং পথ্যকারক অর্থাৎ পথ্য হিসেবে উপকারী। আর একটি নতুন পদ্ধতিতে নটে শাক খেয়ে দেখতে পারেন। নটে শাক অল্প তেলে নেড়েচেড়ে নিয়ে, জল ও আন্দাজ মতে নুন মিশিয়ে সেদ্ধ করে নিন। নামাবার আগে কাঁচা আমের কুচি বা একটু ঘোল মিশিয়ে দিন। খেতে ভালই লাগবে শরীরের পক্ষেও ভাল ।

গুজরাতিরা নটে শাক ভাজায় বেসন, টক দই, হিং ইত্যাদি মিশিয়ে কড়হি বা টক ঝোল-ঝোল তরকারি তৈরি করেন। এটিও যেমন উপকারী গরম ভাতের সঙ্গে তেমনই সুস্বাদযুক্ত। খেলে মুখের রুচি ফেরে।

সুস্থ থাকতে নটে শাক:

১. রক্তের দোষ দূর করতে: যদি শরীর গরম হওয়ার দরুণ বা যে কোনো কারণে রক্তের দোষ ঘটে এবং সেই কারণে চুলকুনি হয় তাহলে নিয়মিত নটে শাক ভাজা খেলে উপকার পাওয়া যায়। কুষ্ঠ রোগ, শরীর জ্বালা, লিভার ও পিত্তের অসুখেও নটে শক উপকার দেয়।

২. গ্রীষ্মকালীন রোগ সারাতে: গরমকালের নিয়মিত নটে শাক ভাজা খেলে অনেক রোগ সারে যায়। এছাড়া যাঁরা অসুস্থ তাঁদেরও নটে শাক খাওয়ানো যেতে পারে কারণ নটে শাক খেলে কোনো অপকার হবে না। যদি সম্ভব হয় গরমকালে ও বর্ষাকালে অর্থাৎ নটে শাক যখন বাজারে প্রচুর পাওয়া যায় ও দামে সস্তা প্রতিদিন নিয়ম করে ভাতের সঙ্গে নটে শাক ভাজা, চচ্চড়ি, ভাতে বা ঘণ্ট খান অনেক রোগের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবেন। এই সব গুণের জন্যেই তো নটে শাককে বিষয় বলা হয়। তা ছাড়া সব রকম বিষের ক্রিয়া নাশের পক্ষেই নটে শাক হল সবচেয়ে সুলভ, সস্তা, সহজ ও অব্যর্থ ওষুধ।

৩. মেয়েলি অসুখেও: নটে শাক খুব উপকারী। অনেক রোগেরই সুলভ, সস্তা, সহজ ও ঘরোয়া ওষুধ। যন্ত্রণাদায়ক প্রমেহ, যৌনব্যাধি ও প্রস্রাবের অসুখ শরীর যদি ফুলে ওঠে এবং ব্যথা করে সেই যন্ত্রণাও নটে শাক খেলে শান্ত হয়।

৪. বুকের দুধ বাড়ায়: যে সব মায়েরা বাচ্চাদের দুধ খাওয়ান তাঁরাও নটে শাক ভাজা খেলে সুফল পাবেন কারণ নটে শাক স্তন্যদুগ্ধব।

৫. আয়ুর্বেদের মতে: নাটে শাকের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। সব রকমের বিষ, সব রকম ধাতর বিষ দূর করতে নটে শাক ব্যবহার করা হয়। এই সব বিষ- থেকে উৎপন্ন রক্তের দোষে নটে শাক উপকারী। এছাড়াও চোখ খারাপ হওয়া, উদররোগ বা পেটের রোগ, পেটের অসুখ, পুরোনো পেটে অসুখ, পেটে মোচড় দেওয়া, নাক মুখ থেকে রক্তপড়া বা পিত্ত, অশ, কোষ্ঠকাঠিন্য, লিভারের দোষ, পিলে বেড়ে যাওয়া অর পুরোনো জ্বরে নটে শাক খুব কাজ দেয়।

৬. ত্বকের সব অসুখ সারে: ত্বকের রোগ, এমনকি কুষ্ঠরোগ, চর্মরোগেরও নটে শাক খেলে উপশম হয়। নটে শাকের রসে চিনি মিশিয়ে খেলে চুলকুনি সারে, শরীরের গরম হয়। নটে শাক ভাজা বা যে কোনো রকমভাবেই এই শাক নিয়মিত খেলে এসব রোগের কষ্টের হাত থেকে অনেকটা নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।

৭. মায়েদের জন্য উপকার: যাঁরা মা হতে চলেছেন, যাঁরা ছোট শিশুর মা, যাঁরা সদ্য মা হয়েছেন সেসব মেয়েরাই নটে শাক খেলে উপকার পাবেন। যাঁরা শরীরের দিক থেকে খুব দুর্বল তাঁদেরও নির্ভয়ে খেতে দেওয়া যেতে পারে।

৮. চোখের সমস্যায়: চোখের সব অসুখেই নটে শাক উপকারী। চোখ জ্বালা করা, চোখ লাল হওয়া, চোখে পিচুটি জমা, চোখের পাতা পিচুটিতে জুড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রভৃতি সব অসুখ ও অস্বস্তি দূর করবার জন্যেই নিয়মিত যথেষ্ট পরিমাণে নটে শাক খাওয়া উচিত।

৯. শরীর সুস্থ রাখতে: নটে শাক মধুর, পরিপাকেও মধুর, শরীরের পক্ষে শীতল, খিদে বাড়ায়, মলমূত্রের শুদ্ধি করে। সেইজন্যে রোগী বা সুস্থ সব রকম মানুষরে জন্যেই সমান উপকারী। পিত্তের গরমের জন্যে যে জ্বর তারও উপশম হয় নটে শাক খেলে।

১০. অস্ত্র দুর্বলতা দূর করতে: নটে শাকের রস মধুর ও শরীর ঠাণ্ডা করে। যাঁদের অস্ত্র দুর্বল হয়ে গেছে তাঁদের পক্ষে উপকারী। এতে ক্ষারদ্রব্য (লবণ) ও রেশ (আঁশ বা ছিবড়ে) আছে বলে অন্ত্রের মধ্যে জমা পুরনো মল বহিষ্কার করে এবং পুরনো কোষ্ঠ কাঠিন্য রোগ সারিয়ে তোলে।

১১. কোষ্ঠকাঠিন্যে দূর করতে: যদি কোনো বৃদ্ধ যিনি কোষ্ঠকাঠিন্যে ভূগছেন তিনি নিয়মিত এই শাক খান তাহলে তাঁর এই কষ্ট দূর হবে এবং শরীরও পুষ্টি লাভ করবে।

১২. উদররোগের উপকার: নটে শাকের রস বের করে জলে মিশিয়ে খেলে বা নটে শাকের ভাজা, ঘন্ট, চচ্চড়ি ইত্যাদি খেলে উদররোগের উপকার হয়।

১৩. রক্তপিত্ত সারাতে: নটে শাক ভাজা, নটে শাকের রস বা নটে শাকের পাতা পিষে নিয়ে খেলে রক্তপিত্ত সারে, নাক মুখ থেকে রক্তপড়া বন্ধ হয়।

১৪. জ্বালা-পোড়া: নটে শাকের রসে অল্প চিনি মিশিয়ে খেলে পা বা হাতের তালু (চেটো) জ্বালা করা, প্রস্রাব করতে গেলে জ্বালা করা, বার বার প্রস্রাব হওয়া ও জ্বালা করা সারে। কাঁটা নটে শাক খেলে প্রমেহ সারে। মূত্র কম হওয়ার জন্যে শরীর জ্বালা করার কষ্টটা মূত্রবৃদ্ধি অর্থাৎ পরিষ্কার প্রস্রাব হয়ে গিয়ে দূর হয়ে যায়।

১৫. প্রদর রোগ সারে: নটে শাক বা কাঁটা নটের মূল বা শিকড় পিষে জলে সেদ্ধ করে কাথ তৈরি করে সেই কাপের ২ চা চামচ তার সঙ্গে মধু ২ চা চামচ এবং ভাতের ফ্যান ৮ চা চামচ মিশিয়ে খেলে মেয়েদের সব রকমের প্রদর রোগ সারে। এছাড়াও নটে শাকের মূল বা শিকড় পিষে নিয়ে তার সঙ্গে ভাতের ফ্যান মিশিয়ে খেলেও প্রদর রোগে উপকার পাওয়া যায়।

১৬. রক্তস্রাব বন্ধ করতে: নটে শাকের মূল বা শিকড় পিষে নিয়ে তার সঙ্গে ভাতের ফ্যান মিশিয়ে খেলে প্রসূতির (যে মেয়ের বাচ্চা হয়েছে) এবং সগর্ভার (যার বাচ্চা হবে) রক্তস্রাব বন্ধ হয়। যদি কোনো কারণে যে মেয়ের বাচ্চা হবে তার রক্তস্রাব আরম্ভ হয় এবং বাচ্চা বা গর্ভ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় নটে শাকের শিকড় বাটার সঙ্গে ভাতের ফ্যান মিশিয়ে খেলে গর্ভ স্থির হয় এবং অজাত শিশু বা ভূণ নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।

১৭. পিত্তের দোষ দূর করে: রক্তবিকার অর্থাৎ রক্তের দোষ এবং পিত্তবিকার অথাৎ পিত্তের দোষে কাঁটা নটেরশাক খুব উপকারী।

১৮. প্রস্রাবের সমস্যা দূর করতে: কাঁটা নটে শাকের ক্ষার বা লবণ তৈরি করে নিয়মিত খেলে প্রস্রাব কম হওয়া (মূত্রকৃচ্ছতা) মূত্রাঘাত (প্রস্রাব করতে গেলে জ্বালা করা) আর পাথরি রোগ সেরে যায়।

১৯. পাথরি রোগ দূর করতে: পাথরির (কিডনি বা গল ব্লাডারে পাথরে হলে) জন্যে তীব্র যন্ত্রণা হলে নটে শাকের ক্ষার চার টেবিল নটে শাকের রসে মিশিয়ে ঘন্টয় একবার করে দু-তিনবার খাওয়ালে অনেক সময় পাথর ভেঙে বেরিয়ে যায়। এই ক্ষার কবিরাজি দোকানে কিনতে পাওয়া যায়।

২০. শরীরের বিষ দূর করতে: পারদ বা অন্য ধাতুর বিষের নটে শাকের রসের সঙ্গে অল্প শুদ্ধ ঘি মিশিয়ে আট দিন নিয়ম করে খেলে উপকার পাওয়া যায়। নটে শাক ভাজা খেলেও এক্ষেত্রে উপকার পাওয়া যায়। শরীরের ধাতুর সঙ্গে এই বিষ বেরিয়ে যায় এবং আরাম পাওয়া যায়। নটে শাকের রস শরীরে লাগিয়ে স্নান করলেও উপকার হয়।

২১. আগুনে পোড়া ও ব্রণ: আগুনে পোড়া ঘা বা ব্রণতে নটে শাকের রস লাগালে ঘা বা ব্রণ দূর হয়।

২২. ফোঁড়া সারাতে: নটে শাকের পুলটিস তৈরি করে ফোড়ার ওপর বাঁধলে ফোড়া তাড়াতাড়ি পেকে ফেটে যায়। ফোলার ওপর নটে শাক বাটার প্রলেপ লাগালে ফোলা কমে।

২৩. ইঁদুরের কামড়ে: নটে শাকের রস গরুর দুধে মিশিয়ে খেলে বিষ নেমে যায়। ১ চা চামচ নটে শাকের শিকড়ের চূর্ণ (গুঁড়া) ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে দিনে দু বার করে চেটে খেলে শরীর থেকে ইদুরের বিষ নেমে যায়।

২৪. বিছের কামড়: নটে শাকের রসে চিনি মিশিয়ে খেলে বিছের কামড়ের বিষও নেমে যায়। ২৫. শরীরের দোষ দূর করতে: নটে শাকের রসে বা শিকড়ের ক্বাথের সঙ্গে গোলমরিচ মিশিয়ে খেলে বা রোগীকে বেশি পরিমাণে নটে শাক ভাজা খাওয়ালে শরীর থেকে সব রকমেরই বিধ-দোষ দূর হয়।

এছাড়াও আয়ুর্বেদ মতে, নটে শাক হালকা অথাৎ পাচনে গঘু, শীতল, তৈলহীন, প্রাক ও মল নিষ্কাশনে সাহায্য করে, রুচি উৎপন্ন করে; খিদে বাড়ায়, বিষ দূর করে, কফ, পিত্ত ও রক্ত বিকার (রক্তের দোষ) দূর করে।

সুশ্রুতের মতে, নটে শাক অত্যন্ত শীতল, রস ও পরিপাকে মধুর, রক্তপিত্ত (নাক মুখ থেকে রক্ত পড়া), মদ ও বিষের দোষ নাশ করে।

নটে শাক ভাজা খাওয়ার নিয়ম : বেশি উপকার পেতে হলে নটে শাক প্রথমে সেদ্ধ করে নিন। তার পরে অল্প ঘিয়ে সাঁতলে নিন। এইভাবে ভাজুন। তেল দিয়ে রান্না করবেন না বেশিক্ষণ সেদ্ধও করবেন না তাহলে গুণ নষ্ট হয়ে যাবে।

বৈজ্ঞানিক মতে, নটে শাকে ভিটামিন এ, বি আর সি আছে। নটে শাক রক্তবর্ধক, রক্ত গরম হওয়া দূর করে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখে, রক্ত শোধন করে, জীবাণু নাশ করে এবং সহজে হজম হয়। এই শাকে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, গন্ধক, তামা প্রভৃতিও আছে। নটে শাকের নরম কচি পাতা ও নরম কচি ডাঁটায় প্রোটিন, খনিজ, ভিটামিন এ ও সি প্রচুর মাত্রায় পাওয়া যায়।

কাঁটা নটে বা বুনো নটে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতার ওষুধ ; গ্রামাঞ্চলে ঝোপে-জঙ্গলে এই শাক প্রচুর পরিমাণে হয়। নটে শাকের চেয়ে এই শাকের পাতা ছোট এবং সারা গায়ে থাকে ছোট ছোট কাঁটা। গ্রামবাসীরা এই শাক ভাজা বা এই শাক ও উচ্ছে দিয়ে চচ্চড়ি রান্না করে খেয়ে রক্তাল্পতার হাত থেকে নিষ্কৃতি পান। শরীরে রক্তবৃদ্ধি হয় ও অ্যানিমিয়া সারে।

আয়ুর্বেদ মতে, কাঁটা নটে শীতল, রুচিকর, কাশি, শরীর জ্বালা করা, অর্শ, শোথ (শরীর ফুলে ওঠা) রক্তপিত্ত (নাক, মুখ থেকে রক্তপড়া) ও বিষদোষে উপকারী।

তথ্যসূত্রঃ

১. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা, ১৩৪-১৩৯।

কলমি শাকের ঔষধি গুণ

কলমি শাকের ঔষধি গুণ

কলমি শাক অতি পরিচিত একটি শাক। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ও বাংলায় অনেকের প্রিয় ও পরিচিত শাক। এর ব্যাটানিক্যাল নাম Ipomoea reptans (Linn.). পরিবার Convolvulaceae.

উপকারিতা:

১. বিষক্রিয়ায়: ঢলে পড়েছে, হাতের কাছে কিছু নেই, কলমী শাকের রস করে অন্ততঃ এক ছটাক খেলে; শরীর স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

২. প্রথম বয়সের যৌবনের চাঞ্চল্যের কু-অভ্যাসে শরীর হাড়-সার, ঘুমলেই ক্ষরণ, এর সঙ্গে মাথা ধরা, হাত-পা জ্বালা, অগ্নিমান্দ্য, মুখে জল আসা, পড়াশুনা মনে না থাকা ইত্যাদি এ ক্ষেত্রে কলমী শাকের রস ২ চা-চামচ, তার সঙ্গে অশ্বগন্ধা (Withania somnifera Dunal.) মূল চূণ ১ গ্রাম আন্দাজ মিশিয়ে খেতে হয়; অল্প দুধ মিশিয়ে খেলে আরও ভালো। এর দ্বারা তার যেসব উপসর্গ উপস্থিত হয়েছিল সেগুলি তো যাবেই, অধিকন্তু তার ধারণ ক্ষমতাও বেড়ে যাবে।

৩. কোলের শিশু রাত জাগে আর দিনে ঘুমোয়: অনেকের বিশ্বাস রাত্রিবেলায় জন্মালেই বুঝি এই হয়, তা ঠিক নয়; এর জন্য অনেক সময় দেখা যায় তার মল কঠিন হয়েছে এবং দুধে তোলে সে। এ ক্ষেত্রে অল্প গরম দুধের সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ ফোঁটা কলমী শাকের রস খাওয়ালে এই উপদ্রব চলে যাবে।

৪. বসন্তের প্রতিষেধক: বাড়িতে জল-বসন্ত কলে যেতে চায় না, এ ক্ষেত্রে কলমী শাকের রস ২ চা-চামচ একটু, গরম দুধের সঙ্গে মিশিয়ে প্রত্যহ সকলের খেলে ভালো হয়; এর দ্বারা অন্যান্যরা রক্ষা পেতে পারেন। এ ভিন্ন আশপাশের বাড়িতেও এটা খাওয়া উচিত।

৫. স্তন্যে দুধ বাড়তে: শিশু-পোষণের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুও দুধ নেই, এ ক্ষেত্রে কলমী শাকের রস ৩ থেকে ৪ চা চামচ মাত্রায় একটু ঘিয়ে সাঁতলে খেতে হয়। সকালে ও বিকালে দু’বার খেলেই ভাল হয়। এটাতে দুধ বাড়বেই।

৬. গলারিয়ায়: জ্বালা-যন্ত্রণা, তার সঙ্গে পুজ পড়া, এ ক্ষেত্রে কলমী শাকের রস ৪ থেকে ৫ চা-চামচ অল্প ঘিয়ে সাঁতলে দুইবেলা খেতে হয়। এর দ্বারা কয়েকদিনের মধ্যেই এ জ্বালা-যন্ত্রণা ও পুঁজ পড়া বন্ধ হয়।

৭. ঠুনকো হলে: কলমী বেটে অল্প গরম করে স্তনে লাগাতে হয় এবং ঐ শাকের রস দিয়ে ধুতে হয়; এর দ্বারা বসা দুধ পাতলা হয়ে নিঃসরণের সুবিধা হয় এবং যন্ত্রণাও কমে যায়।

৮. হুলের জ্বালা: বোলতা, ভীমরুল, মৌমাছি প্রভৃতির হুল ফুটানোর জ্বালায় এই কলমী শাক বেটে লাগালে জালা কমে যায়। অগত্যা পক্ষে কলমীর ডগা ঘষে দিলেও উপকার হয়।

৯. নিমুখো ফোঁড়ায়: ভেতরে পুজ হয়েছে, বেরুতে পারছে না, বসে যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে ঐ কলমীর শিকড় ও ডগা একসঙ্গে বেটে ফোঁড়ার উপর প্রলেপ দিতে হয়; এর দ্বারা ফোঁড়ার মতো হয়ে যায়।

রাসায়নিক গঠন:

(a) Hydrocarbons viz, pentairiacotane tiacontance.
(b) Sterol,
(c) Acids viz, melissic acid, behenie acid, butyric acid and myristic acid.
(d) Essential oil=0.08%.
(e) Diferent type of resin-7.27%,

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা,৯।

তেলাকুচা পাতার উপকারিতা

তেলাকুচা পাতার উপকারিতা

তেলাকুচা (বৈজ্ঞানিক নাম: Coccinia grandis) হচ্ছে কিউকারবিটাসি (শসা লাউ) পরিবারের সিট্রালাস গণের একটি বহুবর্ষজীবী আরোহী বীরুৎ।[১] বনজ আরোহি এই লতাগাছটির অনেকগুলো নাম রয়েছে, সেসব হচ্ছে কুচিলা, তেলা, তেলাকচু, তেলাহচি, তেলাচোরা, কেলাকচু, তেলাকুচা, বিম্বী, কাকিঝিঙ্গা, কাওয়ালুলি, কান্দুরি, কুচিলা ও মাকাল। নিম্নে তেলাকুচার ভেষজ বা লোকায়তিক ব্যবহার উল্লেখ করা হলো। তেলাকুচার দৈহিক গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন:

তেলাকুচা বাংলাদেশ ভারতের সুলভ ঔষধি লতা
১. সর্দিতে: ঋতু পরিবর্তনের যে সর্দি হয়, সেই সর্দিকে প্রতিহত করতে পারে, যদি তেলাকুচা পাতা ও মূলের রস ৪/৫ চা-চামচ একটু গরম করে সকালে ও বিকালে খাওয়া যায়; তা হলে এর দ্বারা আগন্তুক শ্লেষ্মা আক্রমণের ভয় থাকে না, তবে পাতার ওজনের সিকি পরিমাণ মূল নিলেই চলে।

২. অধগত রক্তপিত্তে: জ্বালা যন্ত্রণা থাকে না কিন্তু টাটকা রক্ত পড়ে, অর্শের কোনো লক্ষণই বোঝা যায়নি; এক্ষেত্রে মূল ও পাতার রস ৩ চা-চামচ গরম করে খেলে ঐ রক্তপড়া ২/৩ দিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে।

৩. আমাশয় শোথে: যাঁদের আমাশা প্রায়ই লেগে থাকে, পা ঝুলিয়ে রাখলেই ফুলে যায়, এক্ষেত্রে মূল ও পাতার রস ৩/৪ চা চামচ প্রতিদিন একবার করে খেলে ঐ ফুলোটা চলে যাবে। তবে মূলরোগ আমাশার চিকিৎসা না করলে পা ফুলো আবার আসবে।

৪. পান্ডু রোগে: (শ্লেষ্মা জন্য) এইরূপ ক্ষেত্রে এর মূলের রস ২/৩ চা চামচ, গরম না করেই সকালের দিকে একবার খেতে হবে।

৫. শ্লেষ্মার জন্য জ্বর: এইসব জ্বরে তেলাকুচা পাতা ও মূল একসঙ্গে থেতো করে ২/৩ চা চামচ রস একটু গরম করে সকালে ও বিকালে ২ বার করে দুই দিন খেলে জ্বর ছেড়ে যায়। এ জ্বরে সাধারণতঃ মুখে খুবই অরুচি, এমনকি জ্বরঠুঁটোও বেরোয়, আবার কারোর মুখে ঘাও হয়।

৬. হাঁপানির মত হলে: আসলে বুকে সার্দি বসে গিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে, পূর্বে বংশপরম্পরায় হাঁপানি বা একজিমা অথবা হাতের তালু ও পায়ের তলায় অস্বাভাবিক ঘাম হওয়ার ইতিহাস নেই, এইরকম যে-ক্ষেত্রে, সেখানে এই তেলাকুচোর পাতা ও তার সিকিভাগ মূল একসঙ্গে থেতো করে তার রস ৩/৪ চা চামচ একটু গরম করে খেলে ঐ সর্দি তরল হয়ে যায়।

৭. শ্লেষ্মার জন্য কাশি: এই কাশিতে শ্লেষ্মা (কফ) একেবারে যে ওঠে না তা নয়, কাশতে কাশতে বমি হয়ে যায় তাও নয়, এই কাশিতে সর্দি (কফ) কিছু না কিছু ওঠে, তবে খুব কষ্ট হয়। এই রকম ক্ষেত্রে মূল ও পাতার রস ৩/৪ চা-চামচ একটু গরম করে, ঠান্ডা হলে আধ চা-চামচ মধু মিশিয়ে (সম্ভব হলে) খেলে ঐ শ্লেষ্মা তরল হয়ে যায় ও কাশিও উপশম হয়।

৮. জ্বর ভাব: জ্বর যে হবে তার সব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, মাথা ভার, সারা শরীরে কামড়ানি, এই অবস্থায় কাঁচা তেলাকুচা ফলের রস ১ চা চামচ একটু মধুসহ সকালে ও বিকালে ২ বার খেলে জ্বরভাবটা কেটে যাবে, তবে অনেক সময় একটু বমি হয়ে তরল সর্দিও উঠে যায়; এটাতে শরীর অনেকটা হালকা বোধ হয়। তবে যে ক্ষেত্রে এই রোগে বায়ু অনুষঙ্গী হয় সেখানে কাজ হবে না, যেখানে পিত্ত অনুষঙ্গী হয় সেখানেও কাজ হবে না; কেবল যেখানে শরীরে কফের প্রবণতা আছে, তার সঙ্গে ডায়েবেটিস, সেখানেই কাজ করবে। এ ক্ষেত্রের লক্ষণ হবে থপথপে চেহারা, কালো হলেও ফ্যাকাসে, কোমল স্থানগুলিতে ফোড়া হতে চাইবে বেশী, এদের স্বাভাবিক টান থাকে মিষ্ট রসে, এরা জলা জায়গার স্বপ্ন বেশী দেখেন। রমণের স্থায়ীত্বও নেই যে তা নয়, এই বিকার যে কেবল বৃদ্ধকালে আসবে তা নয়, সব বয়সেই আসতে পারে। এদের ক্ষেত্রে আলু খাওয়া, মিষ্টি খাওয়া, ভাত বেশী খাওয়া নিষেধ করেছেন আয়ুর্বেদের মনীষীগণ, যাঁরা বায়ু বা পিত্ত বিকৃতির সঙ্গে ডায়েবেটিস রোগে আক্রান্ত হন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সব বর্জনের খুব উপযোগিতা আছে বলে আয়ুর্বেদের মনীষীগণ মনে করেন না।

৯. বমনের প্রয়োজনে: অনেক সময় বমি করার দরকার হয়, যদি কোনো কারণে পেটে কিছু গিয়ে থাকে বা খেয়ে থাকেন — সেক্ষেত্রে তেলাকুচা পাতার রস ৫/৬ চাচামচ কাঁচাই অর্থাৎ গরম না করেই খেতে হয়, এর দ্বারা বমন হয়ে থাকে।

১০. অরুচি: যে অরুচি শ্লেষ্মাবিকারে আসে অর্থাৎ সর্দিতে মুখে অরুচি হলে তেলাকুচোর পাতা একটু সিদ্ধ করে, জলটা ফেলে দিয়ে শাকের মত রান্না করে (অবশ্য ঘি দিয়ে সাঁতলে রান্না করতে হবে) খেলে; এর দ্বারা অরুচি সেরে যাবে।

১১. ডায়বেটিস: অনেক সময় আমরা মন্তব্য করি, তেলাকুচার পাতার রস খেলাম, আমার ডায়েবেটিসে সুফল কিছুই হলো না; কিন্তু একটা বিষয়ে যোগে ভুল হয়ে গিয়েছে। এই রোগ তো আর এক রকম দোষে জন্ম নেয় না। এক্ষেত্রে তেলাকুচোর পাতা ও মূলের রস ৩ চা চামচ করে সকালে ও বিকালে একটু গরম করে খেতে হবে। এর দ্বারা ৩/৪ দিন পর থেকে শারীরিক সুস্থতা অনুভব করতে থাকবেন।

১২. স্তনে দুধহীনতায়:—মা হলেও স্তনে দুধ নেই, এদিকে শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, এক্ষেত্রে কাঁচা সবুজ তেলাকুচা ফলের রস একটু গরম করে ছেকে তা থেকে এক চা চামচ রস নিয়ে ২/৫ ফোঁটা মধু মিশিয়ে সকালে ও বিকালে ২ বার খেলে ৪/৫ দিনের মধ্যে স্তনে দুধ আসবে।

১৩. অপস্মার রোগে : এটি যদি শ্লেষ্মা জন্য হয়, তবে এ রোগের বিশিষ্ট লক্ষণ হবে রোগাক্রমণের পর থেকে ভোগকালের মধ্যে রুগী প্রস্রাব করে থাকে। এদের দাঁড়ানো বা চলাকালে কখনও রোগাক্রমণ বড় দেখা যায় না। খাওয়ার পর ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা খুব ভোরের দিকে এদের রোগাক্রমণ হবে। এদের (এ রোগীর) মুখ দিয়ে গাঁজলা বেরোয় না। এটা যদি দীর্ঘদিন হয়ে যায় অর্থাৎ পুরাতন হলে যদিও নিরাময় হওয়া কষ্টসাধ্য, তথাপি এটা ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে তেলাকুচোর পাতা ও মূলের রস একটু গরম করে, ছেঁকে নিয়ে ২ চা চামচ করে প্রত্যহ খেতে হবে। তবে এটা বেশ কিছুদিন খাওয়ালে আক্রমণটা যতশীঘ্র আসছিলো সেটা আর আসবে না।

তেতো তেলাকুচা: আর এক রকম তেলাকুচা আছে যার স্বাদ তেতো। তেতো তেলাকুচোর মূলের ছালের একটি বিশেষ উপকারিতা আছে। এটি জোলাপের কাজে লাগে। তেলাকুচো পাতার রস বা পাতার পুলটিস তৈরি করে লাগালে ফোঁড়া সারে। ব্রণও সারে পাতার রসে।

তেতো তেলাকুচাও মল নিঃসারণ করায়। অরুচি নাশ করে। শ্বাসের কষ্ট, কাশি ও জ্বর সারিয়ে তোলে। বমিভাব দূর করে। স্বাদে তেতো হওয়ার জন্যে খিদে বাড়িয়ে দেয়। রক্তবিকার অর্থাৎ ‘রক্তের দোষ’ শোধন করে। বমন করাবার শক্তি আছে। কফ এবং জনডিস রোগ আরোগ্য করে। এই গাছের মূল বমি করায় এবং জোলাপের কাজও করে। শোথ রোগ সারিয়ে দেয়।

তেতো তেলাকুচার মূলের চূর্ণ খাওয়ালে প্রস্রাবের সঙ্গে শ্বেত পদার্থ বেরিয়ে যাওয়া বন্ধ হয়। মূলের চূর্ণ খেলে স্ত্রীরোগে উপকার হয়। যদি বিছে কামড়ায় তেতো তেলাকুচো পাতার রসের প্রলেপ দিলে জ্বালা বন্ধ হয়।

বৈজ্ঞানিকদের মতে, তেলাকুচোয় প্রভাব জননেন্দ্রিয় ও মূত্রাশয়ের ওপর বেশি। শরীর স্নিগ্ধ করে, মূত্র ও রক্তে পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এই শ্রেণীর অন্য তরকারির মধ্যে তেলাকুচার পুষ্টিমূল্য বেশি!

তেলাকুচোকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় ‘বিম্বফল’। তেলাকুচো পাকলে টুকটুকে লাল হয়ে যায়। সেই পাকা বিম্ব-র সঙ্গে কবি কালিদাস সুন্দরীদের ঠোঁটের তুলনা করেছেন ‘পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী’।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. এম অলিউর রহমান, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৭ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩০৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা ২৬-৩১।

৩. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা,১১৩-১১৪।

সুষনি ঔষধি গুণ সম্পন্ন শাক

সুষনি ঔষধি গুণ সম্পন্ন শাক

সুষনিশাক বা সুনসুনি শাক গ্রামে অনেকের পরিচিত শাক। এই শাকের পাতা অনেক নরম ও পাতলা হয়। পাতার রং সবুজ নরম ও সরু ডাল বিশিষ্ট ঘাস বিশিষ্ট। থোকা থোকা জন্মে থাকে। একটি ডালে একটি পাতা হয়। শাক হিসাবে জনপ্রিয় এর বৈজ্ঞানিক নাম Marsilea minuta ও পরিবার  Marsileaceae.

রোগ প্রতিকারে

১. শ্বাস রোগে (হাঁপানিতে): কফের প্রাবল্য নেই অথচ শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট, আয়ুর্বেদের চিন্তাধারায় এটা বায়ু প্রধান শ্বাস রোগ, এ ক্ষেত্রে সুষণ শাকের রস ৪/৫ চামচ একটু গরম করে অথবা কাঁচা হলে ৮-১০ গ্রাম, আর শুকনো হলে ৩-৪ গ্রাম ৩/৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে ছেকে নিয়ে সন্ধ্যাবেলায় খেলে শ্বাসকষ্টের অনেকটা লাঘব হয়, তার সঙ্গে নিদ্রাও ভাল হয়।

২. জ্বালা মেহে: প্রস্রাবে জালা, তার সঙ্গে কিছু ক্ষরণও হচ্ছে—এ ক্ষেত্রে উপরিউক্ত মাত্রায় ও ঐ পদ্ধতিতে তৈরি করে তিন চার দিন খাওয়ার পর থেকেই উপকার বুঝতে পারবেন।

৩. অল্প মেধায়: বাল্যকাল থেকে মেধা কম, সে ক্ষেত্রে এই শাক বেশ কিছুদিন অন্তত ৩-৪ মাস নিয়মিত খাওয়াতে হয়; তবে তার মাত্রা বয়সানুপাতে নিতে হবে। তবে এই শাক শুকিয়ে গুড়ো করে, ছেঁকে নিয়ে খেলেও চলে; এটার মাত্রা পূর্ণবয়স্কের ২ গ্রাম নিতে হয়; জলসহ না খেয়ে অন্তত আধকাপ দুধ আর একটু চিনি মিশিয়ে খেলে খুবই ভাল হয়।

৪. বিস্মৃতিতে: বয়সের ধর্মে এটা আসে; তার কারণ মূর্ধা থেকে যে সব বর্ণের উচ্চারণ হয় যেমন র, ড়, ল প্রভৃতি বর্ণ যেসব শব্দের আদিতে থাকে, বয়স বেশি হলে এগুলি মনে পড়তে চায় না—সে ক্ষেত্রে সুষুণী শাকের রস দিয়ে ঘি পাক করে প্রত্যহ ২-১ চামচ করে কিছুদিন খেলে ঐ অসুবিধেটা আস্তে আস্তে চলে যায়। এটা বালকদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করানো চলে। ব্রাহ্মী ঘৃতের প্রতিনিধিও এটি।

৫. অনিদ্রায়: কোনো কারণ বা অবান্তর কারণে মানসিক দুশ্চিন্তা, শুয়ে থাকলেও ঘুম আসে না; আবার কারও কারও তন্দ্রা আসার মুখে চমকে উঠে ঘুম ভেঙে যায়, অবান্তর চিন্তায় মন ভারাক্রান্ত, শরীর উদ্বেগগ্রস্ত, সে ক্ষেত্রে কাঁচা হলে ১৫ গ্রাম আর শুষ্ক হলে ৩/৪ গ্রাম ৩/৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে, ছেকে ২-৪ চামচ দুধ মিশিয়ে প্রত্যহ সন্ধ্যেবেলা খেলে ঐ অসুবিধেটা চলে যাবে।

৬. উচ্চ রক্তচাপে: ব্লাডপ্রেসার বেশি থাকলে কাঁচা শাক আন্দাজ ১২ গ্রাম বেটে, জলে গুলে, ছেকে নিয়ে একটু, মিছরি বা চিনি মিশিয়ে সরবৎ করে খেতে হয়; তবে ডায়াবেটিস থাকলে অথবা অম্লরোগ থাকলে কোনো মিষ্টি দেওয়া চলবে না; আর শাক শুকিয়ে গেলে ৩/৪ গ্রাম আন্দাজ ৩/৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে, ছেকে ওটাকেই সরবৎ করে খেতে হয়; তবে সিদ্ধ করার পূর্বে একটু থেঁতো করে দেওয়াই ভাল।

৭. রমণ প্রয়াসের শৈথিল্যে: মেদোবহ স্রোত দুষিত হলে এবং তার জন্য অগ্নিমান্দ্য, অরুচি, পিপাসা থাকলে সুষুণী শাকের রস অথবা শাক বেঁটে সরবৎ করে খেলে ১৫-২০ দিনের মধ্যে কিছুটা ফল উপলব্ধি করা যায়।

৮.দাহ রোগে: শাকের রস অথবা শাক বাটা গায়ে মেখে কিছুক্ষণ বাদে স্নান করলে স্নায়বিক কারণে সর্ব শরীরের দাহ প্রশমিত হয়।

৯. কীট দংশনে: বিষাক্ত কীটের দংশনের জ্বালায় সুষুণীর রস অথবা শাক বাটা ওখানে লাগালে কয়েক মিনিটের মধ্যে ওখানকার জ্বালা কমে যায়।

১০. রক্তপিত্তে: সুষুণীশাক ঘিয়ে ভেজে খেতে বলা আছে সশ্রুত সংহিতায় _ আবার ভাবপ্রকাশে রক্তপিত্তে এই শাকটিকে প্রয়োগ করতে নিষেধ করেছেন (এই গ্রন্থটির প্রণেতা ভাবমিশ্র, এটি ষোড়শ শতকের গ্রন্থ)।

১১.অপস্মারে (Epilepsy): শুকনো সুষুণী শাক ৪ গ্রাম এবং জটামাংসী ২ গ্রাম ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে ২ কাপ থাকতে থাকতে নামিয়ে, চটকে, ছেকে ঐ জল সকাল ও বৈকালে ২ বারে খেতে হবে। এর দ্বারা ঐ রোগ প্রশমিত হয়। এই ভেষজ দুটির ঘন সারকে উপাদান করেই কোনো কোনো স্থলে বিশেষ ধরণের অপস্মারহারক বটিকা নামে প্রচার করার পিছনে ভারতীয় এই ভেষজ দুটি আজ জনসাধারণের গোচরীভূত।

রাসায়নিক গঠন:
(a) ketonic constituents viz, marsiline, 3-hydroxytriacontane.
(b) Alcoholic constituents viz, hentiacontan-l6-01.
(c) Sterol viz., betasitosterol.
(d) Mixture of normal hydrocarbons.
(e) Nitrogenous compounds viz, methylamine.
(f) Saponin.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ 

১ আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি‘ খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ৭১-৭৩।

গিমা বা গিমে ঔষধি গুণে ভরা শাক

গিমা বা গিমে ঔষধি গুণে ভরা শাক

গিমে শাক পরিত্যক্ত জমিতেও হয় আবার আলু, রসুন, পেঁয়াজ ইত্যাদি ক্ষেতে জন্মে থাকে। যত্ন ছাড়া এই শাক হৃষ্ট-পুষ্টভাবে বেঁচে থাকে। তবে স্যাঁতস্যাঁতে অর্থাৎ কলতলা, পুকুরপাড়ে, নালার পাশে এটি ভালো ভাবে জন্মে। বোটানিকাল নাম Glinus oppositifolius (L.) Aug.DC. এটি Molluginaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

স্বাদে তিক্ত, কফ পিত্তাধিক্যনাশক ও রুচিকারক, আর রোগারোগ্যের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে পাণ্ডু-কামলা (জণ্ডিস বা তার পূর্বাবস্থা) ইত্যাদি যকৃত-প্লীহাঘটিত যাবতীয় রোগ প্রতিষেধক ও উপশমক।

নব্য ভেষজ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে:

এই তিক্ত শাকটিতে সাবান জলের মত কতকগুলো ফেনিল পিচ্ছিল পদার্থ আছে, তার নাম স্যাপোনিন, তা থেকে বিশিষ্ট প্রক্রিয়ার দ্বারা কতকগুলো নতুন ধরনের টাইটারপিন জাতীয় দ্রব্য পাওয়া গিয়েছে। বর্তমানে এই শাকটি মানুষের রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে তার বিশিষ্ট উপযোগিতার ক্ষেত্র কি, তার অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

আয়ুর্বেদের দৃষ্টিতে: যেকোনো তরকারী মাত্রেই শাক পর্যায়ভুক্ত, অবশ্য তার শ্রেণীভেদ করা হয়েছে, যথা-পত্র, পুষ্প, ফল, নাল, কন্দ ও সংস্বেদজ (ছত্রাক শাক) শাক; এই ছয়টি শ্রেণীর মধ্যেই সমস্ত তরকারী। এগুলি উত্তরোত্তর গুরুপাক, এর মধ্যে পত্রশাকই সর্বাপেক্ষা লঘু। এছাড়া তেল (তিলের তেল এখানে বক্তব্য) দিয়ে সাঁতলে নিয়ে খাওয়া উচিত; এদ্বারা শাকের রুক্ষতা নষ্ট হয়ে হজমের পক্ষে সহায়ক হয়।

বর্তমান সমীক্ষার উপলব্ধ তথ্য:

১. এই শাক সম্পর্কে একটি বিধিনিষেধ আছে যেসব রমণীর কষ্টরজঃ (ডিসমেনোরিয়া) আছে, আহার্যের সঙ্গে এটি খেলে তারা সে দোষ থেকে রেহাই পাবেন;

২. যাদের স্রাবের আধিক্য আছে, তারা এটা খাবেন না। এই তথ্যটি দিয়েছেন ডাইমক সাহেব। এটার সত্যতা সম্পর্কে আমি নিঃসন্দেহ।

৩. এই শাকটির বিভিন্ন রোগনাশক গুণ থাকলেও আহার্যের সঙ্গে কালে ভদ্রে শাক হিসেবে অথবা ফুলুরির মতো বড়া করে ব্যবহার করে খেলেও কিছু না কিছু উপকার হবেই।

৪. যাদের লিভারের ক্রিয়া মন্দীভূত, সেসব ক্ষেত্রে সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ দিন। অল্প পরিমাণ শাক হিসেবে যদি ব্যবহার করা হয়, তাহলে যকৃতের ক্রিয়া স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে। কারণ অন্ন-পানের মাধ্যমেই আমাদের অন্তরাগ্নি ইন্ধন সঞ্চয় করে। তাতেই আমাদের প্রাণ ধারণ সুষ্ঠ হয়। এ আবিষ্কার আজকের নয় চরক সংহিতার চিকিৎসা প্রচলনের যুগে। এই অভিমত আজও স্বীকৃত ও অপরিবর্তিত।

লোকায়তিক ব্যবহার:

১. চোখ উঠলে: চোখ দিয়ে পিচুটি পড়লে, গিমে পাতা সেকে নিয়ে তার রস ফোঁটা ফোঁটা করে চোখে দিলে, চোখের করকরানি কমে, পিচুটি পড়া বন্ধ হয়।

২. অম্ল পিত্ত রোগে যাদের বমি হয়, তারা গিমে পাতার রস ১ চামচ এবং তার সঙ্গে আমলকী ভিজানো জল আধকাপ মিশিয়ে সকালে খাবেন, অচিরেই বমি করা কষ্ট দূর হবে।

রাসায়নিক গঠন:

(a) Saponin.

(b) Vitamin via carotene.

(c) Fatty acid

(d) Glucoside (different types).

(e) Alkaloid 0.088%.

(f) Highly essential oil.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১ আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ২১-২৩।