শিগেলোসিস : কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

শিগেলোসিস : কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত শিগেলোসিস বা রক্ত আমাশয় আমাদের হজম ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। এটি শিগেলা নামক একটি ব্যাকটেরিয়ার গোষ্ঠীর দ্বারা হয়। শিগেলা দূষিত জল এবং খাবার বা দূষিত মলের মাধ্যমে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শিগেলা সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে, যদিও এটি যেকোনও বয়সেই হতে পারে। সাধারণত ছোটো বাচ্চাদের মধ্যে দেখা যায় কারণ তারা প্রায়ই নিজেদের আঙ্গুলগুলি মুখে ঢুকিয়ে রাখে। তাই, ব্যাকটিরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

শিগেলোসিসের লক্ষণসমূহ
এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হল ডায়রিয়া। ব্যাকটেরিয়া সংস্পর্শে আসার এক বা দুই দিন পর থেকে লক্ষণগুলি দেখা দেয়। তবে, এটি বিকাশ হতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নিতে পারে।

শিগেলোসিসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলি হল-
ক) ডায়রিয়ার সাথে প্রায়ই রক্ত ​​বা শ্লেষ্মা বেরোয়
খ) জ্বর
গ) পেটে ব্যথা বা টান অনুভব করা
ঘ) বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া

শিগেলোসিসের কারণ
ব্যাকটিরিয়া যখন আমাদের পাচন পদ্ধতিতে প্রবেশ করে তখন সংক্রমণটি বিকাশ লাভ করে। ব্যাক্টেরিয়াগুলি বিষক্রিয়া ছড়াতে থাকে যার কারণে অন্ত্র জ্বালা করে। এর কারণগুলি হল –
ক) হাত না ধুয়ে খাওয়া বা মুখে ছোঁয়া
খ) দূষিত খাবার খাওয়া
গ) দূষিত জল পান করা

শিগেলোসিসের ঝুঁকির কারণ
ক) বয়স
খ) শিগেলা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে সংস্পর্শে আসার ফলে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গ) বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া হয় এইরকম কেন্দ্রগুলিতে, কমিউনিটি ওয়েডিং পুল, নার্সিংহোম, জেল ইত্যাদিতে শিগেলার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।
ঘ) স্যানিটেশনের অভাব রয়েছে এমন অঞ্চলে থাকা।

শিগেলোসিসের নির্ণয়
এই অবস্থার প্রাথমিক লক্ষণ হল ডায়রিয়া, যা অন্যান্য ডিজিজকেও চিন্হিত করতে পারে। রোগীর শিগেলোসিস হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে একজন চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস ও বিভিন্ন পরীক্ষা করেন। শিগেলা ব্যাকটিরিয়া বা টক্সিনের উপস্থিতির জন্য চিকিৎসক রোগীর মল পরীক্ষা করারও পরামর্শ দেন।

শিগেলোসিসের চিকিৎসা
এই সংক্রমণ সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে চলে। এর চিকিৎসাগুলি হল –
ক) তীব্র শিগেলা সংক্রমণের ক্ষেত্রে, অ্যান্টিবায়োটিকগুলি অসুস্থতার সময়কাল হ্রাস করতে সাহায্য করতে পারে। তবে, চিকিৎসকরা অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের বিরুদ্ধে পরামর্শ দেন কারণ কিছু শিগেলা ব্যাকটিরিয়া ড্রাগ-প্রতিরোধী তাই কেবল সংক্রমণ তীব্র হলেই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
খ) স্বাস্থ্যকর প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, ডায়রিয়ার নানান প্রভাবগুলি প্রতিরোধ করার জন্য জল পান করা যথেষ্ট। বাচ্চারা ওরাল রি-হাইড্রেশন সমাধান থেকে উপকৃত হতে পারে। গুরুতরভাবে ডিহাইড্রেটেড ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন।

শিগেলোসিস প্রতিরোধ
শিগেলার ভ্যাকসিন তৈরির জন্য এখনও গবেষণা চালানো হচ্ছে।
তবে, এইমূহূর্তে চিকিৎসকরা এই অবস্থার সূত্রপাত রোধ করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলির পরামর্শ দেয়-
ক) ছোটো বাচ্চাদের হাত ধোওয়ার সময় খেয়াল রাখুন
খ) ঘন ঘন, ভাল ভাবে হাত ধোবেন
গ) দূষিত পুকুর, সুইমিং পুল এড়িয়ে চলুন
ঘ) ডায়রিয়ায় আক্রান্ত এমন ব্যক্তির সঙ্গে যৌন ক্রিয়াকলাপ এড়িয়ে চলুন
ঙ) আপনার ডায়রিয়া হলে অন্যের জন্য খাবার প্রস্তুত করবেন না
চ) ব্যবহৃত ডায়াপার সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করুন

“দুগ্ধ পনির মধ্যে প্রজনন হরমোন রয়েছে যা স্তন ক্যান্সারের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।”

“দুগ্ধ পনির মধ্যে প্রজনন হরমোন রয়েছে যা স্তন ক্যান্সারের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।”

FDA কে ১২,০০০ ডক্টর দাবী জানিয়েছে রূপান্তরিত পনিরের গাঁয়ে সাবধানতার লেবেল দিতে।

পনির পণ্যগুলিতে স্বাস্থ্য সতর্কতা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকরা FDA র কাছে আবেদন করছেন। গবেষণাগুলি বলছে যে, দুগ্ধ সেবনের কারণে নারীদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির সাথে মৃত্যু ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে। যা দিনে দিনে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।

তাই আমেরিকার চিকিৎসকদের কমিটি ফর রেসপন্সিবল মেডিসিন (PCRM) মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনকে (FDA) পনিরের উপরে স্তন ক্যান্সারের সতর্কতার লেবেল দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছে।

১২,০০০ চিকিৎসা পেশাদার সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত, PCRM চায় পণ্যগুলিতে সিগারেটের প্যাকেটের মতো সতর্কতা লেবেল দিয়ে রাখে। সেই্ রকম লেবেল যেন পনিরের গাঁয়ে লাগানো থাকে, এটি আবেদনের সাথে একটি উদাহরণ দিয়েছে যে, পনিরের প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকুক : “দুগ্ধ পনির মধ্যে প্রজনন হরমোন রয়েছে যা স্তন ক্যান্সারের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।”

রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলির মতে মহিলাদের মধ্যে মৃত্যু সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলির মধ্যে স্তন ক্যান্সার অন্যতম। PCRM স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাসের শুরুতে ৩ অক্টোবর তার আবেদন জমা দেয়।

“ক্রাফ্টের মতো পনির প্রস্তুতকারকরা ফিলাডেলফিয়া ক্রিম চিজ এবং ম্যাকারনি ও পিজের মতো পণ্যগুলিতে গোলাপী ফিতা চাপড়ানোর পরিবর্তে, (তারা বলতে চায় এতে নারীর স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভবনা নেই) যেমন তারা স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাসের আগে করেছিলেন, তাদের সতর্কতা লেবেল যুক্ত করা উচিত, PCRM সভাপতি নীল বার্নার্ড একটি বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা চাই নারীরা সচেতন হন যে দুগ্ধ পনির তাদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।”

দুগ্ধ এবং স্তন ক্যান্সার
গরুর দুগ্ধে ইস্ট্রোজেন থাকে। দুধ যখন পনিরে রূপান্তরিত হয় তখন ইস্ট্রোজেনগুলি আরও ঘন হয়। PCRM বলছে, “যদিও এগুলি কেবলমাত্র চিহ্নস্বরূপ, বস্তুত ইস্ট্রোজেনগুলি মানবদেহে জৈবিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠে,তাতে নারীর স্তন ক্যান্সারের মৃত্যুর হার বাড়িয়ে তোলে”

এটি একটি গবেষণাকে বোঝায় – যা লাইফ আফটার ক্যান্সার এপিডেমিওলজি স্টাডি হিসাবে পরিচিত – যা প্রমাণ করে যে মহিলাদের মধ্যে আগে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে, যেগুলি প্রতিদিন উচ্চ ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারগুলির এক বা একাধিক প্রক্রিয়ায় গ্রহন করেছেন তাদের স্তন ক্যান্সারের মৃত্যু হার ছিল ৪৯ শতাংশ, সেই তুলনায় যারা প্রতিদিন এক-অর্ধেকেরও কম দুগ্ধ পনির কম খেয়েছেন কিংবা বর্জন করেছেন করছেন তাদের স্তন ক্যান্সারের মৃত্যু ঝুঁকি কম।

বিশ্বখ্যাত স্তন সার্জন ডাঃ ক্রিস্টি ফানক স্তন ক্যান্সার এবং পশু থেকে উৎপাদিত দুগ্ধ পণ্যগুলির মধ্যে যোগসূত্র সম্পর্কে কথা বলেছেন।

তিনি গত বছর লাইভাকিন্ডলিকে বলেছিলেন, “প্রাণীর প্রোটিন এবং প্রাণীর ফ্যাট গ্রহণের বিষয়ে শরীরের সেলুলার প্রতিক্রিয়া হ’ল স্বাস্থ্যের স্বাভাবিক ক্রিয়া দমিয়ে রাখা, ইউমিনিট দূর্বল করে দেওয়া এবং দুগ্ধ পণ্য গ্রহনের সময় অসুস্থতা খাওয়ায় এবং শরীরে জ্বালানি প্রবাহ বৃদ্ধি করে সমস্ত অর্গানগুলোকে দুগ্ধপণ্য পাচনে ব্যস্ত করে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পানীয় চুষে নেয়, তিনি আরও যোগ করেছেন, “ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি, বৃদ্ধি হরমোনস স্ক্রাইকেট, প্রদাহ প্রসারণ, মুক্ত র‌্যাডিকালগুলি চালায় কোষকে ক্ষতিগ্রস্থ করে এবং DNA কে পরিবর্তিত করে দেয় যা একজন ক্যান্সারের রোগী দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঝুকতে থাকে।”

লেটস বিট ব্রেস্ট ক্যান্সার শিরোনামে একটি নতুন Vegan প্রচারে বেশ কিছু সেলিব্রিটি – পাশাপাশি ফানক PCRM র সাথে কাজ করছে। এটি মানুষকে আরও বেশি উদ্ভিদ-ভিত্তিক (শাক সবজি, ফলমূল) খাবার খাওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে, নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন করতে, অ্যালকোহল গ্রহণ সীমাবদ্ধ করতে এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে উৎসাহ দেয়ার উপর জোর দিয়েছে।

তারা এর কাছে জোড়ালো দাবী করেছে যেভাবে সিগারেটের গাঁয়ে স্বাস্থ্য ক্ষতির কথা উল্লেখ থাকে সেভাবেই যেন পনিরের গায়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা লেবেলে দেওয়া হয়।

সেই সাথে জোড়ালো দাবী করা হয়েছে নারীদের সচেতন হওয়ার জন্য তারা যেন পনির বর্জন করে, আমেরিকার সহ পৃথিবীর সব দেশেই পিজা, বার্গার সহ পরিচিত ফাষ্টফুডগুলোতে পনিরের উপস্থিতি অনেক অনেক বেশি। তাই সেই খাদ্য বর্জন করতে। যেহেতু নারীর স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার দরুন এখন আমেরিকায়ই স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের অপারেশন করার সার্জনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে সেহেতু চিকিৎসকরাই এখন জোড় দাবী জানাচ্ছে রোগ হয়ে চিকিৎসা করানোর চেয়ে রোগ না হওয়ার সচেতনতা বেশি সাশ্রয়।

এই চিত্র আমেরিকার, যেখানে জীবনমান, সচেতনতা, চিকিৎসা, খাদ্য বিশুদ্ধতা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে, তাদের ডাক্তারদের আহ্বান তাদের নারীদের প্রতি প্রভাব পড়বে। কিন্তু বাংলাদেশে কোন দিনও ডাক্তাররা বলবে না, ‘আপনি পনির সহ দুগ্ধজাতীয় খাদ্য বর্জন করে নিজের ইস্ট্রোজেন ভাল রাখুন, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখুন।’ সেহেতু এখনই সময় দুধ ও পনির জাতীয় খাবার বর্জন করে নিজের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকুন।

আলমগীর আলম
প্রতিষ্ঠাতা: প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
২৯ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, (তৃতীয় তলা)
ঢাকা।

চিকিৎসায় বিপ্লব আনছে চীন?

চিকিৎসায় বিপ্লব আনছে চীন?

এবার চিকিৎসা খাতে জোর পদক্ষেপ নিতে চাইছে চীন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয়ে এরই মধ্যে অনেকটা এগিয়ে গেছে চীন। দেশটি এবার চিকিৎসায় ‘বিপ্লব’ আনতে চাইছে। শুধু নিজেদের জনগণের জন্যই নয়, একই সঙ্গে পুরো পৃথিবীর জৈবপ্রযুক্তি ও ওষুধশিল্পে অগ্রগণ্য ভূমিকায় আসীন হতে চাইছে সি চিন পিংয়ের দেশ।

যদিও এ ক্ষেত্রে মূল প্রয়োজনটি সৃষ্টি হয়েছে চীনের ভেতর থেকেই। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক হিসাবে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে চীনের ২০ কোটি নাগরিকের বয়স হয়ে যাবে ৬০ বছর। বয়স্ক নাগরিকদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকায় চীনের এখন প্রয়োজন নানা ধরনের উন্নত ওষুধ ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রযুক্তি। এ ছাড়া বর্তমানে বিশ্বের প্রতি চারজন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর একজন চীনা। তাই দেশটি নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির জন্য স্থানীয় ওষুধশিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে সঙ্গে জৈবপ্রযুক্তির নিত্যনতুন সুবিধাও কাজে লাগাতে চায় চীন। তাই জৈবপ্রযুক্তি–বিষয়ক ইউরোপ-আমেরিকার অসংখ্য স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করছে দেশটি।

এত দিন মূলত পশ্চিমা বিশ্বে তৈরি উন্নত ওষুধ আমদানি করেই অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে গেছে চীন। এর পাশাপাশি চীনের হাজার হাজার স্থানীয় ওষুধ কোম্পানি তৈরি করছিল ‘কপি-পেস্ট’ ওষুধ। অর্থাৎ উন্নত ওষুধের ফর্মুলার লাইসেন্স কিনে তা উৎপাদন করত চীনা কোম্পানিগুলো। কয়েক বছর ধরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসছে দেশটি। অন্যের ফর্মুলায় ওষুধ তৈরির পরিবর্তে গবেষণার মাধ্যমে চীন উন্নত ধরনের ওষুধ উদ্ভাবন করতে চাইছে। চীনের লক্ষ্য—এর মাধ্যমে একসময় ইউরোপ-আমেরিকার বাজারও দখলে আনা। বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, নিকট ভবিষ্যতে চীনেই সৃষ্টি হবে জৈবপ্রযুক্তির ‘পাওয়ারহাউস’।

চীনা প্রতিষ্ঠান ‘মাই বায়ো-মেড’। এই প্রতিষ্ঠানের সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা জ্যাকসন ঝু ওয়েইয়ান বলছেন, চীন উদ্ভাবনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন বিষয়কে সমন্বয় করার চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ জৈবপ্রযুক্তির সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির একটি সুষম মেলবন্ধন করার উদ্যোগ নিচ্ছে চীনারা।

ফিলিপস কোম্পানির পক্ষ থেকে চলতি বছর ‘ফিউচার হেলথ ইনডেক্স’ নামের একটি সূচক তৈরি করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য সব দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে চীন। এ ক্ষেত্রে টেলিহেলথ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করছে দেশটি।

দেশীয় ওষুধশিল্পকে এগিয়ে নিতে এরই মধ্যে এই খাতে চীন বিনিয়োগ বাড়িয়ে দিয়েছে। আইকিউভিআইএ নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, ২০১৭ সালে ওষুধের বৈশ্বিক বাজারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোক্তা ছিল চীন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সালের মধ্যে দেশটির ওষুধের বাজার ১৪৫ বিলিয়ন থেকে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ২০১৫ সাল থেকে ওষুধশিল্পের স্থানীয় বাজারে আমূল পরিবর্তন আনতে কাজ শুরু করে চায়না ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (সিডিএ)। ক্রমবর্ধমান বয়স্ক নাগরিকদের কথা মাথায় রেখে প্রথমে দেশের বাইরে থেকে আনা উন্নত ওষুধগুলোর ছাড়পত্র দ্রুত দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কমিয়ে দেওয়া হয় আমদানি শুল্ক। এ ছাড়া স্থানীয় কারখানাগুলোর ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল। এবার স্থানীয় ওষুধ উৎপাদনকারীদের জন্য ফের কঠোর নিয়মকানুন চালু করছে সিডিএ। এতে হয়তো অনেক চীনা কোম্পানি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তবে চীনা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতি হলো—কিছুটা ক্ষতি স্বীকার করে হলেও উন্নত মান নিশ্চিতের রাস্তায় হাঁটা। বলা হচ্ছে, এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে লাভ হবে চীনেরই। কারণ, উন্নত মানের ওষুধ তৈরি করতে হলে গবেষণা বিভাগ জোরদার করতেই হবে। আর এই গবেষণাতেই মিলবে নতুন উদ্ভাবন। এক হিসাবে দেখা গেছে, বর্তমানে চীন তার মোট জিডিপির আড়াই শতাংশ খরচ করছে গবেষণায়।

এখন ওষুধসংক্রান্ত নানা লাইসেন্স চীন কিনতে শুরু করেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর শুধু চীনা জৈবপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোই ১৬৪টি আন্তর্দেশীয় লাইসেন্স কেনার চুক্তি করেছে। পাঁচ বছর আগের হিসাব ধরলে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। এই চুক্তিগুলো প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের। বিদেশি স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ দিনকে দিন বাড়াচ্ছে চীন। এর মধ্য দিয়ে দেশটি নতুন নতুন উদ্ভাবন করায়ত্ত করতে চাইছে, যাতে একই সঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়। ঠিক একইভাবে বিদেশি তথ্যপ্রযুক্তিগত স্টার্টআপেও চীন বিনিয়োগ বাড়িয়েছিল।

এত আলোর নিচে অন্ধকারও আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চীনের বড় বড় শহরকেন্দ্রিক হাসপাতালগুলো যতটা উন্নত, শহরের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি ততটা ভালো নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অভাবও প্রকট। চীনের প্রতি ৬ হাজার ৬৬৬ জন নাগরিকের জন্য ১ জন চিকিৎসক রয়েছেন। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, মাথাপিছু দেড় থেকে দুই হাজার নাগরিকের জন্য একজন করে চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন। চীনের প্রত্যন্ত এলাকায় হাসপাতালের সংখ্যাও অপ্রতুল, কিছু ক্ষেত্রে শত শত মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে পৌঁছাতে হয় হাসপাতালে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চিত্রের পরিবর্তন না হলে নতুন নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করেও চীনের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার পরিপূর্ণ উন্নতি হবে না।

চীনে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। চায়না ক্যানসার ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ৭০ শতাংশের রোগ চিহ্নিত হয় এবং তার চিকিৎসা শুরু হয় একেবারে শেষ পর্যায়ে। সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় এই রোগ আগেভাগে চিহ্নিত করা সম্ভব। কিন্তু উন্নত শহরগুলোর বাইরে থাকা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় না। ফলে, সামগ্রিকভাবে চীনের স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির সুফল পাচ্ছে না দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের অধিবাসীরা। 

অবশ্য চীন সরকারও বসে নেই। ক্যানসার নিরাময়ের নিত্যনতুন গবেষণায় কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢালা হচ্ছে। এরই মধ্যে ক্যানসার নিরাময়ের জন্য ‘সিএআর-টি’ নামের একটি নতুন থেরাপি নিয়ে কাজ করছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। সুযোগ বুঝে তাতে বিনিয়োগ করছে পশ্চিমারাও।

এটি ঠিক যে চিকিৎসা খাতে ব্যাপক পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে চীন। কিন্তু পরিবর্তনের গতি যতই থাকুক, তা কখনোই নিশ্চিত সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। নতুন নতুন ওষুধ বা জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভাবন প্রক্রিয়াটি বেশ অনিশ্চিত। আশার কথা হচ্ছে, অনিশ্চিত জেনেও চীন এই পথে এগোতে শুরু করেছে। হয়তো একদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাদের চীনেই যেতে হবে!