রোগ নিরাময়ে ‘গিলয়’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জেনে নিন এর উপকারিতা

রোগ নিরাময়ে ‘গিলয়’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জেনে নিন এর উপকারিতা

প্রাচীনকাল থেকেই আয়ুর্বেদ চিকিৎসার জুড়ি মেলা ভার। তখন ছিল না হোমিওপ্যাথি, এলোপ্যাথি। মানুষ গাছ-গাছড়া থেকেই ওযুধ তৈরি করে রোগ সারাতো। বর্তমানের প্রযুক্তিগত দুনিয়ায় বিভিন্ন রোগে বিভিন্ন ওষুধ বেরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু, সেই আয়ুর্বেদিক ওযুধের গুণগত মান আজও সমান ভাবেই প্রাধান্য পাচ্ছে।

বহু প্রাচীন কাল থেকেই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাবিদ্যায় ‘গিলয়’ নামে একটি ভেষজ ব্যবহৃত হয়। এই ভেষজের মধ্যেই আছে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান । ওষুধের নানান বৈশিষ্ট্যগুলি থাকার কারণে, গিলয় যুগে যুগে ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রস, ক্যাপসুল বা গুঁড়ো যেকোনও ভাবেই এটি খাওয়া যেতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে, এটি আমাদের স্বাস্থ্যের উপকারে লাগে বলে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শাস্ত্রে এটি একটি জনপ্রিয় ঔষধি হিসেবে বিবেচিত। প্রায়ই সকলের রোগ নিরাময় করতে গিলয়কে ব্যবহার করা হয়। কারণ, খুব কম রোগই আছে যা এই ভেষজটি নিরাময় করতে পারে না।

নীচে গিলয়ের রোগ নিরাময় সম্পর্কে আলোচনা করা হল –

১) শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গিলয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে যা রক্তকে বিশুদ্ধ করে, টক্সিনগুলি সরায় এবং রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটিরিয়ার ও ফ্রি-রেডিক্যালগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করে। হৃদরোগ, মূত্রসংক্রান্ত নানান রোগ প্রতিরোধে এর যথেষ্ট কার্যকারিতা রয়েছে।

২) হজম শক্তি বৃদ্ধিতে গিলয় অন্যতম ভূমিকা পালন করে। পেটের নানান ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহৃত হয়।

৩) ক্রনিক জ্বর নিরাময়ের ক্ষেত্রেও গিলয় যথেষ্ট কার্যকর। প্রকৃতির অ্যান্টি-পাইরেটিক হওয়ায়, ঘন ঘন জ্বর হওয়া থেকে মুক্তি দেয় এটি। জ্বরের লক্ষণগুলি হ্রাস করতে পারে। এছাড়া, ডেঙ্গু, সোয়াইন ফ্লু ও ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।

৪) ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে এটি যথেষ্ট কার্যকর। গিলয়ের রস পান করা অত্যন্ত উপকারী।

৫) হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহার করা হয় গিলয়। এটি সাধারণ ঠাণ্ডা লাগা ও কাশির জন্যও অত্যন্ত কার্যকরী।

৬) বিষণ্ণতা, স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কমাতেও এটির ভূমিকা অপরিসীম। এটি মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

৭) ভেষজটির মধ্যে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্যগুলি থাকার কারণে এটি বেদনাদায়ক অসুস্থতা দূর করতে সাহায্য করে। আর্থ্রাইটিসের মতো প্রদাহজনিত রোগ নিরাময় করে। এতে অ্যান্টিআরথ্রিটিক বৈশিষ্ট্যও রয়েছে বলে মনে করা হয়। যা জয়েন্টের ব্যথা সারাতেও সহায়তা করে।

৮) গিলয়ের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য অকাল বয়স্কতা রোধে সহায়তা করে। ব্রণ, ডার্ক স্পট, রিঙ্কেলস এগুলি কমাতে সহায়তা করে এবং আপনার ত্বককে উজ্জ্বল রাখে। বয়স বৃদ্ধির প্রকোপ চেহারায় প্রকাশ পেতে দেয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে আমাদের দেহে যে ক্ষয় হয়, তা কিছুটা রোধ করে গিলয়।

৯) দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে।

পানের আশ্চর্য গুণ

পানের আশ্চর্য গুণ

রসিয়ে রসিয়ে মনের আনন্দে পান খান অনেকেই। কেউ কেউ নিয়মিত খেয়ে থাকেন আবার কেউ মাঝে মধ্যে খান। অনেকে আবার মুখ দুর্গন্ধমুক্ত রাখার জন্য পান চিবিয়ে থাকেন। এই পানের সঙ্গে সুপারি যেমন থাকে তেমনি থাকে অন্যান্য উপাদেয় সামগ্রী। পান তো স্বাদ বা মজার জন্য খেলেন, জানেন কি এর কত উপকার?

দেহের ক্লান্তি ও স্নায়ুবিক দুর্বলতা কাটানোর জন্য কয়েকটা পান পাতার রস এক চামচ মধু দিয়ে খেলে নাকি তা টনিকের মতো কাজ করে। খাবার হজম হতে সাহায্য করে। পান পাতা সেবনে দেহের চর্বি বা মেদ এবং ওজনও কমে বলে জানা গেছে।

এবার জেনে নিন পান খাওয়ার উল্লেখযোগ্য কিছু উপকারিতা-

হজমে সাহায্য করে
পান খেলে লালাগ্রন্থির নিঃসরণ বেড়ে যায়। এ লালার কারণেই হজমের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হয়। লালার মধ্যে থাকা বিভিন্ন এনজাইম বা উৎসেচক খাদ্যকে কণায় ভাঙতে সাহায্য করে যার ফলে হজম ভালো হয়। শুধু পান পাতা চিবিয়ে খেলেও এ উপকার পাওয়া যায়।

মুখের দুর্গন্ধ দূর করে
খাবার গ্রহণের পর তার কণা মুখের ভেতরে, দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকে। এগুলো ব্যাকটেরিয়া পচিয়ে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। পান খেলে তার রস জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে এসব ব্যাকটেরিয়াকে জন্মাতে দেয় না। যার ফলে মুখের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং দুর্গন্ধমুক্ত হয়।

যৌন শক্তি বাড়ায়
এটি একটি পুরনো প্রথা তবে কার্যকর। পানের রস যৌন শক্তি বৃদ্ধি করে। আগেকার দিনে নববিবাহিতরা বেশি বেশি পান খেতেন।

গ্যাস্ট্রিক আলসার দূর করে
পান খেলে পেটে বায়ু জমে কম। যার ফলে গ্যাস্ট্রিক ও আলসার সৃষ্টির সুযোগ পায় না। পানের রস হজমে সাহায্য করায় তা পেটে বদ গ্যাস তৈরিও রোধ করে। যার ফলে পেট ফাঁপে না।

জন্মরোধ করে
পান গাছের শিকড় বেটে রস করে খেলে ছেলেপুলে হয় না। জন্ম নিরোধক বড়ি না খেয়েও এটা জন্মনিয়ন্ত্রণে সেবন করা যায়। বিভিন্ন দেশের গবেষণায় এর প্রমাণও মিলেছে।

উঁকুন মারে
মাথায় উঁকুন হলে গোসলের কিছুক্ষণ আগে পান পাতার রস মাথায় লাগিয়ে বসে থাকলে উঁকুন মারা যায়। এ কাজে ঝাল জাতীয় পান হলে ভালো হয়।

ফোঁড়া ফাটায়
পান পাতার চকচকে সবুজ পিঠে ঘি মাখিয়ে একটু সেঁক দিয়ে গরম করে ফোঁড়ার ওপর লাগিয়ে দিলে দ্রুত ফোঁড়া পেকে ফেটে যায়। আবার পাতার উল্টো পিঠে ঘি মাখিয়ে একইভাবে বসিয়ে রাখলে তা পুঁজ টেনে বের করে আনে। ঘিয়ের বদলে ক্যাস্টর অয়েল ব্যবহার করেও একই ফল পাওয়া যায়।

চর্মরোগ সারায়
দেহের কোথাও চুলকানি বা পাঁচড়া হলে সেখানে পান পাতার রস লাগিয়ে দিলে কয়েক দিনের মধ্যে তা ভাল হয়ে যায়।

মুখ ও দাঁতের উপকার করে
দাঁতের মাঢ়ি দূষিত হলে ফুলে যায় এবং ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে পানের রসের সঙ্গে অল্প পানি মিশিয়ে কুলকুলি করলে ধীরে ধীরে ক্ষত শুকিয়ে যায়। মুখগহ্বরে কোনো ক্ষত হলে পানের রসে তার উপশম হয়। পানের রসে এসকরবিক এসিড আছে যা একটি চমৎকার এন্টিঅক্সিডেন্ট। এটা মুখের ক্যান্সারও প্রতিরোধ করে।

নখের ব্যথা সারায়
অনেক সময় নখের কোণায় ব্যথা হয়। এ অবস্থায় সেখানে কয়েক ফোঁটা পানের রস দিলে ব্যথা চলে যায়।

আঁচিল দূর করে
শরীরে আঁচিল হলে তার উপর কয়েক দিন পানের রস লাগান। এতে তা ধীরে ধীরে খসে পড়বে আঁচিল এবং ওই জায়গায় আর তৈরিও হবে না।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে
পান রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে গবেষণায় জানা গেছে। ফলে পানে রয়েছে ডায়াবেটিস প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য।

সর্দি বের করে
বুকের ভেতর কফ/সর্দি বা শ্লেষ্মা জমা হলে তা বের করতে পানের রস কার্যকর। এ ক্ষেত্রে পানের রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে কয়েক দিন খেতে হবে। এতে বুকে জমা কফ বেরিয়ে যাবে।

মাথা ব্যথা দূর করে
মাথা ব্যথা হলে কপালে পানের রস লেপে দিলে দ্রুত মাথা ব্যথা কমে যায়।

ক্ষত ও ব্যথা সারায়
পানের বেদনানাশক ও ক্ষত সারানোর ক্ষমতা আছে। কোথাও ব্যথা হলে পান পাতা বেটে মলমের মতো সেখানে লেপে দিলে দ্রুত ব্যথা কমে। দেহের ভেতরে কোথাও ব্যথা হলে পানের রস করে পানিতে মিশিয়ে তা শরবতের মতো খেতে হবে। শুধু পান পাতা চিবিয়ে এর রস খেলেও এ উপকার মিলবে।

ঠাণ্ডা লাগা দূর করে
ঠাণ্ডা লাগা সারাতে পান চমৎকার কাজ করে। ঠাণ্ডা লাগলে সর্দি কাশিও হয়। এক্ষেত্রে পানপাতা গরম পানি দিয়ে ছেঁচে রস বের করতে হবে। এ রসের সঙ্গে এক চিমটি গোলমরিচের গুঁড়া ও আদার রস মিশিয়ে খেতে হবে।

ক্ষুধা বৃদ্ধি করে
পাকস্থলী গড়বড় হলে সবই উল্টে যায়। খিদেও লাগে না। পাকস্থলীতে অম্লমান বা পিএইচের মাত্রা স্বাভাবিক না থাকলেই এরূপ হয়। পান তা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। শুধু পান পাতা চিবিয়ে খেলেও ক্ষুধা বাড়বে।

এন্টিসেপটিকের কাজ করে
কোথাও কেটে গেলে দ্রুত সেখানে পানের রস লাগিয়ে দিলে জীবাণু সংক্রমণের ভয় থাকে না। পান পাতা পলিফেনল বিশেষত চাভিকল নামক রাসায়নিক উপাদানে পূর্ণ। এটা জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে। এ ছাড়া সেখানে ফোলাও বন্ধ করে, ব্যথার উপশম করে।

পিঠে ব্যথার উপশম করে
নানা কারণে পিঠে ব্যথা হতে পারে। শোয়া থেকেও হয়। বয়স্কদের এ সমস্যা প্রায়ই দেখা দেয়। মাংসপেশির টান থেকেও এরূপ ব্যথা হতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যথা জায়গায় পান পাতা দিয়ে সেঁক দিলে উপকার মেলে। এ ছাড়া পান পাতার রসের সঙ্গে নারিকেল তেল মিশিয়ে ব্যথা জায়গায় মালিশ করলে ব্যথা কমে।

মূত্র স্বল্পতা ও মূত্রকৃচ্ছতার উপশম করে
যাদের কম প্রস্রাব হয় বা প্রস্রাব করতে গেলে কষ্ট হয় তারা পান পাতার রস সেবন করে উপকার পেতে পারেন। এক্ষেত্রে ১টি পান পাতা ছেঁচে রস করে নিতে হবে। সেই রস একটু দুধের সঙ্গে মিশিয়ে পান করলে উপকার হবে। এতে দেহে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়বে ও মূত্রকৃচ্ছতা চলে যাবে।

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়
পান পাতায় আছে চমৎকার এন্টিঅক্সিডেন্ট যা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় ও দেহে ক্যান্সার সৃষ্টি প্রতিরোধ করে। এজন্য রোজ ১০-১২টি পান পাতা পানিতে ৫ মিনিট জ্বাল দিতে হবে। এরপর তা নামিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। একটু ঠাণ্ডা হলে তাতে কয়েক ফোটা মধু মিশিয়ে কুসুম গরম থাকতেই পান করুন। রোজ এটি খেতে পারলে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।

শিশুদের পেট ব্যথা কমায়
পেটে ব্যথা হলে ছোট্ট শিশুরা কাঁদতে থাকে। বড় শিশুরা পেট চেপে ধরে কাতরাতে থাকে। এ অবস্থায় পান পাতার চকচকে পিঠে নারিকেল তেল মাখিয়ে তা গরম করে সেই পাতা পেটের ওপর চেপে ধরে সেঁক দিতে হবে। ৩-৪ মিনিট পর পর এভাবে কয়েকবার সেঁক দিলে পেটে ব্যথা কমে যাবে। খেয়াল রাখতে হবে সেঁকের সময় তাপটা যেন বেশি না হয়।

পোড়া সারায়
পুড়ে গেলে সেখানে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া হয়। পোড়া জায়গায় পান পাতা বেটে তার সঙ্গে ১ টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে প্রলেপ দিলে যন্ত্রণার উপশম হবে ও পোড়া জায়গা শুকিয়ে যাবে।

তবে পানের কিছু দোষও রয়েছে। পানের নতুন পাতা শ্লেষ্মা বাড়ায়। পান হজম করে বটে তবে বেশি খেলে অজীর্ণ হয়। পানের বোঁটা ও শিরার রস ইন্দ্রিয়ের শক্তি কমিয়ে দেয়। তাই পানের বোঁটা খাওয়া উচিত নয়। যারা রুগ্ন, দুর্বল, ক্ষীণ স্বাস্থ্যের তারা পান খাবেন না। মূর্চ্ছা রোগী, যক্ষ্মা রোগী ও যাদের চোখ উঠেছে তারও পান খাবেন না।

আলমগীর আলম
ন্যাচারোপ্যাথি ও আকুপ্রেসার বিষেশজ্ঞ
২৯ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, তৃতীয় তলা, ঢাকা
01611010011

পেয়ারার পাতার অসাধারণ গুণ

পেয়ারার পাতার অসাধারণ গুণ

পেয়ারার পাতা ডায়াবেটিস কমাতে কাজ করে।

পেয়ারার মধ্যে রয়েছে ভিটামিন এ, সি, পটাশিয়াম, লাইকোপেন। তবে আপনি কি জানেন পেয়ারার পাতায়ও রয়েছে অনেক গুণ? স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথ ডাইজেস্ট জানিয়েছে পেয়ারার পাতার কিছু অসাধারণ স্বাস্থ্যকর গুণের কথা।

১. পেয়ারা পাতার চা নিয়মিত খেলে রক্তের বাজে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে। এটি ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়াতে কাজ করে।

২. পেয়ারা পাতার চায়ের মধ্যে থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদানের জন্য এটি ডায়রিয়া ও ডিসেনট্রি কমাতে কাজ করে।

৩. কফ ও ব্রঙ্কাইটিস কমাতেও পেয়ার পাতার চা বেশ কার্যকর।

৪. পেয়ারা পাতার চা ওজন কমাতে সাহায্য করে। এটি চর্বি কমাতে কাজ করে এবং  পেট ভরা ভরা ভাব রাখে। এতে ওজন কমে।

৫. ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিয়মিত পেয়ারার পাতার চা পান করা ভালো। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে কাজ করে।

৬. পেয়ারা পাতার অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদানের জন্য এটি পাকস্থলীর সমস্যারোধে ভালো কাজ করে। এটি ফুড পয়জনিং রোধেও উপকারী।

৭. পেয়ারার পাতা পানিতে ফুটান। একে ঠান্ডা হতে দিন। এরপর পানিটি মাথায় ম্যাসাজ করুন। চুল পড়া প্রতিরোধ হবে। 

কলমি শাকের ঔষধি গুণ

কলমি শাকের ঔষধি গুণ

কলমি শাক অতি পরিচিত একটি শাক। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ও বাংলায় অনেকের প্রিয় ও পরিচিত শাক। এর ব্যাটানিক্যাল নাম Ipomoea reptans (Linn.). পরিবার Convolvulaceae.

উপকারিতা:

১. বিষক্রিয়ায়: ঢলে পড়েছে, হাতের কাছে কিছু নেই, কলমী শাকের রস করে অন্ততঃ এক ছটাক খেলে; শরীর স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

২. প্রথম বয়সের যৌবনের চাঞ্চল্যের কু-অভ্যাসে শরীর হাড়-সার, ঘুমলেই ক্ষরণ, এর সঙ্গে মাথা ধরা, হাত-পা জ্বালা, অগ্নিমান্দ্য, মুখে জল আসা, পড়াশুনা মনে না থাকা ইত্যাদি এ ক্ষেত্রে কলমী শাকের রস ২ চা-চামচ, তার সঙ্গে অশ্বগন্ধা (Withania somnifera Dunal.) মূল চূণ ১ গ্রাম আন্দাজ মিশিয়ে খেতে হয়; অল্প দুধ মিশিয়ে খেলে আরও ভালো। এর দ্বারা তার যেসব উপসর্গ উপস্থিত হয়েছিল সেগুলি তো যাবেই, অধিকন্তু তার ধারণ ক্ষমতাও বেড়ে যাবে।

৩. কোলের শিশু রাত জাগে আর দিনে ঘুমোয়: অনেকের বিশ্বাস রাত্রিবেলায় জন্মালেই বুঝি এই হয়, তা ঠিক নয়; এর জন্য অনেক সময় দেখা যায় তার মল কঠিন হয়েছে এবং দুধে তোলে সে। এ ক্ষেত্রে অল্প গরম দুধের সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ ফোঁটা কলমী শাকের রস খাওয়ালে এই উপদ্রব চলে যাবে।

৪. বসন্তের প্রতিষেধক: বাড়িতে জল-বসন্ত কলে যেতে চায় না, এ ক্ষেত্রে কলমী শাকের রস ২ চা-চামচ একটু, গরম দুধের সঙ্গে মিশিয়ে প্রত্যহ সকলের খেলে ভালো হয়; এর দ্বারা অন্যান্যরা রক্ষা পেতে পারেন। এ ভিন্ন আশপাশের বাড়িতেও এটা খাওয়া উচিত।

৫. স্তন্যে দুধ বাড়তে: শিশু-পোষণের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুও দুধ নেই, এ ক্ষেত্রে কলমী শাকের রস ৩ থেকে ৪ চা চামচ মাত্রায় একটু ঘিয়ে সাঁতলে খেতে হয়। সকালে ও বিকালে দু’বার খেলেই ভাল হয়। এটাতে দুধ বাড়বেই।

৬. গলারিয়ায়: জ্বালা-যন্ত্রণা, তার সঙ্গে পুজ পড়া, এ ক্ষেত্রে কলমী শাকের রস ৪ থেকে ৫ চা-চামচ অল্প ঘিয়ে সাঁতলে দুইবেলা খেতে হয়। এর দ্বারা কয়েকদিনের মধ্যেই এ জ্বালা-যন্ত্রণা ও পুঁজ পড়া বন্ধ হয়।

৭. ঠুনকো হলে: কলমী বেটে অল্প গরম করে স্তনে লাগাতে হয় এবং ঐ শাকের রস দিয়ে ধুতে হয়; এর দ্বারা বসা দুধ পাতলা হয়ে নিঃসরণের সুবিধা হয় এবং যন্ত্রণাও কমে যায়।

৮. হুলের জ্বালা: বোলতা, ভীমরুল, মৌমাছি প্রভৃতির হুল ফুটানোর জ্বালায় এই কলমী শাক বেটে লাগালে জালা কমে যায়। অগত্যা পক্ষে কলমীর ডগা ঘষে দিলেও উপকার হয়।

৯. নিমুখো ফোঁড়ায়: ভেতরে পুজ হয়েছে, বেরুতে পারছে না, বসে যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে ঐ কলমীর শিকড় ও ডগা একসঙ্গে বেটে ফোঁড়ার উপর প্রলেপ দিতে হয়; এর দ্বারা ফোঁড়ার মতো হয়ে যায়।

রাসায়নিক গঠন:

(a) Hydrocarbons viz, pentairiacotane tiacontance.
(b) Sterol,
(c) Acids viz, melissic acid, behenie acid, butyric acid and myristic acid.
(d) Essential oil=0.08%.
(e) Diferent type of resin-7.27%,

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা,৯।

গুলঞ্চ লতার ঔষধি গুণাগুণ

গুলঞ্চ লতার ঔষধি গুণাগুণ

ঘোড়া গুলঞ্চ ও পদ্ম গুলঞ্চ নামে দুটি লতা ভারতীয় উপমহাদেশে পাওয়া যায়। গুলঞ্চ লতা বা গুড়ুচ হচ্ছে মেনিস্পারমাসি পরিবারের টিনোস্পোরা গণের একটি লতানো উদ্ভিদ। এই গাছের রয়েছে অনেক রকমের ভেষজ গুণ। এদের ভেতরে পদ্ম গুলঞ্চের গুণাগুণ বেশি। নিচে এই লতার গুণাগুণসমূহ বিস্তারিত উল্লেখ করা হলও।

ব্যবহার

১. পুরাতন বা জীর্ণ জ্বরে: গুলঞ্চের পাতা শাকের মতো কুচিয়ে ভেঙ্গে খেলে জ্বর ছেড়ে যায়। পাতা সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে ৮ থেকে ১০ গ্রামের মতো গুলঞ্চের ডাঁটা অল্প জল দিয়ে থেতো করে নিংড়ে ঐ রসকে ছেঁকে, অল্প গরম করে খেতে হবে, এটাতেও কাজ হবে অথবা থেতো করা ঐ গুলঞ্চ এক কাপ জলে সিদ্ধ করে আধা কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে অল্প চিনি মিশিয়ে খেতে হবে অথবা গুলঞ্চের রস বা ক্বাথ দিয়ে ঘি তৈরী করে খেতে হবে। এতে জ্বর ছেড়ে যায়।

২. অরুচিতে: যাঁদের মুখে কিছু ভাল লাগে না, খেতে ইচ্ছে হয় না, তাঁরাও এই পাতা ভেজে খেয়ে দেখুন, তাহলে অরুচি চলে যাবে।

৩. বাতের যন্ত্রণায়: প্রায়ই হাত পা কনকন করে, এই ক্ষেত্রে ১০ গ্রাম অন্দাজ গুলঞ্চ ছেঁচে উপরিউক্ত নিয়মে ক্বাথ করে অল্প একটু দুধ মিশিয়ে কয়েকদিন খেলে ওটা উপশম হবে। তবে যে সব কারণে যেমন আহার, বিহারের জন্য বাত বাড়ে সেগুলিকে বর্জন তো করতেই হবে।

৪. পচা ঘায়ে: ১০ থেকে ১৫ গ্রাম থেঁতো গুলঞ্চের ক্বাথ করে সেটা দিয়ে ক্ষত ধুলে পচা ঘায়ের ব্যথা কমে যাবে।

৫. হৃৎ কম্পনে: ৫ থেকে ৭ গ্রাম গুলঞ্চকে ক্বাথ করে খেলে ওটা কমে যাবে, তবে ২ গ্রেণ বা একরতি গোল মরিচের গুড়া মিশিয়ে খেতে হবে।

৬. রক্তার্শে: যাঁরা এ রোগে ভুগছেন, তাঁরা ৫ থেকে ৭ গ্রাম গুলঞ্চকে ক্বাথ করে খেতে হবে তাহলে প্রশমিত হবে। তবে এই ক্বাথকে ভাগ করে দুই বেলায় খেতে হবে।

৭. দ্বিতীয় যোগ (অর্শের): একটা মাটির বাটি বা খুরিতে গুলঞ্চের রস মাখিয়ে, সেই পাত্রে দই পেতে সেই দই খেলে অর্শের উপকার হয়।

৮. আগ্নিমান্দ্যে: খাওয়ার ইচ্ছে যেমন কম, আবার খেলেও হজম হতে চায় না, যাকে বলা হয় অগ্মিমান্দা রোগ বা শ্লেষ্মাপ্রধান অগ্নিমান্দা, এ ক্ষেত্রে গুলঞ্চ শুকিয়ে গুড়া করে প্রত্যহ ১ গ্রাম করে জলসহ খেতে হবে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ক্ষিধে বেড়ে যাবে।

৯. স্বরভঙ্গে: স্থুলকায়, তার সঙ্গে আবার কফের যোগ হলে অনেকের স্বরভঙ্গ হয়, সেখানে গুলঞ্চের ক্বাথে কাজ হয়।

১০. কাসিতে: অনেক সময় কাসি হেকে ডেকে আসে না, খসখসে, সেখানে একটু গুলঞ্চের ক্বাথে মধু মিশিয়ে খেলে অসুবিধাটা কমে যাবে।

১১.বাতরক্তে: অনেক সময় গায়ে চাকা চাকা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে শক্ত হয়, আবার ব্যথাও থাকে; এ ক্ষেত্রে গুলঞ্চের রস বা ক্বাথ দিয়ে তৈরী তেল মাখা, অভাবে গুলঞ্চের রস গায়ে মাখা ও গুলঞ্চের ক্বাথ খাওয়া, এর দ্বারা ঐ বাতরক্তজনিত অসুবিধা যেটা আসছে সেটা দূর হবে। তবে এটি যদি পদ্মগুলঞ্চ হওয়া দরকার, তা না হলে আশানুরূপ উপকার হয় না।

১২. কমলা বা ন্যাবা রোগ: ২ ইঞ্চি পরিমাণ গুলঞ্চ চাকা চাকা করে কেটে ১ কাপ জলে রাত্রে ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই জলটায় একটু চিনি মিশিয়ে খেতে হবে।

১৩. বাতজ্বরে: সর্দি কাসি কিছুই নেই, হঠাৎ হাই উঠে কেঁপে জ্বর আসে, আবার খানিকক্ষণ বাদে কমে যায়, একে বলে বাতিকের জ্বর, এ ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ গ্রাম গুলঞ্চকে থেঁতো করে তার ক্বাথ ছেঁকে ঠাণ্ডা হয়ে গেলে খেতে হবে।

১৪. শুল ব্যথা: গুলঞ্চ চূর্ণ ১ গ্রাম, গোল মরিচের গুঁড় সিকি গ্রাম একসঙ্গে গরম পানি দিয়ে খেতে হবে।

১৫.বসন্ত রোগে: হাত পা অসম্ভব ব্যাথা করে এক্ষেত্রে গুলঞ্চ রস করে অল্প জল দিয়ে থেঁতো করলেই এর রস সহজে বেরোয়; সেই রস হাত পায়ে লাগালেই ঐ জ্বালা কমে যাবে।

১৬. পেটের দোষে: প্রায়ই ভুগে থাকেন, পেট জ্বালাও করে, সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাকাসে ভাব আসছে, এ ক্ষেত্রে গুলঞ্চের ক্বাথ কাজে আসে।

১৭. সোরিয়াসিসে (Psoriasis): গায়ে চাকা চাকা হয়ে ওঠে, মুমড়ি পড়তে থাকে, আবার কোনো কোনো জায়গা থেকে রস গড়তে থাকে, এ ক্ষেত্রে গুলঞ্চের ক্বাথ খাওয়া, গুলঞ্চের রস দিয়ে তৈরী তেল মাখা, আর গুলঞ্চ রস করে গায়ে মাখা। অদ্ভুত ফল পাবেন।

১৮. পিত্ত বমিতে: পেটে কিছু থাকছে না, সে ক্ষেত্রে আধ কাপ জলে দেড় বা দুই ইঞ্চির মতো গুলঞ্চ পাতলা চাকা চাকা করে কেটে জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে, তারপর তা থেকে ছেঁকে ২ থেকে ১ চামচ করে জল নিয়ে তার সঙ্গে ২ থেকে ১ চামচ দুধ মিশিয়ে খেতে হয়। অবশ্য এটা পিত্তশ্লেষ্মা জন্য বমনেই ভাল।

১৯. পিপাসায়: ঐভাবে কাটা গুলঞ্চ ও মৌরী একসঙ্গে ভিজিয়ে ঐ জল একটু একটু করে খেতে হবে তাহলে পিপাসা চলে যায়।

২০. মেদবৃদ্ধিতে: যারা না খেয়েই মোটা আর খেলে তো কথায় নেই, তাঁরা ৮ থেকে ১০ গ্রাম গুলঞ্চের ক্বাথ করে বা ১ কাপ আন্দাজ; তাতে ১ চামচ মধু মিশিয়ে খেয়ে হবে, তবে ২ থেকে ৪ দিন খেয়েই হতাশ হলে চলবে না।

২১. ক্রিমিতে: গুলঞ্চের ক্বাথ একটু একটু খেতে হবে, বা খেলে ক্রিমি সমস্যার সমাধান হবে।

গুলঞ্চের চিনি বা শ্বেতসার প্রস্তুত

পরিণত বয়সের মোটা মোটা গুলঞ্চকে টুকরো টুকরো করে কেটে থেঁতো করে ৮ গুণ জল দিয়ে ভাল করে মসটে, যাকে বলা হয় চটকে নিয়ে, একটু চুবড়িতে ঢেলে দিলে সিটেগুলি মোটামুটি ভাবে বেরিয়ে যাবে, তারপর ঐ জল থিতিয়ে গেলে উপরের ঐ জল আস্তে আস্তে ঢেলে ফেলতে হবে। নিচে যেটা থিতিয়ে বসে আছে সেইটাই রোদে শুকিয়ে ছেকে নিলেই গুলঞ্চের শ্বেতসার পাওয়া যায়; একেই গুলঞ্চের চিনি বলে। বহু রোগের ক্ষেত্রে এই চিনি ব্যবহার করা হয়।

২২. মস্তিকের দূর্বলতা: গুলঞ্চের চিনি ৩ রতি থেকে এক আনা মাত্রায় একটু দুধের সঙ্গে খেলে ঐ দূর্বলতাটা কেটে যায়।

২২. দূর্বলতা: দীর্ঘদিন থেকে চলছে, অস্থির কোনো পোষণ নেই; সেক্ষেত্রে অল্প ঘিয়ের সঙ্গে গুলঞ্চর চিনি ১ গ্রাম আন্দাজ মিশিয়ে চেটে খেলে আস্তে আস্তে সমস্যার ঠিক হয়ে যাবে।

২৩. প্রমেহ রোগে: প্রমেহ কথাটার দ্বারা প্রস্রাব ঘটিত বহু, রোগের ইঙ্গিত বহন করে, তার মধ্যে যে মেহে প্রস্রাবের পূর্বে বা পরে লালার মত নির্গত হয় তাকে বলা হয় লালা মেহ । এই ক্ষেত্রে গুলণ্ডের চিনি হাফ গ্রাম এবং তার সঙ্গে কাবাবচিনি হাফ গ্রাম মাত্রায় একত্রে দুধসহ খেলে কয়েক দিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যায়। আমাদের দেশে একটা প্রবাদ প্রচলিত যে, নিম গাছের গুলঞ্চই বেশী তিক্ত হয়, এবং সেই গাছের গুণ গ্রহণ করে। এরা অপরাশ্রীতা লতা হলেও অপরের রস গ্রহণ করার উপযোগী পরিবেশই বা কোথায় ? তারা তো মাটি থেকে রস গ্রহণ করে। তবে প্রজাতি ভেদে সে যে গাছই আশ্রয় করে থাকুক না কেন, স্বল্প বা তিক্ত হবেই। সাধারণ গুলঞ্চ যাকে আমরা চলতি কথায় বলি ‘ঘোড়া গুলঞ্চ’ (Tinospora cordifolia). সে গুলঞ্চ নিমগাছের হলে সে তিক্ত হবে। আবার পদ্মগুলঞ্চ যদি আমড়া গাছেও হয়, তার তিক্ততা যে কেমন তা যে পান করে সেই বুঝবেন।

২৪.মাথায় ছোট ছোট ফুসকুড়ি ও ব্যথাও আছে, আবার মুখে মামড়িও পড়ে; এটি পিত্তশ্লেষ্মাজ ব্যাধি। এ ক্ষেত্রে গুলঞ্চের রস দিয়ে তৈরী তেল মাথায় লাগালে ভাল কাজ হয়, তা না হলে ১ চামচ রস ৩ থেকে ৪ চামচ জল মিশিয়ে একটু গরম করে সেইটা প্রত্যহ একবার করে কয়েকদিন লাগানো আর গুলঞ্চের রস খেতে হবে।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ গুলঞ্চ লতা থেকে অ্যালিলো রসায়ন পাওয়া যায়। এই ধরণের আলিলো রসায়ন ইউক্যালিপ্টাস গাছের শেকড় এবং পাতা থেকেও নিঃসৃত হয় যা অন্য গাছের অঙ্কুরোদ্গম বা বৃদ্ধির অন্তরায় ঘটিয়ে থাকে। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা এখন ভেবে দেখছেন এই প্রাকৃতিক রসায়ন ইনসেক্‌টিসাইড হিশেবে ব্যবহার করা যায় কি না।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি‘ খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ১৬৭-১৭১।

পান পাতার উপকারিতা

পান পাতার উপকারিতা


পান হচ্ছে পিপারাসি পরিবারের পিপার গণের একটি লতানো উদ্ভিদ। এরা গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের একপ্রকার লতাজাতীয় গাছের পাতা। এদের বৈজ্ঞানিক নাম Piper betle. পানের নানান জাত আছে। সাধারণত দু ধরনের পান বাজারে পাওয়া যায় কপুরি ও মলবারি। কপুরি পান আকারে ছোট আর স্বাদে মৃদু। বাংলা পানের আকার বড় হয় ও স্বাদে তীক্ষ্ণ। বাংলা পানের রস তীক্ষ্ণ, মলনিঃসারক, পিত্ত উৎপাদন করে, গরম এবং কফ হরণ করে। পাকা সাদা পাতলা ও ছোট আকারের পানই সবচেয়ে ভাল গুণের দিক থেকেও শ্রেষ্ঠ। কাঁচা সবুজ পানের চেয়ে পাকা সাদা পানেরই স্বাদ ও গুণ বেশি।[২]

পান স্বচ্ছ, রুচি উৎপাদক, তীক্ষ্ণ, উষ্ণ, কায়, মল পরিষ্কার করে, কটু, ক্ষারযুক্ত, রক্ত এবং পিত্তকারক, হালকা, বলপ্রদ, কফ, মুখের দুর্গন্ধ, বায়ু নাশক এবং শ্রম দূর করে। পান কামোদ্দীপক, রুচি বৃদ্ধি করে এবং বস্তিকর অর্থাৎ চেহারা সুন্দর করে।

বলা হয় পানের সরু ডগায় আয়ুষ্য, মধ্যে লক্ষ্মী আর মূলে যশের আবাস। সেইজন্যে পান সাজবার সময় এই সব অংশ বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। নিম্নে রোগ প্রতিকারে পানের ভেষজ গুনাগুণ উল্লেখ করা হলো। পান পাতা সম্পর্কে জানতে বিস্তারিত পড়ুন

পান পিপার গণের ঔষধি অর্থকরী লতা
১. শ্লেমাপ্রধান রোগ: পানের রোগ-নাশিনী শক্তি সম্পর্কে সর্বাগ্রে মনে রাখতে হবে যেখানে শ্লেমাপ্রধান রোগ, সেখানেই তার প্রভাব বেশি; তাই রসতাত্ত্বিক আয়ুর্বেদগণ ঔষধের সহপানে পানের রস বেশি ব্যবহার করেন।[১]

২. মাড়ির ক্ষতে: দাঁতের মাড়ির দুষিত ক্ষতে পুঁজ জমতে থাকলে পানের রসের সঙ্গে অল্প জল মিশিয়ে কুলকুচি করলে ওখানে আর পুজ জমে না; মুখের ক্ষত শুকিয়ে যায়। আবার, পানের রসে তীক্ষ্ণতায় আছে জীবাণুনাশক গুণ। সেইজন্যে পরিমিতভাবে পান খাওয়া দাঁত ও মুখের পক্ষে ভাল। পানে একটি বিশেষ ধরনের তৈল পদার্থ আছে- সেইজন্যে পান মুখশুদ্ধি করায়, দাঁতের পচে যাওয়া রোধ করে। পানের স্বাদ তীক্ষ্ণ, কিছু সুগন্ধযুক্ত, পান খেলে মুখের বিস্বাদ দূর হয়ে যায়, অরুচি ও মুখের দুর্গন্ধও দূর হয়।

খাওয়া-দাওয়ার পরে একটা করে পান খাওয়া ভাল। ভোজনের পরে যদি মুখের ভেতরে তেলতেলে ভাব উৎপন্ন হয়, যদি দাঁতের মধ্যে খাবারের ফলা আটকে গিয়ে থাকে আর যদি দাঁতের গোড়ায় পোকা ধরে গিয়ে থাকে তাহলে পান খেলে সে সব দোষ নষ্ট হয় এবং মুখ সুগন্ধি হয়।

৩. চুলকানি: পুরাতন দাদ বা চাপড়া-চুলকানিতে পানের রস ঘষে দিলে কয়েক দিনেই ও অবস্থাটার অবসান হয়।

৪. কানের পুঁজে: এর রস গরম করে ২ থেকে ১ ফোঁটা কানে দেওয়ার বিধি গ্রামাঞ্চলে তো আছেই। পানের গরম রস কানে দিলে কানের ব্যথাও সারে।

৫. হাতে-পায়ে হাজায়: পানের রস অল্প গরম করে রাত্রে লাগিয়ে রাখুন; উপশম হবে তবে এটাও ঠিক যে, হেতুটা বর্জন না করলে সেটা আবার হবেই।

৬. নখকুনির কষ্ট: পানের রস গরম করে দিনে ৩ থেকে ৪ বার নখের কোণে দিলে ব্যথা থেকে রেহাই হয়, তবে নখের ঐ বৃদ্ধিটুকু কাটতেই হয়।

৭. ফোড়ায়: পানের পাতার সোজা পিঠে ঘি (পুরাতন হলে ভাল হয়) মাখিয়ে ফোড়ার উপর বসিয়ে দিলে ফোড় পাকে ও ফাটে; আবার এইভাবে পানের উল্টোপিঠ ফোড়ায় বসালে ওটা পুজ টেনে বার করে শুকিয়ে দেয়; (অবশ্য একটু গরম করে নিতে হয়)। এখানে আর একটা কথা বলে রাখি পানের পাতায় পচন-নিবারক উদবায়ী তৈল আছে, যার জন্য ঐ ফোড়া বিসর্পিত হতে পারে না।

৮. মাথায় উকুন হলে: পানের পাতার রস মাথায় লাগিয়ে দেখুন ওরা সবংশে চলে যাবে। (তবে ঝাল পান হলে ভাল হয়। এ পানের গঠন একটু, মোটা হয়।)

৯ গর্ভনিরোধ: পানের শিকড় বেটে খাওয়ালে ছেলেপুলে হয় না একথা গ্রামাঞ্চলের মধ্যে কানাঘুষা শুনতাম, এখন দেখি বর্তমানের প্রামাণ্য গ্রন্থ Glossary of Indian Medicinal Plants- এ এ-কথা লেখা আছে।

১০. হজমে: পানে একটি বিশেষ ধরনের তৈল পদার্থ আছে। সেইজন্যে পান পেটে পাচক রসকে উত্তেজিত করে খাবার তাড়াতাড়ি হজম করিয়ে দেয়। পান খেলে শরীরের অন্নাশয়িক নালীর (গাস্ট্রিকের) এবং পাচক রসের স্রাব বাড়ে- এইভাবে খাবার হজম হয় তাড়াতাড়ি। যদি গুরুভোজন বা অতিভোজন হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে পান খেলে পেট হাঁসফাস করা থেকে একটু নিস্তার পাওয়া যায় এবং একটু যেন শরীরটা হালকা মনে হয়। পানের রস পাচক, অগ্নিদীপক অর্থাৎ খিদে বাড়ায় এবং বায়ু হরণ করে। সেইজন্যে পানের রস পেট গেলে বায়ু নীচে বসে যায়, তৃপ্তির ঢেকুর ওঠে এবং পেটে একটা শান্তির ভাব অনুভব করা যায়।

১১. কফ, বাত ও পিত্তের প্রকোপে: পানে চুন ও খয়ের থাকে। তার ওপরও এলাচ, ধনের চাল, মৌরি, সুপারি লবঙ্গ প্রতি মশলা দিয়ে পান সাজা হয়। এগুলির আছে নানা গুণ। চুন বাত ও কফ হরণ করে, খয়ের পিত্তের প্রকোপ দূর করে।

পান রসে তীক্ষ্ণ, কটু, কষায়, উষ্ণবীর্য (কড়া-শরীর গরম করে), পিত্ত-প্রকোপ বাড়িয়ে দেয় এবং বায়ু প্রকোপ কম করে। কিন্তু চুন ও খয়ের সহযোগে খেলে পান ত্রিদোষ (কফ, বাত ও পিত্ত) নাশক হয়ে যায়। ভাতের পরে একটা পান চিবিয়ে খেলে মন তৃপ্ত ও প্রফুল্ল হয়।

পান সকালে খেলে তাতে সুপারি, দুপুরে খেলে তাতে খয়ের আর সন্ধেবেলা খেলে তাতে চুন বেশি দেওয়া উচিত (অবশ্য গাল যেন না পুড়ে যায়)। এই পদ্ধতিতে পান খেলে সকালবেলা কফ, দুপুরবেলা পিত্ত আর সন্ধেবেলা বায়ুর সমতা বজায় থাকে।

পান কফ নাশক বিধায় পানের ভেতরের বিশেষ প্রকারের সুগন্ধিযুক্ত তেল শ্বাসনালীর ভেতরটা যদি কোনো কারণে ফুলে যায় তা সারিয়ে দেয়।

১৩. খাবারের পর স্বস্তি আনতে: স্নিগ্ধ, মধুর ও গরিষ্ঠ ভোজনের পর পান খেলে স্বস্তি পাওয়া যায় বিশেষত উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ুর দেশে যাঁরা থাকেন এবং যাঁরা ভাত খান তাঁদের ভোজনের পর একটি করে পান খেলে বেশি উপকার হবে।

পানের চুন যাতে শরীরের ক্ষতি না করে সেইজন্যে পানে খয়ের মেশানো হয়। শুধু চুন রক্তে মিশে যেতে পারে না কিন্তু পানের ক্লোরোফিল বা সবুজতার সঙ্গে এক হয়ে গিয়ে সহজে হজম হয়ে যায়। এতে দাঁতের উপকার হয় এবং পেটের পাচক রসও কাজ করে তাড়াতাড়ি।

১৪. গ্যাস আর বদহজমে: পাকা পান আর সজনের ছাল একসঙ্গে নিয়ে রস বের করে তিন দিন নিয়ম করে খেলে অন্ত্রে যদি বায়ু সৃষ্টি হয় তার উপশম হবে।

পানের রসে মধু মিশিয়ে চাটলে আধোবায়ু মুক্ত হয়। ছোটদের গ্যাস আর বদহজমে খুব তাড়াতাড়ি উপশম পাওয়া যায়।

১৪. স্বর ভাঙ্গায়: পানের শিকড় তীক্ষ্ণ, স্বল্পশোধক, কফনাশ করে। যদি কোনো কারণে গলা বসে যায় তো পানের শিকড় (বাজারেও পানের দোকানে পাওয়া যায়) খেলে গলায় স্বর খুলবে।[২]

১৫. সর্দি ও কাশিতে: একটি বা দুটি পান পাতা চিবিয়ে নিলে সর্দিতে উপকার পাওয়া যায়। আবার পানের শিম্বির (পান গাছে যে সিমের মতো ফল হয়) চূর্ণ মধুতে মিশিয়ে চাটলে সর্দির জন্যে যে কাশি হয় তা সেরে যায়।

পান পাতায় রেড়ির তেল লাগিয়ে একটু গরম করে ছোট শিশু বুকের ওপর রেখে কাপড় গরম করে হালকাভাবে সেঁকে দিলে শিশুর বুক ভরা কফ দূর হয়।

১৬. চোখের ব্যথায়: পানের রস চোখে দিলে রাতকানা রোগে উপকার হয় এবং চোখে ব্যথারও উপশম হয়।

১৭. বুকের দুধ বেড়ে গেলে: প্রসূতা স্ত্রীর যদি বুকের দুধ খুব বেড়ে গিয়ে স্তন ফুলে যায় এবং ব্যথা হয় তাহলে পান পাতা গরম করে খেলে অতিরিক্ত দুধ বেরিয়ে গিয়ে ফুলো কমে যায় এবং ব্যথাও কমে যায়।

পান বেশি খেলে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি

১. পান বেশি খেলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

২. বেশি পান খান যাঁরা তাঁদের রক্তে বিশেষ ধরনের একটি বিষতত্ত্ব প্রবেশ করে। এর ফলে হজমের গোলমাল দেখা দেয়। বেশি খয়ের খেলে ফুসফুসের ক্ষতি হয় এবং অন্ত্রের বিকৃতি ঘটে।

৩. পানের সঙ্গে সুপুরি অধিকমাত্রায় খেলে চুলকুনি হয়।

৪. যিনি পান খাচ্ছেন তিনি যদি শোওয়ার আগে মুখ ভাল করে পরিষ্কার করে না নেন অর্থাৎ ধুয়ে না নেন তাহলে দাঁতের ক্ষতি হবে। মাড়ি দুর্বল হয়ে যাবে এবং দাঁত তাড়াতাড়ি পড়ে যাবে। দাঁত লাল হয়ে যায়, দাঁতের গোড়া ঢিলে হয়ে যায়, দাঁত খারাপ হতে আরম্ভ করে। এই লাল-কালো ছোপ ধরা দাঁতের জন্যে হাসির সৌন্দর্য আর থাকে না অতএব মুখশ্রী যতই সুন্দর থাকুক বেশি পান খাওয়া দাঁতের কালিমা সব কিছুকে আড়াল করে দেয়।

৫. সারা দিন ধরে পান চিবানো স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়। খাওয়ার পরে মুখশুদ্ধি হিসেবে একটি করে পান খাওয়া ভাল। বেশি পান খেলে দাঁত খারাপ হয়ে গিয়ে পাইয়োরিয়া রোগের সৃষ্টি হয়। দাঁতের অসুখ, চোখের অসুখ শক্তিক্ষয় আর মুখের রোগ হয়।

৬. পিত্তপ্রকোপ বেড়ে যায়, শরীর বেশি গরম হয়ে যায় এবং ধাতুর উষ্ণতা বেড়ে গিয়ে শরীরের ক্ষতি হয়।

৭. যেখানে সেখানে পানের পিক ফেলা অতি কু-অভ্যাস। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে বলা হয় পানের প্রথম পিক গিলে ফেললে বুদ্ধিনাশ হয়। দ্বিতীয় পিক গিলে ফেললে মলের বেগ আসে। তৃতীয় পিক এবং তার পরের সব পিকই গিলে ফেলা যেতে পারে। কারণ এই রসকে অমৃতের সমান বা অমৃততুল্য বলে মনে করা হয়।

পানের তেল: পানের আরও উপযোগিতা আছে। পান থেকে তেল নিষ্কাশন করা হয়। প্রায় ৫০ হাজার পান পাতা থেকে ১ কিলোগ্রাম তেল পাওয়া যায়। এক কিলো তেলের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা। এই তেল দিয়ে তৈরি হয় নানা রকম অ্যালোপ্যাথি ও কবিরাজি ওষুধ। পান গাছের শেকড় থেকে তৈরি হয় উকুন মারা ওষুধ ও কানের অসুখের জন্য ওষুধ বা ড্রপ। পানের তেল বিভিন্ন সুগন্ধি তৈরি করবার কাজেও ব্যবহার করা হয়।

যাদের পান খাওয়া উচিত নয়: (১) রুক্ষ ও দুর্বল ব্যক্তির, (২) মা রোগীর ও যার চোখ উঠেছে, (৩) রক্তপিত্তে, ক্ষয় ও যক্ষা রোগীর, (৪) অতিরিক্ত নেশার পর।

রাসায়নিক গঠন:

(a) Phenolic compounds viz. chavicol, hydroxychavicol.
(b) Vitamin viz. ascorbic acid.
(c) Enzymes.
(d) Essential oil.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ১৯৯-২০০।

২. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা, ৫৬-৫৯।