মুগ ডাল (mung bean) হচ্ছে (বৈজ্ঞানিক নাম: Vigna radiata) মুগের ফল যা ডাল হিসেবে খাওয়া যায়। কাঁচা মুগ কফ বাত পিত্তের রোগ সারায়, ত্রিদোষ নাশক, ভাজা মুগ মল নিঃসরণ করে— সারক, মুসুর পুষ্টিকর, ভাজা মুসুর মলরোধক, মটর রুচিকর, ছোলা বলবর্ধক, কলাই শীতল, অড়হর বর্ণ প্রসাদক অথাৎ গায়ের রং উজ্জ্বল করে। আয়ুর্বেদে লেখা না থাকলে এসব তথ্য কে আর জানতে পারত।

আমাদের প্রতিদিনের ঘরোয়া খাবার ডাল-ভাতের মধ্যে ডাল আমিষবহুল এবং ভাত শ্বেতসারবহুল। প্রতিদিন যদি ডাল-ভাত বা ডাল-রুটি খাওয়া যায় তাহলে প্রাণীজ আমিষ মাছ, মাংস ইত্যাদি দামি খাবার খাওয়ার প্রইয়োজনই হয় না। অবশ্য সে ক্ষেত্রে ডাল বেশি পরিমাণে খেতে হবে এবং তার সঙ্গে খেতে হবে শাক-সবজি, ফল ও দুধ। ডালে ভিটামিন এবং লবণ জাতীয় পদার্থও চাল এবং গমের চেয়ে বেশি আছে। কাজে কাজেই ভাত-রুটির সঙ্গে এক বাটি করে ডাল খেলে ভিটামিন ও লবণজাতীয় পদার্থের অভাব মিটবে। তবে ডাল অনেক দিনের পুরোনো হলে চলবে না। কারণ পুরোনো ডালে ভিটামিন ও আমিষ উপাদান অনেক কমে যায়। পুরোনো ডাল সেদ্ধও হতে চায় না সহজে।

সহজে ও সস্তায় পুষ্টিকর খাবার খেয়ে পেট ভরাতে হলে খিচুড়ি সবচেয়ে ভাল। এতে ভাতের ফ্যান নষ্ট হয় না, ডালও ভালভাবে সেদ্ধ হয়। আয়ুর্বেদে খিচুড়ির অনেক গুণের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীর ডালে আছে বিভিন্ন রকমের গুণ। সুস্থ থাকতে খাওয়া-দাওয়ার তালিকায় প্রতিদিন ডাল রাখলে অনেক অসুখের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে এবং অনেক অসুখ যদি করেই তাহলেও সহজে সেরে যাবে। নিম্নে মুগ ডালের উপকারিতা দেওয়া হলো।

মুগ ডালের বহুবিধ উপকারিতা:
মুগ অনেক রোগ উপশম করে। মুগ ডাল সম্বন্ধে গুজরাতে একটি লোকোক্তি প্রচলিত আছে যার বাংলা অনুবাদ করলে অনেকটা এই রকম দাঁড়ায়— মুগ বলে, আমার দানা সবুজ মাথায় কালো দাগ/ আমাকে খেলেই রোগ সেরে যায় লাগ ভেলকি লাগ।

আয়ুর্বেদ মতে কাঁচা মুগ ত্রিদোষনাশক, রুচিকর, তাপ ও পিত্ত বিকারে উপকারী। সৈন্ধব লবণ দিয়ে রান্না করে খেলে সব রোগ উপশম করে।

আয়ুর্বেদ মতে ভাজা মুগে কাচা মুগের সব গুণই আছে, তবে ভাজা মুগের ভাল সারক অর্থাৎ মল ও বায়ু নিঃসারণ করে। মুগ কালো, সবুজ, হলুদ, সাদা ও লাল রঙেরও হয়। কিন্তু চরক ও সুশ্রুতের মতে সবুজ মুগই সর্বশ্রেষ্ঠ।

মুগ রুক্ষ, হালকা, মল রোধ করে, কফ ও পিত্তের দোষ হরণ করে, শীতল, মধুর, অল্পমাত্রায় বায়ুকারক, চোখের পক্ষে ভাল এবং জ্বর সারিয়ে দেয়। শরীর সুস্থ রাখতে মুগ অনেক উপকার।

১. ভাজা মুগের ডাল ঘন করে রান্না করে তাতে মুড়ি মধু ও চিনি মিশিয়ে খেলে শরীরের জ্বালা দূর হয়, জ্বরে ও পেটের অসুখে উপকার দেয়।

২. মুগের ডালের খিচুড়ি অসুস্থ শরীরের অতি-উত্তম পথ্য।

৩. মুগের ঘন ডালের চেয়েও মুগের পাতলা জুস বেশি উপকারী। মুগ অল্প বায়ুকারক হলেও এই জুস একেবারেই বায়ু সৃষ্টি করে না।

৪. পুরোনো জ্বরে এবং অন্যান্য অসুখে মুগের জুস খেলে দুধের মতো উপকার পাওয়া যায়।

৫. শরীরে ত্রিদোষের (কফ, পিত্ত ও বাত) জন্যে সদ্য সদ্য যে জ্বর হয়েছে যাতে দুধ খাওয়া নিষেধ সেই জ্বরে রোগীকে এই জুস খাওয়ালে খুব উপকার পাওয়া যায় কারণ মুগের জুস বাত, পিত্ত ও কফের প্রকোপশান্ত করে। অতএব অসুস্থ ব্যক্তির পক্ষে এই জুস খাওয়া খুবই হিতকর।

৬. মুগের আটা বা বেসন দিয়ে মুগ পাক নামক মিষ্টি তৈরি হয় তা ছোলার ডালের বেসনের মিষ্টির চেয়ে অনেক বেশি উপকারী। মুগের বেসনের পুষ্টিকর লাড্ডু খাওয়া শরীরের পক্ষে খুবই ভাল বিশেষত শীতকালে।

মুগের ডালের জুস বা পসাবন:

মাটির হাঁড়িতে এক মুঠো মুগের ডাল দিয়ে তাতে প্রায় এক লিটার জল দিন। কম আঁচে বসিয়ে রেখে মুগ ভাল করে সেদ্ধ করে জুস বের করে নিন।

বেশি স্বাদ আনবার জন্যে অল্প ঘি গরম করে জিরে ফোড়ন দেবেন এবং নুন মেশাবেন। দুর্বল রোগীর পক্ষে এই জুস খুব হালকা ও উপকারী পথ্য।

মুগের ডালের বেসনের লাড়ু: মুগের ডাল একটু ভেজে নিয়ে পিষে বেসন তৈরি করুন। বেসনের সম পরিমাণ ঘি কড়াইয়ে ঢালুন। কম আঁচে বসিয়ে রাখুন। বেসন মিশিয়ে লালচে না হওয়া পর্যন্ত নাড়তে থাকুন। মাঝে মাঝে একটু দুধ ছিটিয়ে দিন।

এই ভাবে দুধ ছিটিয়ে ভেঙ্গে বেসন যখন দানা দানার মতো হয়ে যাবে তখন নামিয়ে নিন। এতে পেষা চিনি, কুচোনো বাদাম, পেস্তা, এলাচের ও লবঙ্গর গুড়ো, গোলমরিচের গুঁড়া মিশিয়ে লাড়ু তৈরি করে নিন।

এই রকমভাবে তৈরি করা মুগের লাড়ু শীতল, বীর্যবর্ধক বাত ও পিত্তের প্রকোপ কমিয়ে দেয়। শীতকালে এই পুষ্টিকর লাড্ডু খেলে অনেক রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। বাঙালি বাড়িতে মুগের ডাল নানা রকম ভাবে রান্না করা হয়। এটি একটি হালকা ও নিদোষ আহার! মুগের ডাল, ভাজা মুগের ডাল, মুগের ডালের খিচুড়ি, লাউ-মুগ বা লাউ দিয়ে মুগের ডাল, মুগের ডালের পাঁপড় সব কিছুর সঙ্গেই বাঙালিরা পরিচিত। | অবাঙালিরা মুগের ডালের বড়ি, মুগের ডালের লাড়ু, ভাত-রুটির সঙ্গে মুগের ডাল, মুগের ডালের খিচুড়ি, এমনকি অন্যান্য তরকারি সংযোগে মুগের ডালের তরকারিও খেয়ে থাকনে। মুগের ডালের পকৌড়া যাকে মুংগৌড়ি বলা হয় তার খুবই সমাদরও জনপ্রিয়তা আছে।

তথ্যসূত্রঃ

১. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা,৬০-৬২।