মসুর ডাল হচ্ছে কলাই জাতীয় শস্য মসুরের (বৈজ্ঞানিক নাম: Lens culinaris) শুকনো পুষ্ট ফল। বাঙালির প্রিয় একটি অতি পরিচিত ডাল। এটি মূলত প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে। কালো জিরে ফোড়ন দিয়ে মুসুরির ডাল, পেঁয়াজ ভাজা দিয়ে মুসুরির ডাল, আম দিয়ে মুসুরির ডাল বাঙালি রসনায় চিরপ্রিয়। এ ছাড়া আছে মুসুরির ডাল ভাতে, মুসুর ডালের ভাজা বড়ি, মসুরির ডালের বড়া।[১] মসুর সম্পর্কে জানতে আরো পড়ুন

মসুর কলাই জাতীয় খাদ্যশস্য
আয়ুর্বেদ মতে, কাঁচা মুসুরির ডাল পুষ্টিকর, মলরোধক ও প্রমেহ (যৌনব্যাধি) নাশক। ভাজা মুসুরির ডাল লঘুপাক, বর্ণপ্রসাদক, মলরোধক। কফ, রক্তপিত্ত ও বিষমজ্বরে (ম্যালেরিয়ায় বা ঠাণ্ডা লেগে যে জ্বর হয়) হিতকর। অনেকে বলেন মুসুর ডাল খেলে শরীর গরম হয়— সেইজন্যে আগে নিরামিষাশীরা এই ডাল খেতেন না কিন্তু এই ডাল শরীরের পক্ষে আদৌ উত্তেজক নয়।

আরও বলা হয় মুসুরির ডাল পাকে মধুর, মলাবেগ থামায়, শীতল, হালকা, রুক্ষ্ম। কফ, পিত্ত, রক্তপিত্ত ও জ্বরনাশক। এছাড়াও মুসুরির ডাল বলকারক ও পুষ্টিকর। মুসুরির ডাল খেলে বায়ুর প্রকোপ হওয়ার ভয় থাকে। তেল দিয়ে সাঁতলে খেলে আর সে আশঙ্কা থাকে না। সুস্বাস্থ্যের জন্যে খাওয়া-দাওয়ায় তালিকায় মুসুরির ডাল গুরুত্ব অনেক।এদের ঔষধি গুণাগুণও যথেষ্ট রয়েছে, নিম্নে সেসবের কিছু উল্লেখ করা হলো। এই মূসর সাধারণত রসবহ স্রোতে কাজ করে।

১. মূত্রকৃচ্ছ্রতা: এ কৃচ্ছ্রতা গ্রন্থিস্ফীতিজনিত ক্ষেত্রের নয়। এটা এসেছে চোরা অম্বলরোগ থেকে। কোনো কারণে পেটে বায়ু হয়েছে, উর্ধ্ব বা অধঃ কোনো দিকেই নিঃসরণ হচ্ছে না, এক্ষেত্রেও মূত্রকৃচ্ছ্রতা দেখা দেয়, সেখানে খোসা সমেত মসূরের ডাল এক লিটার জলে সিদ্ধ করে ৫০০ মিলিলিটার থাকতে নামিয়ে রেখে দিতে হবে, ওটা থিতিয়ে গেলে, উপর থেকে পাতলা জলটা আস্তে আস্তে ঢেলে নিতে হবে এবং এক ঘণ্টা অন্তর ৩ থেকে ৪ বারে খেতে হবে। এর দ্বারা অপানবায়ুর স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে; তার ফলে এই কৃচ্ছ্রতাটা চলে যাবে।[২]

২. দাহ রোগ: যাঁদের শরীরে মেদ কম, যাকে বলে হাড়ে মাসে জড়ানো, এদের দেখা যায় প্রকৃতি মন্ডলের আবহাওয়ায় একটু অসমতা হলেই ক্ষণে দাহ ক্ষণে শীত উপস্থিত হয়। এরা তেল না মাখলে থাকতে পারেন না। এই প্রকৃতির লোক যাঁরা, তাঁরা খোসাসহ মসুর ২৫ গ্রাম এক লিটার বা আন্দাজ এক সের জলে সিদ্ধ করে ২৫o মিলিলিটার বা আন্দাজ এক পোয়া থাকতে নামিয়ে, ছেঁকে উপরের পাতলা জলটা কিছুদিন আহারের সময় অথবা অন্য সময় খাওয়ার অভ্যস করতে হবে। এর দ্বারা পিত্তবিকারটা চলে গিয়ে দহটা আর হবে না এবং শরীরে একটু মাংসও লাগে।

৩. মাথা ধরা: চোখের সমস্যা হয় নি, সমস্ত দিন পরিশ্রম, বিকেলে প্রায়ই মাথা ধরে, বৈদ্যকের চিন্তা হলো মস্তিকের শ্লেষ্মাধরা কলা বায়কুপিত; এখন চাই এমন জিনিস খাওয়া, যেটি এসে স্নিগ্ধ করতে পারে, তাই পূর্বের নিয়মে গোটা মসুর ডাল সিদ্ধ করে ছেঁকে, সেই জলটা কয়েকদিন খাওয়া। এর দ্বারা বিকালের দিকে মাথার যন্ত্রণা হবে না।

৪. পেটের ব্যথায়: মুখে ভালো লাগছে, তখনও খেয়ে ইচ্ছে হয়, শাকপাতা খেতে কিছুই বাদ যাচ্ছে না, এর পরিণতিতে দেখা গেল পেটে কি যেন গজগজ করছে, আর ভিতরে ফুটছে, তার সঙ্গে ব্যথা আরম্ভ হয়েছে; এক্ষেত্রে খোসাসহ মসুরের ডাল পুর্বের নিয়মে সিদ্ধ করে উপরের সেই স্বচ্ছ জলটাই আধা ঘণ্টা অন্তর ২ থেকে ৩ বারে খেলে ওটা সেরে যায়।

অর্থাৎ যাঁরা পেটের অসুখে ভুগছেন যাঁদের বারবার মলের বেগ আসে মুসুরির ডাল খেলে তাঁরা উপকার পাবেন।

৫. বাতকুন্ডলী: অম্বালপিত্ত হলেও এই রকম হয়, যেক্ষেত্রে পেটাটা হঠাৎ শক্ত হয়ে বলের মতো হয়ে ওঠে, খালি কি ভরা সেটার সঙ্গে সম্পর্ক নেই। এক্ষেত্রে খোসা সমেত মসুর ডাল ২০ গ্রাম ৩ কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে এর সঙ্গে এক চা চামচ খাঁটি ঘি মিশিয়ে তার সঙ্গে পরিমাণমত লবণ দিয়ে সুস্বাদু করে সকালে ও বিকালে দু’বারে ঐ ডালের জলটা খেতে হবে। এইভাবে তৈরি করে কয়েকদিন খেলে বাতকুণ্ডলী আর পাকাবে না। গ্রামে একে অনেকে বায়গোলা বলে।

৬. পুরাতন গ্রহণী রোগ: মল কখনও ঢিলে কখনও শক্ত এটার চিকিৎসায় চিকিৎসকের বিভ্রান্তি ঘটে। এই মল এমন শক্ত হয় যেন অজবিষ্ঠা, আবার যেদিন দাস্ত হতে আরম্ভ হলো তো একদিনেই ৭ দিনের রোগী; এক্ষেত্রে অর্থাৎ বাতকুন্ডলী রোগের জন্য প্রস্তুত পদ্ধতিতে মসুরের জুসকে সমস্তদিনে ৪ বারে খেতে হবে। এর দ্বারা ঐ অসুবিধেটা চলে যাবে।

মুসুরির ডালে লৌহ বেশি আছে বলে যাঁরা আমাশায় ভোগেন তাঁদের মুসুরির ডাল খাওয়া হিতকর।

৭. গ্রহণী রোগে: এর লক্ষণ আবার অন্য ধরনের, সেটা হলো ৪ থেকে ৫ বার দাস্ত হয়। কিন্তু সেটা দিনের বেলাই হয়ে যাবে, রাত্রে উৎপাতে পড়তে হয় না। এক্ষেত্রে উপরিউক্ত নিয়মে মসুরের জুস প্রস্তুত করার সময় ১০ গ্রাম বেলশুঠ ওটার সঙ্গেই সিদ্ধ করতে হবে। তারপর ছেঁকে কেবলমাত্র ঐ জলটাই নিতে হবে। সকালে ও বিকালে দু’বারে ঐ জুসটা খেতে হবে। এর দ্বারা ঐ অসুবিধাটা চলে যাবে।

৮. রক্তপিত্ত: কোনো প্রকার ডাল রক্তপিত্তরোগে খাওয়া ঠিক নয় সেটা সত্য,কিন্তু বৈশিষ্ট্য এইটাই যে এই মসুরে ডালটাকে ব্যবহার করা যায়, তবে এক্ষেত্রে খোসাসহ মসুরকে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে, ছেঁকে নিয়ে দু’বেলায় খেতে হবে। তবে ঐ ডাল সিদ্ধ হওয়ার সময় দুই বা এক মুঠো সাদা খই ওর সঙ্গে সিদ্ধ করতে হবে। মাত্রা ১০ থেকে ২৫ গ্রামের মধ্যে।

৯. জ্বালা মেহ: ক্ষেত্রটা হলো মূত্রনালী দিয়ে যা বেরোয় সেটাতেই জ্বালা অথবা শুক্রনির্গত হওয়ার সময়ও জ্বালা করে আর প্রস্রাব করার সময় তো করেই, অথচ প্রস্রাবের সঙ্গে যা কিছু নির্গত হচ্ছে তা নয়। এক্ষেত্রে ২৫ গ্রাম খোসাসহ মসুরের ডাল দেড় লিটার জলে সিদ্ধ করে এক লিটার থাকতে নামিয়ে, ছেঁকে দিনের মধ্যে দুই বা তিন বারে সেই জলটা খেতে হবে, এর দ্বারা ঐ জ্বালাটা চলে যাবে।

১০. জীর্ণ জ্বর: জীর্ণ জ্বর: যেটাকে সাধারণত ঘুসঘুসে জ্বর বলা হয় এক্ষেত্রে ২o থেকে ২৫ গ্রাম খোসাসহ মসুর ডাল ৫ কাপ জলে সিদ্ধ করে ৩ কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে ঐ জলটা ২ থেকে ৩ বারে খেতে হবে।

১১. বর্ণের ঔজ্জ্বল্য: লোকে একসময় সন্দুরী বলতো, কিন্তু আজ কালোর পর্যায়ে, লিভার যে খারাপ তাই বা বলি কি করে, অথচ গায়ের ও মুখের রঙটা চেপে গিয়েছে এমতাবস্থায় মসুর ডাল খোসা বাদ দিয়ে ও এক টুকরো কাঁচা হলুদ এক গাঁটের মতো একসঙ্গে বেটে ওর সঙ্গে একটু দুধের সর মিশিয়ে মাখতে হবে, এর দ্বারা ঐ ঝাঁই দাগটা উঠে যায়।

এছাড়াও মুসুরির ডালের গুড়ো জলে মেখে বা মুসরির ডাল বেটে মুখে যতক্ষণ পর্যন্ত না জল শুকোচ্ছে লাগিয়ে মাখলে মেছতা বা মুখে ছোপ ছোপ দাগ ভাল হয়।

মুসুরির ডাল বর্ণ সংশোধক বা বর্ণ প্রসাধক একথা আগেই বলা হয়েছে। মুসুরির ডাল বাটার রূপটান খুব প্রচলিত। বিশেষত অবাঙালিদের মধ্যে এই ডাল বেটে জল শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত মুখে প্রলেপ লাগালে এবং তার পরে ঠাণ্ডা হলে ধুয়ে ফেললে মুখের ক্লান্তির উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়।

মুসুরির ডাল ঘিয়ে ভেঙ্গে দুধ দিয়ে বেটে মুখে প্রলেপ লাগালে ছুলি সারে।

১২. চোখ ওঠা: এ রোগের উপসর্গগুলো হলও চোখ ফুলে যাওয়া ও পিচুটি পড়া, এক্ষেত্রে মসুরের ডাল বেটে চোখের পাতার পাশে লাগিয়ে দিলে। ফুলো ও পিচুটি পড়া কমে যাবে।

১৩. ফোড়ায়: পেকে গিয়েছে বটে, কিন্তু ফাটছে না, আবার এও হয় পাকছেও না, যাকে বলে দরকচা মেরে আছে, এক্ষেত্রে মসুরের ডাল বেটে গরম করে ফোড়ার উপর প্রলেপ দিলে হয় বসবে না হয় ফাটবে।

১৪. গায়ের দুর্গন্ধ: দেশগাঁয়ে একে বলে ‘বাকরেশে গন্ধ’। যার উপায় নেই সেইই কাছে আসে, নইলে জানা লোকে দূরে থাকতে চায়; এরা যদি মসূরের ডাল বেটে গায়ে, বিশেষত যেসব জায়গায় ঘাম হয়, সেখানে সপ্তাহে ৩ দিন মাখেন, তাহলে ওটা সেরে যায়।

১৫. ঠূনকো: মায়েরা বড়ই ভারাক্রান্তা হয়ে পড়েন, যন্ত্রণাও হয়, এক্ষেত্রে মসুরের ডাল বেটে স্তনে লাগিয়ে দিলে ব্যথা ও ভার হওয়াটা কমে যায়, তবে যতক্ষণ খানিকটা স্তন্য না বের করে ফেলা যায় ততক্ষণ স্বস্তি হয় না।

১৬. রক্তগুল্ম: যাঁদের মাঝে মাঝে মাসিক স্রাব বন্ধ থাকে, আবার ২ থেকে ৩ মাস বাদে বেশি স্রাব হতে থাকে, তাঁরা মসুরের ডাল ভোজ্য হিসেবে প্রায়ই খেতে হবে। এর দ্বারা ঐ অনিয়মিত স্রাবটা চলে গিয়ে স্বাভাবিক হবে।

১৭. অর্শে: যাঁদের অর্শ থেকে রক্তস্রাব হচ্ছে বা যাঁরা অর্শে ভোগেন মুসুরির ডাল খেলে তাঁদের সেই কষ্টের উপশম হবে।

১৮. ত্রিদোষে: মুসুরির ডালের আটা (মুসুরির ডালের মিহি চুর্ণ) ডালিমের রসে মিশিয়ে খেলে ত্রিদোষের (কফ, বাত, পিত্ত) জন্যে যদি বমি হয় তা থেমে যাবে।

১৯. ব্রণ বা ঘায়ে: যে ঘায়ে বা ব্রণে বার বার পুঁজ ভরে যাচ্ছে মুসুরির ডাল পিষে লাগালে সেই ঘা বা ব্রণ সারবে।

২০. বল বৃদ্ধিতে: রোগ সারবার পর মুসুরির ডালের জুস মাংসের টেংরির জুসের মতোই সুপথ্য ও শরীরের বল বৃদ্ধি করে-কিন্তু টেংরির চেয়ে দামে অনেক সস্তা বলে সকলেই খেতে পারেন।

রাসায়নিক গঠন

(a) Vitamins of B group, other vitamins are: Carotene, ascorbic acid, vitamin K, tocopherol. (b) Protein, starch.

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা, ৬৩-৬৪।

২. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা, ২৫৫-২৫৬।