জিরা : পাঁচ হাজার বছরের পুরনো মশলা

0
11

সিরিয়ার তেল এদ-দার অঞ্চলে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে, খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার অব্দেও সেখানে জিরা খাওয়ার প্রচলন ছিল। সমসাময়িক মিসরীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোতেও পাওয়া গেছে জিরা ব্যবহারের প্রমাণ। প্রাচীন মিসরীয়রা খাবারে জিরার ব্যবহার করত মসলা হিসেবে। আবার মমি তৈরির প্রক্রিয়ায়ও প্রয়োজন পড়ত জিরার। মসলা হিসেবে জিরার ব্যবহার ছিল পুরনো গ্রিক ও রোমান সভ্যতায়ও। সেখানে আবার ভেষজ চিকিৎসারও অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল জিরা। আবার এর ব্যবহার ছিল প্রসাধনী হিসেবেও। সে সময় গায়ের রঙকে পাণ্ডুর বর্ণ করে তোলার জন্য ব্যবহার হতো মসলাপণ্যটি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন মসলাপণ্যগুলোর একটি হলো জিরা। এটি আসলে Cuminum Cyminum নামের এক ধরনের লতানো উদ্ভিদের বীজ। সম্ভবত গোলমরিচের পর এটিই বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি সমাদৃত ও জনপ্রিয় মসলাপণ্য। কিছুটা কটুস্বাদ ও সুগন্ধযুক্ত মসলাটি গোটা ও গুঁড়া— দুভাবেই খাওয়া হয়। বাজারে তিন ধরনের জিরার উপস্থিতি পাওয়া যায়— কিছুটা পীতাভ (বাজারে এর উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি), সাদা ও কালো (দুটোই এশিয়ার বাজারে পাওয়া যায়)। এর মধ্যে সাদা ও পীতাভ বর্ণের জিরার স্বাদ-গন্ধ কিছুটা একই রকম। কিন্তু কালো বর্ণের জিরার স্বাদ ও গন্ধ কিছুটা অন্য রকম।

উপমহাদেশের রান্নাঘরগুলোয় জিরার উপস্থিতি অপরিহার্য। উপমহাদেশীয় বিশেষ করে বাঙালি রাঁধুনিরা জিরার ব্যবহার ছাড়া কোনো তরকারি রান্নার কথা সম্ভবত চিন্তাও করতে পারেন না। প্রকৃতপক্ষে এ অঞ্চলের রান্নার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরা হয় জিরা ও ধনে পাতার উপস্থিতিকে। বর্তমান বিশ্বে জিরার উৎপাদন ও ভোগের বিষয়টি এ উপমহাদেশের মানুষেরই একচেটিয়া। যদিও এর উত্পত্তিস্থল আসলে অন্য কোথাও।

প্রকৃতপক্ষে জিরার ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। সিরিয়ার তেল এদ-দার অঞ্চলে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে, খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার অব্দেও সেখানে জিরা খাওয়ার প্রচলন ছিল। সমসাময়িক মিসরীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোতেও পাওয়া গেছে জিরা ব্যবহারের প্রমাণ। প্রাচীন মিসরীয়রা খাবারে জিরার ব্যবহার করত মসলা হিসেবে। আবার মরদেহকে মমিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায়ও প্রয়োজন পড়ত জিরার। মসলা হিসেবে জিরার ব্যবহার ছিল পুরনো গ্রিক ও রোমান সভ্যতায়ও। সেখানে আবার ভেষজ চিকিৎসারও অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল জিরা। আবার এর ব্যবহার ছিল প্রসাধনী হিসেবেও। সে সময় গায়ের রঙকে পাণ্ডুর বর্ণ করে তোলার জন্য ব্যবহার হতো মসলাপণ্যটি।

জিরার উল্লেখ পাওয়া যায় বাইবেলেও (নিউ লিভিং ট্রান্সলেশন; ইসাইয়াহ ২৮: ২৫, ইসাইয়াহ ২৮: ২৭)। ধর্মগ্রন্থটিতে জিরা আবাদের বর্ণনা রয়েছে। আবার এটি উৎপাদনসংক্রান্ত জ্ঞানকে উল্লেখ করা হয়েছে ঈশ্বরপ্রদত্ত হিসেবে।

ধারণা করা হয়, মিসরের ভূমধ্যসাগর-তীরবর্তী অঞ্চল থেকে ইরানের মধ্যবর্তী কোনো এক স্থানে উত্পত্তি হয়েছে জিরার। এর মধ্যে আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে মসলাপণ্যটির মূল উত্পত্তিস্থলের স্বীকৃতির প্রধানতম দাবিদার আসলে দুটি অঞ্চল— পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা লেভান্ত (সিরিয়া, ফিলিস্তিন, জর্ডান, লেবানন, সাইপ্রাস এবং ইরাক ও তুরস্কের একাংশ) ও মিসর। ধনে পাতার গোত্রভুক্ত মসলাপণ্যটির ব্যাপক জনপ্রিয়তা শুধু উপমহাদেশীয় দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই। মেক্সিকো, ভিয়েতনাম ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও রান্নায় ব্যাপক হারে ব্যবহার হচ্ছে জিরা। প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যে খাবার টেবিলে জিরাভর্তি পাত্র সার্বক্ষণিক রাখার চল ছিল। আজকের দিনে এ প্রথার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় মরক্কোর অধিবাসীদের মধ্যে।

অন্যসব মসলার মতোই অনেক সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধিকারী জিরা। বাইবেলের ভাষ্যমতে, জিরার ভেষজ গুণ এতটাই শক্তিশালী যে, একে ঋণ পরিশোধে বা মুদ্রা হিসেবেও ব্যবহার করা চলে! মধ্যযুগের খ্রিস্টীয় মঠগুলোর বাগানে আবাদকৃত ফসলগুলোর অন্যতম ছিল জিরা। প্রাচীন গ্রিক ও মিসরীয় চিকিৎসকরাও এর অনেক ভেষজ গুণের কথা লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

মধ্যযুগে মসলাপণ্য ছিল মারাত্মক রকমের দুষ্প্রাপ্য। এর মধ্যেও সবচেয়ে সহজলভ্যগুলোর অন্যতম ছিল জিরা। ধারণা করা হতো, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততার মনোভাব তৈরিতে জিরার জুড়ি নেই। বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোয় আগত অতিথিরা পকেটে জিরার কৌটা নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। এমনও ধারণা ছিল, ভালোবাসার মানুষ ও পোষা মুরগিকে দূরে চলে যাওয়া থেকে বাধা দেয় জিরা। এ কারণে বিবাহিত যোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর সময় তাদের দেয়া হতো জিরা সহযোগে প্রস্তুতকৃত রুটি।

মধ্যযুগে এসে ইউরোপীয়দের কাছে জিরার গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা কমতে থাকে। তবে স্পেন ও মাল্টায় এর আবেদন হারায়নি কখনই। নিউ ওয়ার্ল্ড অর্থাৎ আমেরিকা মহাদেশে এর প্রচলন ঘটে স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ঔপনিবেশিকদের হাত ধরে।

পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় জিরার ভেষজ গুণ সম্পর্কে তেমন একটা ধারণা না থাকলেও প্রাচ্যের দেশগুলোর চিকিৎসকদের কাছে এটি ছিল অমূল্য। বলা হয়, এটি টনিক হিসেবে অনন্য। এছাড়া এটি দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে পারে বলেও মনে করা হয়। একই সঙ্গে এটি লিভার ও কিডনির জন্যও উপকারী বটে। হজমশক্তিবর্ধক হিসেবে জিরার বেশ সুনাম রয়েছে। বলা হয়, জিরা দেহের তাপমাত্রা বাড়ায়। এতে হজমশক্তির কার্যকারিতাও বেড়ে যায়। এছাড়া প্রাতঃকালীন অস্বস্তি, ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, অ্যাটনিক ডিসপেপসিয়া, পেটফাঁপা ও হজমসংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যার ক্ষেত্রেও এটি বেশ কার্যকর। এসব সমস্যার ক্ষেত্রে এক গ্লাস পানিতে এক চা-চামচ পরিমাণ জিরা, সমপরিমাণ ধনে পাতা বাটা ও একটু লবণ মিশিয়ে খেয়ে নিলে ভালো উপকার পাওয়া যায়।

এছাড়া সর্দিকাশির ক্ষেত্রে জিরাসহ প্রস্তুত চা পান করলে বেশ উপকার পাওয়া যায়। খুসখুসে কাশির ক্ষেত্রে এ চায়ের সঙ্গে একটু আদা যোগ করলেও বেশ উপকার পাওয়া যায়। জিরায় প্রচুর পরিমাণে লৌহের উপস্থিতি রয়েছে। সুতরাং মসলাপণ্য হিসেবে জিরা বেশ স্বাস্থ্যকর বলে প্রমাণিত। ফোসকা পড়ে যাওয়াসহ ত্বকের বেশকিছু সমস্যা সমাধানে চামড়ার ওপর প্রলেপ হিসেবে জিরা ব্যবহার করা যায়। এছাড়া অ্যাজমা ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় কালিজিরা বেশ কার্যকর বলেও দাবি করেন অনেকে।

আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের কাছে অন্য রকম এক কদর রয়েছে জিরার। এর উদ্দীপক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ব্যবহার করা যায় অ্যান্টিসেপটিক হিসেবেও। বলা হয়, অগ্ন্যাশয় থেকে বিশেষ কিছু এনজাইম নিঃসরণের মাধ্যমে খাবারের পুষ্টিগুণ দেহে শুষে নেয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখে জিরা।

জিরা ইংরেজিতে অভিহিত হয় ‘কিউমিন’। এটি এসেছে মূলত লাতিন ‘কিউমিনাম’ থেকে, যার উৎস হচ্ছে গ্রিক ‘কিমিনোন’। বলা হয়, এ কিমিনোন শব্দটি এসেছে হিব্রু ‘কামোন’ ও আরবি ‘কামুন’ থেকে। সংস্কৃতে জিরাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘জিরক’ নামে। এর অর্থ হচ্ছে ‘হজমে সহায়ক’। ফারসি ও উর্দু ভাষাতেও এটি জিরা নামে পরিচিত। আয়ুর্বেদে চারভাবে জিরা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো কষায় (পানীয় হিসেবে), অরিষ্ঠ (গাঁজানো পানীয় হিসেবে), বটি (ট্যাবলেট/পিল) ও ঘিয়ের সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত হিসেবে।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে, কয়েক ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে কারসিনোজেন (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান) প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এছাড়া গবেষণাগারে দেখা গেছে, জিরা ব্যবহারের পর কয়েকটি প্রাণীর পাকস্থলী ও লিভারে টিউমারের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে এসেছে।

জিরা সাধারণত উজ্জ্বল সূর্যালোকবিশিষ্ট জলবায়ুর দেশগুলোয় ভালো জন্মায়। বিভিন্ন ধরনের আবহাওয়ার মধ্যেই এটি উৎপাদন করা সম্ভব। তবে এর জন্য কিছুটা বৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক হাজার ফুট উচ্চতায়ও জন্মানো সম্ভব। খরাসহিষ্ণু, গ্রীষ্ণমণ্ডলীয় ও প্রায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়াতেও এটি ফলানো সম্ভব। এটি বাড়তে সাধারণত ১০০-১২০ দিন সময় নেয়। বিশেষ করে ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এটি দ্রুত বাড়ে। তবে ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়াই এর জন্য সর্বোত্কৃষ্ট। কম তাপমাত্রায় এর গাছের পাতা সবুজ থেকে কিছুটা রক্তাভ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে উচ্চ তাপমাত্রায় এর জিয়নকাল কমে যায় ও ফল তাড়াতাড়ি পাকে। উপমহাদেশীয় অঞ্চলগুলোয় এটি অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত বোনা হয়। ফলন তোলা শুরু হয় ফেব্রুয়ারি নাগাদ। সিরিয়া ও ইরানে এটি বোনা হয় নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। অন্যদিকে ফসল তোলা হয় জুন-জুলাই নাগাদ।

বর্তমানে বিশ্বের অনেকখানেই জিরা উৎপাদন করা হয়। বিশেষ করে ভারতে মসলাপণ্যটির উৎপাদন হয় সবচেয়ে বেশি। শুধু উৎপাদন নয়, পণ্যটির অভ্যন্তরীণ ভোগ ও রফতানির দিক থেকেও শীর্ষে ভারত। এছাড়া মেক্সিকো ও চীনও শীর্ষ জিরা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে মাল্টা, মিসর, ইরান, সৌদি আরবে প্রচুর পরিমাণে জিরা উৎপাদন হয়।

SHARE

LEAVE A REPLY