অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না আইসিইউর অনেক রোগীর

0
30

সিজারিয়ান প্রসবের পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় রাজধানীর ওয়ারীর বাসিন্দা সৈয়দা মেহজাবিনের (৩৮)। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ১৭ ডিসেম্বর তার চিকিৎসা শুরু হয়। সেখান থেকে ২৩ ডিসেম্বর তাকে ভর্তি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ)। সেই থেকে দুই মাস ধরে আইসিইউর ১৭ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন তিনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, একটি মাত্র অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে তার শরীরে, যেটি আবার কিডনির জন্য ক্ষতিকর।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি হন মাগুরার অমিত কর (২৭)। অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। গত বছরের নভেম্বরে তাকে ভর্তি করা হয় বিএসএমএমইউর আইসিইউতে। এখন পর্যন্ত আইসিইউতেই চিকিৎসা চলছে তার। সৈয়দা মেহজাবিনের মতো অমিতের শরীরেও মাত্র একটি অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে।

সৈয়দা মেহজাবিন ও অমিত করের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৪টি অ্যান্টিবায়োটিকের নামের পাশে ‘আর’ (রেজিস্ট্যান্স) লেখা। শুধু কোলিস্টিন সালফেট নামের অ্যান্টিবায়োটিকের পাশে লেখা ‘এস’ (সেনসিটিভ)। অর্থাৎ তাদের শরীরের ব্যাকটেরিয়া দমন করতে পারবে শুধু কোলিস্টিন সালফেট। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, কোলিস্টিন সালফেটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করলেও রোগীর কিডনির জন্য ক্ষতিকর এটি।

বিএসএমএমইউর অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. এ কে এম হাবিব উল্লাহ বলেন, সৈয়দা মেহজাবিন ও অমিত কর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়েই আইসিইউতে এসেছেন। তাদের শরীরে ১৫ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের সুযোগ ছিল। এখন কোলিস্টিন সালফেট ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। শুধু এ দুজনই নয়, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের অধিকাংশই কোনো না কোনো অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট। বর্তমানে বাজারে প্রচলিত ২০-২৫ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। আইসিইউর অধিকাংশ রোগীরই ২০টার মধ্যে অন্তত ১৮টা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয়ে রয়েছে। কিছু রোগী পাচ্ছি যাদের সব অ্যান্টিবায়োটিকই রেজিস্ট্যান্স।

আইসিইউতে চিকিৎসাধীন কম-বেশি ২৫ শতাংশ রোগী অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সি নিয়ে কাজ করছেন বিএসএমএমইউর ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সায়েদুর রহমান।  তিনি বলেন, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সে বছরে কত মানুষ মারা যায় তার কোনো তথ্য নেই। সব অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স যে ব্যাকটেরিয়া তা কমন ইনফেকশনে পাওয়া যায় না কিন্তু আইসিইউতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় গবেষণা করে আমরা দেখেছি, যেকোনো আইসিইউতে প্রায়ই সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স থাকে অন্তত ২৫ শতাংশ রোগীর। তখন অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করে দেয়া হয় বা শক্তিশালী কোনো অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়। এ রোগীগুলোর জন্য বিকল্প কিছুই থাকে না। শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া।

অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে ব্যাকটেরিয়ার বেঁচে থাকার ও বংশবিস্তার করার ক্ষমতা অর্জনই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, নিয়ম না মেনে ব্যবহারের কারণে জীবাণুরা অ্যান্টিবায়োটিক চিনে ফেলে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানান চিকিৎসকরা।

ডা. এ কে এম হাবিব উল্লাহ বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। ফার্মেসির দোকানদার, পল্লী চিকিৎসক থেকে শুরু করে সবাই অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছে। কোন রোগের কোন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক কোন মেয়াদে দিতে হবে তা না জেনেই তারা অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছে। এছাড়া চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে যে অ্যান্টিবায়োটিক লিখছেন, রোগীরা পূর্ণমেয়াদে তা শেষ করছে না। ফলে তার শরীরে যে জীবাণু থাকছে তা ওই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স তৈরি করছে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছর পর এ অবস্থা আরো ভয়াবহ হবে।

জানা গেছে, দেশের প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ফার্মেসিতে ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয়। অনেক চিকিৎসক সামান্য অসুখে অ্যান্টিবায়োটিক দেন। বেশি দামের কারণে রোগীরা কিছুটা সুস্থ হলে অ্যান্টিবায়োটিকের মেয়াদ শেষ করে না। এর ফলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে। দেশে গড়ে প্রতিদিন সাত লাখ মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে।

অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায় বাজারে এ ধরনের ওষুধ বিক্রির তথ্যেও। গত বছর দেশে দ্বিতীয় সর্বাধিক বিক্রীত ওষুধ ছিল সেফালোসপোরিন্স অ্যান্ড কম্বিনেশন বা অ্যান্টিবায়োটিক। এ শ্রেণীর ১ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি হয় গত বছর। ওষুধটির বিক্রয় প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর বলে সর্দি, কাশির মতো জীবাণুবাহিত সংক্রমণেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে জানান চিকিৎসকরা। অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সমস্যা সমাধানে চিকিৎসক ও রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে হবে। চিকিৎসকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিকের ঝুঁকি সম্পর্কে বোঝানো। অযৌক্তিক কারণে চিকিৎসকরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করবে না। পাশাপাশি রাষ্ট্রকে কাজ করতে হবে, যাতে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না হয়।

তবে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স যাতে না হয়, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা। তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু রোডম্যাপ যেমন—অ্যান্টিবায়োটিক পলিসি, ইউজার্স গাইডলাইন, সব ইনস্টিটিউটের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক গাইডলাইন। সেটি নিয়েই আপাতত কাজ করা হচ্ছে। আমরা দেখার চেষ্টা করছি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কী অবস্থা। তার ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ নেব। এছাড়া চিকিৎসকদের মাধ্যমে মানুষকে অহেতুক অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। যাতে অপ্রয়োজনে কেউ অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করে।

LEAVE A REPLY