কোমল পানীয় কতটা ক্ষতিকর

0
10

কয়েকদিন ধরে তাত্রা অতিরিক্ত গরম পড়ছে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এই গরমে সবার মধ্যে ঠাণ্ডা কোমল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস শরীরে চালান করা প্রবণতা বেড়ে গেছে। অথচ অনেকেই জানেন না এসব ড্রিংকস স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর।

এনার্জি ড্রিংকসের ইতিহাস অর্ধশতকালের। পানি, চিনি, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, লেবুর জুস দিয়ে প্রথম তৈরি করা হয় এনার্জি ড্রিংকস। কালের বিবর্তনে এতে এসেছে উপাদানগত পরিবর্তন। যোগ হয়েছে ক্যাফেইন, কখনো বা ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল, অপিয়েট। ক্যাফেইন যোগ করার কারণ হলো, এটি মস্তিষ্ক উত্তেজিত করে। ফলে নিজের মধ্যে ভালো লাগা শুরু হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এনার্জি ড্রিংকসের ক্ষতিকর দিকগুলো উন্মোচিত হয়। তা হলো ঘুম না হওয়া, অস্থিরতা, পেটের সমস্যা, হাত-পায়ে কাঁপুনি, দ্রুত হৃৎস্পন্দন, এমনকি মৃত্যুও। গর্ভবতীর জন্য এটি হতে পারে গর্ভপাতের কারণ। এছাড়া গর্ভস্থ শিশুর জন্ম হতে পারে কম ওজন নিয়ে এভং দেখা দিতে পারে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা। এসব পানীয়ে ব্যবহার করা হয় সিনথেটিক ক্যাফেইন। তা আরও ভয়াবহ। কাজেই এনার্জি ড্রিংকস কতটা ক্ষতিকর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসব ড্রিংকস ফরমালিনের চেয়ে কোনো অংশে কম ক্ষতিকর নয়।

এনার্জি ড্রিংকস কোম্পানিগুলো ভোক্তা ধরে রাখার জন্য পানীয়ে মিশিয়ে থাকে অপিয়েট। শুরুতে এটি ভালো লাগার অনুভূতি জন্মায়, রিলাক্স ভাব তৈরি করে। এ অনুভূতি তাদের শেষ করে দেয়। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে আসক্তি জন্মায়। দিন দিন বাড়তে থাকে পানীয় পানের পরিমাণ। এতে দেখা দেয় ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য ও অস্থিরতা এবং কমে যায় যৌন চাহিদা। শুধু তা-ই নয়, এটি নিয়মিত সেবনে যকৃৎ, ফুসফুস, কিডনি হারায় কার্যকারিতা এবং দেখা দেয় হৃৎপিণ্ডের রোগবালাই। ধীরে ধীরে মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করে। একবার এনার্জি ড্রিংকসে আসক্ত হলে হঠাৎ করে ছাড়া কষ্টকর। ছাড়লে ঘটে আরো বিপত্তি। দেখা দয়ে অস্থিরতা, ঘুমহীনতা, বমি বমি ভাব।

এ দেশের এনার্জি ড্রিংকগুলোয় মেশানো হয় সিলডেনাফিল। এটি সাময়িক যৌন উত্তেজনা বাড়ায় এবং যৌনরোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এটি সেবনে যৌনশক্তি হ্রাস পেতে শুরু করে। শুরুতে কিছুদিন ভালো লাগলেও চির জীবনের জন্য হারাতে হয় যৌনক্ষমতা।

এক গবেষকরা দেখা গেছে, এনার্জি ড্রিংকস সেবনের মাধ্যমে মাদক জগতে প্রবেশ করে টিনএজাররা। তাই এ থেকে সবাইকে দূরে থাকা উচিত।

এনার্জি ড্রিংকস মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বর্তমানে তরুণদের মধ্যে এনার্জি ড্রিংকসের খুব কদর বেশি। বিশেষ করে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী তরুণদের ৩৪ শতাংশ নিয়মিত এনার্জি ড্রিংকস পান করে। এছাড়া শিশু ও বয়স্করাও এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন।

অনেকেরই ওই আসক্তি নেশায় পরিণত হয়েছে। এগুলো পান করার মাধ্যমে মাদকাসক্তে পরিণত হচ্ছে তরুণরা। শুধু মাদকাসক্তিই নয়, বরং মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ দাঁড়িয়েছে।

যে কোনো কোমল পানীয়তেই ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও  ক্যাফেইন রয়েছে। বেশি মাত্রার ক্যাফেইন শরীরের মারাত্মক ক্ষতির করে। আসক্তি তৈরি করার মতো একটি উপাদান হলো ক্যাফেইন। এটি কেন্দ্রীয় ও প্রান্তিক স্নায়ুতন্ত্রটিকে উদ্দীপিত করে। এটা বেশি মাত্রায় গ্রহণে ঘটাতে পারে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা, পেটের অসুখ ও হার্টের ছন্দে অনিয়ম।

কোল্ড ড্রিংকস মুখ খোলার পর যে গ্যাস বেরিয়ে আসে এতে থাকে কার্বন ডাই-অক্সাইড, খাবার সোডা বা সোডিয়াম বাই কার্বনেট। এছাড়া থাকে সাইট্রিক এসিড, টারটারিক এসিডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য। আবার পানীয়কে মজাদার করতে স্যাকারিন, সরবিটল, ম্যাটিটল ছাড়াও অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় মাত্রা অতিরিক্ত সোডিয়াম বাই কার্বনেট রক্তে মিলে ক্ষারত্বের মাত্রা বাড়িয়ে অ্যালকালোসিসের সৃষ্টি করে। এটি কিডনি সমস্যা, অস্থিরতা, শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধাসহ অনেক রোগের জন্ম দেয়।

অনেকে লেবু বা কমলার স্বাদ মনে করে যেসব ড্রিংকস পান করেন। এসব পানীয়ে দাঁতের এনালেলটিকে ক্ষয় করে দেয়। কোকাকোলা, সেভেনআপ, পেপসি, স্প্রাইট, ফান্টা, মিরিন্ডা, আরসি, টাইগারসহ অন্যান্য পানীয়ের সোডিয়াম বাই কার্বনেট রক্তচাপ বাড়ায়। এছাড়া যারা ব্যথানাশক, জীবাণুনাশক, রিউমেটিক আর্থ্রাইটিস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি রোগের ওষুধ খান তাদের এসব পানীয় পান না করা উচিত। কারণ এসব পানীয় ওষুধের কার্যক্ষমতা গুরুতরভাবে হ্রাস করে।

শরীরের ওইসব ক্ষতিকর ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে ইতোমধ্যে অনেক দেশেই এনার্জি ড্রিংকস সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া শিশুদের কাছে এসব পানীয় বিক্রি একেবারেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশেও ক্ষতিকর এনার্জি ড্রিংকস বিক্রি নিষিদ্ধ করতে দ্রুতই পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তা না হলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকাসক্ত থেকে বিরত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে কোল্ড ড্রিংকসের ক্ষতিকর দিকগুলো সব শ্রেণির মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। যেভাবে ফরমালিনের বিরুদ্ধে অভিযান, নিষিদ্ধকরণ দণ্ডবিধি আরোপ করা হয়েছে এভাবেই এনার্জি ড্রিংকসের আমদানি, তৈরি ও বিক্রি নিষিদ্ধের জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেয়াও জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকেই কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে।

LEAVE A REPLY