বিস্ময়কর মস্তিষ্ক

0
80

একুশ শতকের বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্ককে সঠিকভাবে জানা ও বোঝা। আমাদের ঘাড়ের ওপর চড়ে বসা মাত্র ১.৩০ কেজি ওজনের এই মানবমস্তিষ্ক সম্পর্কে আমরা জানি খুবই কম। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন এই মস্তিষ্কের অসাধারণ সক্ষমতা উদঘাটন করতে শুরু করেছেন।

এক : সবাই প্রতিভাধর হওয়ার ক্ষমতা রাখেন
ওরল্যান্ডো সেরেলের বয়স তখন দশ বছর। তখন বেসবল খেলার সময় সে তার মাথার বাম পাশে মুষ্টাঘাতে আহত হয়। প্রথমে তিনি বিস্মিত হয়ে পড়েন। এরপর নিজে নিজে উঠে দাঁড়ান এবং আবার খেলতে শুরু করেন। কিন্তু তার মাথাব্যথা চলে যাওয়ার পর উপলব্ধি করতে পারেন, এই আঘাত ছিল তার জন্য এক বড় উপহার : কারণ এ আঘাতের পর থেকে তিনি তার জীবনের প্রতিটি ক্ষণ সুস্পষ্টভাবে স্মরণ করতে পারছেন। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৯ সালে। সেই থেকে সেরেল তার জীবনের যেকোনো দিনের যেকোনো ঘটনা স্পষ্ট স্মরণ করতে পারছেন। তিনি জটিল হিসাব করতে পারছেন তারিখ ও সময়ের। এমনকি যেকোনো দিনের আবহাওয়া সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত পর্যন্ত তিনি মনে রাখতে পারছেন।

সেরেল হচ্ছেন একজন ‘অ্যাকোয়ার্ড স্যাভেন্ট’ তথা ‘স্বভাব পণ্ডিত’। বেসবল খেলার সময় তার মাথায় পাওয়া আঘাত আসলে তার অসাধারণ মানসিক ক্ষমতা খুলে দিয়েছে। এই আঘাতই তার মস্তিষ্কের সুপ্ত মেধা জাগিয়ে দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কেই রয়েছে এমনি অসাধারণ সুপ্ত ক্ষমতা। এরই নাম মেধা বা প্রতিভা। এর স্ফূরণ ঘটিয়ে আমরা বাড়িয়ে নিতে পারি মস্তিষ্কের ক্ষমতা। কেউ এই মেধার অনুশীলন করে একটি বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ক্ষমতা অর্জন করেছেন। কেউ শিখেছেন বিদেশী ভাষায় কথা বলা। কোনো কোনো সময় মস্তিষ্কের এ ধরনের অসাধারণ সক্ষমতা দেখা দিতে পারে ডিমেনশিয়া বা চিত্তভ্রংশ রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে।

এর একটা ব্যাখ্যা আছে। বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক নিয়মিত এমন সব স্মৃতি ফিল্টার আউট বা ছেকে বাদ দেয়, যা আমাদের প্রয়োজন হয় না বললেন নিউরোসাইকোলজিস্ট ড. অ্যালান স্নিডার। তিনি সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর দ্য মাইন্ড’-এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রাথমিক অপরিপক্ব তথ্যগুলো বিশ্লেষিত হয় আমাদের মস্তিষ্কের বাম পাশে, যেখান থেকে বিশ্ব¦ সম্পর্কিত অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এসব তথ্যের একটা যৌক্তিক ধারণা সরবরাহ করা হয়। মস্তিষ্কের এই ধারণাগত অংশটুকু খুলে নিলে কিংবা অবদমন করলে তথ্য পরিসংখ্যান ইচ্ছেমতো অবাধে উড়ে চলে।

কিন্তু যারা নন-স্যাভেন্ট, অর্থাৎ পণ্ডিতপ্রবর নন, তাদের এ ব্যাপারটি আসলে কেমন? আমাদের বেশির ভাগের মস্তিষ্কে আনফিল্টার্ড তথ্য-উপাত্ত জমাট বাঁধে। ফলে তাদের পক্ষে এ নিয়ে ভাবারও সুযোগ আসে না। অবশ্য প্রত্যেক পণ্ডিতের জন্য প্রতিটি দিনই এক-একটি চ্যালেঞ্জ। অ্যালান স্নিডার বলেন, পণ্ডিতজনেরা বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত পেয়ে বিস্মিত হন এবং তারা তাদের জগতকে সরলায়ন করতে পারে রুটিনের মাধ্যমে।

কিন্তু অ্যালান স্নিডারের পরীক্ষায় মস্তিষ্কের বাম অর্ধাংশকে তেজস্বী করে তোলার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বিদ্যুৎপ্রবাহ। এ পরীক্ষায় দেখা গেছে, নন-স্যাভেন্ট বা পণ্ডিত নন, এমন জনও মস্তিষ্কের অসাধারণ পাওয়ার সুইচ অন করতে পারেন। অথচ তাদের মস্তিষ্কে এ ধরনের ক্ষমতা থাকতে পারে, তা তাদের জানা ছিল না। এই পরীক্ষায় অংশ নেয়া স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে ট্রান্সক্রানিয়েল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন। সেখানে একটি শক্তিশালী ম্যাগনেট বসানো হয়েছিল মস্তিষ্কের ইন্টারফেসের নির্দিষ্ট একটি এলাকায়। তখন ইন্টারফেসে নিউরনের স্বাভাবিক প্রবাহও চালু রাখা হয়েছিল।
চিকিৎসার পর বেশির ভাগ স্বেচ্ছাসেবকের হঠাৎ করেই জটিল ধাঁধা সমাধান করার ক্ষমতা কিংবা সুন্দর ছবি আঁকার ক্ষমতা বেড়ে যায়। তবে এই ক্ষমতা তাদের স্থায়ী হয়নি। এই পদক্ষেপ মস্তিষ্কের বিদ্যমান ক্ষমতা জোরদার করার জন্য নয়, বরং তা করা হয়েছে বিদ্যমান পূর্বজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনার জন্য, যাতে মানসিক সৃজনশীলতার বাধা দূর করার জন্য ডিভাইস উদ্ভাবন করা যায়।

দুই : মস্তিষ্ক যেভাবে কাজ করে
মানবদেহের সবচেয়ে জটিল অঙ্গ হচ্ছে মস্তিষ্ক। ভৌতভাবে মস্তিষ্ক গঠিত তিনটি অংশ নিয়ে। এর সবচেয়ে বড় অংশের নাম সেরিব্রাম। এই অংশটি মাথার খুলির বেশির ভাগ অংশ ভরে রেখেছে। এই অংশটি বসে আছে মস্তিষ্কের সবচেয়ে ওপরে। এ অংশের কারণেই আমরা সবকিছুই আমাদের বলে ভাবতে পারি। এই অংশ দিয়েই আমরা অনুভব করি এবং এই অনুভূতি সূত্রে ইন্টারেক্ট বা মিথষ্ক্রিয়া করি।

সেরিব্রামের বাইরের ভাঁজ করা আবরণাংশের নাম কর্টেক্স। কর্টেক্স আমাদের কাজ করা, যেমন হাঁটাচলা, মেমরি কোড করা, ভাবনাচিন্তা করা, শব্দ, দৃষ্টি, স্বাদ, স্পর্শ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। মাথার পেছনের দিকে সেরিব্রামের নিচে থাকে সেরিবেলাম অংশ। এর কাজ সমন্বয় সাধন, সুষ্ঠু চলাফেরা ও ভারসাম্য রক্ষা করা। মস্তিষ্কের তলদেশে আছে মস্তিষ্কের স্টেম, যা আমাদের মেরুদণ্ডের সাথে সংযুক্ত। এটি মস্তিষ্ক ও দেহের মধ্যকার মোটর সিগন্যালের সংযোগ ঘটায়। এটি শরীরের স্বয়ংক্রিয় কাজগুলো, যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস, বিপাকক্রিয়া ইত্যাদি নির্দেশ করে। মস্তিষ্কের কাজগুলো সম্পন্ন হয় নিউরনের মাধ্যমে।

একটি প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কে রয়েছে ১০ হাজার কোটি নিউরন। প্রতিটি নিউরনের রয়েছে শাখা-প্রশাখা। একটি নিউরনের শাখা-প্রশাখা এই নিউরনকে অন্য নিউরনের সাথে সংযুক্ত করে। আমাদের মস্তিষ্কে রয়েছে এ ধরনের ১০০ ট্রিলিয়ন নিউরন শাখা। এসব শাখা দিয়ে প্রবাহিত ইলেকট্রনিক সিগন্যালই আমাদের ভাবনাচিন্তা, অনুভূতি ও স্মরণশক্তির মূলে। প্রতিটি সংযোগস্থলে রয়েছে একটি সিনেপসি। যখন ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল সিনেপসিতে পৌঁছে, তখন এটি নিঃস্বরণ করে নিউরোট্রান্সমিটার নামে রাসায়রিক। এই রাসায়নিক সিগন্যালকে পরবর্তী সিগন্যালে বয়ে নিয়ে যায়। এক সময় আমাদের অভিজ্ঞতা কাজের ধরন সৃষ্টি করে, সৃষ্টি করে কাজের পথরেখা, যেখানে সিগন্যাল হয় সবচেয়ে জোরালো।

তিন : মন নিয়ন্ত্রণের নয়াযুগ
২০১৩ সালের আগস্টে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক অ্যানড্রিয়া স্টোকো কম্পিউটার গেম খেলতে বসেন। ঠিক একটা সময়ে তার আঙুল আপনাআপনি অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি বাটনে চাপ দেয়, যার মাধ্যমে ভার্চুয়াল রকেট ছোড়া হয়। কেন? কারণ স্টোকোর আঙুলকে ইনস্ট্রাকশন দেয়া ছিল তার সহকর্মী রাজেশ রাওয়ের মাধ্যমে মুভ করার জন্য। রজেশ রাও বসেছিলেন তখন ক্যাম্পাসের অন্য পাশে। এই দু’জনের বিশ্বাস এটি হচ্ছে হিউম্যান-টু-হিউম্যান মাইন্ড কস্ট্রোলের প্রথম বোধগম্য বা অধিগম্য উদাহরণ।

রাজেশ রাও কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ের একজন অধ্যাপক। তিনি পরিধান করেছিলেন একটি ক্যাপ। এই ক্যাপে আটকানো ছিল ইলেকট্রোএনকেপালোগ্রাফি মেশিনে আটকানো ইলেকট্রোড, যা ব্রেইনের ইমপালস রেকর্ড করে। ক্যাম্পাসজুড়ে স্টোকো পরিধান করেছিলেন একটি টুপি, যাতে ছিল একটি ট্র্যান্সকারনিয়েল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন ডিভাইস তার মস্তিষ্কের ওপরের অংশে। এটি নিয়ন্ত্রণ করে এর চলাফেরা। অর্থাৎ এটি নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের বাম করটেক্স।

রাজেশ রাও যখন এই ভেবে কম্পিউটার গেম খেলছিলেন যে, তার ডান হাত হিট করবে ‘ফায়ার বাটন’, স্টোকো তখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তার কম্পিউটারের করেসপন্ডিং বাটনে আঙুল চালাবেন। তিনি বলেন, তিনি তখন পেশিতে অনুভব করেন এক ধরনের বিব্রতকর খিঁচুনি। প্রযুক্তি একজনকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চালাতে এবং নিশ্চিতভাবে ভাবনাচিন্তা ট্রান্সমিট করতে না পারলেও এর ক্ষমতা রয়েছে সেসব মানুষকে সক্ষম করে তুলে সাহায্য করতে, যারা অন্য কোনোভাবে যোগাযোগ করতে সক্ষম নন। এমনকি জরুরি সময়ে একজন বিমানযাত্রীকে বিমান থেকে নামতে পর্যন্ত সহায়তা করতে পারে।

অন্যত্র ব্রেইন ও মেশিনের মধ্যে আন্তঃক্রিয়ায় অবিশ্বাস্য ধরনের অগ্রগতি সাধন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর অর্থ বিজ্ঞানীরা এখন এমন যন্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছেন, যে যন্ত্র প্যালাইজড মানুষও চিন্তাকে ব্যবহার করে তার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, একজন কোয়াড্রিপ্লেজিক মহিলা (প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে যার দুই হাত ও দুই পা অবশ হয়ে গেছে) নিজে নিজে চকোলট খেতে সক্ষম হন। দু’টি ছোট্ট ইলেকট্রড লাগানো হয় তার বাম মোটর করটেক্সে। মস্তিষ্কের এই অংশ মানুষের হাঁটাচলা নিয়ন্ত্রণ করে। ইলেকট্রড দু’টিকে একটি কম্পিউটারের সাহায্যে তখন সংযুক্ত করা হয় দু’টি রোবটবাহুর সাথে, যা ব্রেইন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য একজন সুস্থ মানুষের মতোই সিগন্যাল ট্রানশ্লেট করতে পারে।

চার : ডিমেনশিয়া প্রতিহতে বেড়ে চলা মস্তিষ্ক কোষ
এই নিকট অতীতেও বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, আমরা নির্দিষ্টসংখ্যক মস্তিষ্ককোষ নিয়ে জন্মগ্রহণ করি। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই কোষগুলো একটা একটা করে মরতে থাকে, আর এভাবেই মস্তিষ্কের কোষসংখ্যা কমে যেতে থাকে। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে , আমরা সারাজীবন নিউরন তৈরি করে যেতে থাকি।

বিজ্ঞনীরা মানুষের পূর্ণবয়স্ক সময়ে জন্ম নেয়া নিউরনের বয়স একদম সঠিকভাবে আমাদের বলে দিতে পারেন। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে বিপুল পরিমাণ কার্বন-১৪ বায়ুমণ্ডলে ছাড়া হয়। ১৯৬৩ সালে এসব টেস্ট বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পর থেকে বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ একটা জানা হারে কমে আসছে। এটি আছে একটি কোষের ডিএনএতে, সেই মাত্রায় যা ছিল কোষ গঠনের সময়ে। মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস (মস্তিষ্কের এই হিপ্পোক্যাম্পাস অংশ মানুষের মেমরি ও শেখার কাজ সম্পাদন করে) অংশে পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞনীরা দেখেছেন, এখানকার কোষগুলোর বয়স সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বয়সের চেয়ে কম।

এতে প্রমাণ হয়, এগুলো পরে জন্ম নেয়া নতুন কোষ। একে বলে নিউরোজেনেসিস। গবেষকেরা বলেন, আমরা প্রতিদিন মস্তিষ্কে মোটামুটি ৭০০ নতুন মস্তিষ্ককোষ তৈরি করি। সমস্যাটি হচ্ছে, বয়সের সাথে সাথে এই নিউরোজেনেসিস কমতে থাকে। এ জন্যই আমাদের বয়স বেড়ে চলার সাথে সাথে স্মরণশক্তিও কমতে থাকে এবং এর ফলে আমরা এ সময় ডিমেনশিয়া বা পারকিনস রোগের শিকার হই।

কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানতে পেরেছেন, স্নায়ুকোষের তৈরি ফ্র্যাকটালকাইন নামের মলিউকুল স্টেমসেলকে সতেজ করে তোলে নতুন নিউরন সৃষ্টির জন্য। আমরা যখন ব্যায়াম করি, তখন ফ্র্যাকটালকাইন উৎপাদিত হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বয়স্ক ইঁদুরকে ব্যাপক ব্যায়াম করালে ছোট ইঁদুরের মতোই এটি স্মরণ করার ক্ষমতা অর্জন করে । এগুলো তখন আরো বেশি দিন বাঁচে।

‘এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি, নিয়মিত ব্যায়াম মস্তিষ্কের জন্য উপকারী কিন্তু সম্ভবত ব্যায়ামের ফলে গ্রোথ হরমোন কোষ উৎপাদন বাড়িয়ে দমন করতে পারে ডিমেনশিয়া’এ অভিমত কুইন্সল্যান্ড ব্রেইন ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর প্রফেসর পেরি বার্টলেটের।

SHARE

LEAVE A REPLY