বিশুদ্ধ পানি সর্ব রোগের নিরামক

0
51

মানুষের দেহ প্রধানত পানি, ভিটামিন এবং মিনারেল দ্বারা পরিচালিত সুপার মেশিন। মানব দেহের ওজনের ৭২% শতাংশ পানি ৮ শতাংশ নানা রকম ভিটামিন এবং মিনারেল। বাকি ২০% শতাংশ হাড় এবং মাংসপেশী। দেহের অভ্যন্তরে সকল প্রকার রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া, হজম, পুষ্টি গ্রহণ, বর্জ্য ও বিষ ত্যাগ প্রভৃতি পানি দ্বারা সংঘটিত হয়, অতএব, শরীরের পানির প্রভাব অপরিসীম। পানি যেমন রোগ বহন করতে পারে, তেমনি রোগ তাড়িয়েও দিতে পারে। তাই বলা হয় পানির আরেক নাম জীবন।
রক্ত শরীরের ওজনের ৭ শতাংশ। সাধারণত, ৪.২৫ থেকে ৭.৫০ লিটার রক্ত শরীরের থাকে। রক্ত ছাড়া মানুষ এক মুহুর্ত বাঁচতে পারে না। কারণ, এই রক্ত ঘন্টায় ৬০,০০০ হাজার মাইল বেগে সমস্ত শিরা এবং উপশিরার মধ্যে প্রবাহিত হয়ে প্রতিটি কোষে পুষ্টি এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। রক্তে শতকরা ৮০ ভাগ পানি আছে। সিংহভাগ পানি আছে বলেই পানিতে দ্রবণীয় সব ভিটামিন, মিনারেল এবং এম্যাইনো এসিড শরীরে যেখানে প্রয়োজন সেখানে পৌঁছে দিতে সক্ষম। যদি পানির পরিমাণ কম হয়ে যায়, তখন সয়ংক্রিয়ভাবে অন্য অর্গান থেকে শুষে নিয়ে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম করে থাকে। এটা যখন ঘটে তখন অন্য অর্গানগুলির পানির স্বল্পতা দেখা দেয় এবং তার নিজস্ব কার্যক্রম বিঘিœত হয়। শরীরের সমস্ত সংকটপূর্ণ সময়ের কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য অবশ্যই বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
দিন-রাত ২৪ ঘন্টায় কোন মানুষ যদি তার স্বাভাবিক কাজকর্ম করে-যেমন সকালে ঘুম থেকে উঠে কোন রকম ব্যায়াম ছাড়া সারাদিন রুটিন অনুযায়ী কাজকর্ম করে তবে সারাদিন শরীর থেকে ২.২৫ লিটার পানি মলমুত্র, ঘাম এবং নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। অতএব, শরীরের কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য ২.৫-৩.০০ লিটার পানি সারা দিনব্যাপী পান করা প্রয়োজন।
মানুষের ব্রেনে শতকরা ৮০ ভাগের বেশি পানি থাকে। ব্রেনটা যেন পানির মধ্যে ডুবে আছে। শরীরের সবধরনের কার্যক্রম ব্রেনের নির্দেশে সম্পাদিত হয়ে থাকে। প্রতি মুহুর্তে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নার্ভাল সিস্টেমের মাধ্যমে আলোর গতিতে নির্দেশ দেয় এবং তথ্য আদান-প্রদান করে। যে নার্ভের মাধ্যমে ব্রেন দেহের বিভিন্ন জায়গায় তথ্য আদান প্রদান করে সেই নার্ভের শতকরা ৯৫ ভাগ পানি এবং সামান্য পরিমান মিনারেল আছে। শরীরে পানির পরিমাণ স্বাভাবিক লেভেল থেকে কমে গেলে প্রেরিত বার্তা বা সংকেত পৌঁছাতে বাধাপ্রাপ্ত হলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘিœত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্ধারিত লেভেল থেকে শতকরা ৫ ভাগ পানি শরীর থেকে কমে গেলে বেশির ভাগ মানুষ শতকরা ৩০ ভাগ এনার্জি বা কর্মশক্তি হারায়।
বর্তমান বিশ্বের গতিময় জীবনে বেশির ভাগ নরনারী  প্রয়োজনীয় পানি পান করেনা অথবা পারিপার্শ্বিকতার কারণে প্রয়োজনীয় পানি পান করা হয়ে উঠেনা। ফলে পানি স্বল্পতার কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। এই ধরনের পানি শূণ্যতা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকলে অনেক রোগ সৃষ্টি হতে পারে। রোগগুলির মধ্যে হাঁপানি, এলার্জি, মাইগ্রেন, আর্থারাইটিস, কোলেস্ট্রেরোল বৃদ্ধি, উচ্চরক্তচাপ, ক্লান্তি বোধ, মাথাব্যাথা, হাইপারটেনশন, অবসাদ, উদ্যামহীনতা এবং প্রবীণদের টাইপ- ২ ডায়াবেটিস উল্লেখযোগ্য। সাধারণত এই ধরনের রোগগুলির উপসর্গ দেখা দিলে ঔষধ সেবন না করে সারাদিন ব্যাপী ৮-১০ গ্লাস পানি (প্রতি গ্লাস ২৫০ মিলি) পান করলে এইসব রোগ থেকে সহসাই মুক্তি পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে প্রতিকাপ চা পান করলে ২ কাপ পানি শরীর থেকে কমে যায়। (১ কাপ চা পান করলে ২ কাপ পানি পান করতে হবে)।
পানির স্বল্পতা হলে শরীর অনেক রকম চিহ্ন, নিদর্শন এবং সংকেত দিয়ে থাকে। যেমন-পিপাঁসা, মুখ ও জিহবা শুকনো, অবসাদ, গাঁড় রঙ্গের প্রসাব, অনিয়মিত মূত্রত্যাগ, প্রসাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, শুস্ক চামড়া, ঢিলাচামড়া, কুঁচকানো চামড়া, দ্রুত নাড়ীর স্পদন, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, পেশীর খিঁচুনী, দুর্বল পেশী, চোখ বসে যাওয়া, মাথা হালকা বোধ হাওয়া, নারীদের মাসিকের বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি। যারা ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত ও নির্ধারিত পানিপান করতে পারেনা তাদের উপরের উপসর্গ দেখা দিলে কোন ঔষধ ব্যবহার না করে যদি শুধু বিশুদ্ধ পানি পান করেন তাহলেই সুস্থতা অনুভব করবেন।
শরীরে পানির কার্যক্রমঃ
(১) শরীরের সমস্ত কোষে পুষ্টি জোগান দিতে সাহায্য করে।
(২) যেখানে যে হরমোন প্রয়োজন সেখানে সেই হরমোন পানি দ্বারা পরিবাহিত হয়।
(৩) শরীরে উৎপাদিত সব ধরনের বর্জ্য এবং টক্সিন, নিঃসরণ নালীতে পরিবহন করে।
(৪) শরীরের অভ্যন্তরে যত রকমের রাসায়নিক ক্রিয়া বিক্রিয়া হয়, সেখানে পানি মিডিয়ার ভূমিকা পালন করে থাকে।
(৫) শরীরের তাপ নির্দিষ্ট পরিমানে রাখতে পানি সাহায্য করে। যদি তাপ বেশি হয়ে যায় তাহলে শরীরের অভ্যন্তরের পানি বাস্পে পরিণত হয়ে চামড়া এবং ফুসফুস দিয়ে বেরিয়ে যায় ফলে, শরীরের তাপ আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
(৬) পানি শরীরের বিভিন্ন অর্গান এবং হাঁড়ের সন্ধিস্থলে কুসনের মতো কাজ করে। যদি কোন সময় জোরে আঘাত লাগে তখন পানি অল্প হলেও ক্ষতির হাত থেকে আমাদের রক্ষা করে।
(৭) শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সন্ধিস্থলে পিচ্ছিল কারক হিসাবে কাজ করে।
(৮) সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হজম প্রক্রিয়া। হজম রসটা শতকরা ৮০ ভাগই পানি।
(৯) এই সবগুলির বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, শরীরের অভ্যন্তরে সমস্ত ধরণের রাসায়নিক কার্যক্রম পানি ছাড়া সংঘটিত হয় না।
সহজভাবে পানি পান করার নিয়মঃ
(১) ভোরে ৬০০ মিলি কুসুম গরম পানিতে ১ চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে পান করলে শরীরের অভ্যন্তরে ধোয়া মোছার কাজ করে।
(২) প্রতি ১ ঘন্টা পরপর পানি পান করলে শরীরের প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা পূরণ হয়।
(৩) খাবারের ১৫ মিনিট পূর্বে ১ গ্লাস এবং খাবারের ৩০ মিনিট পর ১ গ্লাস পানি পান করতে হবে এবং রাতে শোয়ার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত প্রতি ঘন্টায় ১ গ্লাস পানি পান করতে হবে। (খাবারের সাথে পানি পান করবেন না)
(৪) দিনের মধ্যে অন্তত ২ বার ১ গ্লাস গরম পানিতে ১ চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে (খালি পেটে) পান করতে হবে। লেবুর প্রধান উপাদান সাইট্রিক এসিড। পাকস্থলীতে প্রবেশ করার পর হজম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে Alkali রূপান্তরিত হয়ে শরীরে প্রয়োজনীয় এসিডের মাত্রা স্বাভাবিক রাখে।
(৫) সব সময় শরীরের তাপের (body temperature) সঙ্গে সমতা রেখে পানি পান করা উচিৎ।  ঠান্ডা পানি শরীরের অভ্যন্তরে কোমল অর্গানে প্রচন্ড শক/ধাক্কা দেয়, তখন তার স্বাভাবিক কার্যক্রম অল্প সময়ের জন্য থমকে যায়। কুসুম গরম পানি শরীর সহজেই গ্রহণ করে এবং কাজে লাগাতে পারে।
(৬) চা কিংবা কফি পানে অভ্যস্তদের প্রতিকাপ চা/কফিপান করার পর ১ গ্লাস বাড়তি পানির প্রয়োজন হবে।
(৭) চা কিংবা কোমল পানীয় দিয়ে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণ করা যাবে না। তবে ফলের রস, সবজি সুপ পানির পরিপুরক।
বিশুদ্ধ পানির বৈশিষ্ঠ :
ভূগর্ভস্থ থেকে আহরিত যে পানির বর্ণ, গন্ধ ও স্ব্দা থাকবেনা এবং যার মধ্যে মানবদেহের পাকস্থলী, লিভার, কিডনি ও ইনটেসটাইন এর জন্য উপকারী মিনারেলস্ ও এলিমেন্ট বিদ্যমান থাকে, তাকেই দেহের জন্য বিশুদ্ধ বলে বিবেচিত হয়। বর্তমান পৃথিবীতে ভূগর্ভস্থ আহরিত পানির মধ্যে জমজমের পানি সর্বশ্রেষ্ঠ। আনুমানিক প্রায় তিনহাজার বছর যাবৎ এই পানি এক অজানা উৎস থেকে প্রবাহিত হয়ে আসছে। বর্তমানে ও অতীতে এই পানি পান করে অনেক কঠিন রোগ নিরাময় হয়েছে। জমজমের পানি পান করে এ্যাজমার মত আজীবন রোগীও নিরাময়ের ঘটনা ঘটেছে।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় থেকে জানা যায় এক লিটার জমজমের পানিতে ২০০০ মি:গ্রা: উপকারী এলিমেন্ট রয়েছে। এই ২০০০ মি:গ্রা: মধ্যে মিনারেল আছে ২৫০  মি:গ্রা: সোডিয়াম, ২০০ মি:গ্রা: ক্যালসিয়াম, ২০ মি:গ্রা: পটাশিয়াম, ৫০ মি:গ্রা: ম্যাগনেসিয়াম আয়ন আছে যা অন্যান্য ভূর্গভস্থ পানির তুলনায় অনেক বেশী। এছাড়া অতি সামান্য (TRACE)  পরিমাণে সালফেট, বাইকার্বোনেট, নাইট্রেট, ফসফেট ও অ্যামোনিয়া বিদ্যমান যা হজমের জন্য উৎকৃষ্ট পানি, এটাই একমাত্র ভুর্গভস্থ পানি যা সংরক্ষণ করলে কোন শ্যাওলা বা জলজজীবানু জমতে পারেনা।
*জমজমের পানি না পেলেও বর্ণ, গন্ধ এবং স্বাদহীন পানিই দেহের জন্য উপকারী। একে ঔষধ হিসাবে আল্লাহ আমাদের নিয়ামত হিসেবে দিয়েছেন।
বিশুদ্ধ পানি দ্বারা চিকিৎসাঃ
জাপানে পানি চিকিৎসা (Hydro-therapy) বেশ জনপ্রিয়। সেদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা প্রমান করেছেন, শুধুমাত্র বিশুদ্ধ পানি দিয়ে নিম্নের রোগগুলি শতভাগ নিরাময় করা যায়। যেমনঃ মাথাব্যথা, শরীরে বিরামহীন ব্যথা বা যন্ত্রণা, হার্টের রোগ, বাত ব্যথা, দ্রুত হৃদপন্দন অতিরিক্ত ওজন, এ্যাজমা, টিবি, কফরোগ, মেনিনজাইটিস (মস্তিস্কঝিল্লির প্রদাহ) কিডনি এবং মূত্রবিষয়ক রোগ, বমি, গ্যাসট্রিক, ডায়রিয়া, ডায়াবেটিস, সব ধরনের চোখের রোগ, ক্যান্সার, মস্তিকের সমস্যা জনিত সবধরনের রোগ, কান, নাক এবং গলার সব ধরনের সমস্যা।
চিকিৎসা প্রণালী :
১। রাতে শোয়ার পূর্বে ভালো মতো দাঁত ব্রাশ করতে হবে।
২। ভোরে উঠে দাঁত ব্রাশ করার পূর্বে কুলি না করে ৬০০ মিলি কুসুম গরম পানিতে লেবুর রস  মিশিয়ে পান করতে হবে, এবং ১ ঘন্টা পেট খালি রাখতে হবে।
৩। ১ ঘন্টা পর দাত ব্রাঁশ করে নাস্তা গ্রহণ করতে হবে। নাস্তা স্বাস্থ্য সম্মত হওয়া বাঞ্চনীয়।
৪। প্রতিবার খাবারের ১৫ মিনিট পূর্বে ১ গ্লাস পানি পান করতে হবে এবং খাবার শেষ করে ৩০ মিনিট পর ১ গ্লাস পানি পান করতে হবে।
৫। এছাড়া রাতে শোয়ার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত প্রতি ঘন্টায় ১ গ্লাস হালকা কুসুম গরম পানি পান করতে হবে।
৬। “পানি চিকিৎসাকালীন” (water therapy)  সময়ে মাছ, মাংস, মুসুর ডাল, ঠান্ডা পানীয়, পোলাও, ভুনা, তেলে ভাজা ফাস্টফুড, যে কোন শুকনো ঠান্ডা খাবার, বাসি খাবার, সাদা ময়দার তৈরী যে কোন খাবার, চিনি এবং চিনির দ্বারা তৈরী সব ধরনের খাবার এবং আইসক্রিম বর্জন করতে হবে।
৭। সব খাবার গরম গরম খেতে হবে।
উপরোক্ত নিয়মগুলি মেনে চললে নিন্মে উল্লেখ করা রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় হতে সময় লাগবে না।
  • উচ্চরক্তচাপ-৩০ দিন (লবণ খাওয়া কমাতে হবে)।
  • গ্যাস্ট্রিক-১০ দিন।
  • ডায়াবেটিকস -৩০ দিন। (ভাত, রুটি কমিয়ে সবজির পরিমাণ বাড়াতে হবে)
  • কোষ্ঠ্যকাঠিন্য-১০দিন।
  • ক্যান্সার-১৮০ দিন। (সব ধরনের প্রোটিন এবং রান্না খাবার বর্জন করতে হবে)।
  • টিবি-৯০ দিন। সব ধরনের ঠান্ডা খাবার বর্জন করতে হবে।
  • আর্থারাইটিস রোগী প্রথম সপ্তাহে তিনদিন এবং পরের সপ্তাহ থেকে প্রতিদিন পানি চিকিৎসা নিতে হবে। সব ধরনের প্রোটিন বর্জন করতে হবে তাহলে ৩০ দিনের মধ্যে সেরে যাবে।
শহীদ আহমেদ ও আলমগীর আলম
খাদ্য ও অ্যাকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ
ন্যাচারোপ্যথি সেন্টার
83 নয়াপল্টন বি -7, জোনাকি সিনেমা হলের বিপরিতে মসজিদ গলি।
মোবাইল ০১৭১৫১১৮৮৮৯, ০১৬১১০১০০১১
SHARE

LEAVE A REPLY